নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী পর চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছানোর ঐতিহাসিক মিশন শেষে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন নাসার আর্টেমিস-২ (Artemis II) মিশনের চার নভোচারী। শনিবার (১১ এপ্রিল) বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা ৭ মিনিটে তাদের বহনকারী ওরিয়ন ক্যাপসুলটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে। ১০ দিনের এই রোমাঞ্চকর অভিযানে কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং জেরেমি হ্যানসেন পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে দূরে ভ্রমণের নতুন রেকর্ড গড়েছেন। পৃথিবী থেকে তাদের সর্বোচ্চ দূরত্ব ছিল ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৭ মাইল, যা ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো-১৩ মিশনের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
অবতরণ ও বর্তমান অবস্থা
ওরিয়ন ক্যাপসুলটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর প্যারাসুটের মাধ্যমে সাগরে অবতরণ (স্প্ল্যাশডাউন) করে। অবতরণের পর কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান জানান সবাই সুস্থ এবং স্থিতিশীল আছেন। মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস জন পি. মার্থা-তে তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। বর্তমানে তারা হাসিমুখে জাহাজের ডেকে হাঁটাহাঁটি করছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বুঝতে তাদের নাড়ির গতি, রক্তচাপ এবং স্নায়ুর কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন নাসার চিকিৎসকরা।
মহাকাশ ভ্রমণে শরীরে কী কী পরিবর্তন হয়?
আর্টেমিস-২ মিশন সফল হলেও বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ নভোচারীদের শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে। মাইক্রোগ্রাভিটি বা শূন্য মাধ্যাকর্ষণে থাকার ফলে মানবদেহে বেশ কিছু জটিল পরিবর্তন ঘটে:
পেশি ও হাড়ের ক্ষয়: পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় শরীরকে নিজের ওজন বইতে হয় না। ফলে পেশি দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়। নাসার গবেষণা অনুযায়ী, মহাকাশে হাড়ের ঘনত্ব প্রতি মাসে ১ থেকে ১.৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
তরল পদার্থের স্থানান্তর: পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণ রক্ত ও অন্যান্য তরলকে নিচের দিকে টানে। মহাকাশে এই তরল মাথার দিকে উঠে আসে। এতে মুখমণ্ডল ফুলে যায় এবং মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি হয়।
দৃষ্টিশক্তির সমস্যা: মাথার দিকে তরল জমা হওয়ায় চোখের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। একে বলা হয় স্পেসফ্লাইট অ্যাসোসিয়েটেড নিউরো-অকুলার সিনড্রোম (SANS)। এতে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে।
ভারসাম্য রক্ষা ও মাথা ঘোরা: পৃথিবীতে ফেরার পর মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে মস্তিষ্ক হিমশিম খায়। ফলে নভোচারীদের হাঁটতে কষ্ট হয়, ভারসাম্য হারান এবং বমি বমি ভাব দেখা দেয়।
রেডিয়েশন ঝুঁকি: মহাকাশে উচ্চমাত্রার কসমিক রেডিয়েশন ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
সময়ের পার্থক্য: আইনস্টাইনের তত্ত্বের প্রতিফলন
আর্টেমিস-২ মিশনে আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের একটি ক্ষুদ্র প্রভাবও দেখা যায়। উচ্চগতিতে ভ্রমণ এবং মাধ্যাকর্ষণ কম থাকায় মহাকাশে সময় পৃথিবীর তুলনায় সামান্য ধীরগতিতে চলে। ফলে এই চার নভোচারী পৃথিবীর মানুষের তুলনায় কয়েক মিলিসেকেন্ড কম বয়সী হয়ে ফিরে এসেছেন।
পরবর্তী লক্ষ্য: ২০২৮ ও মঙ্গল অভিযান
আর্টেমিস-২ এর সাফল্য ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মানুষের পদচিহ্ন ফেলার পথ প্রশস্ত করল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নভোচারীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য মঙ্গল গ্রহ। তবে ইলন মাস্কের স্পেস-এক্স ও জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিন-এর ল্যান্ডার তৈরির চ্যালেঞ্জ এবং চীনের ২০৩০ সালের চন্দ্রাভিযানের ঘোষণা এই প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। বিজ্ঞানীদের মতে আর্টেমিস-২ এর তথ্য ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদী মঙ্গল অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে যেখানে নভোচারীদের অন্তত ৭ থেকে ৯ মাস মহাকাশে কাটাতে হবে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: