অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক │বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব, শিশু মৃত্যু, টিকাদান সংকট, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও শিক্ষা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, বৈশ্বিক টিকা বৈষম্য, এলডিসি উত্তরণের স্বাস্থ্যঝুঁকি, প্যারেন্টিং শিক্ষা, গবেষণা ঘাটতি এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে এই দীর্ঘ বিশ্লেষণধর্মী সাহিত্যধর্মী ফিচারটি নির্মিত হয়েছে। এখানে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ কেবল চিকিৎসা সংকট নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অবহেলা, সামাজিক দায়িত্বহীনতা, তথ্য বিভ্রান্তি, নৈতিক বৈষম্য এবং ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। জাপান, ব্রাজিল, রুয়ান্ডা, সিঙ্গাপুর ও ফিনল্যান্ডের উদাহরণের আলোকে বাংলাদেশের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে—স্বাস্থ্য শিক্ষা, টিকাদান, বৈজ্ঞানিক সচেতনতা, স্থানীয় গবেষণা এবং মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। প্রতিটি শিশুর জীবন যে একটি জাতির ভবিষ্যৎ—এই গভীর মানবিক উপলব্ধিকে কেন্দ্র করেই রচিত এই বিশেষ সম্পাদকীয় ফিচার। হাম টিকা গাফলতির কারণে শিশু মৃত্যু, স্বাস্থ্য শিক্ষা সংকট, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসায় অবহেলা এবং টিকা গবেষণায় বৈশ্বিক বিনিয়োগ বৈষম্য নিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি সাহিত্যধর্মী বিশ্লেষণধর্মী ফিচার।
১. একটি পরিসংখ্যান, একটি নিথর দেহ এবং চিরন্তন কিছু প্রশ্ন
২০ মে এক পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও উপসর্গ নিয়ে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে হাম উপসর্গে ৩ জন এবং নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৩ জন। এই সময় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৪০৮ জন। ২০ মে প্রকাশিত এই একটি সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ বাস্তবতা। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মারা গেছে কয়েকজন শিশু। নতুন আক্রান্তের সংখ্যাও হাজার ছাড়িয়েছে। পরিসংখ্যানের ভাষায় এটি হয়তো একটি স্বাস্থ্য সংকট। কিন্তু একটি শিশুর মৃত্যুকে কখনো শুধু সংখ্যা দিয়ে বোঝানো যায় না। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে থাকে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ।
শিশুটির নাম হয়তো রাইসা। কিংবা রাফি। হয়তো তার বয়স মাত্র আট মাস। সে এখনো ‘মা’ শব্দটি পুরোপুরি উচ্চারণ করতে শেখেনি। তার ছোট্ট আঙুল এখনো পৃথিবীর মানচিত্র চেনে না। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্র বা সমাজ তাকে চিনে ফেলেছে—একটি চিলতে পরিসংখ্যান হিসেবে। একটি বার্ষিক রিপোর্টের লাল রেখা হিসেবে। একটি হাসপাতালের শয্যায় নিথর হয়ে থাকা প্রাণহীন দেহ হিসেবে।
হাসপাতালের করিডোরে তখন এক মা দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখে ঘুম নেই, মুখে ভাষা নেই, শুধু বুক চেরা একটিই প্রশ্ন—‘একটা টিকা যদি সময়মতো দেওয়া হতো, তাহলে কি আমার সন্তান বাঁচত?’ এই প্রশ্ন শুধু একজন মায়ের ব্যক্তিগত আর্তনাদ নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া এক জলজ্যান্ত প্রশ্ন। এটি আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার গলদগুলো মুখোমুখি দাঁড় করায়। সর্বোপরি, এটি আমাদের পুরো সভ্যতার গায়ে লেপ্টে থাকা গভীর অপরাধবোধের প্রশ্ন।
হাম—একসময় যে মরণব্যাধিকে আধুনিক মানবসভ্যতার সম্মিলিত প্রয়াস ও চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিল, সেই রোগ আজ আবার নতুন করে ফিরে আসছে। বহু দশক আগের কোনো কুৎসিত দুঃস্বপ্ন যেন নতুন রূপ নিয়ে আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আজ হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। কোথাও টিকা বিরোধী তীব্র বিভ্রান্তি ও গুজব, কোথাও চিকিৎসাসেবার চরম বৈষম্য, কোথাও যুদ্ধ-বিগ্রহ, কোথাও চরম দারিদ্র্য, আবার কোথাও রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক অদক্ষতা—সব উপাদান মিলিয়ে এক অদৃশ্য আগুন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। আর সেই আগুনের প্রথম ও সবচেয়ে সহজ শিকার আমাদের নিষ্পাপ শিশুরা।
শিশুদের হাম যেন শুধু একটি ভাইরাসজনিত রোগ নয়; এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, জনসচেতনতা, টিকাদান কাঠামো এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের একটি কঠোর আয়না। একসময় যে হামকে পৃথিবী থেকে প্রায় নির্মূলের স্বপ্ন দেখেছিল বিশ্ব, আজ সেই হাম ফিরে এসে বহু শিশুর শৈশব কেড়ে নিচ্ছে। একটি শিশুর কপালে জ্বরের উত্তাপ, চোখে লালচে ক্লান্তি, সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া লাল দাগ—এসব কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় উপসর্গ নয়; এগুলো একটি পরিবারের আতঙ্ক, এক মায়ের নির্ঘুম রাত এবং একটি সমাজের ব্যর্থতার প্রতীক।
বাংলাদেশে এখনও বহু পরিবার দারিদ্র্য, কুসংস্কার, তথ্যের অভাবে কিংবা স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতায় সময়মতো শিশুদের টিকা দিতে পারেন না। কোথাও টিকাদান কেন্দ্র অনেক দূরে, কোথাও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। ‘টিকা নিলে জ্বর হয়’, ‘টিকা শিশুদের অসুস্থ করে তোলে’—এমন ভিত্তিহীন গুজব এখনও অনেক পরিবারকে ভয় ও দ্বিধার মধ্যে ফেলে। অথচ হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ, যা এক শিশু থেকে আরেক শিশুর শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, অন্ধত্ব, মস্তিষ্কের জটিলতা এমনকি মৃত্যুর মতো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, হামের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ। শিশুকে নির্ধারিত বয়সে হাম-রুবেলা (MR) টিকা প্রদান করলে এই রোগ থেকে সুরক্ষা সম্ভব। একটি ছোট্ট টিকা শুধু একটি শিশুকে নয়, পুরো সমাজকে সুরক্ষা দেয়। যখন অধিকাংশ শিশু টিকা পায়, তখন সমাজে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হয় এবং রোগের বিস্তার কমে আসে। তাই হামের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
২. গ্রামাঞ্চলের বাস্তব চিত্র: অজ্ঞতা, গুজব ও ভাইরাসের মরণকামড়
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক মা-বাবা জানেনই না যে হাম কতটা ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী হতে পারে। কারও ধারণা, ‘জ্বর তো এমনিতেই ভালো হয়ে যাবে’। কেউ সামাজিক ও পারিবারিক প্রভাবে বলেন, ‘টিকা দিলে বাচ্চা উল্টো আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে’। কেউ আবার ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যা কিংবা নানা গুজবের বেড়াজালে আটকে যান। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, হাম কোনো সাধারণ জ্বর নয়। এটি নিউমোনিয়া, মারাত্মক মস্তিষ্কের সংক্রমণ, চরম অপুষ্টি, স্থায়ী অন্ধত্ব, এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো—এই প্রান্তিক অজ্ঞতার দায় কার? শুধু কি সেই মায়ের, যিনি কখনো প্রাথমিক স্বাস্থ্য শিক্ষার সুযোগ পাননি? শুধু কি দিনমজুর বাবার, যিনি পেটের দাবিতে সন্তানকে টিকাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার সময় পাননি? নাকি এই দায় আরও গভীরে—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি রন্ধ্রে? যে ব্যবস্থায় শিশু জটিল গণিতের সূত্র শেখে, কিন্তু জীবনরক্ষাকারী স্বাস্থ্য সচেতনতা শেখে না; মুখস্থ করে পাতার পর পাতা কবিতা, কিন্তু শেখে না কীভাবে প্রতিদিনের জীবনে রোগ প্রতিরোধ করতে হয়; পরীক্ষার নম্বরের জন্য প্রতিযোগিতা শেখে, কিন্তু সুস্থ থাকার বিজ্ঞান শেখে না।
আমাদের বিদ্যালয়ে ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা’ এখনো একটি চরমভাবে অবহেলিত ও উপেক্ষিত বিষয়। পরীক্ষায় কম নম্বর আসে বলে শিক্ষকেরাও দ্রুত পাতা উল্টিয়ে পড়ে যান। শিক্ষার্থীরা কেবল পরীক্ষার আগের রাতে মুখস্থ করে লিখে আসে—‘হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ’। তারপর সেই জ্ঞান খাতার সঙ্গেই সমাহিত থাকে। বাস্তব জীবনে সেই শিক্ষার্থী বড় হয়ে যখন মা বা বাবা হয়, নিজের সন্তানকে সঠিক সময়ে টিকা দিতে ভুলে যায়। কারণ সেই শিক্ষা কখনো তার জীবনের অংশ ছিল না; ছিল শুধু পরীক্ষার নম্বরের একটি মাধ্যম।
৩. জনস্বাস্থ্য সংকটের সঙ্গে শিক্ষার বিচ্ছিন্নতা ও তথ্যের অনাহার
বাংলাদেশের বর্তমান জনস্বাস্থ্য সংকটের সঙ্গে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতা অত্যন্ত ভয়াবহ। আমরা এমন এক বস্তুবাদী সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে বড় হাসপাতাল বাড়ছে, কিন্তু মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ছে না; মেডিকেল কলেজ বাড়ছে, কিন্তু প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য সংস্কৃতি গড়ে উঠছে না। একজন শিশুর অকালমৃত্যু কখনো শুধু চিকিৎসার ব্যর্থতা নয়। এটি একটি সামষ্টিক সামাজিক ব্যর্থতা, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতা, জনযোগাযোগের ব্যর্থতা এবং আমাদের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
কল্পনা করুন, একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকা কার্যক্রম চলছে। বাইরে মায়েদের লম্বা লাইন। কিন্তু সেই লাইনে অনুপস্থিত কিছু পরিবার। কারণ আগের রাতেই ফেসবুকে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে—‘টিকা দিলে শিশুরা অটিস্টিক হয়ে যায়’। ভিডিওতে এক স্বঘোষিত ‘বিশেষজ্ঞ’ চটকদার ভঙ্গিতে কথা বলছেন। লক্ষ ভিউ, হাজার হাজার শেয়ার। আর সেই মিথ্যার মোকাবিলায় রাষ্ট্রের কোটি টাকার স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যর্থ। এটাই আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিপদ—তথ্যের বিস্ফোরণ ঠিকই, কিন্তু জ্ঞানের চরম অনাহার।
আমরা ডিজিটাল হয়েছি সত্য, কিন্তু বৈজ্ঞানিক বা যুক্তিবাদী হতে পারিনি। আমরা দামি স্মার্টফোন কিনেছি, কিন্তু সমাজকে সমালোচনামূলক চিন্তা শেখাতে ব্যর্থ হয়েছি। ফলে গুজব যেকোনো প্রাণঘাতী ভাইরাসের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। হামের ভাইরাস মানুষের শরীরে নিজের লক্ষণ প্রকাশ করতে কয়েকদিন নেয়, কিন্তু ভয়ের ভাইরাস, গুজবের ভাইরাস এবং অবিশ্বাসের ভাইরাস সমাজে ছড়িয়ে পড়ে কয়েক মিনিটে। স্বাস্থ্য শিক্ষা আজ আর হেলাফেলার বিষয় নয়। এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৪. বৈশ্বিক মডেল বনাম আমাদের ‘কমন প্রশ্ন’ খোঁজার সংস্কৃতি
উন্নত দেশগুলো বহু আগেই বুঝেছে—রোগের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধ হাসপাতালের দেয়ালে জিতে নেওয়া যায় না। এই যুদ্ধ জিততে হয় শ্রেণিকক্ষে, পাঠ্যবইয়ের পাতায়, গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপনে এবং শিশুর কৌতূহলে। জাপানে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শেখানো হয় হাত ধোয়া, পরিচ্ছন্নতা ও রোগ প্রতিরোধ। ফিনল্যান্ডে স্বাস্থ্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক একটি জীবনদক্ষতা। সিঙ্গাপুরে স্কুল পর্যায়েই জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলার বাস্তবভিত্তিক অনুশীলন হয়। নিচে কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হলো:
জাপান: সেরোসার্ভে দিয়ে শূন্যস্থান চিহ্নিতকরণ
জাপানের উদাহরণটি আমাদের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ২০০৭-২০০৮ সালে জাপানে এক ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, যেখানে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ছিল কিশোর-কিশোরীরা—যারা দ্বিতীয় ডোজের টিকা পায়নি । জাপান সরকার তখন জাতীয় সেরোলজিক্যাল সার্ভিলেন্স (রক্তের নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাচাই) শুরু করে। এই জরিপ স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে দেয়—কোন বয়সী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রোগ প্রতিরোধের ঘাটতি রয়েছে ।
এরপর তারা পাঁচ বছরের একটি জাতীয় কর্মসূচি হাতে নেয় (২০০৮-২০১৩)। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের (১২-১৩ বছর) এবং দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের (১৭-১৮ বছর) জন্য বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক টিকাক্যাম্পেইন চালানো হয় । সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একা কাজ করেনি; শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় গড়ে তোলা হয়। স্কুলগুলোকেই টিকাদানের কেন্দ্রবিন্দু বানানো হয়। ফলাফল? ২০১৫ সালে জাপান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে হাম নির্মূলের স্বীকৃতি লাভ করে এবং আজও তা ধরে রেখেছে ।
জাপানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো কুরাশিকি শহরের মডেল। এখানে কিন্ডারগার্টেন, প্রাথমিক ও জুনিয়র হাইস্কুলে ভর্তির সময় টিকার সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়। ১১ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, যেখানে শুধু শিক্ষামূলক ক্যাম্পেইন ছিল, সেখানে টিকার হার কম; কিন্তু স্কুলে ভর্তির সঙ্গে টিকার সনদ যুক্ত করায় টিকা গ্রহণের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে । তাদের অভিজ্ঞতা থেকে তারা শিখেছে—অভিভাবকদের শুধু শিক্ষিত করলেই হয় না, চিকিৎসকদেরও টিকা সংক্রান্ত সঠিক জ্ঞান দিতে হবে ।
ব্রাজিল: অ্যাক্টিভ ভ্যাকসিনেশন সার্চ ও কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার
ব্রাজিলের উদাহরণটি আমাদের গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকার জন্য দারুণ শিক্ষণীয়। ২০১৫ সালের পর ব্রাজিলে টিকাকভারেজ ক্রমাগত কমছিল, হামের টিকার কভারেজ ২০২১ সালে নেমে আসে ৭৩ শতাংশে । করোনা মহামারি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। কিন্তু ব্রাজিল হাল ছাড়েনি।
তারা ‘বুসকা আতিভা ভাসিনাল’ বা ‘অ্যাক্টিভ ভ্যাকসিনেশন সার্চ’ কর্মসূচি চালু করে । এর মূলকথা হলো—শিশুদের কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়া, শিশুদের টিকা কেন্দ্রে আনার জন্য অপেক্ষা না করা। মানাউস শহরের কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার লিন্ডালভা ডি ফ্রেইতাসের গল্পটি অনুপ্রেরণাদায়ক। তিনি আমাজন রেইনফরেস্টের প্রত্যন্ত এলাকায় নৌকা বেয়ে, কাঠের সেতু পেরিয়ে, পাহাড় বেয়ে শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা পৌঁছে দিয়েছেন । শুধু তাই নয়, তারা ডে-কেয়ার সেন্টার, স্কুল, এমনকি স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টারকেও টিকাদান কেন্দ্র বানিয়ে ফেলে। ফলাফল? বাতুরিতে শহরে তাদের পাইলট প্রকল্প শেষে পোলিও ও অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য রোগের টিকাকভারেজ দাঁড়ায় ৯৫ শতাংশের ওপরে ।
ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—টিকা পৌঁছানোর জন্য সৃজনশীল পদ্ধতি দরকার, কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কারদের বিনিয়োগ জরুরি, এবং তাদের সম্মান ও পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে ।
রুয়ান্ডা: একীভূত টিকাক্যাম্পেইন
আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডার উদাহরণটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। রুয়ান্ডা ২০১৩ সালে একটি সমন্বিত টিকাক্যাম্পেইন চালায়, যেখানে একসঙ্গে হাম-রুবেলা টিকা, এইচপিভি টিকা এবং ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন সম্পন্ন করা হয় । ফলাফল চমৎকার—হাম-রুবেলা টিকার কভারেজ দাঁড়ায় ৯৭.৫ শতাংশ । সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা টিকা কার্যক্রমকে স্কুল-ভিত্তিক করেছিল। রুয়ান্ডার স্কুলে ভর্তির হার বেশি হওয়ায় এই পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর হয় ।
তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা হলো—একাধিক স্বাস্থ্য সেবা একসঙ্গে দেওয়া সম্ভব, টিকা কার্যক্রমে স্থানীয় কমিউনিটি লিডার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্পৃক্ত করা জরুরি, এবং সবচেয়ে কার্যকর তথ্যের উৎস হলো রেডিও ও কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার । ২০২৪ সালেও রুয়ান্ডা তাদের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সপ্তাহে হাম-রুবেলা টিকাকে অপুষ্টি স্ক্রিনিং, ভিটামিন এ, পরিবার পরিকল্পনা সেবার সঙ্গে একীভূত করছে ।
সিঙ্গাপুর: প্রেসকুল ইনফেকশন ও ট্রাভেল অ্যালার্ট
সিঙ্গাপুরের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও আমাদের জন্য সতর্কবার্তা বহন করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিঙ্গাপুরে পঞ্চম infant measles case শনাক্ত হয়, যেখানে ১১ মাস বয়সী একটি শিশু প্রেসকুলে আক্রান্ত হয় । সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গেই কন্টাক্ট ট্রেসিং শুরু করে, প্রেসকুলের সঙ্গে সমন্বয় করে, এবং যাদের টিকা সুরক্ষা নেই তাদের কোয়ারেন্টিনে রাখে । তারা ট্রাভেল অ্যালার্ট জারি করে এবং অভিভাবকদের সতর্ক করে। এই ঘটনা আমাদের শেখায়—উচ্চ টিকাকভারেজ থাকলেও ছোট ছোট শূন্যস্থান কত ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, এবং দ্রুত সাড়া দেওয়া কত জরুরি।
ফিনল্যান্ড: স্বাস্থ্য শিক্ষা একটি জীবনদক্ষতা হিসেবে
ফিনল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাব্যবস্থায় স্বাস্থ্য শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও প্রধান জীবনদক্ষতা হিসেবে গণ্য করা হয়। সেখানে নার্সিং ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য টিকা সংক্রান্ত বাধ্যতামূলক কোর্স আছে, যেখানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক টিকা কর্মসূচি, টিকার গঠন, উপকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সবকিছু শেখানো হয় ।
আর আমাদের দেশের চিত্র?
আমরা এখনও বোর্ড পরীক্ষার ‘কমন প্রশ্ন’ আর সাজেশনের গোলকধাঁধায় হাবুডুবু খাচ্ছি। শিক্ষার্থীরা নিউটনের সূত্র মুখস্থ করে ফেলতে পারে, জটিল সমীকরণ সমাধান করতে পারে, কিন্তু তাদের অনেকেই জানে না শিশুর জন্মের পর কখন হামের টিকা দিতে হয়। জানে না জ্বরের কোন লক্ষণ বিপজ্জনক। জানে না অপুষ্টি কীভাবে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে।
জাপান যেখানে সেরোসার্ভে করে টিকার ঘাটতি চিহ্নিত করে, ব্রাজিল যেখানে নৌকা বেয়ে টিকা পৌঁছে দেয়, রুয়ান্ডা যেখানে স্কুলভিত্তিক একীভূত ক্যাম্পেইন চালায়, সিঙ্গাপুর যেখানে প্রেসকুলে সংক্রমণ শনাক্তের সঙ্গে সঙ্গেই কন্টাক্ট ট্রেসিং শুরু করে—আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? এই বৈপরীত্য শুধু শিক্ষাগত ত্রুটি নয়; এটি আমাদের সভ্যতার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের প্রতীক। একটি জাতি যখন তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জীবনের বাস্তব প্রস্তুতি দেওয়ার চেয়ে পরীক্ষার নম্বর ও প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে শেখায়, তখন সেই জাতি ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্বের ভিত্তিই দুর্বল করে ফেলে।
৫. চিকিৎসা গবেষণায় বৈশ্বিক বৈষম্য ও নৈতিকতার সংকট
৬. বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি ও ২০২৬ সালের হাম প্রাদুর্ভাব
বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই একসময় বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য সাফল্যের এক অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতো। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে নদীভাঙন কবলিত চরাঞ্চল, পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নগর বস্তি—স্বাস্থ্যকর্মীরা শিশুদের কাছে টিকা পৌঁছে দিতেন এক ধরনের সামাজিক আন্দোলনের মতো করে। বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের এই সাফল্যকে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য মডেল হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির অভিঘাত সেই সুসংগঠিত ব্যবস্থায় গভীর ফাটল তৈরি করে। দীর্ঘ লকডাউন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা ব্যাহত হওয়া, অভিভাবকদের আতঙ্ক, জনবল সংকট এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের বিঘ্ন ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য ঝুঁকি তৈরি করেছিল। ২০২৬ সালের ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব যেন সেই জমে থাকা সংকটেরই নির্মম প্রকাশ।
বছরের শুরুতে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু আক্রান্ত শিশুর খবর এলেও এপ্রিল মাসে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই ১২৮ শিশুর সন্দেহজনক মৃত্যুর খবর জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। কয়েক দিনের ব্যবধানে ১৪ এপ্রিল সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬৬-এ। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে তখন উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের দীর্ঘ সারি, কোলজুড়ে জ্বরাক্রান্ত শিশু, অক্সিজেন সংকট এবং চিকিৎসকদের ক্লান্ত মুখ এক ভয়ংকর বাস্তবতার ছবি হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আগেই ৬ মে নাগাদ মৃতের সংখ্যা ৩১৭-এ পৌঁছে যায়। এরপর ১০ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয়, হামজনিত জটিলতায় মৃত শিশুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪০৯। মাত্র এক সপ্তাহ পর, ১৭ মে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সেই সংখ্যা ৪৫৯-এ পৌঁছানোর খবর প্রকাশিত হয়। প্রতিটি সংখ্যা যেন একটি পরিবারের ভেঙে পড়া পৃথিবীর প্রতীক হয়ে সামনে আসে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল আক্রান্ত ও মৃত শিশুদের বয়স ও টিকাগ্রহণ পরিস্থিতি। অধিকাংশ শিশুর বয়স পাঁচ বছরের নিচে। তাদের বড় একটি অংশ কখনও টিকা পায়নি, আবার কেউ কেউ নির্ধারিত ডোজ সম্পূর্ণ করতে পারেনি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-পরবর্তী টিকাদান ব্যবস্থার শৈথিল্য, শহর ও গ্রামের বৈষম্য, ভুল তথ্যের বিস্তার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এই বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করেছে। ঢাকা বিভাগে মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক সংঘটিত হলেও আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বরিশাল, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী অঞ্চলে। ঘনবসতি, অপুষ্টি, দরিদ্রতা এবং স্বাস্থ্যসচেতনতার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
২০ মে ২০২৬ ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সের প্রেস ব্রিফিং তাই কেবল একটি পরিসংখ্যান উপস্থাপন ছিল না; সেটি ছিল মানবিক বিপর্যয়ের এক বৈশ্বিক ভাষ্য। একদিকে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার সাফল্যের কথা বলা হচ্ছিল, অন্যদিকে ৬০ হাজারের বেশি হাম আক্রান্ত শিশু এবং অন্তত ৪৭৫টি শিশুমৃত্যুর হিসাব গোটা জাতিকে নাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ইতিহাসে এই প্রাদুর্ভাব শুধু একটি রোগের বিস্তার নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা—প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে অবহেলা করলে উন্নয়নের অর্জন কত দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে, তার এক নির্মম স্মারক।
৭. শিক্ষা সংস্কার, আন্তঃবিষয়ক শিক্ষা এবং বিশেষ প্যারেন্টিং শিক্ষা
বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার নিয়ে যখনই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কথা বলি, তখন আমাদের শুধু গৎবাঁধা পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করলেই চলবে না; আমাদের শিক্ষার মূল জীবনদর্শন নিয়েও গভীরভাবে ভাবতে হবে। প্রশ্ন হলো, আমাদের প্রচলিত শিক্ষা কি সত্যিই শিশুদের সুনাগরিক ও প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছে, নাকি কেবল যান্ত্রিক ‘পরীক্ষার্থী’ বানিয়ে ছাড়ছে? একজন বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী যদি বিজ্ঞানের মৌলিক ও মানবিক প্রয়োগই না শেখে, তবে তার জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন এ-প্লাস এই সমাজকে কোনো মহামারি বা সংকট থেকে রক্ষা করতে পারবে না।
প্রকৃত স্বাস্থ্য শিক্ষা মানে শুধু কয়েকটি রোগের খটমটে নাম বা ভাইরাসের গঠনমুখস্থ করা নয়। এটি মূলত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শেখা। এটি যেকোনো অপপ্রচার ও গুজব প্রতিরোধ করতে শেখা। এটি নিজের প্রতি এবং সমাজের প্রতি সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ তৈরি করা। একজন সচেতন নাগরিককে বোঝাতে হবে—আমি বা আমার সন্তান যখন সময়মতো টিকা নিচ্ছি, তখন আমি শুধু নিজেকে নয়, পুরো সমাজকেই একটি অদৃশ্য রোগের হাত থেকে সুরক্ষা দিচ্ছি।
পাঠ্যপুস্তক সংস্কার: বাস্তব উদাহরণ
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ‘শারীরিক স্বাস্থ্য ও শারীরিক শিক্ষা’ নামে একটি বিষয় কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে এর গুরুত্ব নগণ্য। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগের রাতে মুখস্থ করে লিখে আসে—‘হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ’। তারপর সেই জ্ঞান খাতার সঙ্গেই সমাহিত থাকে। বাস্তব জীবনে সেই শিক্ষার্থী বড় হয়ে যখন মা বা বাবা হয়, তখন নিজের সন্তানকে সঠিক সময়ে টিকা দিতে ভুলে যায়। কারণ সেই শিক্ষা কখনো তার জীবনের বা আচরণের অংশ ছিল না।
- বাংলা বা ইংরেজি পাঠ: কল্পনা করুন, পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘ছোট্ট রাইসার টিকা’ শিরোনামে একটি গল্প থাকল। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ছোট্ট রাইসার মা তাকে সময়মতো টিকা দিতে ভুলে যান, কারণ গ্রামের কুসংস্কারমুখরা একজন প্রতিবেশী বলেছিলেন ‘টিকা দিলে বাচ্চার জ্বর হয়’। পরে হাম ধরে, রাইসা অসুস্থ হয়ে পড়ে। একজন সচেতন স্বাস্থ্যকর্মী এসে সবকিছু বুঝিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত টিকা দেওয়া হয় এবং রাইসা সুস্থ হয়। এই গল্পটি শুধু ভাষা শিক্ষা দেবে না, এটি শিশুর মনে গেঁথে দেবে টিকা কত জরুরি।
- গণিত: গণিত বইয়ের অনুশীলনীতে অবাস্তব হিসেবের বদলে বাস্তব উপাত্ত ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন: ‘ঢাকা বিভাগে হামে আক্রান্ত হয়েছে ১,৪০৮ জন শিশু, যার মধ্যে ৬ জন মারা গেছে। মৃত শিশুদের মধ্যে ৩ জন টিকাবঞ্চিত ছিল। সুস্থ শিশুদের শতকরা হার কত?’ বা ‘একটি গ্রামে ৫০০ শিশুর মধ্যে হামের টিকা পেয়েছে ৪২৫ জন। টিকাপ্রাপ্তদের হার কত? টিকাবঞ্চিতদের শতকরা হার কত?’—এমন সমস্যা শিশুদের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচেতনতা শেখাবে।
- বিজ্ঞান: বিজ্ঞান বইয়ে শুধু ভাইরাসের গঠন না দেখিয়ে, ‘একটি টিকা কীভাবে আমাদের শরীরের ভেতর অ্যান্টিবডি তৈরি করে’—সেটা ছবি ও সরল ভাষায় ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। ভাইরাসটি কীভাবে কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে এক শিশু থেকে আরেক শিশুতে ছড়ায়, তা বোঝানোর জন্য সহজ ডায়াগ্রাম ব্যবহার করা প্রয়োজন।
- সামাজিকবিজ্ঞান: নবম-দশম শ্রেণির সামাজিকবিজ্ঞান বইয়ে আলোচনা থাকতে পারে—‘কেন একটি এলাকায় টিকাদানের হার কম?’ সেখানে গ্রামীণ দারিদ্র্য, স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট, অশিক্ষা, ধর্মীয় কুসংস্কার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব—এসব কারণ নিয়ে বিশ্লেষণ থাকবে। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই ক্ষুদ্র জরিপ করে দেখতে পারে তাদের এলাকার টিকাদানের হার কত।
বিশেষ প্যারেন্টিং শিক্ষা: পরিবারই প্রথম বিদ্যালয়
একটি শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা শুরু হয় তার পরিবার থেকে। বাংলাদেশে বহু শিশু প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হয় কেবল মা-বাবার সঠিক তথ্যের অভাবে ও কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে। তাই জাতীয় পর্যায়ে ‘বিশেষ প্যারেন্টিং শিক্ষা’ বা স্পেশাল প্যারেন্টিং এডুকেশন ইনিশিয়েটিভ চালু করার সময় এসেছে।
কীভাবে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব? প্রথমত, স্কুলে অভিভাবক সভার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে মাসিক স্বাস্থ্য ওরিয়েন্টেশন। দ্বিতীয়ত, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকা দেওয়ার সময় মা-বাবাদের জন্য ১০ মিনিটের স্বাস্থ্য শিক্ষা সেশন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, স্থানীয় মসজিদ, মন্দির বা গির্জায় জুম্মার খুতবা বা ধর্মীয় সভায় স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বার্তা দেওয়া যেতে পারে। চতুর্থত, স্থানীয় সরকার ও এনজিও’র মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে অভিভাবক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে।
এই প্যারেন্টিং শিক্ষায় কী কী থাকা জরুরি? জন্ম থেকে ৫ বছর পর্যন্ত কোন মাসে কোন টিকা দিতে হবে, তার একটি সহজ ছক। জ্বর, কাশি, ডায়রিয়ার কোন লক্ষণগুলো বিপজ্জনক এবং কখন হাসপাতালে যেতে হবে। শিশুর সঠিক পুষ্টি ও বুকের দুধের গুরুত্ব। অপুষ্টি কীভাবে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুয়া তথ্য চিহ্নিত করার উপায়। ইতিবাচক শাসন ও শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য। অটিজম, প্রতিবন্ধিতা সংক্রান্ত সঠিক ধারণা।
একজন সচেতন মা বা বাবা শুধু নিজের সন্তানকে নয়, পুরো প্রজন্মকে সুরক্ষিত করতে পারেন। একটি সচেতন পরিবার একটি সচেতন সমাজ গড়ে তোলে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে চায়, তবে শিক্ষা সংস্কারকে শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। পরিবারকেও ‘শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয়’ হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। আর সেই পথেই বিশেষ প্যারেন্টিং শিক্ষা হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে জরুরি সামাজিক বিনিয়োগ। কারণ এক ফোঁটা টিকার দাম যেখানে মাত্র কয়েক টাকা, সেখানে একটি শিশুর জীবন অমূল্য। আর সেই জীবন বাঁচানোর যাত্রা শুরু হয় একজন সচেতন মায়ের হাত ধরে—যাকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে তৈরি করে দিতে হবে।
৮. শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অংশীদারিত্ব ও স্থানীয় গবেষণার গুরুত্ব
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু উপেক্ষিত স্তম্ভটি হলো ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশন—শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা যদি শিল্পের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা জার্নালের পাতায় ধুলো জমে নিঃশেষ হয়ে যায়। অথচ দেশের ওষুধ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একসঙ্গে কাজ করলে তৈরি করতে পারে টিকা ট্র্যাকিং সিস্টেম, গুজব শনাক্তকরণের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি, কমিউনিটি স্বাস্থ্য ডাটাবেজ এবং স্বল্পমূল্যের ডায়াগনস্টিক কিট। এতে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমে, খরচ সাশ্রয় হয় এবং স্থানীয় বাস্তবতার সমাধান স্থানীয়ভাবেই সম্ভব হয়।
এছাড়া স্থানীয় স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে আমাদের নিজস্ব গবেষণার অভাব প্রকট ও বেদনাদায়ক। আমরা প্রায়ই আন্তর্জাতিক তথ্য বা বিদেশি মডেলের ওপর চোখ বুজে নির্ভর করি। কিন্তু কেন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে হঠাৎ টিকা গ্রহণের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেল? কেন কিছু পরিবার এখনও আধুনিক চিকিৎসকের বদলে ওঝা বা কুসংস্কারের ওপর নির্ভর করে? কেন মা-বাবারা শিশুর জ্বরকে ‘সাধারণ’ ভেবে অবহেলা করেন? এসব প্রশ্নের উত্তর কোনো বিলাসী বিদেশি ল্যাবরেটরিতে পাওয়া যাবে না। এগুলো লুকিয়ে আছে আমাদের গ্রাম-বাংলার মানুষের যাপিত জীবন, সংস্কৃতি, দারিদ্র্য ও সামাজিক বাস্তবতার গভীরে।
তবে আশার কথা হচ্ছে, এই গবেষণার সুযোগ এখনও হাতছাড়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, জনস্বাস্থ্য বিভাগ ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সমন্বয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি মাঠগবেষণা (ফিল্ড রিসার্চ) চালু করা জরুরি। তরুণ গবেষক, চিকিৎসক, শিক্ষক ও কমিউনিটি সংগঠকদের গবেষণা অনুদান ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে। কারণ একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সেই দেশ নিজের সমস্যা নিজের বাস্তবতার নিরিখে বুঝতে শেখে। বিদেশি তত্ত্ব পথ দেখাতে পারে, কিন্তু স্থানীয় গবেষণাই বলে দেয়—কোন পথটি আমাদের মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থে কার্যকর, সাশ্রয়ী ও টেকসই।
৯. মেধা পাচার বনাম মেধা অর্জন এবং এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের অসংখ্য মেধাবী গবেষক আজ ছড়িয়ে আছেন বিশ্বের নামীদামী গবেষণাগারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজির সাবেক অধ্যাপক ড. যুবায়েরের মতো যিনি এখন আমেরিকার এনআইএইচ-এ গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করছেন—এটি শুধু একজনের গল্প নয়, এটি আমাদের হারানো এক সম্ভাবনার প্রতীক। এই মেধাগুলো দেশের জনস্বাস্থ্যে বিপ্লব ঘটাতে পারে। কিন্তু কাজের অনুকূল পরিবেশ, পেশাগত সম্মান ও গবেষণার স্বাধীনতার অভাবে তারা ফিরছেন না। রাষ্ট্র যদি এই বিশাল মেধা নেটওয়ার্ককে কাজে লাগাতে পারে, তবে ‘ব্রেইন ড্রেন’ থামিয়ে তা ‘ব্রেইন গেইন’-এ রূপান্তরিত করা সম্ভব।
বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর পেটেন্ট আইনের কঠোরতা আমাদের ওষুধশিল্পে চাপ সৃষ্টি করবে। বর্তমানে যেসব জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আমরা কম দামে পাচ্ছি, ভবিষ্যতে সেগুলোর দাম বহুগুণ বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। ক্যানসার, হেপাটাইটিস, ডায়াবেটিসের ওষুধ থেকে শুরু করে টিকা—সবকিছুই পেটেন্টের থাবায় আটকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে সময় নিজস্ব গবেষণা ও উৎপাদন শক্তি না থাকলে দেশে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যসংকট তৈরি হবে।
তাই এখনই দরকার একটি সুদূরপ্রসারী ‘জাতীয় স্বাস্থ্য গবেষণা ও উদ্ভাবন পুনর্জাগরণ কর্মসূচি’। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি গবেষকদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে, তাদের জন্য দেশে গবেষণা কেন্দ্র ও আধুনিক ল্যাব স্থাপন করতে হবে। শুধু তাহলেই আমরা ভবিষ্যতের পেটেন্ট-বিরোধী যুদ্ধে টিকে থাকতে পারব, এবং আমাদের জনগণের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারব।
১০. বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা
এই মৃত্যুর দায় কে নেবে? নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা অপুষ্টি নয়—এখানে মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট অবহেলা, প্রশাসনিক গাফিলতি ও নীতিনির্ধারণের অদক্ষতা। আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত ‘দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি’ ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। একটি শিশু মারা গেলে শুরু হয় তদন্ত কমিটি, কিছু কাগজপত্র তৈরি হয়, কয়েকদিন সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু চাপা পড়ে যায়। কেউ জেল খাটে না, কেউ চাকরিচ্যুত হয় না, কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয় না। সেই চরম উদাসীনতা আজ আমাদের নাগরিক জীবনকে গ্রাস করেছে। শিশুদের জীবন নিয়ে এই অবহেলা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি নৈতিক অপরাধ, এটি মানবিক অপরাধ, এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে গুরুতর ব্যর্থতা।
প্রশ্ন হলো, আমরা কতদিন শুধু প্রতিবেদন ও সুপারিশের ফাঁদে সময় নষ্ট করব? কতদিন আমরা অপরাধীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হব? সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের বিরুদ্ধে যদি জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে আগামী বছর আবার অন্য কোনো রোগ প্রাদুর্ভাবে একই মৃত্যুমিছিল দেখতে হবে। তাই এখনই সময় স্বচ্ছ ও শক্তিশালী বিচার বিভাগীয় তদন্তের, যাতে সত্য সামনে আসে এবং কেউ যেন আইনের চোখ এড়াতে না পারে। আজকের নীরবতা আগামীকালের আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। শিশুরা মরছে—আমাদের চুপ করে থাকার সময় আর নেই।
১১. ন্যায়বিচার, ভিকটিমদের ক্ষতিপূরণ ও দায়ীদের বিচারের আইনী বাধ্যবাধকতা (দেশী ও আন্তর্জাতিক আইন)
হাম বা অন্য প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশু মৃত্যুর ঘটনা শুধু জনস্বাস্থ্য ব্যর্থতার বিষয় নয়; এটি আইনী ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও। যখন একটি শিশু সময়মতো টিকা না পাওয়ার কারণে মারা যায়, যখন অবহেলা, দুর্নীতি, গাফিলতি বা ভুল তথ্য প্রচারের কারণে পরিবার তাদের সন্তান হারায়, তখন সেই ক্ষতি কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে চলবে না। রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণ করা জরুরি।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার মৌলিক দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর অর্পণ করেছে। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে চিকিৎসা ও মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ১৮ অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশু মৃত্যু কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
যদি কোনো এলাকায় টিকাদান কর্মসূচি সচেতন অবহেলা, দুর্নীতি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে ভেঙে পড়ে এবং তার ফলে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ক্ষতিপূরণ দাবি করার নৈতিক ও আইনী অধিকার রাখে। বাংলাদেশে রিট মামলার মাধ্যমে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের বিচার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জনস্বার্থে মামলা করাও সম্ভব।
আন্তর্জাতিক আইনেও শিশুর স্বাস্থ্য অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে প্রতিটি শিশুর সর্বোচ্চ মানের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত। বাংলাদেশ এই সনদের স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। ফলে টিকাদান, পুষ্টি এবং প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতারও অংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ দীর্ঘদিন ধরে বলছে, প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশু মৃত্যু মানবাধিকারের লঙ্ঘনের সমান। কারণ আধুনিক বিশ্বে হাম প্রতিরোধের কার্যকর টিকা বহু বছর ধরে বিদ্যমান। তারপরও যদি শিশু টিকার অভাবে মারা যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—ব্যবস্থার কোথায় ভাঙন ছিল?
ক্ষতিপূরণ শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি যে অন্যায় ঘটেছে। একটি পরিবার যখন সন্তান হারায়, তখন তাদের মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। অনেক পরিবার চিকিৎসার জন্য ঋণে ডুবে যায়। অনেক মা-বাবা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমায় ভোগেন। তাই ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থাকে মানবিক ও কার্যকর করতে হবে।
দায়ীদের বিচারের প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি টিকা সরবরাহে দুর্নীতি হয়, যদি মেয়াদোত্তীর্ণ টিকা ব্যবহার করা হয়, যদি ভুয়া তথ্য প্রচার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শুধু প্রশাসনিক বদলি বা সাময়িক বরখাস্ত নয়, প্রয়োজন হলে ফৌজদারি তদন্তও হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো অনুযায়ী রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান দায়িত্ব রয়েছে—অধিকারকে সম্মান করা, সুরক্ষা দেওয়া এবং বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ শুধু হাসপাতাল নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; মানুষ যেন বাস্তবে নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা পায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তদন্তমূলক সাংবাদিকতা, জনস্বার্থ মামলা এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে অনেক সময় চাপ সৃষ্টি হয়, যা নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনে। ইতিহাস বলছে, অনেক স্বাস্থ্য সংস্কারই এসেছে জনমতের চাপে।
শিশুদের মৃত্যু নিয়ে নীরবতা সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ নীরবতা দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করে। যদি প্রতিটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত হয়, যদি পরিবারগুলো ন্যায়বিচার পায়, যদি অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের গাফিলতি কমে আসবে।
সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড আদালতের দেয়ালে লেখা আইন নয়; সেই আইন কতটা মানবিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটিই আসল প্রশ্ন। একটি শিশুর জীবন রক্ষা করতে না পারা রাষ্ট্রের জন্য গভীর আত্মসমালোচনার বিষয় হওয়া উচিত। আর যখন সেই মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য ছিল, তখন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শুধু আইনী নয়, মানবিক দায়িত্বও।
১২. এলডিসি উত্তরণ: পেটেন্টের থাবা, ওষুধশিল্পে সংকট ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি—এখনই তৈরি হতে হবে
বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত প্রান্তিকায় পৌঁছেছে, তখন অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধশিল্প এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে। এলডিসি সুবিধার আওতায় আমরা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বৌদ্ধিক সম্পত্তি অধিকার সংক্রান্ত নীতি (ট্রিপস) থেকে যে ছাড় পেয়ে এসেছি, তা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার হবে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে—বর্তমানে যে সব জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আমরা স্থানীয়ভাবে কম খরচে তৈরি করছি কিংবা বিদেশ থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে আমদানি করছি, ভবিষ্যতে সেগুলোর ওপর কঠোর পেটেন্ট আইন কার্যকর হবে। এককথায়, পেটেন্টের থাবায় দাম বেড়ে যাবে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার হবে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। ক্যানসার, হেপাটাইটিস, হার্টের জটিল ওষুধ থেকে শুরু করে অ্যান্টিবায়োটিক ও ইনসুলিনের দাম বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। আর হামের মতো সংক্রামক রোগের টিকা বা জরুরি চিকিৎসার ওষুধ যদি অভাবের মুখে পড়ে, তবে দেশে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। শুধু তাই নয়, বিদেশি কোম্পানিগুলো যখন পেটেন্টের অধিকার নিয়ে আমাদের স্থানীয় উৎপাদন বন্ধ করে দেবে, তখন ওষুধের সংকট তীব্র আকার ধারণ করবে।
এই সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। প্রথমত, জরুরি ওষুধের একটি জাতীয় তালিকা তৈরি করে সেগুলোর স্থানীয় উৎপাদনে গবেষণা জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, টিকা ও জেনেরিক ওষুধের বিকল্প ফর্মুলেশন তৈরিতে দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চুক্তি জরুরি। তৃতীয়ত, এলডিসি উত্তরণের সময়সীমার মধ্যে একটি ‘জাতীয় ওষুধ নিরাপত্তা তহবিল’ গঠন করা উচিত, যাতে দরিদ্র রোগীদের ভর্তুকি দিয়ে ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয়।
এখনই যদি আমরা নিজেদের গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না বাড়াই, তাহলে পেটেন্টের থাবা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেবে। বাংলাদেশের মানুষের বাঁচার অধিকার যেন আন্তর্জাতিক পেটেন্টের কাছে জিম্মি না হয়—সেজন্য প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা ও এখনই কার্যকর পদক্ষেপ।
১৩. শিক্ষা যা নিলাম এক পালা মৃত্যুর পর: বাংলাদেশের জন্য চিরন্তন কিছু পাঠ
হামের এই প্রাদুর্ভাব—যার হিসাব এখনও শেষ হয়নি, যার কান্না এখনও থামেনি—আমাদের সামনে রেখে গেল কয়েকটি অমোঘ ও চিরন্তন শিক্ষা। প্রতিটি শিশুর মৃত্যু যেন এক একটি করে স্তম্ভ, যার ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থাকে নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। এই শিক্ষাগুলো যদি আমরা আত্মস্থ করতে না পারি, তাহলে আগামীকাল আবার কোনো না কোনো রোগের মহামারি আমাদের দরজায় কড়া নেড়ে বসবে।
- প্রথম পাঠ: প্রতিরোধে বিনিয়োগ সবচেয়ে বড় সাশ্রয়। আমরা এখনও অভ্যস্ত প্রতিক্রিয়াশীল নীতিতে—সংকট তৈরি হোক, তারপর টাকা ছাড় করি, কমিটি করি, হাসপাতালের বিছানা বাড়াই। অথচ একটি টিকার দাম কয়েক টাকা, আর একটি শিশুকে আইসিইউতে ভর্তি করে বাঁচানোর খরচ কয়েক লাখ টাকা। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। হামের টিকার একটি ডোজের দাম যেখানে নগণ্য, সেখানে একটি শিশুর চিকিৎসা ব্যয় একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে। আমাদের বাজেটে প্রতিরোধ বনাম প্রতিকারের এই অঙ্কটা বারবার হিসাব করতে হবে।
- দ্বিতীয় পাঠ: স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পৃথক সিংহাসনে বসলে নয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি সমন্বয়। স্বাস্থ্যকর্মীরা স্কুলে যান না, শিক্ষকরাও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান না। অথচ একটি শিশুর শরীর ও মন—একসঙ্গে গড়ে ওঠে। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে স্বাস্থ্য শিক্ষা যদি বাধ্যতামূলক না হয়, যদি শিক্ষক প্রশিক্ষণে স্বাস্থ্য সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত না থাকে, তাহলে আমরা শুধু পরীক্ষায় পাস করা শিক্ষার্থী তৈরি করব, সচেতন নাগরিক তৈরি করতে পারব না। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ‘স্কুল হেলথ প্রোগ্রাম’ এখনই বাধ্যতামূলক করতে হবে।
- তৃতীয় পাঠ: গুজবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জিততে হবে সংস্কৃতির ভাষায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে ভুয়া তথ্য যে কোনো ভাইরাসের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। গুজবের মোকাবিলা কেবল তথ্য দিয়ে সম্ভব নয়; সম্ভব হলে তা হতো। আমাদের বিজ্ঞানকে মানুষের ভাষায়, মানুষের গল্পে, মানুষের সংস্কৃতিতে রূপান্তর করতে হবে। স্থানীয় নাটক, মসজিদের খুতবা, কমিউনিটি র্যালি, স্কুলের অনুষ্ঠান—যেখানেই জনতা যায়, সেখানেই বিজ্ঞানের বার্তা পৌঁছাতে হবে। আর এক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও গণমুখী ব্যক্তিত্বদের সম্পৃক্ত করা জরুরি।
- চতুর্থ পাঠ: জবাবদিহি ছাড়া উন্নয়ন হয় ভুয়া। কোনো সংকট মোকাবিলায় ভূমিকা রাখেনি এমন কর্মকর্তার জবাবদিহি হয় না, গাফিলতির শাস্তি হয় না, তদন্ত প্রতিবেদন চাপা পড়ে যায়—এই চক্র আমাদের বহুবার দেখতে হয়েছে। হাম প্রাদুর্ভাবের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সব পর্যায়ের ব্যর্থতার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে, কোনো কর্মকর্তাই ভবিষ্যতে সতর্ক হবেন না। জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে না ওঠা পর্যন্ত সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভুয়া থাকবে।
- পঞ্চম পাঠ: স্থানীয় গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ একান্ত জরুরি। আমরা কেন সবসময় বিদেশি তথ্যের ওপর নির্ভর করি? কেন বাংলাদেশের গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যআচরণ, গুজবে বিশ্বাস, টিকা গ্রহণে বাধা—এসব নিয়ে আমাদের নিজস্ব দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা নেই? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জনস্বাস্থ্য গবেষণায় বাজেট বাড়াতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ফিল্ড রিসার্চ সেন্টার স্থাপন করতে হবে। তরুণ গবেষকদের অনুদান ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে। কারণ স্থানীয় সমস্যার সমাধান কখনো বিদেশি ল্যাবে তৈরি হয় না; তা তৈরি হয় এ দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে।
- ষষ্ঠ পাঠ: এলডিসি উত্তরণের ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই প্রস্তুতি। পেটেন্ট আইনের থাবা আমাদের ওষুধশিল্পকে অচল করে দেওয়ার আগেই আমাদের তৈরি হতে হবে। দেশীয় টিকা ও জেনেরিক ওষুধের বিকল্প ফর্মুলেশন উদ্ভাবনে গবেষণা জোরদার করতে হবে। একটি ‘ন্যাশনাল মেডিসিন রিজার্ভ ফান্ড’ গড়ে তুলতে হবে, যাতে দরিদ্র রোগীরা পেটেন্টের কারণে উচ্চমূল্যের ওষুধ কিনতে বাধ্য না হন। আর বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি গবেষকদের ‘ব্রেইন গেইন’ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য গবেষণায় সম্পৃক্ত করতে হবে।
- সপ্তম পাঠ: মিডিয়া ও সুশীল সমাজের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। গণমাধ্যম শুধু সংবাদ প্রচার নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের অংশীদার। টিকা সচেতনতায় নাটক, টকশো, তথ্যচিত্র ও গণমুখী ক্যাম্পেইন চালাতে হবে। আর সুশীল সমাজকে নজরদারি ও জবাবদিহির ভূমিকা পালন করতে হবে। হাসপাতালের অভিযোগ বাক্স আর কাগজের ফর্মালিটি নয়; তা হতে পারে জনস্বাস্থ্যের মেরুদণ্ড।
- অষ্টম পাঠ: একজন মায়ের শিক্ষাই শেষ পর্যন্ত জাতিকে বাঁচায়। সবচেয়ে ছোট ও সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি হলো—একটি সচেতন মা একটি সচেতন সমাজের ভিত্তি। যেসব মা-বাবা জানেন না কোন বয়সে কোন টিকা, জ্বরের কোন লক্ষণ বিপজ্জনক, অপুষ্টির প্রভাব কী—তাঁদের কাছে কেবল তথ্য পৌঁছালেই চলবে না; পৌঁছাতে হবে বিশ্বাস। তাই কমিউনিটি ক্লিনিক, মাতৃসদন, স্কুল ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অভিভাবক শিক্ষা (প্যারেন্টিং এডুকেশন) বাধ্যতামূলক করতে হবে।
- শেষ পাঠ: স্মৃতি আমাদের পাথেয়, মৃত্যু আমাদের পাথর। যে শিশুরা আজ আর নেই—রাইসা, রাফি আর অজস্র নামহারা—তারা চলে গেছে। তাদের হাসি ফিরবে না। কিন্তু তাদের মৃত্যু যদি আমাদের ঘুম ভাঙাতে না পারে, তাদের মায়ের কান্না যদি নীতিনির্ধারকদের কক্ষে প্রবেশ না করে, তবে সভ্যতা হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা চিরস্থায়ী হবে।
বাংলাদেশের হাম প্রাদুর্ভাব আমাদের শেখায়—প্রতিরোধযোগ্য রোগের কাছে হার মানা সভ্যতার পরাজয়। আর এই পরাজয় আমরা মেনে নিতে পারি না। শিক্ষা হোক আমাদের অস্ত্র, বিজ্ঞান হোক আমাদের পাথেয়, মানবিকতা হোক আমাদের মূলমন্ত্র। তাহলেই আমরা একদিন বলতে পারব—এই বাংলায় আর কোনো শিশু টিকার অভাবে মরে না। এই দেশ সত্যিকার অর্থেই ‘সোনার বাংলা’।
শেষ কথা: ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু হামের টিকার নয়। প্রশ্নটি আরও গভীরে—আমরা কেমন রাষ্ট্র হয়ে উঠছি? আমরা কি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছি এমন এক অবস্থায়, যেখানে শিশু মৃত্যু আমাদের আর কাঁপায় না? নবারুণ ভট্টাচার্যের তীব্র উচ্চারণ আজ ফিরে আসে:
সেই উত্তরের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#হাম #শিশুস্বাস্থ্য #টিকাদান #MRVaccine #বাংলাদেশ #স্বাস্থ্যশিক্ষা #জনস্বাস্থ্য #শিশুমৃত্যু #EPI #HealthCrisis #EducationReform #অধিকারপত্র #VaccineAwareness #MeaslesOutbreak #PublicHealth #শিক্ষাসংস্কার #টিকাগাফলতি #ChildRights #GlobalHealth #ParentingEducation #HealthEquity #BangladeshHealth #StopMeasles #VaccinationSavesLives #HumanRights #ScientificAwareness #HealthcareJustice #LDCGraduation #ResearchAndInnovation #SaveChildren
Keywords: হাম, শিশুমৃত্যু, টিকাদান, স্বাস্থ্যশিক্ষা, শিক্ষাসংস্কার, জনস্বাস্থ্য

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: