অধিকারপত্র পরিবেশ সংস্কার ধারাবাহিক│"বাংলার নদীর কান্না"—ইতিহাস, সংকট, রাষ্ট্রব্যর্থতা ও পুনর্জাগরণের পথ
বাংলাদেশের সংসদে প্রকাশিত নতুন তথ্য জানাচ্ছে, বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা ১,৪১৫টি, অথচ অবৈধ দখলদারের সংখ্যা ২১,৯৮৮। এই অনুসন্ধানী ফিচার কেবল পরিসংখ্যান তুলে ধরে না; বরং বিশ্লেষণ করে কীভাবে দখল, দূষণ, প্রশাসনিক দুর্বলতা, নাব্যতার সংকট এবং দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা মিলিতভাবে বাংলাদেশের নদীগুলোকে অস্তিত্বের সংকটে ঠেলে দিয়েছে। সংসদে উত্থাপিত তথ্য, নদী ব্যবস্থাপনা, ড্রেজিং কার্যক্রম এবং নদী রক্ষার বাস্তব চ্যালেঞ্জের আলোকে এই প্রতিবেদন খুঁজে দেখেছে—নদীর প্রকৃত মালিক কে, দখলদারদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কতটা কার্যকর, এবং কেন নদী রক্ষা আজ বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি, সভ্যতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
কখনো কখনো এমন কিছু সংখ্যা উচ্চারিত হয়, যা কেবল পরিসংখ্যান নয়—একটি জাতির বিবেকের সামনে ধরা পড়া নির্মম বাস্তবতার আয়না। ২০২৬ সালের ২৫ জুন জাতীয় সংসদে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম যখন জানালেন, দেশে নদ-নদীর সংখ্যা ১,৪১৫টি এবং এসব নদীর ওপর অবৈধ দখলদারের সংখ্যা ২১ হাজার ৯৮৮ জন, তখন সংখ্যাগুলো যেন সংসদ কক্ষের দেয়াল পেরিয়ে নদীর শুকিয়ে যাওয়া বুক থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাস হয়ে প্রতিধ্বনিত হলো।
একটি সহজ কিন্তু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তখন সামনে এসে দাঁড়ায়—যে দেশে নদীর সংখ্যা মাত্র এক হাজার চারশ পনেরো, সেখানে অবৈধ দখলদারের সংখ্যা তার প্রায় ষোল গুণ! অর্থাৎ গড়ে প্রতিটি নদীর কাঁধে চেপে বসেছে একাধিক নয়, বরং বহু দখলদার। নদী যেন আর স্বাধীন কোনো প্রাকৃতিক সত্তা নয়; তাকে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে অসংখ্য লোভ, প্রভাব, ক্ষমতা ও অবৈধ স্বার্থের মধ্যে। এই পরিসংখ্যান কেবল দখলের সংখ্যা জানায় না; এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচারের এক গভীর সংকটেরও ভাষ্য বহন করে।
মন্ত্রী আরও জানান, এই নদীর তালিকা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নয়; নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন এবং নদী নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন অংশীজনের সমন্বয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র আজ অন্তত জানে—দেশে কত নদী আছে, কোথায় আছে, এমনকি কতজন তাদের দখল করে রেখেছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, জানা আর রক্ষা করার মধ্যে যে দূরত্ব, সেই দূরত্বই কি আজ বাংলাদেশের নদীগুলোর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি নয়?
সংসদে একই আলোচনায় আরেকটি বাস্তবতাও উঠে আসে। নৌপথের নাব্যতা বজায় রাখতে প্রতিবছর গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংরক্ষণ ড্রেজিং পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার ২০০ কিলোমিটার এবং বর্ষায় প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। একই সঙ্গে যাত্রীবাহী লঞ্চবহরে আধুনিক ও বৃহৎ নৌযান সংযোজনের ফলে দুর্ঘটনা কমে আসার কথাও জানানো হয়েছে। এসব অগ্রগতি প্রমাণ করে, নদীকে ব্যবহারযোগ্য রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কিছু ক্ষেত্রে এগোচ্ছে। কিন্তু নদীকে জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে রক্ষা করার লড়াই কি একই গতিতে এগোচ্ছে?
কারণ নদী কেবল নৌপথ নয়, কেবল ড্রেজিংয়ের মানচিত্রও নয়। নদী একটি জীবন্ত সত্তা, যার তীর, চর, জলপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব মিলেই তার পূর্ণ পরিচয়। যদি নদীর বুকে হাজারো দখলদারের স্থাপনা দাঁড়িয়ে থাকে, যদি তার স্বাভাবিক প্রবাহ প্রতিনিয়ত সংকুচিত হয়, তবে কেবল ড্রেজিং দিয়ে নদীর প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। যেমন মানুষের শরীরে অস্ত্রোপচার করলেই সব রোগ সারে না, তেমনি নদীর বুকে পলি অপসারণ করলেই নদী সুস্থ হয় না; তার শিকলও খুলে দিতে হয়।
এই কারণেই সংসদে উচ্চারিত ১,৪১৫ এবং ২১,৯৮৮—এই দুটি সংখ্যা বাংলাদেশের নদী ইতিহাসে শুধু প্রশাসনিক তথ্য নয়; এগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে রাষ্ট্রের জবাবদিহিরও নীরব দলিল। একদিকে নদীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের সাফল্য, অন্যদিকে সেই নদীগুলোর ওপর হাজারো অবৈধ দখলের স্বীকৃতি—এই দ্বৈত বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নদী রক্ষার লড়াই কেবল প্রকৌশলগত নয়; এটি আইনের শাসন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সাহস এবং নাগরিক নৈতিকতারও এক কঠিন পরীক্ষা। কারণ, যে জাতি তার নদীর প্রকৃত মালিকানা ফিরিয়ে দিতে পারে না, সে জাতি শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যতের ওপরও পূর্ণ অধিকার ধরে রাখতে পারে না।
আসুন নদীকে শুধু সম্পদ নয়, জাতির জীবনরেখা হিসেবে দেখি।
-লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র
#বাংলার_নদীর_কান্না #নদী_বাঁচাও #বাংলাদেশ_বাঁচাও #নদী_দখল #পরিবেশ_সংস্কার #নদী_রক্ষা #জলবায়ু_ন্যায়বিচার #সুস্থ_বাংলাদেশ #অধিকারপত্র #SaveOurRivers #RestoreBangladeshRivers

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: