—স্বাধীনতা দিবসে বিশেষ সম্পাদকীয়
১৭৫৭ সালের পলাশীর পরাজয় থেকে ১৯৭১ সালের ধানমণ্ডি ৩২-এর স্বাধীনতার ঘোষণা—বাঙালির ২১৪ বছরের রক্তস্নাত সংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস। জানুন কীভাবে অগণিত প্রাণের আত্মত্যাগ আর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অর্জিত হলো আমাদের লাল-সবুজ পতাকা। ২৬শে মার্চ বিশেষ সম্পাদীয় কলাম।
বাংলার ইতিহাস এক দীর্ঘ সংগ্রামের, এক অবিরাম প্রতিরোধের, এক অদম্য আত্মমর্যাদার কাহিনি। এই কাহিনির সূচনা অনেক আগেই—১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ থেকে। আর এর এক মহান পরিণতি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তার প্রতীকী কেন্দ্র ধানমন্ডি ৩২। এই দীর্ঘ দুই শতাব্দীর পথচলায় রয়েছে শোষণ, বিদ্রোহ, ত্যাগ, নেতৃত্ব এবং এক অবিস্মরণীয় জাতির জন্মের গল্প।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে যখন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটছে, তখন কি কেউ জানত এই অন্ধকারের ব্যাপ্তি হবে দীর্ঘ ২১৪ বছর? সেই নিঝুম দুপুরে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা আর রবার্ট ক্লাইভের চতুরতায় বাংলার আকাশে যে পরাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছিল, তার সমাপ্তি ঘটানোর বীজ বপন করা ছিল ইতিহাসের এক অনিবার্য বাঁকে। পলাশী থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর—এই পথটুকু কেবল ভৌগোলিক দূরত্ব নয়, বরং একটি জাতির শৃঙ্খল ভাঙার মহাকাব্যিক পথপরিক্রমা।
মহান স্বাধীনতা দিবসের প্রেরণায় বাংলার দীর্ঘ দুই শতাব্দীরও অধিক স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে পাঠকের সামনে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর বোধে তুলে ধরার প্রয়াসে এই সম্পাদকীয় নিবন্ধটি চারটি তাৎপর্যপূর্ণ অংশে বিন্যস্ত করা হয়েছে। প্রথম অংশে অস্তমিত সূর্যের মতো নিভে যাওয়া স্বাধীনতার আলো এবং দীর্ঘ পরাধীনতার অন্ধকার রজনীর ভেতরেও কীভাবে বাঙালির মনে স্বাধীনতার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল, তার ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশে পলাশীর বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষত থেকে শুরু করে একাত্তরের রক্তঝরা সংগ্রাম পর্যন্ত গণমানুষের ত্যাগ, বীরত্ব ও অদম্য প্রতিরোধের কাহিনি চিত্রিত হয়েছে। তৃতীয় অংশে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের একটি সাধারণ বাড়িকে কেন্দ্র করে জাতির মুক্তির স্বপ্ন, নেতৃত্ব ও চূড়ান্ত সংগ্রামের প্রতীকী তাৎপর্য গভীর আবেগে উপস্থাপন করা হয়েছে। আর চতুর্থ অংশে অশ্রু, আগুন ও আত্মত্যাগে রঞ্জিত ২১৪ বছরের ইতিহাসকে এক বিস্তৃত চিত্রকল্পে রূপ দিয়ে পলাশীর রক্তাক্ত প্রান্তর থেকে একাত্তরের বিজয়োল্লাস পর্যন্ত বাঙালির অমর অভিযাত্রাকে এক অনন্য বর্ণনায় ধারণ করার চেষ্টা করা হয়েছে—যা পাঠকের সামনে শুধু ইতিহাস নয়, বরং এক জাতির আত্মপরিচয়ের দীপ্ত প্রতিচ্ছবি উন্মোচিত করবে। নিচে ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি অংশ তুলে ধরা হলো:
অংশ এক
অস্তমিত সূর্য ও দীর্ঘ রজনী: পরাধীনতার শৃঙ্খলে স্বাধীনতার বীজ বপন।
[ধারাবাহিক ইতিহাস]
পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার সমাজ ও অর্থনীতিতে যে ধস নেমেছিল, তা ছিল অবর্ণনীয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এদেশকে কেবল তাদের শোষণের চারণভূমি হিসেবে ব্যবহার করেছে। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর থেকে শুরু করে নীল চাষিদের ওপর অত্যাচার—বাঙালি বারে বারে ফুঁসে উঠেছে। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা কিংবা ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ছিল সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব আর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়া মুক্তি ছিল সুদূরপরাহত।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক পরাজয় ছিল না; এটি ছিল বাংলার স্বাধীন সত্তার পতনের সূচনা। নবাব সিরাজউদ্দৌলা-এর পরাজয়ের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এই সময় থেকেই শুরু হয় শোষণ, লুণ্ঠন এবং উপনিবেশিক শাসনের নির্মম অধ্যায়।
কৃষক, শ্রমিক, কারিগর—সকল শ্রেণির মানুষের ওপর আরোপিত হয় করের বোঝা, ধ্বংস হয় শিল্প, ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি। কিন্তু এই নিপীড়নের মাঝেই জন্ম নেয় প্রতিরোধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ।
প্রারম্ভিক প্রতিরোধ: ফকির-সন্ন্যাসী থেকে তিতুমীর
১৮শ ও ১৯শ শতকে বাংলার মানুষ একাধিক বিদ্রোহের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, চুয়াড় বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ—সবগুলোই ছিল শোষণের বিরুদ্ধে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। এই ধারার এক উজ্জ্বল নাম তিতুমীর, যিনি ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে বাঁশের কেল্লা গড়ে তোলেন। তার সংগ্রাম প্রমাণ করে, বাংলার মানুষ কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেনি।
বঙ্গভঙ্গ ও জাতীয়তাবাদের উত্থান
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বাংলার ইতিহাসে নতুন মোড় নেয়। ব্রিটিশরা প্রশাসনিক অজুহাতে বাংলাকে ভাগ করলেও এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য—হিন্দু-মুসলিম বিভাজন সৃষ্টি করা।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত উল্টো বাংলার মানুষকে একত্রিত করে। স্বদেশি আন্দোলন, বয়কট আন্দোলন—সব মিলিয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই সময়ের নেতাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
দ্বিজাতি তত্ত্ব ও পাকিস্তানি শোষণের সূচনা
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা বিদায় নিল ঠিকই, কিন্তু রেখে গেল 'দ্বিজাতিতত্ত্বের' এক বিষবৃক্ষ। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হলো। পূর্ব বাংলার মানুষ ভাবল তারা মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই মোহভঙ্গ হলো। দেখা গেল, ব্রিটিশ শোষকদের জায়গা নিয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। করাচি আর রাওয়ালপিন্ডি থেকে নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু করল সোনার বাংলার ভাগ্য।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু খুব দ্রুতই শুরু হয় বৈষম্য। ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রেই বাঙালিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য।
ভাষা আন্দোলন: প্রথম স্ফুলিঙ্গ
১৯৪৮ সালে যখন জিন্নাহ ঘোষণা করলেন, "Urdu and Urdu shall be the only state language of Pakistan", তখন থেকেই বাঙালির হৃদয়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের রক্তে রঞ্জিত হলো রাজপথ। এই আন্দোলন কেবল ভাষার ছিল না, এটি ছিল আত্মপরিচয় রক্ষার প্রথম লড়াই। আর এই লড়াইয়ের অগ্রভাগে থেকে বারবার কারাবরণ করছিলেন এক বলিষ্ঠ যুবক—শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫২-এর রক্তদানই বাঙালির মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছিল যে, লড়াই ছাড়া অধিকার আদায় সম্ভব নয়। এটা বলা হয়ে থাকে যে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতিসত্তার প্রথম বড় জাগরণ। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার—তাদের আত্মত্যাগ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং জাতির চেতনায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে।
ধূমকেতুর মতো উত্থান
পঞ্চাশ ও ষাটের দশক ছিল বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রস্তুতির সময়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের আইয়ুব খানের সামরিক শাসন—প্রতিটি ঘটনাই বাঙালিকে স্বাধীনতার দিকে এক ধাপ এগিয়ে দিচ্ছিল। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পেশ করলেন বাঙালির 'ম্যাগনা কার্টা' খ্যাত ৬ দফা। এটি ছিল স্বায়ত্তশাসনের এমন এক দাবি, যা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। এর ফলস্বরূপ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করল, পাহাড়সম বাধা দিয়েও গণজোয়ার ঠেকানো যায় না। আর এই ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানি শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। ছাত্র, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ—সবাই একত্রিত হয়ে স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হয়।
১৯৭০: ম্যান্ডেট ও শেষ অঙ্ক
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানি জান্তা সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। এতে পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর ফলে মার্চের শুরু থেকেই পুরো দেশ অচল হয়ে পড়ে। অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সারা বাংলা তখন উত্তাল। সবার চোখ তখন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সেই বাড়িটির দিকে। যে বাড়িটি হয়ে উঠেছিল একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।
৭ই মার্চের মহাকাব্য
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দিলেন, তা ছিল এক অঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণা। "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” —এই ১৮ মিনিটের বজ্রকণ্ঠ সাত কোটি মানুষকে একবিন্দুতে নিয়ে আসে। তিনি ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার ডাক দিলেন। বাঙালির হাতে তখন আর কেবল লাঠি ছিল না, ছিল মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
কালরাত, স্বাধীনতার ঘোষণা ও মহিমান্বিত বিজয় - অপারেশন সার্চলাইট: ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ। মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘুমন্ত ঢাকাবাসীর ওপর। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকে পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে পুরান ঢাকার অলিগলি—সবখানেই চলল পৈশাচিক উন্মত্ততা। 'অপারেশন সার্চলাইট' নাম দিয়ে শুরু হলো ইতিহাসের নৃশংসতম সেই গণহত্যা। সেই কালরাতে কেবল প্রাণ ঝরেনি, বরং এক জাতির স্বপ্নকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক বর্বরোচিত ষড়যন্ত্র চলেছিল সারা দেশজুড়ে। বাংলার মাটি সেদিন ভিজে গিয়েছিল নিরপরাধ মানুষের তপ্ত রক্তে।
ধানমণ্ডি ৩২: শৃঙ্খল ভাঙার অমোঘ ঘোষণা
২৬শে মার্চের প্রথম প্রহর। পাকিস্তানি জান্তার হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে, ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের সেই ঐতিহাসিক বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অকুতোভয় চিত্তে ওয়ারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করেন। তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠের বার্তা নিমিষেই ছড়িয়ে পড়ে পদ্মা-মেঘনা-যমুনার প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি হৃদয়ে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর আম্রকাননে মীরজাফরদের ষড়যন্ত্রে যে মানচিত্র আমরা হারিয়েছিলাম, দীর্ঘ ২১৪ বছর ৫ মাস ২৪ দিন পর সেই একই মাটির বুক থেকে এক জাদুকরী নেতৃত্বের হাত ধরে তা ফিরে পাওয়ার চূড়ান্ত লড়াই শুরু হলো। ধানমণ্ডি ৩২ তখন কেবল একটি ঠিকানা নয়, বরং অবিনাশী এক প্রতিরোধের দুর্গে পরিণত হলো।
মুক্তিকামী বাঙালির এই অসম লড়াইয়ে ভারতসহ আন্তর্জাতিক মহলের অকুন্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা মুক্তিযুদ্ধকে এক অপরাজেয় শক্তিতে রূপ দেয়। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান আর অগণিত মানুষের ত্যাগের মহিমায় অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় পরম কাঙ্ক্ষিত বিজয়। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যখন শত্রুবাহিনী মাথা নত করল, তখন বাংলার আকাশে উদিত হলো এক নতুন সূর্য।
অংশ দুই
রক্তে লেখা মানচিত্র: পলাশী থেকে একাত্তরের বীরগাথা ও গণমানুষের লড়াই
[স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান]
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন, এক অভিশপ্ত বৃহস্পতিবার। পলাশীর আম্রকাননে বিশ্বাসঘাতকতার কালো মেঘে ঢাকা পড়েছিল বাংলার স্বাধীনতার সূর্য। সেইদিন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় কেবল একটি যুদ্ধের অবসান ছিল না, বরং তা ছিল বাঙালির পরাধীনতার দীর্ঘ অমানিশার শুরু। ইতিহাসের পাতায় সেই যে হাহাকার শুরু হয়েছিল, তার পূর্ণ অবসান ঘটাতে বাঙালিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও একটি শুক্লপক্ষের 'শুক্রবার'-এর জন্য। মাঝখানের এই সময়টুকু কেবল দিনপঞ্জির পাতা ওল্টানো ছিল না; বরং তা ছিল ২১৩ বছর ৯ মাস ৪ দিন অথবা ২৫৬৫ মাস ৪ দিন অথবা ১১১৫৩ সপ্তাহ ২ দিন অথবা ৭৮০৭৩ ক্যালেন্ডার দিনের এক নিরবচ্ছিন্ন অগ্নিপরীক্ষা। মুষ্টিমেয় মীরজাফর আর কালান্তরের রাজাকারদের কলঙ্কিত ইতিহাস বাদ দিলে, এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথে প্রতিটি বাঙালির রক্ত আর ঘাম মিশে আছে এক অভিন্ন মোহনায়।
১৭৫৭ সালের সেই বিষাদময় পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, তাকে পুনরায় উদিত করতে দীর্ঘ দুই শতকেরও বেশি সময় ধরে চলেছে এক অবিরাম ও অসম লড়াই। এই সুদীর্ঘ কালপরিক্রমায় বাংলার প্রতিটি আন্দোলন—তা হোক ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ কিংবা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ—পরিচালিত হয়েছে এমন কিছু কালজয়ী নেতৃত্বের হাত ধরে, যারা সময়ের প্রয়োজনে হয়ে উঠেছিলেন একেকজন আলোকবর্তিকা। এই সংগ্রামের ইতিহাসে কোনো একক ব্যক্তির অবদানকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি ছিল তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা থেকে শুরু করে প্রীতিলতার আত্মাহুতি, আর নেতাজির বজ্রকণ্ঠ থেকে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের তর্জনী হেলনের এক অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র। ইতিহাসের এই মহানায়কদের অবদান মূল্যায়ন করতে গেলে দেখা যায়, কেউ যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্র হাতে লড়েছেন, কেউ কলম দিয়ে জাগিয়েছেন সুপ্ত জনতাকে, আবার কেউ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে এক সুতায় গেঁথেছেন কোটি বাঙালিকে। তাঁদের প্রত্যেকের ত্যাগ ও দূরদর্শিতার সমন্বিত রূপই আজকের এই মানচিত্র।
পলাশীর প্রান্তরে ১৭৫৭ সালে যে পরাজয়ের কালো ছায়া নেমে এসেছিল—যা ইতিহাসে পরিচিত পলাশীর যুদ্ধ নামে—তা শুধু একটি যুদ্ধের হার ছিল না; বরং ছিল একটি জাতির দীর্ঘ দাসত্বের সূচনা। কিন্তু এই পরাজয়ের ভেতরেই নিভে যায়নি প্রতিরোধের আগুন। বরং সময়ের প্রবাহে, গ্রাম থেকে নগর, সাধু থেকে সৈনিক—সবাই মিলে সেই আগুনকে বারবার প্রজ্বলিত করেছে। নিচের সারণিটি যেন সেই সংগ্রামের এক সংক্ষিপ্ত মানচিত্র, যেখানে প্রতিটি সময়কাল এক একটি জাগরণের গল্প বলে।
বাংলার এই মুক্তি-সংগ্রামের পথটি ছিল কণ্টকাকীর্ণ ও রক্তঝরা। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের বারুদ থেকে শুরু করে ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন, ১৯৪৭-এর দেশভাগ, ৫২-র রক্তভেজা ভাষা আন্দোলন এবং ৬৯-এর উত্তাল গণ-অভ্যুত্থান—প্রতিটি ঘটনাই ছিল ১৯৭১-এর চূড়ান্ত বিজয়ের সোপান। এই সুদীর্ঘ মিছিলে অগ্রভাগে ছিলেন তিতুমীরের মতো অকুতোভয় বীর, হাজী শরীয়তুল্লাহর মতো সংস্কারক, আর বাঘা যতীন, সূর্য সেন ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো বিপ্লবীরা, যারা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে ছিনিয়ে আনতে চেয়েছিলেন ভোরের আলো।
১৭৬০ থেকে ১৮০০ সাল—পলাশীর ক্ষত তখনও তাজা। বাংলার গ্রামগঞ্জে শুরু হয় ফকির-সন্ন্যাসীদের এক অনন্য প্রতিরোধ। ধর্মীয় সাধনার আড়ালে তারা হয়ে ওঠেন শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী যোদ্ধা। মজনু শাহ এবং ভবানী পাঠক-এর নেতৃত্বে এই আন্দোলন ছিল একদিকে আধ্যাত্মিক, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিরোধের এক অপূর্ব মিশেল। তারা প্রমাণ করেছিলেন—অস্ত্র না থাকলেও আত্মশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়।
১৮৩১ সালে বাংলার আকাশে আবারও প্রতিরোধের বজ্রধ্বনি শোনা গেল বারাসাতে। তিতুমীর—একজন কৃষকনেতা, এক সাধারণ মানুষ—নিজের হাতে গড়ে তুললেন বাঁশের কেল্লা। তাঁর নেতৃত্বে বারাসাত বিদ্রোহ শুধু ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে নয়, সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধেও ছিল এক তীব্র প্রতিবাদ। তিতুমীরের সেই বাঁশের কেল্লা আজও প্রতীক হয়ে আছে সাহস আর আত্মত্যাগের।
১৮৫৭ সালে সারা ভারত উপমহাদেশ জুড়ে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে সিপাহী বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহে সৈনিকরা আর নিছক চাকর ছিলেন না—তারা হয়ে উঠেছিলেন স্বাধীনতার দাবিদার। মঙ্গল পাণ্ডে-এর মতো সাহসী সৈনিকরা প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেন। যদিও বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত দমন করা হয়, কিন্তু স্বাধীনতার বীজ তখন গভীরভাবে বপন হয়ে যায়।
১৯০৫ থেকে ১৯৩০—এই সময়টি ছিল সশস্ত্র বিপ্লবের যুগ। তরুণদের রক্তে তখন জ্বলে উঠেছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন। খুদিরাম বসু, সূর্য সেন এবং বাঘা যতীন—তাদের নাম উচ্চারণ মানেই এক অগ্নিযুগের স্মৃতি। তারা দেখিয়ে দিয়েছিলেন, স্বাধীনতা কেবল দাবি করে পাওয়া যায় না, প্রয়োজনে প্রাণ দিয়েও তা ছিনিয়ে নিতে হয়।
১৯৪২ থেকে ১৯৪৭—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার আন্দোলন পেল নতুন গতি। “ভারত ছাড়ো” আন্দোলনের ঢেউ আর আজাদ হিন্দ ফৌজ-এর সাহসী পদযাত্রা ব্রিটিশ শাসনের ভিতকে আরও দুর্বল করে দেয়। সুভাষচন্দ্র বসু, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মাওলানা ভাসানী প্রমুখ —তাদের নেতৃত্বে এই সময়টি ছিল কৌশল, রাজনীতি এবং সশস্ত্র সংগ্রামের এক জটিল কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।
অবশেষে ১৯৫২ থেকে ১৯৭১—এই সময়টি বাঙালির আত্মপরিচয়ের লড়াইয়ের চূড়ান্ত পর্ব। ভাষা আন্দোলন দিয়ে শুরু হয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-এ এসে শেষ হয় এই দীর্ঘ সংগ্রাম। শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা ভাসানী এবং অসংখ্য বীরশ্রেষ্ঠ ও মুক্তিযোদ্ধা তাদের রক্ত ও ত্যাগ দিয়ে এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দেন—বাংলাদেশ।
কেবল রণক্ষেত্রেই নয়, কলম আর প্রজ্ঞা দিয়ে এই লড়াইকে শাণিত করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো কালজয়ী সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা। সমান্তরালভাবে রাজনীতির ময়দানেও জেগে উঠেছিল স্বাধীনতার বজ্রনিনাদ। এই মাটির কোলেই অঙ্কুরিত হয়েছিল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মতো রাজনৈতিক ধারা, যা সময়ের আবর্তে জন্ম দিয়েছিল শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর মতো মহীরুহদের
অপরদিকে পলাশীর পরাজয়ের দিন ২৩ জুন ১৯৪৮ বাংলাদেশের চূড়ান্ত মুক্তিসংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের আত্মপ্রকাশ ঘটে, আর এই দলের মাধ্যমে মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটেছিল। বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত নেতৃত্বে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্ত হয়েছিল।
তাঁর তর্জনীর ইশারায় নিরস্ত্র বাঙালি জাতি একাত্তরে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। অস্ত্র ধারণ হোক বা সমর্থন—আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকল সাধারণ মানুষই আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে একেকজন অমর সেনানী; যাঁদের ত্যাগ ছাড়া আজকের এই লাল-সবুজ পতাকার স্বপ্নও কল্পনা করা যেত না।
এই চূড়ান্ত মুক্তিসংগ্রামে তাঁকে সহায়তা করেন জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি সশস্ত্র সংগ্রামেও এগিয়ে আসেন জাতির সূর্যসন্তানরা। সেনানায়ক জেনারেল বঙ্গবীর এম. এ. জি. ওসমানীর নেতৃত্বে জেড ফোর্সে মেজর জিয়াউর রহমান, কে ফোর্সে খালেদ মোশারফ এবং এস ফোর্সে মেজর শফিউল্লাহ—তাঁদের অধীনে সেক্টর কমান্ডার, বীর সামরিক ও বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধারা সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করেন।
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী কিংবা ক্র্যাক প্লাটুনের মতো সাহসী সংগঠনে যুক্ত অসংখ্য সাধারণ মানুষও সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। একই সঙ্গে দেশের আপামর জনসাধারণ অকুণ্ঠ সমর্থন, ত্যাগ ও আত্মনিবেদনের মাধ্যমে এই মহান মুক্তিযুদ্ধকে বিজয়ের চূড়ায় পৌঁছে দেয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল এক সর্বাত্মক জনযুদ্ধ। মুক্তিবাহিনী গড়ে ওঠে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে। এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন রাজনৈতিক নেতা, সামরিক কর্মকর্তা ও সাধারণ জনগণ। তাজউদ্দীন আহমদ-এর নেতৃত্বে গঠিত হয় প্রবাসী সরকার। এম এ জি ওসমানী ছিলেন সেনাপ্রধান। নারীরাও পিছিয়ে ছিলেন না। বেগম রোকেয়া-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অসংখ্য নারী সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন এবং সহায়তা করেন।
উপরের আলোচনা থেক স্পষ্ট যে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম এক অবিরাম সংগ্রামের কাহিনি। পলাশীর পরাজয়ের অন্ধকার থেকে শুরু করে স্বাধীনতার সূর্যোদয় পর্যন্ত—প্রতিটি অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কখনো থেমে থাকে না; তা গড়ে ওঠে মানুষের সাহস, ত্যাগ আর অদম্য আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তির কীর্তি নয়; এটি একটি সমষ্টিগত সংগ্রামের ফল—যেখানে প্রতিটি শহীদ, প্রতিটি সংগ্রামী, প্রতিটি সাধারণ মানুষের অবদান চিরস্মরণীয়।
অংশ তির
ধানমণ্ডি ৩২: একটি বাড়ির ইটে মিশে থাকা বাঙালির মুক্তির মহাকাব্য
[চূড়ান্ত সংগ্রামের প্রতীক]
ব্যস্ত ধানমন্ডির লেকের শান্ত শীতল হাওয়ায় মিশে আছে এক বিষাদমাখা বীরত্বের আখ্যান। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর—কেবল একটি সড়কের নাম নয়, বরং বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের আতুরঘর এই বাড়িটি ১৯৯৪ সালের ১৪ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে সময়ের এক নীরব সাক্ষী হয়ে।
আসলেই ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর—একটি সাধারণ বাড়ির ঠিকানা থেকে যা হয়ে উঠেছে একটি জাতির মানচিত্রের সূতিকাগার। বাঙালির দীর্ঘ মুক্তি-সংগ্রামের ইতিহাসে এই বাড়িটি কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপত্য নয়, বরং এটি ছিল অধিকার আদায়ের অবিরাম আন্দোলনের এক জীবন্ত সদরদপ্তর। ষাটের দশকের উত্তাল দিনগুলোতে যখনই বাঙালির অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, এই বাড়ির বারান্দা আর বসার ঘর থেকেই ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিরোধের ডাক। ১৯৬২-এর আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ৯৬৬-এর বাঙালির মুক্তিসনদ 'ছয় দফা' ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের রণকৌশল—সবকিছুরই অলিখিত কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই ঐতিহাসিক আঙিনা।
যে বাড়িটি একসময় প্রাণকেন্দ্র ছিল, ছিমছাম নকশার এই বাড়িটির প্রতিটি দেয়াল যেন আজও বলে যায় এক মহানায়কের সাধারণ জীবন যাপনের গল্প।
এই বাড়িটি সাক্ষী হয়ে আছে এক মহাকাব্যিক রূপান্তরের। ১৯৭০-এর নির্বাচনে বিশাল জয়ের পর যখন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্রের জাল বুনছিল, তখন এই ৩২ নম্বরই ছিল সারা বাংলার মানুষের আশার প্রদীপ। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে সেই কালজয়ী ভাষণের আগে ও পরে, এই বাড়ির প্রতিটি কক্ষ যেন রণপ্রস্তুতির এক নীরব সাক্ষী হয়ে উঠেছিল। ২৫শে মার্চের সেই বিভীষিকাময় কালরাতে, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার চূড়ান্ত 'স্বাধীনতার ঘোষণা' যখন এই বাড়ি থেকেই প্রচারিত হলো, তখন তা আর কেবল একটি বাসভবন রইল না; তা হয়ে উঠল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের অবিনাশী এক দুর্গ।
স্বাধীনতার পর ধানমণ্ডি ৩২ হয়ে ওঠে নবজাতক রাষ্ট্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, কূটনীতি আর স্বপ্নের বুনন চলেছে এই ছাদের নিচেই। পরবর্তীতে এটি 'বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর' হিসেবে রূপ নিয়ে সময়ের এক মহাকাব্যিক ধারক হয়ে দাঁড়ায়। এর সিঁড়ি, দেয়াল আর প্রতিটি সংরক্ষিত স্মৃতিচিহ্ন আজও ফিসফিস করে বলে যায় এক অসম সাহসী নেতার গল্প এবং একটি জাতির রক্তাক্ত জন্মের ইতিহাস।কালের পরিক্রমায় ধানমণ্ডি ৩২ পরিণত হয়েছিলো এক জাতীয় সম্পদে। মালিকানা চলে যায় রাষ্ট্রের কাছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সেই কালরাত এই বাড়ির আঙিনায় এক অপূরণীয় শূন্যতা বয়ে নিয়ে আসে। একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের বুলেটের আঘাতে সপরিবারে প্রাণ হারান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সিঁড়িতে পড়ে থাকা তাঁর নিথর দেহ আর দেয়ালের বুলেটের চিহ্নগুলো ১৯৮১ সালে নির্বাসন থেকে ফিরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যখন এই বাড়িতে পা রাখেন, তখন বাড়িটি ছিল এক ধ্বংসস্তূপের মতো। লোনা ধরা দেয়াল আর অযত্নে পড়ে থাকা বাবার স্মৃতিগুলো আগলে ধরে তিনি একে রূপান্তর করেন এক অনন্য সংগ্রহশালায়। ঋণের দায়ে নিলামে ওঠার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া এই স্মৃতিবিজড়িত ঘরগুলো আজ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থান।
তবে ইতিহাসের পথ সবসময় মসৃণ থাকে না। সাম্প্রতিক সময়ে এই ঐতিহাসিক স্মৃতির ওপর আসা আঘাত আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। ধানমণ্ডি ৩২-এর গুরুত্ব কেবল অতীতচারিতায় নয়, বরং এর গুরুত্ব নিহিত রয়েছে বাঙালির আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াইয়ে। এই বাড়িটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি জাতির অস্তিত্ব টিকে থাকে তার ইতিহাসের স্মারকগুলোকে যথাযথ মর্যাদায় রক্ষার ভেতর দিয়ে। এটি কেবল একটি জাদুঘর নয়, বরং বাঙালির সংগ্রাম, বেদনা এবং বিজয়ের এক অবিনাশী প্রতীক—যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
তাই বলা যায় ৩২ কেবল একটি বাড়ি নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্বের এক অবিনাশী প্রতীক। এই প্রাঙ্গণ থেকেই জন্ম নিয়েছিল একটি জাতির মানচিত্র, আর এই আঙিনা থেকেই ধ্বনিত হয়েছিল শৃঙ্খলমুক্তির চূড়ান্ত ঘোষণা। ইতিহাসকে যারা ভালোবাসেন এবং যারা আগামীদিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চান, তাদের প্রত্যেকের কাছে এই বাড়িটি এক পরম তীর্থস্থান। কালের পরিক্রমায় ধানমন্ডি ৩২ শুধু একটি ব্যক্তিগত বাসস্থানের পরিচয় ছাপিয়ে হয়ে ওঠেছেবাঙালির মুক্তি সংগ্রামের মানচিত্র এবং আগামীর পথে এগিয়ে যাওয়ার অবিনাশী চেতনা।
নিতে একটি কবিতার মাধ্যমে
৩২ নম্বরের অমর কাব্য
[একটি কবিতা]
শেষ কথা: হৃদয়ে আঁকা মানচিত্র ও আমাদের দায়বদ্ধতা
আজকের শান্ত সকালে যখন আমরা শুদ্ধস্বরে জাতীয় সংগীত গাই, একুশের ভোরে যখন নগ্নপায়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করি, কিংবা ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয়োল্লাসে লাল-সবুজের পতাকা উড়াই—তখন মানসপটে ভেসে ওঠে সেই সব অবিনাশী মুখ। খুদিরামের সেই নির্ভীক হাসি, বাঘা যতীনের দুর্জয় সাহস, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের আকাশছোঁয়বীরত্ব আর লাখো জননীর নীরব অশ্রুধারা। তাঁদের এই রক্ত আর চোখের জলই আজ আমাদের বুকের ভেতর দেশপ্রেমের অনির্বাণ শিখা হয়ে জ্বলছে।
পলাশীর সেই বিষাদময় পরাজয় থেকে শুরু করে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক সোপান—এই দীর্ঘ যাত্রাপথ কেবল শুষ্ক ইতিহাস নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয় খোঁজার এক মহাকাব্যিক পথচলা। এই ইতিহাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, বাঙালি জাতি কখনোই পরাধীনতার শৃঙ্খলকে নিয়তি বলে মেনে নেয়নি। প্রতিটি যুগে, প্রতিটি সন্ধিক্ষণে কেউ না কেউ বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বুলেটের সামনে মেলে ধরেছেন অবিনত মস্তক।
এই সুদীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের জন্য রেখে গেছে কিছু অমোঘ শিক্ষা:
- অর্জনের কণ্টকপথ: স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক উপহার নয়; এটি দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অবিরাম সংগ্রামের ফসল।
- ত্যাগের মহিমা: সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ছাড়া কোনো মহৎ অর্জন সম্ভব নয়—এ মাটি তার সাক্ষী।
- ঐক্যের শক্তি: যখনই আমরা বিভেদ ভুলে এক হয়েছি, তখনই বিশ্বের কোনো পরাশক্তি আমাদের দমাতে পারেনি।
পূর্বসূরিদের সেই রক্তের ঋণ আমরা কোনোদিন শোধ করতে পারব না। তবে আজ এই বিজয়ের দাঁড়িয়ে আমরা এইটুকু প্রতিজ্ঞা করতে পারি—তাঁদের রক্তে কেনা এই স্বাধীনতাকে আমরা ধূলিমলিন হতে দেব না। তাঁদের দেখা প্রতিটি অপূর্ণ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই হোক আমাদের প্রজন্মের মূল লক্ষ্য। পলাশীর পরাজয় থেকে একাত্তরের বিজয়—এই আগুন যেন আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে।
চূড়ান্ত প্রতিফলন: পতন থেকে পুনরুত্থান
১৭৫৭ সালের সেই পরাজয়ের গ্লানি ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে এসে এক দৃপ্ত বিজয়ের সংকল্পে রূপান্তরিত হয়েছিল। পলাশী যদি হয়ে থাকে আমাদের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার ট্র্যাজেডি, তবে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর হলো বাঙালির জাতিসত্তার পুনরুত্থানের এক অমর মহাকাব্য। এই ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—সত্য ও ন্যায়ের লড়াইয়ে পরাজয় নেই, কেবল আছে এক গৌরবময় উদয়।
অংশ চার
অশ্রু, আগুন ও অমরত্ব: পলাশীর রক্তাক্ত প্রান্তর থেকে একাত্তরের বিজয়োল্লাস
[একটি ছবির মাধ্যমে ২১৪ বছরের ইতিহাস বর্ণনা]
একটি ছবি হাজারো কথা বলে। পলাশীর রক্তাক্ত মাটি থেকে স্বাধীনতার লাল সূর্য — ইতিহাসের ঘটনাসমূহের বর্ণনা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে নিচের ছবিতে।

প্রিয় পাঠক,
অনুরোধ করছি একমিনিটের জন্য ছবিটিতে ভালো করে দেখুন । কি দেখছেন?
এবার দেখি উপরের ছবিটি আমাদের কি বলছে?
এই ছবিটি আমাদের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরো যাত্রাকে একটি শক্তিশালী, আবেগঘন দৃশ্যে ধরে রেখেছে। ছবির প্রতিটি অংশ একেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায়কে প্রতিনিধিত্ব করে। নিচে ধাপে ধাপে সেই ঘটনাগুলোর সহজ ও আবেগময় বর্ণনা দেওয়া হলো:
- খুদিরাম বসু (১৯০৮): ১৮ বছর বয়সে ফাঁসির মঞ্চে হাসতে হাসতে যান।
- বাঘা যতীন (১৯১৫): বালেশ্বরের জঙ্গলে একা ইংরেজ সেনার সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন। তাদের আত্মত্যাগ বাংলার যুবকদের মনে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
- বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, হামিদুর রহমানসহ হাজার হাজার শহীদ প্রাণ দেন।
- মা-বোনেরা অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করেন। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়।
এই একটি ছবিতেই ধরা পড়েছে বাঙালির দুইশো বছরের আত্মত্যাগ, কান্না, লড়াই ও শেষ পর্যন্ত বিজয়ের গল্প। প্রতিবার দেখলে বুকের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে, চোখে জল আসে, আর মনে হয় — এই স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে, তাদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না।
জয় বাংলা। জয় বাঙালির অমর সংগ্রাম।
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক, বীর শহীদদের স্মৃতি অমর থাকুক।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#স্বাধীনতাদিবস #২৬শেমাচ #বাংলাদেশ #বঙ্গবন্ধু #ধানমণ্ডি৩২ #পলাশীথেকেএকাত্তর #মুক্তিরসংগ্রাম #ইতিহাস #Editorial #IndependenceDayBD #BangladeshHistory

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: