odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Sunday, 19th April 2026, ১৯th April ২০২৬
ঘন ঘন কারিকুলাম পরিবর্তন, তথ্যের বোঝা আর রাজনৈতিক মেরুকরণের যাঁতাকলে পিষ্ট বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ—একটি গভীর অনুসন্ধান।

পাঠ্যক্রমের গোলকধাঁধায় বিপন্ন শৈশব: শিক্ষার আলো নাকি অনিশ্চয়তার অন্ধকার?

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১৭ April ২০২৬ ১৭:৩৮

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১৭ April ২০২৬ ১৭:৩৮

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক

বইয়ের ভার বাড়ছে, কিন্তু শেখার আনন্দ কি কমছে? পাঠ্যক্রমের অলিগলিতে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের আগামী প্রজন্ম। পরিবর্তনের নামে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা কি মেধার বিকাশ ঘটাচ্ছে, নাকি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে শিক্ষার্থীদের? বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অসংগতি ও সংকটের ব্যবচ্ছেদ নিয়ে আমাদের বিশেষ ফিচার: পাঠ্যক্রমের গোলকধাঁধায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা।

পাঠ্যপুস্তকের অলিগলি: যেখানে হারিয়ে যাচ্ছে একটি প্রজন্ম

ভোরবেলার হিমেল হাওয়ায় পিঠে বইখাতার ভারী বোঝা নিয়ে যখন একজন শিক্ষার্থী স্কুলের পথে পা বাড়ায়, তার চোখে কি আগামীর উজ্জ্বল স্বপ্ন থাকে, নাকি পদ্ধতি পরিবর্তনের অজানা কোনো শঙ্কা? বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র যে ‘পাঠ্যক্রম’, তা আজ এক জটিল ও দুর্ভেদ্য গোলকধাঁধায় বন্দি। যেখানে জ্ঞানের অন্বেষণের চেয়ে পথ হারানোর ভয়ই বেশি।

এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা অনুসন্ধান করেছি:

  • বিবর্তনের টানাপোড়েন: সৃজনশীল পদ্ধতি থেকে হালের অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা—ঘন ঘন এই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা কি প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করছে, নাকি তারা কেবল গবেষণাগারের ‘গিনিপিগ’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে?
  • বাস্তবতা বনাম বই: পাঠ্যপুস্তকের তাত্ত্বিক বুলি আর জীবনের রূঢ় বাস্তবতার মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান, তা কীভাবে সুপ্ত মেধাকে বিকশিত হওয়ার আগেই স্থবির করে দিচ্ছে।
  • রাজনীতির ছায়া: পাঠ্যবইয়ের পাতায় পাতায় রাজনৈতিক আদর্শের লড়াই আর ইতিহাসের কাটাছেঁড়া কীভাবে কোমলমতি শিশুদের মনস্তত্ত্বে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে।
  • শহর ও গ্রামের বৈষম্য: যেখানে ঢাকার নামী স্কুলের ‘কুকিং প্রজেক্ট’ এক ধরনের বিলাসিতা, সেখানে দুর্গম চরাঞ্চলের জীর্ণ স্কুলঘরে তা শুধুই এক নিষ্ঠুর উপহাস।

এটি কেবল তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়; বরং হাজারো আদিয়ান, মিথিলা আর অরণ্যদের মনের না-বলা আর্তনাদ আর দীর্ঘশ্বাসের প্রতিফলন। পাঠ্যক্রম কি কেবল পরীক্ষার খাতা পূরণের যান্ত্রিক হাতিয়ার হয়েই থাকবে, নাকি হবে জীবনের প্রকৃত পথপ্রদর্শক? উত্তর খোঁজার সময় আজ সমাগত।

 

পাঠ্যক্রমের গোলকধাঁধায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা: এক অনুসন্ধান

ভোরবেলার হিমেল হাওয়া, স্কুলব্যাগের ভার আর গন্তব্যের অনিশ্চয়তা – বাংলাদেশের হাজারো স্কুলছাত্রের সকালটা শুরু হয় এইভাবেই। বইয়ের পাতায় যে জ্ঞান আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন তারা খোঁজে, তা কি সত্যিই বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র, পাঠ্যক্রম, এক জটিল গোলকধাঁধায় আটকে আছে বলে মনে হয়, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা প্রায়শই পথ হারিয়ে ফেলে।

প্রতি বছর নতুন বইয়ের গন্ধ, নতুন শিক্ষাবর্ষের সূচনা। অথচ, সেই বইগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিষয়বস্তু নিয়ে প্রশ্নগুলো যেন পুরনোই রয়ে যায়। সিলেবাসে যুক্ত হয় নতুন নতুন অধ্যায়, কিন্তু সেই অধ্যায়গুলো কি আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবনের সাথে, সমাজের সাথে প্রাসঙ্গিক? উদাহরণস্বরূপ, প্রযুক্তিনির্ভর এক পৃথিবী আমাদের সামনে, অথচ আমাদের পাঠ্যবইতে হয়তো এমন অনেক বিষয় রয়ে গেছে যা সময়ের সাথে তাল মেলাতে পারছে না। ‘বিজ্ঞান’ নামক যে বিশাল সম্ভার, সেখানে হয়তো পুরনো তত্ত্বের ভিড়ে নতুন আবিষ্কারের আলো পৌঁছায়নি। ‘সাহিত্য’ বিভাগে আমরা হয়তো এমন সব লেখা পড়ছি যা আজকের তরুণ মনের ভাবনার সাথে ঠিক মেলে না।

সমস্যা শুধু এখানেই থেমে নেই। প্রতিটি শিশুর গ্রহণ ক্ষমতা, শেখার ধরণ এক নয়। কিন্তু আমাদের পাঠ্যক্রম যেন এক ছাঁচে ঢালা। একজন মেধাবী ছাত্র যে সহজেই নতুন ধারণা আয়ত্ত করতে পারে, তার জন্য এই পাঠ্যক্রম হয়তো একঘেয়ে। আবার, যে ছাত্র একটু ধীরে শেখে, তার জন্য এই দ্রুতগতির সিলেবাস হয়ে দাঁড়ায় এক দুঃস্বপ্ন। এই বৈষম্য শিক্ষার্থীদের মনে তৈরি করে হীনমন্যতা, আগ্রহের অভাব। তাদের মধ্যে ‘পড়ার চাপ’ নামক এক অলিখিত ভয় বাসা বাঁধে, যা শেখার আনন্দকে কেড়ে নেয়।

অনেক সময় দেখা যায়, তত্ত্ব আর প্রয়োগের মধ্যে এক বিশাল ফারাক। বইয়ে আমরা হয়তো পড়ি ‘পরিবেশ দূষণ’ নিয়ে, কিন্তু আমাদের চারপাশের পরিবেশ হয়তো সেই বার্তা দিচ্ছে না। ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে আমরা পড়ি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন হয়তো সবসময় স্পষ্ট নয়। এই অসঙ্গতি শিক্ষার্থীদের মনে এক ধরণের দ্বিধা তৈরি করে। তারা যা শিখছে, তা কি আসলেই ‘সত্য’? নাকি সবই ‘পরীক্ষার জন্য’?

অতিরিক্ত মুখস্থ নির্ভরতাও পাঠ্যক্রমের এক বিরাট সমস্যা। ‘জেনে রাখা’র বদলে ‘মনে রাখা’ই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এতে করে শিক্ষার্থীরা গভীর ভাবে চিন্তা করতে শেখে না, নতুন কিছু উদ্ভাবন করার তাগিদ অনুভব করে না। পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার জন্য তারা তথ্যের পাহাড় মুখস্থ করে, কিন্তু সেই জ্ঞানের কোন বাস্তব প্রয়োগ জীবনে খুঁজে পায় না। যেন এক বিশাল তথ্যভান্ডার, যার চাবি তাদের হাতে নেই।

এই সকল সমস্যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে। নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনাকে বিকশিত না করে, তা যেন এই পাঠ্যক্রমের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে। এই অচলাবস্থা ভাঙতে হলে প্রয়োজন দূরদর্শী চিন্তা, বাস্তবমুখী পরিকল্পনা। পাঠ্যক্রমকে হতে হবে জীবনমুখী, শিক্ষার্থীদের কৌতূহলকে জাগিয়ে তোলার মতো। তা কেবল পরীক্ষার খাতা পূরণের হাতিয়ার না হয়ে, জীবনের পথ প্রদর্শক হয়ে উঠুক – এটাই হোক আমাদের সকলের কামনা।

পাঠ্যপুস্তকের বাইরে: পাঠ্যক্রমের অসঙ্গতিতে মন্থর শেখার যাত্রা

একই ক্লাস, একই প্রশ্ন—অথচ উত্তর খোঁজে হিমশিম খায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা; পাঠ্যক্রমের অসঙ্গতি আজ চরমে। স্কুলের বারান্দায় সকালের রোদ এসে লেগেছে। হাতে খাতা, ঝোলায় বই নিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির আদিয়ান ভাবছে, আজ বিজ্ঞান ক্লাসে ‘জীবন প্রক্রিয়া’ পড়বে। গত বছরেও সে প্রায় একই অধ্যায় পড়েছিল—আলাদা ছিল শুধু কিছু সংজ্ঞা। এখন মাথায় ঘুরপাক খায়, ‘পাতার খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়াটা কি সালোকসংশ্লেষ নাকি আলোক পাচন?’ দুই বইয়ের দুই নাম, শিক্ষকও যেন দ্বিধায় পড়েন।

আদিয়ানের মতো হাজারো শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের শিক্ষাজীবন যেন এক অদৃশ্য টানাপোড়েনের গল্প। জাতীয় শিক্ষাক্রমের ‘সার্বজনীনতা’র জোরে গাঁথা এই কাঠামোতে যেখানে প্রতিটি শ্রেণির শেষ পাতা উল্টালে একই প্রশ্ন জাগে—‘শেখানোটা কি আদৌ শেখানো হলো?’

পাঠ্যবইয়ের পাহাড়, জ্ঞানের অনটন

রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুলের বাংলা বিভাগের প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের সাহেব প্রতিদিনই যেন এক অমীমাংসিত ধাঁধার সামনে দাঁড়ান। তাঁর কথায়, “পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে রবীন্দ্রনাথ পড়ানোর সময় ‘জীবনীকোষ’ ছাপিয়ে গল্পের টান ধরা মুশকিল। আবার নবম শ্রেণিতে একই লেখকের স্মৃতিকথা ছেঁটে ফেলা এতটুকু যে ছাত্র বলবে—‘স্যার, উনি কি শুধু ঠাকুর বাড়ির গল্প লেখতেন?’” পাঠক্রমের গভীরতায় যেখানে নিমজ্জন দরকার, সেখানে কেবল নাম-তারিখ আর শুষ্ক তথ্যের আধিক্য।

শুধু মানবিক কেন—গণিত আর বিজ্ঞান বিভাগও যেন এক বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খায়। ষষ্ঠ শ্রেণির সাধারণ গণিতের বইয়ে ‘সেট তত্ত্ব’ এত জটিলভাবে সাজানো যে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও হিমশিম খায়। অথচ ভগ্নাংশের বাস্তব প্রয়োগ সেখানে নেই বললেই চলে। ‘বইয়ে আছে তাই পড়াই’, এই যান্ত্রিকতায় মৌলিক দক্ষতা তৈরি হয় না।

মূল্যায়নের জটিল জাল

কেবল বইয়ের বিষয়বস্তু নয়; মূল্যায়ন পদ্ধতিও যেন বিরাট বিভ্রাটের জন্ম দেয়। একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেখুন: “পদ্মা সেতুর অর্থসংস্থানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভূমিকা মূল্যায়ন করো।”—এটি অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীর জন্য। অভিভাবক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুসরাত জাহানের অভিযোগ, “ছেলেটা সেতু দেখেছে টিভিতে, অথচ তাকে ব্যাংকের জটিল শব্দের উত্তর মুখস্থ করতে হয়।”

মুখস্থ বিদ্যার এই চাপে সৃজনশীলতা নিঃশেষ। উত্তর যদি নির্ধারিত বইয়ের বাক্যে না লেখা হয়, তবে নম্বর কাটা যাবে—এমন অলিখিত নিয়ম কুসংস্কারের মতো পেয়ে বসে আছে। শিক্ষার্থীরা ‘কেন’ না ভেবে ‘কী’ শেখায় অভ্যস্ত হয়ে যায়।

অঞ্চলভেদে ভিন্ন বাস্তবতা

উত্তরবঙ্গের একটি প্রান্তিক স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে দেখুন কেমন অদ্ভুত বৈপরীত্য। বাংলা বইয়ের ‘শীতের সকাল’ কবিতায় শহুরে চিত্রকাঠি, কিন্তু ওই শিক্ষার্থীরা শীত মানেই আলু সেদ্ধ আর কুয়াশায় ঠোঁট ফেটে যাওয়া। অথচ ‘সকালের চা–টোস্ট’ কেন যেন সব জায়গায় সমান। পাহাড়ি স্কুলের জন্য কৃষিভিত্তিক উপমা, উপকূলীয় এলাকার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বাস্তব পাঠ—সব অঞ্চলের জন্য একটি সাজানো গোছানো খোপ। অসামঞ্জস্যের বোঝা কেবল শিক্ষার্থীর নয়, শিক্ষকের কাঁধেও চাপে।

এবার দৃষ্টি দেই সমস্যার গহীন অতলে।

পাঠের পথরেখা : বাংলাদেশের স্কুল পাঠ্যক্রমের বিবর্তন, বৈপরীত্য ও বিপন্নতা 

সকাল সাতটা। ধানমন্ডি লেকের ধারে কুয়াশা তখনো সরে যায়নি। লেকের পাড় ঘেঁষে যে স্কুলটি, তার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নবম শ্রেণির মিথিলা। কাঁধে ব্যাগ, ব্যাগের ভেতর তিনটি পাঠ্যক্রমের ছায়া — বাবার আমলের ‘সৃজনশীল’ বইয়ের গল্প, বড় ভাইয়ের ‘নৈর্ব্যক্তিক’ যুগের নোট, আর তার নিজের ‘অভিজ্ঞতাভিত্তিক’ নতুন বই। একই ছাদের নিচে তিন প্রজন্ম, তিনটি বাংলাদেশ, তিন রকমের শেখা। পাঠ্যক্রম বদলেছে, কিন্তু প্রশ্নটা রয়ে গেছে — আমরা আদৌ কোথায় যাচ্ছি?

এক. শিকড় থেকে শাখা— বিবর্তনের ছায়াপথ: ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রথম নিজের পাঠ্যক্রমের খসড়া আঁকে। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট — ঔপনিবেশিক ‘কেরানি তৈরির’ শিক্ষাকে ভেঙে জাতীয়তাবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক, উৎপাদনমুখী মানুষ গড়া। পাকিস্তান আমলের ‘মুসলিম গ্লোরি’ সর্বস্ব ইতিহাসের জায়গায় এল ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, কৃষকের ঘাম। বই ছাপা হলো সস্তা নিউজপ্রিন্টে, কিন্তু অক্ষরের ওজন ছিল পাহাড়সম।

আশির দশকে এল ‘সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা’র ডাক। পাঠ্যক্রমে যোগ হলো গণসাক্ষরতার তাড়া। নব্বইয়ে এসে বইয়ের পাতায় প্রথম হানা দিল বহুনির্বাচনি প্রশ্ন — মুখস্থবিদ্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। ২০১২ সালে ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ এলো ঝড়ের মতো। বলা হলো, ছেলেমেয়েরা আর গাইড বই মুখস্থ করবে না, নিজের ভাষায় লিখবে।

আর সর্বশেষ বাঁক বদল ২০২৩-এর ‘নতুন শিক্ষাক্রম’। দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিভাজনহীন শিক্ষা, ত্রিভুজ-বৃত্ত-চতুর্ভুজে মূল্যায়ন, মুখস্থ নয় — অভিজ্ঞতা, প্রকল্প, দলীয় কাজ। কাগজে-কলমে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রগতিশীল কারিকুলামগুলোর একটি। ফিনল্যান্ডের ছায়া, জাপানের ‘লেসন স্টাডি’র গন্ধ, ইউনেস্কোর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার প্রতিধ্বনি।

পাঠ্যক্রম তাই স্থির নয়, সে প্রবাহমান নদীর মতো — সময়ের পলি জমে, বাঁক নেয়, কখনো চর জাগে, কখনো ভাঙে পাড়।

দুই. বৈপরীত্যের করিডোর: একই উঠানে ভিন্ন সুর:

কিন্তু নদী যখন বাঁক নেয়, দু’পাড়ের গ্রাম সবসময় একসঙ্গে সরে না।

  • . প্রশিক্ষণ বনাম পরিকল্পনা: কারিকুলাম বদলেছে রাতারাতি, কিন্তু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক বদলাননি। কেরানীগঞ্জের স্কুলশিক্ষক রফিকুল ইসলাম হাসতে হাসতে বলেন, “ট্রেনিং পাইছি তিন দিনের। প্রথম দিন পরিচিতি, দ্বিতীয় দিন চা-নাশতা, তৃতীয় দিন সার্টিফিকেট। এখন বৃত্ত-ত্রিভুজ দিয়ে কীভাবে অঙ্কের নাম্বার দেব, কেউ শিখায় নাই।” ফলে নতুন কারিকুলাম পুরনো কাঠামোয় ঢুকে দম বন্ধ হয়ে মরে।
  • . শহর বনাম গ্রাম: ঢাকার একটি নামী স্কুলে ‘কুকিং প্রজেক্ট’ মানে অভিভাবকরা বেকারি থেকে কেক কিনে আনেন। আর কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের স্কুলে ‘কুকিং প্রজেক্ট’ মানে মিড-ডে মিলের চালই নেই। একই পাঠ্যবই, কিন্তু বাস্তবতা দুই মহাদেশ। পাঠ্যক্রম যখন ‘ইনক্লুসিভ’ হতে চায়, তখন অবকাঠামোর বৈষম্য তাকে ‘এক্সক্লুসিভ’ বানিয়ে ফেলে।
  • . মূল্যায়ন বনাম মানসিকতা : ত্রিভুজ মানে ‘অসাধারণ’, বৃত্ত মানে ‘সন্তোষজনক’। কিন্তু অভিভাবকের কাছে ত্রিভুজ মানে ‘এ-প্লাস’ আর বৃত্ত মানে ‘ফেল’। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা এখনো নাম্বার চায়, চাকরির বাজার জিপিএ খোঁজে। ফলে শিক্ষার্থী মূল্যায়নের নতুন দর্শন আর সমাজের পুরনো চাহিদা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে — যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে ওঠে রূপান্তরের রিপোর্ট কার্ড।
  • . বিষয়বস্তুর ভিড় : ইতিহাস বইয়ে মুক্তিযুদ্ধ আছে, আবার ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’-এও আছে। বিজ্ঞানে ‘পরিবেশ’ পড়ানো হয়, আবার ভূগোলেও। পুনরাবৃত্তি এত বেশি যে শিক্ষার্থী বিরক্ত হয়, শিক্ষক তাড়াহুড়ো করেন। অন্যদিকে জীবন দক্ষতা, মানসিক স্বাস্থ্য, আর্থিক সাক্ষরতার মতো জরুরি বিষয়গুলো এখনো পাদটীকা হয়ে থাকে।

তিন. সমস্যার শেকড়: যেখানে আলো কম পৌঁছায়

. গবেষণার ঘাটতি: আমরা পাঠ্যক্রম আমদানি করি, কিন্তু নিজের মাটির ডেটা দিয়ে যাচাই করি না। পাইলটিং হয় ২০টি স্কুলে, বাস্তবায়ন হয় ৬৫ হাজার স্কুলে। ফিনল্যান্ডে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত ১:১২, আমাদের ১:৫০। মডেল এক, মাঠ ভিন্ন।

. গাইড বইয়ের ছায়া-অর্থনীতি: সৃজনশীল এসেছিল গাইড বই তাড়াতে। এখন ‘অভিজ্ঞতাভিত্তিক’ গাইড বই বাজারে। যতবার কারিকুলাম বদলায়, ততবার কোচিং সেন্টারের সাইনবোর্ডের রং বদলায়। সমস্যা বইয়ে নয়, সমস্যা বিশ্বাসে — আমরা এখনো মনে করি শেখা মানে পরীক্ষা পাস।

. ভাষার ভার: ইংরেজি ভার্সন, বাংলা ভার্সন, মাদ্রাসা কারিকুলাম, কারিগরি কারিকুলাম, কওমি ধারা — এক দেশে পাঁচ রকম নাগরিক তৈরি হচ্ছে। তাদের মধ্যে সংলাপ নেই, আছে দূরত্ব। পাঠ্যক্রম জাতিকে এক করার কথা, এখানে তা ভাগ করছে।

. রাজনৈতিক হাওয়া: প্রতিটি সরকার আসে, পাঠ্যবইয়ে নিজের ভাষ্য লেখে। ইতিহাস হয়ে ওঠে ‘আমাদের ভার্সন বনাম তাদের ভার্সন’। শিক্ষার্থী বড় হয় দ্বিধা নিয়ে — কোনটা সত্য, কোনটা সুবিধা?

চার. উপসংহার নয়, একটি খোলা জানালা

সন্ধ্যা নামছে। মিথিলা স্কুল থেকে ফিরে বারান্দায় বসে। তার নতুন বইয়ে লেখা আছে ‘নিজের এলাকার একটি সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের প্রস্তাব লেখো’। মিথিলা খাতা খুলে লেখে — “সমস্যা: আমার স্কুলের বই আমার বড় ভাইয়ের বইয়ের মতো না, আমার বোনের ছেলের বই আবার অন্যরকম। সমাধান: বড়রা একবার আমাদের জিজ্ঞেস করুক, আমরা কীভাবে শিখতে চাই।”

পাঠ্যক্রম কোনো দৈবাণী নয়, সে জীবন্ত দলিল। তার বিবর্তন থামবে না, থামা উচিতও নয়। কিন্তু বিবর্তন মানে শুধু ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নয় — নিচ থেকে শোনাও। বৈপরীত্য থাকবে, কিন্তু তা যেন বৈচিত্র্য হয়, বৈষম্য নয়। আর সমস্যা? সমস্যা থাকাটাই স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক হলো সমস্যাকে ‘ত্রিভুজ’ দিয়ে ঢেকে ফেলা।

কারণ দিনের শেষে, স্কুল মানে ইটের ঘর নয়, পাঠ্যক্রম মানে বইয়ের স্তূপ নয়। স্কুল মানে মিথিলাদের চোখের সেই আলো — যে আলো প্রশ্ন করে, “আমি কেন শিখছি?” 

এই প্রশ্নটার সৎ উত্তর খুঁজে পাওয়াই হোক আগামী পাঠ্যক্রমের প্রথম অধ্যায়। 

কাটাছেঁড়া কারিকুলাম: গোলকধাঁধায় আমাদের ভবিষ্যৎ

ভোরের আলো ফোটার আগেই পিঠে ভারী বইয়ের ব্যাগ নিয়ে যখন ছোট্ট অরণ্য স্কুলের পথে রওনা দেয়, ওর চোখেমুখে থাকে এক অজানা আশঙ্কার ছাপ। তবে এই আশঙ্কা কোনো কঠিন গণিতের সূত্র বা ইতিহাসের সাল-তামামির নয়; বরং আশঙ্কাটি হলো—আজ আবার নতুন করে কী শিখতে হবে, আর কাল যে নিয়মটি শিখল, সেটি আজ বাতিল হয়ে যাবে কি না। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় এই অস্থিতিশীলতাই এখন সাধারণ দৃশ্য। গত কয়েক বছরের ঘন ঘন কারিকুলাম পরিবর্তন যেন আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এক বিশাল এবং অনিশ্চিত গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছে।

পরিবর্তনের জোয়ার নাকি তাসের ঘর?

একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তার মেরুদণ্ড। কিন্তু সেই মেরুদণ্ড যদি বারবার অস্ত্রোপচারের টেবিলে ওঠে, তবে তার সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিগত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি কখনও সৃজনশীল পদ্ধতির অতি-প্রয়োগ, কখনও বা হুট করে গ্রেডিং সিস্টেমের আমূল পরিবর্তন। সবশেষ সংযোজন হিসেবে এসেছে নতুন শিক্ষাক্রম, যেখানে পরীক্ষার চেয়ে শিখনকালীন মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মাঠ পর্যায়ে আমাদের শিক্ষকরা কি এই দ্রুত পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা সময় পেয়েছেন?

শ্রেণিকক্ষের ধূসর বাস্তবতা

ঢাকার একটি নামী স্কুলের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সায়মা জানায়, “আমরা বুঝতে পারছি না ঠিক কীসের ওপর ভিত্তি করে আমাদের মেধা যাচাই করা হচ্ছে। আজ শুনছি কোনো পরীক্ষা নেই, কাল আবার শোনা যাচ্ছে মূল্যায়নের নতুন কোনো পদ্ধতি আসবে। এই দোদুল্যমানতায় আমরা পড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি।”

কেবল শিক্ষার্থী নয়, অভিভাবকরাও রয়েছেন চরম উৎকণ্ঠায়। একজন অভিভাবকের ভাষ্যমতে, কারিকুলাম পরিবর্তন হওয়াটা দোষের কিছু নয়, কিন্তু সেটা হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার ভিত্তিতে আমাদের সন্তানদের ওপর যেভাবে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে, তাতে তাদের ভবিষ্যৎ যেন এক ল্যাবরেটরির গিনিপিগে পরিণত হয়েছে

শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদদের মতে, ঘন ঘন কারিকুলাম পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরণের 'লার্নিং লস' বা শিখন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। যখন একটি পদ্ধতির সাথে শিক্ষার্থীরা অভ্যস্ত হতে শুরু করে, ঠিক তখনই নতুন আরেকটি নিয়ম তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এতে করে গভীর জ্ঞান অর্জনের চেয়ে ভাসা ভাসা ধারণা নিয়ে বড় হচ্ছে এই প্রজন্ম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারিকুলাম পরিবর্তনের প্রভাব সুদূরপ্রসারী:

  • মানসিক চাপ: ক্রমাগত অস্থিতিশীলতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
  • ভিত্তি দুর্বল হওয়া: বারবার নিয়ম বদলালে মূল বিষয়গুলোর ভিত মজবুত হয় না।
  • শিক্ষায় বৈষম্য: যারা শহরকেন্দ্রিক এবং স্বচ্ছল, তারা হয়তো নতুন পদ্ধতির সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এই পরিবর্তনের স্রোতে তলিয়ে যাচ্ছে।

পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠায় রাজনীতি: শিশুমনের ওপর নীরব প্রভাবের গল্প

বাংলাদেশের মতো আজব দলীয় রাজনীতি কোথাও খুজে পাওয়া যাবে না, যেখানে দেশের চেয়ে দল বড়। তাইতো পাঠ্যক্রমে দলীয় হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। আর যার ভুক্তভোগী হচ্ছেন —শিক্ষার্থী, শিক্ষক তথা সমগ্র জাতি। এখানে আমরা এই কারিকুলাম রাজনীতির কারণে জাতির ভবিষ্যতের ওপর কিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, তা একটু দেখার চেষ্টা করি।

ভোরবেলার স্কুলঘণ্টা বাজতেই ছোট্ট নাবিল বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। তার চোখে কৌতূহল, বুকভরা স্বপ্ন—কিন্তু সেই ব্যাগের ভেতরে থাকা পাঠ্যবই কি শুধুই জ্ঞানের আলো বহন করছে, নাকি সেখানে লুকিয়ে আছে অদৃশ্য কোনো মতাদর্শের ছায়া? বাংলাদেশে শিক্ষা বরাবরই জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু সেই হাতিয়ার যখন রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাবে বাঁক নেয়, তখন তা হয়ে ওঠে এক নীরব সামাজিক বাস্তবতার নির্মাতা—যার প্রভাব পড়ে সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তর, অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের মনে।

বাংলাদেশের পাঠ্যক্রম উন্নয়ন ও পরিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি সরকারই ক্ষমতায় এসে পাঠ্যপুস্তক ও কারিকুলামে কিছু না কিছু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। কখনো তা সময়োপযোগী সংস্কার হিসেবে এসেছে, আবার কখনো তা হয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতিফলন। ইতিহাসের ভাষ্য বদলানো, নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্ব বা ঘটনাকে প্রাধান্য দেওয়া কিংবা কিছু বিষয়কে আড়াল করে রাখা—এসব পরিবর্তন শিক্ষার নিরপেক্ষতার প্রশ্নকে বারবার সামনে নিয়ে আসে।

একটি শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে শিক্ষক যখন পাঠ দিচ্ছেন, তিনি কি শুধুই তথ্য তুলে ধরছেন, নাকি অনিচ্ছাকৃতভাবে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করছেন? অনেক শিক্ষকই বলেন, তারা পাঠ্যবইয়ের বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তার সুযোগ দিতে চান, কিন্তু পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচির চাপ তাদের সেই স্বাধীনতা সীমিত করে দেয়। ফলে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় ‘কি ভাবতে হবে’ তা শিখে ফেলে, কিন্তু ‘কিভাবে ভাবতে হবে’—এই মৌলিক দক্ষতাটি আর গড়ে ওঠে না।

এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের মানসিক গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। যখন একটি শিশু বারবার একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান শুনতে শুনতে বড় হয়, তখন তার চিন্তার জগৎ একমুখী হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বহুমতের প্রতি সহনশীলতা, ভিন্নমত গ্রহণের ক্ষমতা—এসব গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তখন ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেখানে হওয়া উচিত মুক্তবুদ্ধির বিকাশ, সেখানে যদি তা হয়ে ওঠে মতাদর্শগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম, তবে তা জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগজনক।

শুধু মানসিক গঠন নয়, শিক্ষার গুণগত মানেও এর প্রভাব পড়ে। যখন পাঠ্যক্রম প্রণয়নে গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের পরিবর্তে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার প্রাধান্য পায়, তখন শিক্ষার কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষা, ২১শ শতাব্দীর প্রয়োজনীয় দক্ষতা—এসব বিষয় পেছনে পড়ে যায়। ফলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।

একজন শিক্ষার্থী যখন উচ্চশিক্ষা বা আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রবেশ করে, তখন সে বুঝতে পারে—তার শেখা অনেক কিছুই প্রশ্নবিদ্ধ বা অসম্পূর্ণ। এই বোধ তাকে কখনো বিভ্রান্ত করে, কখনো হতাশ করে। কারণ শিক্ষা যদি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে তা আত্মবিশ্বাসের জায়গাটিকেও দুর্বল করে দেয়।

অন্যদিকে, পাঠ্যক্রমে ঘন ঘন পরিবর্তন শিক্ষাব্যবস্থায় একটি অস্থিরতা সৃষ্টি করে। শিক্ষকরা নতুন সিলেবাসে মানিয়ে নিতে হিমশিম খান, শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হয়, এবং অভিভাবকরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। একটি স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষানীতি যেখানে প্রয়োজন, সেখানে যদি পরিবর্তন হয় স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে, তবে তা পুরো ব্যবস্থাকেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা। কারণ একটি নির্দিষ্ট বয়ানের মধ্যে আটকে থাকা শিক্ষা কখনোই নতুন চিন্তার জন্ম দিতে পারে না। প্রশ্ন করার সাহস, যুক্তি দিয়ে ভাবার ক্ষমতা, নতুন কিছু কল্পনা করার শক্তি—এসবই ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যায়। ফলে আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করি, যারা হয়তো পরীক্ষায় ভালো ফল করে, কিন্তু বাস্তব জীবনের জটিল সমস্যার সমাধান দিতে পারে না।

তবে আশার জায়গাটিও একেবারে নিভে যায়নি। বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং সচেতন নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরপেক্ষ, গবেষণাভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পাঠ্যক্রমের দাবি জানিয়ে আসছেন। তারা মনে করেন, শিক্ষা হওয়া উচিত রাজনীতির ঊর্ধ্বে—যেখানে ইতিহাসকে দেখা হবে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এবং শিক্ষার্থীদের শেখানো হবে প্রশ্ন করতে, বিশ্লেষণ করতে, এবং নিজস্ব মত গড়ে তুলতে।

নাবিলের গল্পে ফিরে আসা যাক। সে যখন তার বই খুলে পড়ে, তখন সে যেন শুধুই তথ্য না শেখে—সে যেন শেখে সত্যের সন্ধান করতে। তার পাঠ্যবই যেন তাকে কোনো নির্দিষ্ট পথে হাঁটতে বাধ্য না করে, বরং সামনে খুলে দেয় অসংখ্য সম্ভাবনার দরজা। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষার্থীদের চিন্তার স্বাধীনতার ওপর।

অতএব, পাঠ্যক্রম প্রণয়নে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত শিক্ষাকে তাদের স্বল্পমেয়াদী স্বার্থের বাইরে রেখে একটি জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা। কারণ আজকের একটি ছোট্ট পরিবর্তনই আগামী দিনের একটি প্রজন্মকে প্রভাবিত করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুবই সরল—আমরা কি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যা কেবল তথ্য দেয়, নাকি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা, যা মানুষ তৈরি করে? যদি উত্তর হয় ‘মানুষ তৈরি করা’, তবে পাঠ্যক্রমকে অবশ্যই হতে হবে নিরপেক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মুক্তচিন্তার অনুকূল। কারণ পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায়ই লেখা থাকে একটি জাতির ভবিষ্যৎ।

সম্ভাবনার জানালাসম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মধ্যে পাঠ্যক্রমে ‘মৌলিক সংশোধনী’ আনা হবে। অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ সংশোধনী যেন ঘরানায় বাঁধা না পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান মনে করেন, “পাঠ্যক্রমকে হতে হবে নমনীয়। কৃষি, ব্যবসা, কারিগরি দক্ষতা—এগুলোকে সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। শুধু পরীক্ষার নয়, জীবন-শেখার সনদ দিতে হবে।”

স্কুলের পাঠ শেষে আদিয়ান বাড়ি ফিরছে। পেছনে পড়ে যাওয়া অধ্যায় আর অস্পষ্ট অনুশীলনীর পাতা উলটে সে একা একা ‘বোঝার চেষ্টা’ করে। সারা দেশের শিক্ষার্থীরা যেন সেই চেষ্টায় একা নয়—এই আশাতেই বুক বাঁধে অভিভাবক আর শিক্ষকেরা। সংস্কারের পালক যেন হালকা না হয়; বরং উড়ন্ত জানালা খুলে দেয় কিশোর-তরুণের শেখার পরিধি। তবেই না পাঠ্যবইয়ের শেষ মলাটে লেখা থাকবে—‘শেষ হলো না, শুরু হলো শিক্ষার গল্প।’

আগামীর প্রত্যাশা

শিক্ষা কোনো স্থবির বিষয় নয়, সময়ের প্রয়োজনে একে আধুনিক করতে হবে—এতে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই পরিবর্তন হতে হবে সুপরিকল্পিত এবং ধীরস্থির। কেবল বিদেশের অনুকরণে নয়, বরং আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট, অবকাঠামো এবং শিক্ষকদের সক্ষমতার কথা মাথায় রেখেই কারিকুলাম সাজানো প্রয়োজন।

অরণ্য বা সায়মাদের মতো লাখো শিক্ষার্থীর চোখের সামনে থেকে অনিশ্চয়তার এই কুয়াশা কাটানো জরুরি। আমরা চাই এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা, যা ঘন ঘন পরিবর্তনের জোয়ারে ভাসবে না, বরং একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলবে প্রকৃত মানুষ হিসেবে। কারিকুলামের এই ‘কাটাছেঁড়া’ বন্ধ করে এখন সময় সংহতি আর স্থিতিশীলতার। নতুবা, এই গোলকধাঁধায় হারিয়ে যেতে পারে একটি গোটা প্রজন্মের উজ্জ্বল সম্ভাবনা।

অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#EducationBangladesh #CurriculumCrisis #FutureOfStudents #BangladeshEducationSystem #পাঠ্যক্রম_বিভ্রাট #শিক্ষাব্যবস্থা #আমাদের_শিক্ষা_আমাদের_ভবিষ্যৎ #LearningLoss #EducationReform #StudentLifeBD #NewCurriculum #বাংলাদেশ_শিক্ষা

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: