অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক│শিক্ষা দর্শন
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কি এখনো ঔপনিবেশিক চিন্তার বন্দী? জাতীয় চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ, মাতৃভাষা, শিক্ষাদর্শন ও পশ্চিমা মডেলের দ্বন্দ্ব নিয়ে এই বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধে উঠে এসেছে বাংলাদেশের শিক্ষা সংকটের গভীর বাস্তবতা। মুখস্থবিদ্যার কারাগার, রাজনৈতিক প্রভাব, মাদ্রাসা-সাধারণ শিক্ষার বিভাজন, ইংরেজি বনাম বাংলা মাধ্যমের দ্বন্দ্ব এবং জাতীয় শিক্ষাদর্শনের অনুপস্থিতি কীভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিকড়হীন করে তুলছে—তার এক সাহিত্যিক অথচ গবেষণাভিত্তিক নির্মোহ বিশ্লেষণ।
বর্ষার শেষে নদীর পাড় ভাঙে যেমন নিঃশব্দে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেও তেমনি ভাঙছে এক গভীর ভিত্তি—জাতীয় চেতনার ভিত। শ্রেণিকক্ষের ব্ল্যাকবোর্ডে আজও চক দিয়ে লেখা হয় স্বাধীনতার ইতিহাস, অথচ অনেক শিক্ষার্থীর ভেতরে জন্ম নেয় না স্বাধীন চিন্তার সাহস। একদিকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি, অন্যদিকে ম্যাকলের ছায়া; একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অন্যদিকে পরীক্ষামুখী মুখস্থবিদ্যার নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতা। প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই স্বাধীন শিক্ষাব্যবস্থা গড়তে পেরেছি, নাকি এখনো ঔপনিবেশিক মানসিকতার পুরোনো খাঁচাতেই বন্দী আমাদের জ্ঞানচর্চা?
বাংলার গ্রামের ভাঙা স্কুলঘর থেকে শহরের ইংরেজি মাধ্যম ক্যাম্পাস পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে এক নীরব দার্শনিক সংকট। শিক্ষা কি কেবল চাকরি পাওয়ার সিঁড়ি, নাকি আত্মপরিচয় নির্মাণের মহাসড়ক? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বাংলাদেশের শিক্ষাদর্শনের জটিল জড়তা নিয়ে শুরু হয় এক বেদনাময় অথচ জরুরি অনুসন্ধান।
শিকড়হীন বিদ্যার আবাদ — কোন পথে বাংলাদেশের শিক্ষাদর্শন? স্বাধীনতার পরও ঔপনিবেশিক মানসিকতার ছায়া
বাংলার মাঠে যখন আমন ধানের সোনালি শীষ বাতাসে দুলে ওঠে, তখন শহর ও গ্রামের জরাজীর্ণ স্কুলভবনগুলোতেও আরেক ধরনের চাষাবাদ চলে—বিদ্যার আবাদ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিদ্যার বীজ কি কখনও এ মাটির আত্মাকে স্পর্শ করতে পেরেছে? নাকি আমরা এখনও উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক ছাঁচে তৈরি পুরোনো পাত্রেই নতুন নতুন শিক্ষানীতি ঢেলে চলেছি—যার ভেতরে আছে অনুকরণের ঝলক, কিন্তু নেই আত্মপরিচয়ের স্থায়ী ভিত্তি? শিক্ষা দর্শনের জটিল ও আভিজাত্যপূর্ণ শব্দবন্ধের আড়ালে তাই হারিয়ে যায় শ্রেণিকক্ষের হাঁসফাঁস করা বাস্তবতা। একজন কৃষকের সন্তান যদি নিউটনের সূত্র মুখস্থ করে, কিন্তু নিজের গ্রামের পুকুর শুকিয়ে যাওয়ার সংকট বুঝতে না শেখে; যদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ে, অথচ সেই যুদ্ধের চেতনাকে নিজের বিবেকের অংশ বানাতে না পারে—তবে প্রশ্ন জাগে, আমাদের জাতীয় চেতনার আলোকবর্তিকা আসলে কোন পথ দেখাচ্ছে?
গত মাসে রংপুরের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে চোখে পড়ল এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব। দেয়ালে টাঙানো বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির ঠিক নিচেই ঝুলছে ব্রিটিশ আমলের ‘গড সেভ দ্য কুইন’-এর বঙ্গানুবাদ। শিক্ষিকা বললেন, “এটাও পাঠ্যসূচির অংশ।” এই দৃশ্য যেন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতীক—স্বাধীনতার অর্ধশতক পরও আমরা মানসিকভাবে পুরোপুরি স্বাধীন হতে পারিনি। ব্রিটিশ শিক্ষানীতির মূল স্থপতি টমাস ব্যাবিংটন মেকলি যে শিক্ষামডেলের কথা বলেছিলেন—“রক্তে ভারতীয়, কিন্তু চিন্তা ও রুচিতে ইংরেজ”—তার ছায়া এখনও আমাদের শিক্ষার করিডরে ঘুরে বেড়ায়। ১৯৭১ সালে রাষ্ট্র স্বাধীন হলেও শিক্ষাদর্শনের ভিত রয়ে গেছে ঔপনিবেশিক কাঠামোর ভেতর বন্দী।
মুখস্থবিদ্যার কারাগারে বন্দী অন্তর্দৃষ্টি
ফরাসি দার্শনিক জাঁ জাক রুশো বলেছিলেন, “প্রকৃত শিক্ষা হলো অন্তর্দৃষ্টির বিকাশ।” অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্দৃষ্টির চর্চার চেয়ে মুখস্থবিদ্যার বিজ্ঞাপনই বেশি। কোনো এক গভীর রাতে তিতাসের চরে জেলেরা যখন জাল ফেলেন, তখন তাদের সন্তানরা বাংলা-ইংরেজি ব্যাকরণের বই বালিশ করে ঘুমিয়ে থাকে। সেই শিশু হয়তো জানে ‘র্যাট’ মানে ইঁদুর, কিন্তু জানে না যমুনার স্রোত কীভাবে নবান্নের গন্ধ বয়ে আনে। জাতীয় চেতনার প্রথম স্তম্ভ হওয়া উচিত নিজের ভূগোল, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে আত্মিক সত্তা হিসেবে ধারণ করা। বটগাছের শিকড় যেমন মাটির গভীরে প্রবেশ করে, তেমনি শিক্ষার্থীর চেতনারও শেকড় থাকা দরকার নিজের দেশ ও মানুষের ভেতরে। সেই শেকড় না থাকলে শিক্ষা হয়ে ওঠে কেবল পরীক্ষার নম্বরের খেলা, মুক্ত চিন্তার নয়।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলা পাঠ্যপুস্তক: জাতীয় চেতনার সংকট ও মানসিক শূন্যতা
আমাদের পাঠ্যবইয়ের বড় সংকট হলো—এগুলো প্রায়ই বিচ্ছিন্ন সুরের মতো। শিক্ষার্থী বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ পড়ে ‘বন্দে মাতরম’-এর ইতিহাস জানে, কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা কীভাবে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, তা অনুভব করতে পারে না। ইতিহাসের ছাত্র তারিখ মুখস্থ করতে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু ইতিহাসের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া মানুষের রক্ত, স্বপ্ন ও প্রতিরোধের নদী তার সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে না। ফলে ইতিহাস হয়ে দাঁড়ায় পরীক্ষার বিষয়, জাতির আত্মপরিচয়ের আয়না নয়।
জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছিলেন, “আমাদের স্বাধীনতা কেবল ভৌগোলিক নয়, এটি ছিল চেতনার মুক্তি।” কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা সেই মুক্তির বোধকে গভীরভাবে ধারণ করতে পারেনি। শিক্ষার্থীরা তথ্য পাচ্ছে, প্রযুক্তি শিখছে, কিন্তু জ্ঞান ও মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে যে সেতুবন্ধন প্রয়োজন, তার নকশাই যেন অনুপস্থিত। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যাম্পাসগুলোতে একদিকে উৎসবের উন্মাদনা, অন্যদিকে তীব্র হতাশা ও শূন্যতা পাশাপাশি অবস্থান করে। জ্ঞানের সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক না তৈরি হলে শিক্ষা মানুষকে দক্ষ কর্মী বানাতে পারে, কিন্তু পূর্ণ মানুষ বানাতে পারে না।
শিক্ষা কখনোই নিরপেক্ষ নয় — বাংলাদেশের প্রয়োজন নিজস্ব শিক্ষাদর্শনের পুনর্জাগরণ
শিক্ষা কেবল নিরপেক্ষ বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। ব্রাজিলের শিক্ষাবিদ পাউলো ফ্রেইরে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Pedagogy of the Oppressed-এ দেখিয়েছিলেন, শাসকগোষ্ঠী প্রায়ই এমন শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করে যেখানে শিক্ষার্থী কেবল তথ্যের ভাণ্ডার হয়ে থাকে। তিনি একে বলেছিলেন “ব্যাংকিং মডেল অব এডুকেশন”—যেখানে শিক্ষক তথ্য জমা দেন, আর শিক্ষার্থী নিঃশব্দ গুদামের মতো তা জমা রাখে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বড় অংশ আজও সেই কাঠামোর প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন করার অধিকার, বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা, কিংবা সমাজকে পরিবর্তনের স্বপ্ন—এসবের জায়গা খুব সীমিত। ফলে শিক্ষা জাগরণের বদলে অনেক সময় আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি করে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে রূপান্তর করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট জাতীয় শিক্ষাদর্শন। এমন এক দর্শন, যা একইসঙ্গে ধারণ করবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মানবিকতা, যুক্তিবাদ এবং বৈশ্বিক জ্ঞানের সঙ্গে সংযোগ। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তির পাশাপাশি সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস ও সংস্কৃতির জানালাও সমানভাবে খুলে দিতে হবে। কারণ শিক্ষা কেবল চাকরির প্রস্তুতি নয়; এটি আত্মপরিচয় খোঁজার যাত্রা। সেই যাত্রায় শিক্ষার্থী যদি নিজের দেশ, মানুষ ও ইতিহাসকে আবিষ্কার করতে শেখে, তবেই বাংলাদেশের শিক্ষাভবনগুলো সত্যিকার অর্থে আলোকিত হবে।
ঘনঘন দর্শন বদলের জ্বরে শিক্ষার জ্বরভ্রম
স্বাধীনতার পঞ্চাশোর্ধ্ব বছর পেরিয়েও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা যেন এক অস্থির চঞ্চল নদীর চর—একবছর এপাড়ে, পরের বছর ওপাড়ে। পাঠ্যপুস্তকের পাতায় পাতায় দেখা যায় সংযোজন-বিয়োজনের খেলার ছাপ। ১৯৭২ সালের প্রথম শিক্ষাকমিশন থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২০১০-এর জাতীয় শিক্ষানীতি, প্রতিটি সরকারের আমলেই যেন নতুন দর্শনের নামে পুরোনো আদর্শিক ভিতকে বারবার কর্তন করা হয়। প্রশ্ন হলো—শিক্ষা দর্শন কি কোনো বছরের ফ্যাশন, যা প্রতি নির্বাচনী চক্রে রং বদলায়? নাকি এত ঘনঘন পথ পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থীরা হারিয়ে ফেলে চিরায়ত পথের স্মৃতিচিহ্ন ?
কারণ অনুসন্ধানে কারণসমূহ মোটা দাগে ওঠে আসে:
- প্রথম কারণ —হিসেবে ধরা পরে রাজনৈতিক অস্থিরতার করাল ছায়া। ১৯৭৫-এর আগস্টের ঘাতক অন্ধকারের পর থেকে প্রতি অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপতি শাসন ও সামরিক শাসনকালে শিক্ষানীতি হয়ে ওঠে শাসকগোষ্ঠীর হাতিয়ার। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের ‘শিক্ষা নীতি’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে গৌণ করে তোলে, বাড়িয়ে দেয় ধর্মীয় শিক্ষার বরাদ্দ। আবার ১৯৯০-এর দশকে স্বৈরাচার পতনের পর ‘বাংলাদেশ শিক্ষাকমিশন ১৯৯৭’ ফিরিয়ে আনে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ, কিন্তু তাতে নতুন করে জোর দেয় ইংরেজি মাধ্যমের দাম্ভিকতায়। যেন খেয়ালী হাওয়া—উত্তর থেকে বইলে দক্ষিণে ছোটে নৌকা, দক্ষিণ থেকে বইলে আবার দিশাহারা হয় পাল।
- দ্বিতীয় কারণ—বিদেশি অনুদান ও উন্নয়ন সংস্থার প্রভাব। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও ইউনেস্কো যখন শিক্ষাখাতে কোটি কোটি টাকা ঋণ দেয়, তখন তাদের শর্তানুযায়ী পাঠ্যসূচি সাজাতে হয় ‘মডুলার সিস্টেম’, ‘আউটকাম বেসড এডুকেশন’, ‘কম্পিটেন্সি বেসড কারিকুলাম’—যে সব পরিভাষা বাংলার মফস্বল শিক্ষকের কাছে জটিল ধাঁধার মতো। এই বিদেশি ফ্রেমে বসিয়ে আমাদের ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে গোছাতে গিয়ে তৈরি হয় সংকট। এক দশকে জাতীয় শিক্ষাক্রম সায়েন্স ল্যাবরেটরি স্কুলের আদলে গড়া আইডিয়ালিজম, পরের দশকে সেটি ব্যাকফায়ার করে বাণিজ্যিক শিক্ষার মসজিদ হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থী কেবল জানে এ বছর ‘বইটি পরিবর্তিত হয়েছে’, কিন্তু কেন হলো, তার দর্শনগত ব্যাখ্যা তার অজানা।
- তৃতীয় কারণ—শিক্ষা বিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র ও গোষ্ঠীস্বার্থ। আমাদের কিছু পাঠ্যপুস্তকের অধ্যায় থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বাদ দেওয়া হয়েছিল ২০০০ সালের দিকে, আবার পরে সেটি ফিরিয়ে আনা হয়। উগ্র ডানপন্থি কিছু মহল বারবার চেষ্টা চালায় ধর্মীয় গ্রন্থের সরলপাঠকে ‘আদর্শ শিক্ষা’ হিসেবে প্রস্তাব করতে। এদের চাপে বারবার শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ মাথার উপর উঠলেও, বাস্তবায়নের সময় ‘মধ্যপন্থি’ নামে যে আপস তৈরি হয়, তাতে মলিন হয় প্রকৃত জাতীয়তাবাদ। এ যেন বৃক্ষের গোড়ায় ঘনঘন কুঠারাঘাত—আগের ক্ষত বাঁধার আগেই নতুন দাগ কাটে।
- চতুর্থ কারণ —এ ছাড়া আমাদের সমাজের ‘মেরিটের উপাসক’ মধ্যবিত্ত অভিভাবক সমাজ বারবার চায় পরীক্ষামুখী রটনা ভিত্তিক শিক্ষা। ফলে সরকারি দর্শনে যতই সৃজনশীলতা বা যুক্তির বীজ বপন করতে চান নীতিনির্ধারক, অভিভাবক ও কোচিং সেন্টারদের চাপে সেটি শেষ পর্যন্ত মুখস্থ বিদ্যার কঠিন শৃঙ্খলেই রূপ নেয়। একই শিক্ষার্থী সকালে স্কুলে পড়ে ‘শিক্ষা আনন্দময় হবে’, বিকেলে কোচিংয়ে মুখস্থ করে ‘একাদশী বিধি’।
এই ঘনঘন দর্শন বদলের জ্বরে শিক্ষার নিজস্ব কোন শেকড় তৈরি করতে পারে না। প্রতিটি কমিশন আগের কমিশনকে রহিত করে, বাতিল করে তার সেরা অংশগুলো। সিলেবাস পরিবর্তনের এত তোড়জোড়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ তৈরি হয় অসম্পূর্ণ থেকে। আর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় প্রজন্মের—তারা চিরকাল প্রস্তুতির তোড়জোড়ে সময় কাটায়, ধৈর্য ধরে গভীর কোনো বিষয়ে মগ্ন হতে পারে না, কারণ তারা জানে– আগামী বছরের বই হয়তো আজকের জ্ঞানকেই অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করবে।
১৯৭১-এর পতাকার রং লাল-সবুজ; কিন্তু আমাদের শিক্ষাদর্শন যেন হয় সাদাকালো টেলিভিশনের পটভূমি, যেখানে প্রতিবছরই কারও না কারও হাত ঘুরিয়ে দিতে চায় চ্যানেল। জাতীয় চেতনা কখনো ফ্যাড বা ট্রেন্ডের বস্তু নয়—তা গভীর, স্থির, দীর্ঘসময় ধরে গড়ে ওঠে। শিক্ষাব্যবস্থাকে তাই চলনশীল বালুর চর বানানো থেকে বিরত হয়ে এক দৃঢ় মহীরুহের রূপ দিতে হবে, যার ছায়াতলে দাঁড়িয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাবে নিজেদের পরিচয়ের নির্যাস, নয় অস্থিরতার বিষবাষ্প।
আম গাছের ছায়ায় স্বপ্নচারী জনতা: গণমানুষের দার্শনিক সত্ত্বা ও শিক্ষার অনিবার্য শর্তাবলি
শিক্ষা দর্শনের জটিল তর্ক যখন নীতিনির্ধারকদের কনফারেন্স টেবিলে ধোঁয়া ছড়ায়, তখন মফস্বলের চায়ের দোকানের এক কৃষক কিংবা বেহালার এক দিনমজুর তার সন্তানের হাতে তুলে দেয় টিফিন বক্স—ভেতরে থাকে এক টুকরো গুড়মাখা রুটি। তার দর্শন কোনো বইয়ের পাতায় নেই, নেই কোনো পশ্চিমা তত্ত্বের জটিল পরিভাষা। তার দর্শন এতটুকু—“আমার ছেলে আমার চেয়ে ভালো জেনে শুনে বাঁচুক।” এই ‘ভালো বাঁচা’র সংজ্ঞায় মিশে আছে পেটের দায়, সামাজিক মর্যাদা ও এক অলিখিত স্বপ্ন—যেন বটগাছের নিচে বসে কোনো সাপ্তাহিক হাটের দিন গ্রামের মৌলভী সাহেব যখন পুঁথি পড়ান, তখন সেই কৃষক মনে মনে কামনা করে—আল্লাহ, তুই আমার সন্তানকে অক্ষরজ্ঞান দে, যাতে পাকা জমির ফসলের দামের কাগজে সই করতে না লজ্জা পায়।
বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে বড় বড় সেমিনার যখন রাজধানীর অভিজাত অডিটোরিয়ামে আলো ঝলমলে পর্দার নিচে “কারিকুলাম ট্রান্সফরমেশন”, “গ্লোবাল কম্পিটেন্সি” কিংবা “ফিউচার অব লার্নিং” শব্দবন্ধে মুখর হয়ে ওঠে, তখন দেশের দূরবর্তী কোনো গ্রামে, আম গাছের ঘন ছায়ার নিচে বসে এক কৃষক তার সন্তানের খাতা উল্টেপাল্টে দেখে নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তিনি হয়তো শিক্ষাদর্শনের সংজ্ঞা জানেন না, জন ডিউই কিংবা পাউলো ফ্রেইরের নামও শোনেননি; কিন্তু তার অন্তর্গত দর্শন রাষ্ট্রের বহু কমিশন রিপোর্টের চেয়েও গভীর। তিনি জানেন—শিক্ষা মানে কেবল অক্ষরজ্ঞান নয়; শিক্ষা মানে এমন এক আলোকপ্রাপ্তি, যার মাধ্যমে তার সন্তান এই পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। এই নিঃশব্দ আকাঙ্ক্ষাই বাংলাদেশের গণমানুষের প্রকৃত শিক্ষাদর্শন, যা জন্ম নেয় ক্ষুধা, অসমতা, অপমান ও স্বপ্নের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে।
বরিশালের কোনো চরাঞ্চলে সন্ধ্যা নামলে দেখা যায়, কেরোসিনের ক্ষীণ আলোয় এক কিশোরী স্কুলের বই খুলে বসেছে। তার বাবা নদীতে জাল ফেলেন, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। অথচ মেয়েটির পড়াশোনার প্রতি পরিবারের এক ধরনের ধর্মীয় বিশ্বাস কাজ করে। কেন? কারণ তারা জানে—শিক্ষা তাদের কাছে কেবল চাকরির টিকিট নয়; এটি দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শেষ আশ্রয়। এই পরিবার হয়তো কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস দেখেনি, কিন্তু তারা অনুভব করে, অক্ষরজ্ঞান মানুষকে সামাজিক অপমানের হাত থেকে রক্ষা করে। গ্রামের বাজারে জমির দলিলে সই করতে না পারার লজ্জা, হাসপাতালে ওষুধের নাম না বুঝে প্রতারণার শিকার হওয়ার ভয়, কিংবা শহরে গিয়ে কথাবার্তায় পিছিয়ে পড়ার অপমান—এসব বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাদের দর্শনের ভিত গড়ে দেয়। ফলে শিক্ষা তাদের কাছে দার্শনিক বিমূর্ততা নয়; এটি বেঁচে থাকার অস্ত্র।
কিন্তু রাষ্ট্রের শিক্ষানীতির সঙ্গে এই গণমানুষের অন্তর্গত দর্শনের দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ঢাকার নীতিনির্ধারক যখন বলেন, “আমাদের লক্ষ্য চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী মানবসম্পদ তৈরি করা,” তখন নওগাঁর কৃষক হয়তো ভাবেন—“আমার ছেলে অন্তত প্রতারণার শিকার না হোক।” এই দুই আকাঙ্ক্ষার মাঝে তৈরি হয় এক গভীর দার্শনিক খাদ। রাষ্ট্র দক্ষতা চায়, কিন্তু জনগণ চায় মর্যাদা। রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সূচকে এগোতে চায়, কিন্তু মা চান তার মেয়ে নিরাপদে স্কুলে যাক এবং মানুষ হয়ে উঠুক। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট কেবল অবকাঠামোগত নয়; এটি মূলত সংলাপহীনতার সংকট। জনগণের অভিজ্ঞতা যেখানে নীতিনির্ধারণে প্রবেশ করে না, সেখানে শিক্ষানীতি হয়ে ওঠে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম নির্মাণ।
রংপুরের এক চা-স্টলে বসে এক বৃদ্ধ কৃষক বলেছিলেন, “স্যার, আমার নাতিটা ইংরেজি শিখুক, তাতে সমস্যা নাই; কিন্তু যেন বাংলায় নিজের মায়েরে চিঠি লিখতে পারে।” এই একটি বাক্যের ভেতর লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের গভীরতম দার্শনিক বোধ—বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ চাই, কিন্তু শেকড় হারিয়ে নয়। এ কারণেই বাংলাদেশের গণমানুষের শিক্ষাদর্শন কখনো সম্পূর্ণ রক্ষণশীল নয়, আবার অন্ধ পাশ্চাত্যপ্রীতিও নয়। তারা চায় এমন শিক্ষা, যেখানে প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু মানবিকতা হারাবে না; ইংরেজি থাকবে, কিন্তু বাংলা লজ্জার ভাষা হবে না; বিজ্ঞান থাকবে, কিন্তু ইতিহাস ও সংস্কৃতির স্মৃতি মুছে যাবে না। অর্থাৎ জনগণের ভেতরে অদৃশ্যভাবে কাজ করে এক ধরনের “গ্লোকাল চেতনা”—মাটির গন্ধ ও বৈশ্বিক জ্ঞানের সহাবস্থান।
বাস্তবতার আরও নির্মম উদাহরণ পাওয়া যায় শহরের বস্তিগুলোতে। ঢাকার কড়াইল বস্তির এক রিকশাচালক প্রতিদিন অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা রিকশা চালান শুধুমাত্র ছেলেকে কোচিংয়ে পাঠানোর জন্য। কিন্তু সেই ছেলেটি যখন পরীক্ষার চাপে বিষণ্ণ হয়ে পড়ে, তখন বাবা বোঝেন না—শিক্ষা কেন আনন্দের বদলে আতঙ্ক হয়ে উঠল। এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আরেক দার্শনিক সংকট: শিক্ষা কি মানুষ গড়ার জন্য, নাকি কেবল প্রতিযোগিতার যন্ত্র তৈরির জন্য? মুখস্থবিদ্যা ও নম্বরকেন্দ্রিক সংস্কৃতি সাধারণ মানুষের স্বপ্নকে এমন এক দৌড়ে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে শিশুরা জ্ঞানের আনন্দ নয়, বরং ব্যর্থতার ভয় শিখছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থা মানুষের অন্তর্গত বিকাশের বদলে উৎপাদনশীল শ্রমবাজারের কাঁচামাল তৈরির কারখানায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
গণমানুষের দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নৈতিকতা ও সহমর্মিতার আকাঙ্ক্ষা। গ্রামের মা চান তার সন্তান “মানুষ” হোক—এই “মানুষ” শব্দটি বাংলাদেশের লোকজ দর্শনে অত্যন্ত গভীর। এটি কেবল শিক্ষিত হওয়া নয়; এটি ন্যায়পরায়ণ, সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা। অথচ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা প্রায়ই পরীক্ষার বহুনির্বাচনী প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা জিপিএ শেখে, কিন্তু সহমর্মিতা শেখে না; প্রযুক্তি শেখে, কিন্তু সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা শেখে না। এই বিচ্ছিন্নতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ কর্মী বানাতে পারে, কিন্তু পূর্ণ মানুষ বানাতে পারে না।
বাংলাদেশের শিক্ষা উন্নয়নের জন্য তাই প্রথম শর্ত অবকাঠামো নয়—শুনতে শেখা। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, গণমানুষের স্বপ্ন কোনো গবেষণাগারের তৈরি তত্ত্ব নয়; এটি শত বছরের বঞ্চনা ও আশার ফসল। দ্বিতীয় শর্ত হলো শিক্ষার সমতা নিশ্চিত করা। রাজধানীর শিশুর হাতে যখন ট্যাবলেট কম্পিউটার, তখন হাওরের শিশুর স্কুলে নৌকা নেই—এই বৈষম্যের মধ্যে কোনো জাতীয় শিক্ষাদর্শন টেকসই হতে পারে না। তৃতীয় শর্ত শিক্ষকতার মর্যাদা পুনর্গঠন। কারণ যে শিক্ষক নিজেই সামাজিক অনিরাপত্তায় ভোগেন, তিনি কীভাবে শিক্ষার্থীর ভেতরে মুক্তচিন্তার আগুন জ্বালাবেন? আর চতুর্থ শর্ত হলো—শিক্ষানীতি প্রণয়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। শিক্ষাব্যবস্থা যদি জনগণের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা কাগজে আধুনিক হলেও বাস্তবে শিকড়হীন হয়ে পড়বে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের গণমানুষের শিক্ষাদর্শন খুব জটিল কিছু নয়। সন্ধ্যার পর আম গাছের নিচে বসে থাকা সেই কৃষক, নদীর পাড়ে কেরোসিনের আলোয় পড়া সেই কিশোরী, কিংবা শহরের বস্তিতে ঘুমহীন রিকশাচালক—তারা সবাই একই স্বপ্ন দেখে: শিক্ষা যেন মানুষকে মানুষ করে তোলে। এই স্বপ্নকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষাদর্শন—যেখানে জ্ঞান হবে মুক্তির আলো, শিক্ষা হবে আত্মমর্যাদার ভাষা, আর পাঠশালা হবে কেবল পরীক্ষার কেন্দ্র নয়, বরং জাতির আত্মার নির্মাণশালা।
জাতীয় চেতনা ও গণমানুষের দর্শন উপেক্ষিত: বালুর উপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার
বাংলার গণমানুষের দার্শনিক আকাঙ্ক্ষা তিনটি স্তরে ভাসে—উপযোগিতা, সম্মান ও সত্ত্বার বিকাশ। প্রথম স্তর, ‘উপযোগিতা’ : শিক্ষা হবে কর্মমুখী, রুটি-রুজির নিশ্চয়তা দেবে। গ্রামের মা চায় না তার ছেলে বেকার বসে কবিতার বই মুখস্থ করুক। সে চায়—হাতের কাজ শেখার পাশাপাশি লিখতে-পড়তে জানলে চাষবাসেও মুনাফা বাড়ে। দ্বিতীয় স্তর, ‘সম্মান’ : শিক্ষা মানুষকে দেবে বড় হওয়ার ঠিকানা। সেই বৃদ্ধ কৃষককে যখন কেউ ‘নিরক্ষর অশিক্ষিত’ বলে তাচ্ছিল্য করে, তখন তার কষ্ট বোঝে শিশুটি। তাই সে চায়, তার পরের প্রজন্ম যেন ‘উন্নত’, ‘শিক্ষিত’ হিসেবেই সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। তৃতীয় ও গভীরতর স্তরটি হলো ‘সত্ত্বার বিকাশ’—যা প্রায় অনির্বচনীয়। ভারতের সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের নওগাঁর এক ভ্যানচালক তার মেয়েকে যখন স্কুলে পাঠায়, শুধু চাকরির আশায় নয়; বরং এই তীব্র প্রত্যাশায় যে, মেয়েটি যেন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বাবার কথা মনে রাখে, নিজের অধিকার বুঝে, আর এই দেশের আইন-অধিকারকে প্রাধান্য দেয়। গ্রামীণ সেই প্রত্যাশা চুপিচুপি বহন করে আসছে এক লিবারেল, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন—ঠিক সংবিধানের ভাষ্যের মতো।
কিন্তু তলিয়ে দেখলে দেখা যায়, জনসাধারণের এই দার্শনিক প্রত্যাশা এবং রাষ্ট্রের শিক্ষা-উন্নয়নের শর্তগুলোর মাঝে যেন খাদ। কোনো সচিব বা পরিকল্পনাকারীর কলমে থাকা ‘শর্ত’ ভিন্ন, আর মানুষের কল্পনার ‘শর্ত’ ভিন্ন। রাষ্ট্র বলছে, ‘দক্ষতা বাড়াতে চাই’, কিন্তু মা বলছেন, ‘নৈতিকতা ও সহমর্মিতা শিক্ষা দাও’। রাষ্ট্র বলছে, ‘আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম’, আর বাবা বলছেন, ‘মেয়েটি যেন রাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে স্কুল থেকে’—এটাও একটা শর্ত, যার সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার শারীরিক পরিকাঠামো জড়িত। আর এই শর্ত পূরণ না হলে উন্নয়নের সব স্বপ্ন ভেস্তে যায় মিছিলে-হাঁটার ক্লান্ত শিশুর মতো।
সুতরাং শিক্ষা উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো—‘জনগণের দর্শন ও রাষ্ট্রের দর্শনের সংলাপ’। রংপুরের চা-দোকানের আলোচনা থেকে যদি না উঠে আসে জেলের সন্তানের বিদ্যালয়ের আসনসংকট, চাষির সন্তানের স্কুলের টিউবওয়েলের নোনা পানির গল্প—তবে যে কোনো শিক্ষানীতি হবে বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া। ২০২৩ সালের জাতীয় শিক্ষা জরিপ বলছে, অধিকাংশ বাবা-মা চান তাদের সন্তান ইংরেজি জানুক, কিন্তু একই সময়ে চান বাংলা সাহিত্য ও দেশের ইতিহাস ভালো জানুক। এটাই হচ্ছে গভীরে থাকা ‘মিশ্র চেতনা’—মাটির গন্ধ হারাতে না চাওয়া, আবার বিশ্বের ডাকও উপেক্ষা না করা।
এককথায়, গণমানুষের দার্শনিক আকাঙ্ক্ষা কোনো রকম কঠিন আদর্শিক পবিত্র জিনিস নয়; এটি তাদের দৈনন্দিন সংকট ও স্বপ্নের সন্তান। বাংলাদেশের শিক্ষা উন্নয়নের জন্য তাই প্রথম শর্ত হলো—শুনতে জানা। দ্বিতীয় শর্ত হলো, শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি করে সুযোগের সমতা আনা। তৃতীয় শর্ত, শিক্ষকের মর্যাদা ফিরিয়ে আনা। আর চতুর্থ শর্ত, থমকে যাওয়া প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের মতামত’ বাধ্যতামূলক করা। যদি এই শর্তগুলো পূরণ হয়, তবেই ‘অধঃস্তনের দর্শন’ ও ‘উর্ধ্বতনের পরিকল্পনা’ এক কাতারে ডাক দেবে—বাংলাদেশের শিক্ষার ভোর হবে সত্যিকার অর্থেই।
ওপারের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভ্যানচালকের মেয়ে যখন সন্ধ্যায় হাতে প্রদীপ জ্বালায়, সেই আলো যেন ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি গ্রামীণ পাঠশালায়—শিক্ষা হবে কেবল মুখস্থ বিদ্যার আঙ্গিনা নয়, হবে জীবন ও জিজ্ঞাসার মিলনমেলা। সেটাই গণমানুষের অন্তর্নিহিত স্বপ্ন। সেটাই একমাত্র শর্ত, যেখানে পরীক্ষার নম্বরের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে চেতনার মুক্তি।
দর্শনের ভিত্তিহীন সংস্কার: বিনা মূলের শত ডালপালা
শিক্ষাব্যবস্থার কোনো সংস্কার যদি কাঁঠাল গাছের কলমের মতো হয়—একটি পরিণত ডাল অন্য গাছের গোড়ায় বসিয়ে দেওয়া—তবে সেটি ফল দেয় কিনা নির্ভর করে গোড়ার মাটির সঙ্গে চারার আত্মীয়তা কতখানি। পশ্চিমা দেশের ‘আউটকাম বেসড এডুকেশন’ কিংবা ফিনল্যান্ডের ‘ফ্লেক্সিবল কারিকুলাম’ দেখে আমরা সেগুলো হুবহু আনার চেষ্টা করি। কিন্তু ভুলে যাই—ফিনল্যান্ডের সেই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠতে লেগেছিল পঞ্চাশ বছর, সেখানে দর্শনের ভিত্তি ছিল ‘সমতা ও স্বায়ত্তশাসন’। বাংলাদেশের মতো নিম্ন আয়ের দেশে যদি সেই পদ্ধতি বসাই, কিন্তু নিজেদের মূল দর্শন ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মানবমুক্তি’কে উপেক্ষা করি, তাহলে সংস্কার কেবল নামেই থাকে—নতুন নামের পুরোনো ব্যর্থতা।
শিক্ষাদর্শন হলো সেই কম্পাস, যা সংস্কারকে অভিমুখ দেয়। কোনো দেশ যদি স্থির না করে—‘আমরা কী ধরনের মানুষ তৈরি করতে চাই?’—তবে তৈরি হবে বিভ্রান্তির নকশা। চীন, জাপান, ভিয়েতনামের মতো দেশ দেখিয়ে দিয়েছে, তারা ঔপনিবেশিক শিক্ষার কালো ছায়া কাটিয়ে নিজস্ব দর্শনের ভিত্তিতেই শতবর্ষের রূপকল্প বাস্তবায়ন করেছে। জাপানের মেইজি পুনরুদ্ধারের সময় তারা পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান নিলেও, নৈতিক শিক্ষার ভিত রেখেছিল নিজস্ব কনফুসীয় মূল্যবোধে। অথচ আমরা শুধু ‘কারিকুলাম রিফর্ম’ করি, দর্শনটাকে করি উপেক্ষিত—যেন মেরুদণ্ডহীন দেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন, যা হাঁটতে পারে না।
প্রায় প্রতি দশকেই বাংলাদেশে তৈরি হয় নতুন শিক্ষাকমিশন। মুনীর চৌধুরী কমিশন, মজিদ খান কমিশন, শামসুল হক কমিশন, কামাল হোসেন কমিশন—প্রত্যেকটির প্রতিবেদন ছিল আয়তনে বৃহৎ, চিন্তায় গভীর। কিন্তু সেসব দর্শন বাস্তবায়নের অভাবে তা পরিণত হয় গ্রন্থাগারের ধুলোমাখা পাণ্ডুলিপিতে। কারণ সংস্কার করতে গিয়ে শুধু ‘কী পড়াব’ নিয়ে ভাবা হয়, ‘কেন পড়াব’ এবং ‘কীভাবে মূল্যায়ন করব’ সেই দার্শনিক প্রশ্নগুলো থাকে অবহেলিত। ফলে এক সংস্কার আরেক সংস্কারের পরিপূরক হয় না, বরং প্রতিপক্ষ হয়।
শিক্ষাদর্শন যদি হয় জাহাজের হাল, সংস্কার তাহলে পাল ও দিকনির্দেশনা। হাল না থাকলে ঝড় এলেই জাহাজ ভেঙে যায়। ঠিক তেমনি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বারবার ‘পাঠ্যসূচি হালনাগাদ’ ও ‘পদ্ধতির আধুনিকায়ন’ করা হচ্ছে, কিন্তু ‘আমাদের জাতীয় চেতনার আলোকে আদর্শ ভিত্তি’ শব্দদুটো যেন নিত্য নৈর্ব্যক্ত। ফাঁপা ঘোষণায় ভরপুর সরকারি কাগজপত্রের ভিড়ে এমন একটা স্থির নীতি দরকার যা সরকার পরিবর্তন, মন্ত্রী বদল, কিংবা দাতা সংস্থার চাহিদার দোলাচলে দুলবে না।
সংস্কারের পুরো প্রক্রিয়া—শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্য প্রণয়ন, মূল্যায়ন কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক শাসন—প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রশ্ন করতে হবে: ‘এটি কি আমাদের চেতনার সূর্যকে সামনে রাখে?’ শিক্ষা দর্শনের গুরুত্ব এখানেই যে, এটি সংস্কারকদের ধরে দেয় পরীক্ষার মাপকাঠি। এটি ছাড়া সংস্কার অন্ধের যষ্টির মতো—টোকা দেয়, কিন্তু পথ চেনে না।
সুতরাং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসে প্রথম কাজ হতে হবে ‘জাতীয় শিক্ষাদর্শন প্রণয়ন’, যা হবে সংবিধানের মতো স্থায়ী ও সর্বসম্মত। তারপর ধাপে ধাপে গড়ে উঠবে সেই দর্শনের নিরিখে কারিকুলাম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা। তবেই সংস্কারের ডালপালা হবে শক্ত মূলের পরিচায়ক, নয়ত বালুর উপর প্রাসাদ গড়ার মতো বিলাসিতা।
মাটির টানে উড়ালের টানে: স্বদেশি বনাম বিদেশি দর্শনের দোলাচল
বাংলাদেশের শিক্ষা পরিকল্পনার মর্মরোধ জুড়ে যেন এক চিরন্তন দ্বন্দ্ব—মনের এক কোণে লাল-সবুজের পতাকার ছায়ায় বেড়ে ওঠা লালন-গীতির ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলি’ সুর, আর অন্য কোণে ডারউইনের বিবর্তনবাদ, ডিউইয়ের প্রগতিশীলতা আর ফ্রেইরের মুক্তির পেডাগজির কোলাহল। এই দ্বান্দ্বিকতায় বারবার প্রশ্ন জাগে—আমরা কি গড়ব এক বাঙালি শিক্ষা দর্শন, যার শেকড় বর্ষা-শরতে মিশে থাকা মাটির গভীরে? নাকি বিশ্বায়নের ডাক শুনে খুলে দেব দ্বার পাশ্চাত্যের সব পদ্ধতি ও মূল্যবোধের জন্য?
স্বদেশি দর্শনের পক্ষে সুযুক্তি কম নয়। ‘বাংলাদেশি শিক্ষা দর্শন’ বলতে বোঝায়—আমাদের হাজার বছরের শ্রেণিকক্ষ যেখানে বসেছে বটবৃক্ষের নিচে, যেখানে গুরু ও শিষ্যের সংলাপ ছিল বাণী ও প্রতিবাণীর মধুর মিলন। সেখানে রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে বেরা, সোনার বাংলার স্বপ্ন বুনেছিলেন যে দর্শনে, তাকে পুঁজি করে তৈরি হবে ‘মৌলিক পাঠ’। এই দর্শনের মূল কথা হলো—আমাদের শিক্ষার্থী প্রথম জানবে তার নদীর নাম, তার পাখির ডাক, তার উৎসবের ঢোলের তাল। ইংরেজিতে না হোক, মাতৃভাষায় সে লিখবে সাহিত্য, আবিষ্কার করবে বিজ্ঞান। কারণ যতদিন শিক্ষার ভাষা ও উপকরণ থাকবে পরকীয়, ততদিন মন থাকবে অধীন। এ যেন জোয়ার ভাটার চরের বাসিন্দা—জলের নেশায় পড়লেও মাটি ছাড়তে পারে না বলেই টিকে থাকে।
অন্যদিকে পাশ্চাত্য দর্শনের সমর্থকরা বলেন, বিচ্ছিন্নতা আজ অচল। বিশ্ব যেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের একক সেতুতে পা রেখেছে, সেখানে ফিনল্যান্ডের শিক্ষা, আমেরিকার লিবারেল আর্টস ও জার্মানির ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের মিশ্রণ ছাড়া প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না বাংলাদেশ। তাঁরা যুক্তি দেন—ডিউয়ের ‘লার্নিং বাই ডুইং’ চিরচরক কৃষির চেয়ে কম মূল্যবান নয়; ফ্রেইরের ‘সংলাপমুখী শিক্ষা’ লালনসম্রাটের গানের চেয়ে কম দার্শনিক নয়। বরং এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই তৈরি হবে চমক। সমস্যা হলো, পাশ্চাত্য দর্শনের জয়গান করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই—পাশ্চাত্য দর্শন নিজেও বহু বিবর্তনের শিশু, কোনো পবিত্র ধ্রুবসত্য নয়। সরাসরি অনুকরণে তৈরি হয় উপনিবেশিক মানসিকতার নতুন সংস্করণ।
উদাহরণ দিই। গত দশকে ‘ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং’ পদ্ধতি দারুণ জনপ্রিয় হলো বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে তা যুক্ত হলো বেগবতী নদীর বন্যার মতো। কিন্তু দেখা গেল, গ্রামের ক্লাসরুমে শিক্ষক নিজে ‘ক্রিটিক্যাল থিংকার’ না হলে শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন শেখানো যায় না। অন্যদিকে স্মৃতিভিত্তিক মুখস্থবিদ্যার বিপরীতে আমরা যেন ভুলেই গেলাম—প্রাচীন বৌদ্ধবিহার ও গুরুশিষ্য পরম্পরায় যুক্তি ও বিতর্কের যে চর্চা ছিল, তা কোনো অংশে কম ছিল না নালন্দা-বিক্রমশীলায়। আমাদের মাটিতে পুঁতে রাখা নিজস্ব দার্শনিক সোনা উপেক্ষা করে অন্যের ইট দিয়ে গড়া বাড়ি যেমন টেকসই হয় না, তেমনি শিক্ষা পরিকল্পনায় স্বদেশি ভিত্তি ছাড়া সব সংস্কার হয় কৃত্রিম।
সত্যিকার সমাধান হলো—উভয়ের সংলাপ, নয় দ্বন্দ্ব। ‘আমার সোনার বাংলা’র গানের সুর যেমন আধুনিক পিয়ানোতে বাজে অনবদ্য, তেমনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের মর্মবাণীকে পাশ্চাত্যের প্রগতিশীল শিক্ষাতত্ত্বের ফ্রেমে ফেলা যেতে পারে। আমাদের দরকার ‘গ্লোকাল’ শিক্ষাদর্শন—যার মজ্জায় থাকবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সরস্বতী পূজার গান, সাপ্তাহিক হাটের গণিত ও চৈত্রের কালবৈশাখীর ভূগোল; আর পদ্ধতিতে থাকবে ডিজিটাল লিটারেসি, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা ও বৈশ্বিক সহমর্মিতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে তাই করেছিলেন—পাশ্চাত্য প্রকৃতি বিজ্ঞান শিখিয়েছেন হাতে-কলমে, আবার গভীর যোগ রেখেছেন উপনিষদ ও বাউল দর্শনের সঙ্গে।
অতিরিক্ত স্বদেশিয়ানায় বদ্ধ ঘরে পরিণত হওয়া আর অতিরিক্ত পাশ্চাত্যাভিমুখে উড়ে যাওয়া—উভয়েই বিপদ। শিক্ষা পরিকল্পনাকারীদের পথ দেখবে বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ, অন্ধভক্তি নয়। বুদ্ধ বলেছিলেন, ‘আপন আলো নিজেই হও’। সেই আলো জ্বালাতে হবে দেশীয় চেতনার প্রদীপে, কিন্তু তেল দিতে হবে বিশ্ব জ্ঞানের ভাণ্ডার থেকেও। তবেই ‘বাংলাদেশের শিক্ষাদর্শন’ হবে এক আবহমান মিশ্রণ—যেখানে বাউলের দেহতত্ত্ব যেমন ঠাঁই পাবে, তেমনি ঠাঁই পাবে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা। এই সমন্বয়ই পারে জটিল দার্শনিক দ্বন্দ্ব থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে।
জটিলতার জটলায় শিক্ষার বীজ: দার্শনিক গোলমালের বাস্তব চিত্র
শিক্ষা দর্শনের গোলমাল শব্দটা শুনতে যেমন বিমূর্ত, বাস্তবেও তার চেহারা হয় নিত্যদিনের ধন্ধে—শিক্ষক বুঝতে পারেন না কোন পথে হাঁটবেন, ছাত্রের মন ভাগ হয়ে যায় দুই-তিন ফালি, আর অভিভাবক টেনে নেন সন্তানকে বাইরের কোচিংয়ে। এই গোলমালের সাক্ষী রয়েছে দেশের প্রতিটি স্কুল-কলেজের চার দেয়ালে, এমনকি পাঠ্যপুস্তকের অলিতে-গলিতে। নিচে কিছু বাস্তব উদাহরণ ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো, যা প্রমাণ করে—দর্শনের দ্বন্দ্ব কেবল তত্ত্বের জটিলতা নয়, এটি শিক্ষার সর্বক্ষেত্রের স্থবিরতার মূল কারণ।
- উদাহরণ ১│বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে ‘দ্বিজাতি তত্ত্বের’ নতুন সংস্করণ: শিক্ষার একাংশ চায় ‘মাতৃভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞানচর্চা’, আরেকাংশ চায় ‘ইংরেজি মাধ্যমেই উন্নত বিশ্বের গেট খোলে’। ফলের জটিলতা—মফস্বলের একটি স্কুল যখন সকালে বাংলা ভার্সনে ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ পড়ায়, দুপুরে ইংরেজি ভার্সনের শিশু একই ইমারতে পড়ে ‘লাইফ অফ লর্ড মাউন্টব্যাটেন’—তখন সচেতন ছাত্রের মনে গেঁথে যায় বিভাজন। একটি মধ্যবিত্ত পরিবার সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমে ভর্তি করাতে হিমশিম খায়, কারণ সে বিশ্বাস করে ‘সেখানে ভবিষ্যৎ’, কিন্তু নানাভাবে সেই শিশুর বাঙালি সত্তাটা পড়ে থাকে অনূদিত খাতায়। এই দার্শনিক দোলাচলে তৈরি হয় ‘ভাষার জটিল মেরুকরণ’—ইংরেজি জানলে তুমি ‘এলিট’, বাংলায় পড়লে তুমি ‘ব্যাকডেটেড’। এটি স্রেফ মাধ্যমের দ্বন্দ্ব নয়, বরং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দর্শনের লুকায়িত প্রত্যাবর্তন। ২০২৩ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার অভিজাত ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ৬০% শিক্ষার্থী ভুলভাবে জানে যে ‘বাংলার পতাকার সবুজ অংশ কেবল প্রকৃতি বোঝায়’, তারা মুক্তিযুদ্ধের পতাকার ডিজাইনের ইতিহাস জানে না। এটি প্রত্যক্ষ উদাহরণ দার্শনিক গোলমালের—যেখানে বাস্তবে আমরা স্বাধীন পঞ্চাশ বছর পরও ম্যাকলির ছায়ায় বেড়ে উঠছি।
- উদাহরণ ২│ মাদ্রাসা শিক্ষার ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট কৌশল’—আদর্শ আর বাস্তবের সংঘর্ষ: ১৯৭২ সালের আদর্শ ঘোষণা করেছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও সাধারণ শিক্ষার একক কাঠামো, কিন্তু পরে ধর্মীয় শিক্ষা বাঁচাতে তৈরি হয় পৃথক মাদ্রাসা বোর্ড। ২০১০-এর নীতি মাদ্রাসাকে সাধারণ ধারায় আনার চেষ্টা করে ‘ইত্তেফাক’ (মার্জ)-এর নামে। কিন্তু বাস্তব জটিলতা—মাদ্রাসার দর্শন ও সাধারণ শিক্ষার দর্শনের মৌলিক দ্বন্দ্ব। মাওলানা সাহেব এক ক্লাসে বলেন ‘বিজ্ঞান আল্লাহর সৃষ্টি’, আর জেনারেল শিক্ষকের পাঠ চায় ‘বিবর্তন তত্ত্বের খোলাখুলি আলোচনা’। এই সংঘাতের পণ হয় শিক্ষার্থী—কেন একই পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় সাধারণ বিজ্ঞানের লাভ, কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা কোটা? প্রশাসনিক জটিলতা তো আছেই, তার ওপর দার্শনিক ভিত্তির অভাবে দিন দিন মাদ্রাসা ও সাধারণ ধারার ব্যবধান চওড়া হচ্ছে। বলা যায়, এ যেন খালের দুই ধারের দুই কূল—একপাড়ে খেজুরের রস, অন্যপাড়ে কোল্ড ড্রিংক—দুইয়ের সংমিশ্রণ ঘটাতে গিয়ে যা হয় তা হলো এক অর্ধশিক্ষিত প্রজন্ম, যাদের মধ্যবিত্ত গণ্ডিতে মাথা ঘোরানো ছাড়া কিছু করার থাকে না।
- উদাহরণ ৩│‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ নামে ক্লান্ত মুখস্থের কমেডি: ২০০১ সালে পরীক্ষায় ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ চালু হলো—সেখানে মুখস্থের বদলে যুক্তি ও বিশ্লেষণ চাওয়া হয়। দার্শনিক ভিত্তি ছিল ডিউয়ের ‘প্রাগমাটিজম’ ও ফ্রেইরের ‘সংলাপমুখী শিক্ষা’। কিন্তু বাস্তবায়নে দেখা গেল, শিক্ষক যন্ত্রচালিত প্রস্তুত করে দেন ‘সৃজনশীল প্রশ্নের তৈরিমালা’। আর শিক্ষার্থীও মুখস্থ করে ‘সৃজনশীল উত্তর’। গত বছর রাজশাহী বোর্ডের এক ইংরেজি পরীক্ষায় প্রশ্ন ছিল: ‘যদি তুমি হ্যামলেট হতে, তবে কী করতে?’ একজন পরীক্ষার্থী লিখেছিল: ‘তখন আমি হ্যামলেট হয়ে নিজেকে মেরে ফেলতাম।’ এটি তার নিজস্ব চিন্তা? না, সেটি ওই অধ্যায়ের মুখস্থ ‘বিকল্প’ উত্তর। ফলে প্রকৃত যুক্তি ও সৃজনশীলতার বদলে আমাদের হাতে আসে ‘সৃজনশীল নামের মুখস্থ’। ওই দার্শনিক গোলমাল—কে বলে দেবে, যুক্তির ক্লাসরুমে শিক্ষক কীভাবে ধাপে ধাপে তৈরি করবেন স্বাধীন চিন্তা? দর্শনের উচ্চপদস্থ সূত্রগুলো বাস্তবে খেলনা হতে থাকে।
- উদাহরণ ৪│বইয়ের পাতায় ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বনাম ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’—পাঠ্যপুস্তক বিতর্ক: ২০১০-এর শিক্ষানীতি স্পষ্ট জানায়—ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনই আমাদের পথ। কিন্তু ২০২০ সালের কিছু শ্রেণির ইতিহাস বইয়ে কোনো ঘটনা বাদ পড়ে গেছে, আবার অন্য বছর ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কুমিল্লার এক শিক্ষক বললেন, “আমি নিজেই বুঝি না—কয়েক বছর আগে পাঠাইতাম ‘ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের ভূমিকা’, এখন বই সেটা বাদ দিছে।” দার্শনিক গোলমালের জেরে লেখকরা কনফিউজড—কোনটা স্থায়ী জাতীয় চেতনা, কোনটা দলীয় তত্ত্ব। ফলে শিক্ষার্থীরা পায় নড়বড়ে ইতিহাস, সাহিত্যে পায় ‘বাছাইকৃত’ রবীন্দ্রনাথ। এতে বাঙালির আসল মানবিক বোধ ও সংস্কৃতির সাথে যোগাযোগ ছিন্ন হয়।
যুক্তি ও ব্যাখ্যা: গোলমাল কেন তৈরি হয় এবং কেন তা জটিলতা বাড়ায়
- প্রথম যুক্তি: শিক্ষা দর্শনের কোনো ‘জাতীয় কনসেনসাস’ নেই। একদল চান ‘নিট সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা’, একদল চান ‘প্রতিযোগিতামূলক বাজারমুখী শিক্ষা’, আরেকদল চান ‘ঔপনিবেশিক কাঠামোয় অনুকরণের শিক্ষা’—এই ত্রিমুখী টানাপড়েনে স্থায়ী কোনো ভিত্তি গড়ে ওঠে না ফলে শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিনিয়ত ‘এক্সপেরিমেন্টাল ল্যাবরেটরি’তে পরিণত হয়।
- দ্বিতীয় যুক্তি: রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে দর্শন ‘অফিস টাইম’ বোঝে। প্রতি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টে যায় কমিশনের সুপারিশের বাস্তবায়ন। ফলে শিক্ষা পরিকল্পনায় ধারাবাহিকতা হত্যা পায়।
- তৃতীয় যুক্তি: বহির্বিশ্বের তত্ত্ব ও নিজস্ব চেতনার মধ্যে সেতু নির্মাণের ব্যর্থতা—পাশ্চাত্য কনস্ট্রাকটিভিজম ধার করি, কিন্তু নিজেদের গুরুশিষ্য ও নালন্দার ঐতিহ্য ভুলে যাই। ফলে করি ‘বানর-অনুকরণ’, যা ফরাসি দার্শনিক দেরিদার ভাষায় ‘অ্যান্টিনমি অফ মিমিক্রি’—অনুকরণ করতে গিয়ে নিজেকে হারানো।
এই গোলমালের ফল কী? ক্লাসরুমে বিশৃঙ্খল নির্দেশনা, শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যে মতানৈক্য, শিক্ষার্থীর জাতীয় চেতনায় শূন্যতা, ও সবশেষে যে কাঠামো তৈরি হয় তা এমন এক জটিল প্যাচওয়ার্ক যেখানে কেউ আর সবজান্তা নয়, বরং সবাই আংশিকভাবে অন্ধ—হাতি আর অন্ধের গল্পের মতো, কেউ শুঁড় ধরে নিশ্চিত ‘শিক্ষা হচ্ছে সাপ’ আবার কেউ পা ধরে নিশ্চিত ‘শিক্ষা হলো খুঁটি’।
আসল সমাধান যদি কখনো আদৌ আসে, তবে তা একক সিদ্ধান্তে নয়, বরং এক সুদীর্ঘ জাতীয় সংলাপে—যেখানে দার্শনিক গোলমালগুলো খোলাখুলি স্বীকার করা হবে, ঘটনা ও তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে, ও সবশেষে সর্বসম্মত ‘বাংলাদেশি শিক্ষা দর্শন’ স্থির করা হবে। তবেই এই জটলার জাল কেটে বাংলাদেশের শিক্ষা বেরিয়ে আসবে স্বচ্ছ পরিকল্পনার আলোয়।
দর্শনের প্রতিচ্ছবি: শিক্ষা সংস্কারে সাতটি অনিবার্য প্রভাব
শিক্ষাদর্শন কোনো শুষ্ক তত্ত্বের জমিদারি নয়—বরং এটি একটি অদৃশ্য স্থপতির হাত, যে স্কুলের ক্লাসরুম থেকে শুরু করে পাঠ্যপুস্তকের প্রতিটি বাক্য, শিক্ষকের প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র—সবকিছুর আকার নির্ধারণ করে দেয়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যখন দার্শনিক গোলমাল লেগেই থাকে, তখন সংস্কারের প্রতিটি উদ্যোগ ঘাটায় পড়ে যায়; আবার যদি একটি সুস্থির ও জাতীয় চেতনাভিত্তিক দর্শন থাকে, তবে তার সাতটি মৌলিক প্রভাব সংস্কার প্রক্রিয়াকে দিকনির্দেশনা দেয়। নিচে সেই প্রভাবগুলো বাস্তবের আলোকে ব্যাখ্যা করা হলো।
- প্রথম প্রভাব—শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণে স্পষ্টতা আসে: শিক্ষা দর্শন প্রথমেই প্রশ্ন তোলে—‘আমরা কী ধরনের মানুষ তৈরি করতে চাই?’ যদি উত্তর হয় ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী, মানবিক ও সৃজনশীল নাগরিক’, তবে সংস্কারের প্রতিটি ধাপ সেই লক্ষ্যে নিবেদিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, কুদরাত-ই-খুদা কমিশন স্পষ্ট বলেছিল—শিক্ষা হবে শোষণহীন সমাজ গড়ার হাতিয়ার। এই স্পষ্টতা থাকায় তখন পাঠ্য প্রণয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ সবকিছু একসূত্রে গাথা হয়েছিল। বর্তমানে এই স্পষ্টতার অভাবেই দেখা যায়, একই শিক্ষামন্ত্রণালয় একদিকে ‘ডিজিটাল দক্ষতা’ বলে, অন্যদিকে ‘নৈতিক শিক্ষা’ বলে—দুইয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা থেকে যায়। সংস্কার তখন নামমাত্র হয়।
- দ্বিতীয় প্রভাব—পাঠ্যসূচির কাঠামো নির্ধারণ করে: দার্শনিক ভিত্তি স্থির করে দিলে, পাঠ্যসূচি আর ‘অমুক দেশের বই দেখে’ তৈরি করতে হয় না। যেমন, যদি দর্শন হয় ‘প্রকৃতিপ্রেম ও পরিবেশ বান্ধব মন’, তাহলে গণিতের সমস্যাও তৈরি হবে নদীর স্রোত, ধানের ফলন বা বায়ু দূষণের তথ্য দিয়ে। ফিনল্যান্ডের দর্শন যতটা ‘সাম্য ও স্বাধীনতা’নির্ভর, তাদের পাঠ্যসূচি ততটা নমনীয়। আমাদের দেশে দর্শনের অস্থিরতার কারণে পাঠ্যসূচি ‘প্যাচওয়ার্কে’ পরিণত হয়—কোনো অংশ পশ্চিমা কম্পিটেন্সি থেকে নেয়া, কোনো অংশ ধ্রুপদী রটনা থেকে, কোনো অংশ ধর্মীয় নীতি থেকে। ফলে শিক্ষার্থীর মাথায় গলিত জ্ঞানের বন্যায় ভাসে না, বরং বিভ্রান্তির কাদায় আটকে যায়।
- তৃতীয় প্রভাব—শিক্ষক প্রশিক্ষণের দিকনির্দেশনা দেয়: শিক্ষক যদি না জানেন ‘কী দর্শনে তাঁকে পাঠ দিতে হবে’, তাহলে তাঁর পড়ানো হয় দিশাহারা। যেমন, ২০২১-এর এনসিএফ দর্শনে চেয়েছিল ‘অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা’, কিন্তু শিক্ষক প্রশিক্ষণ না থাকায় তিনি ক্লাসে ফিরে যান পুরোনো মুখস্থ পদ্ধতিতেই। অথচ একটি স্থির দর্শন থাকলে, যেমন ‘শিক্ষার্থী নিজে আবিষ্কার করবে’, তাহলে শিক্ষকের প্রশিক্ষণের মডিউল সেই পদ্ধতি শেখানোর জন্য তৈরি হয়—তিনি হন ‘সুবিধাদাতা’, কেবল ‘বক্তা’ নন। বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণেই আদর্শের অস্পষ্টতা রাজত্ব করে, তাই সংস্কার ব্যর্থতার শিকার হয়।
- চতুর্থ প্রভাব—মূল্যায়ন পদ্ধতির রূপ বদলে যায়: মূল্যায়ন কেমন হবে—সেটা নির্ভর করে শিক্ষার দর্শনের ওপর। যদি দর্শন হয় ‘মুখস্থ বিদ্যা যাচাই’, তাহলে থাকবে এমসিকিউ ও রটনার প্রশ্ন। যদি দর্শন হয় ‘যুক্তি ও সমস্যা সমাধান’, তাহলে দীর্ঘ সৃজনশীল প্রশ্ন, প্রকল্পভিত্তিক কাজ, ও পোর্টফোলিও মূল্যায়ন আসবে। আমাদের দেশে দার্শনিক সংকটের কারণে ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ চালু হলেও তার মূল্যায়ন হয় পুরোনো ‘স্মৃতিনির্ভর’ স্টাইলে। সম্প্রতি রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ‘সৃজনশীল’ প্রশ্নের ৮০% উত্তরই মুখস্থ সমাধান। এটি প্রমাণ করে, দর্শন পাল্টায়নি, শুধু প্রশ্নের চেহারা বদলেছে। ফলে সংস্কার নামের পিলে চেপে রোগ একই থাকে।
- পঞ্চম প্রভাব—শিক্ষার মাধ্যম ও ভাষানীতি স্থির করে : ভাষার প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য সংবেদনশীল। দর্শন যদি হয় ‘মাতৃভাষার মাধ্যমে সকল শিক্ষা’, তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এমনকি মেডিকেল শিক্ষাও বাংলায় পড়ানো হবে। অন্যদিকে দর্শন যদি হয় ‘বিশ্ববাজারের জন্য ইংরেজি জরুরি’, তবে গণমাধ্যম শিক্ষাই প্রাধান্য পাবে। আমাদের দ্বিধান্বিত দর্শনের ফলে এক ক্লাসে শিক্ষক বাংলায় ব্যাখ্যা দেন, বই ইংরেজিতে, আর পরীক্ষা হয় দুই ভাষার সংমিশ্রণে। সংস্কারের নামে মাঝেমধ্যে ভাষাপolicy বদলায়, কিন্তু কাঠামোগত সুফল আসে না। প্রতিবেশী ভারতের তামিলনাড়ু বা পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে আমরা পিছিয়ে আছি, কারণ দর্শনের গলদে ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে শিক্ষায় পূর্ণতা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
- ষষ্ঠ প্রভাব—শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও বৈষম্য কমানো যায়: একটি সমাজমুখী শিক্ষাদর্শন শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত হতে দেয় না। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর শিক্ষাদর্শন বলে—‘সকলের জন্য সমান সুযোগ’, তাই তারা বেসরকারি কোচিং সেন্টারবিহীন একীভূত ব্যবস্থা গড়েছে। অন্যদিকে আমাদের দার্শনিক দ্বন্দ্বের জেরে অভিভাবকদের একাংশ চায় ‘ইংলিশ মিডিয়াম প্রাইভেট স্কুল’, আরেকাংশ চায় ‘সকলের জন্য ফ্রি শিক্ষা’। ফলে সংস্কার এমন এক হাইব্রিড তৈরি করে যেখানে সরকারি স্কুলের সংস্কার ব্যর্থ হয়, বেসরকারি খাত বেপরোয়া বেড়ে ওঠে, শিক্ষার বৈষম্য চরমে পৌঁছে। একটি স্থির দর্শন এই ঝুলন্ত সেতুকে শক্ত মাটিতে নামিয়ে আনতে পারে।
- সপ্তম প্রভাব—রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতা আনে: শিক্ষাদর্শন যত দোলাচলে থাকে, শিক্ষাব্যবস্থা তত অস্থির হয়, আর সেই অস্থিরতা সমাজের চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলে। স্থির দর্শন (যেমন জাপানের ‘মেইজি শিক্ষা দর্শন’ যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও অটুট ছিল) শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বদেশপ্রেম, দায়বদ্ধতা ও নাগরিক বোধ জাগায়। বাংলাদেশে বারবার দর্শন বদলায় বলে শিক্ষার্থীরা ‘নিগেটিভ নেশনালিজম’ ও ‘পজিটিভ নেশনালিজম’–এর মাঝে দোদুল্যমান থাকে। সংস্কার তখন প্যাঁচের খেলায় পর্যবসিত হয়, জাতীয় উন্নয়ন থমকে যায়।
পরিশেষে বলা যায়—শিক্ষা সংস্কারের সাফল্য শতভাগ নির্ভর করে এগারো নম্বর বিষয়ের ওপর নয়, বরং প্রথমে ‘কেন সংস্কার করছি’ তার জবাবের ওপর। এই জবাব দেয় শিক্ষাদর্শন। সুতরাং পাঠ্যপুস্তকের ছাঁচ বদলানোর আগে, বাংলাদেশকে বসতে হবে বৃহৎ এক জাতীয় সম্মেলনে—যেখানে রাজনীতিক, শিক্ষক, অভিভাবক, দার্শনিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সাধারণ জনতার কণ্ঠ শোনা হবে। তবেই স্থির হবে একটি ‘জাতীয় শিক্ষাদর্শন’, যা সংস্কারের প্রতিটি ধাপকে করবে অর্থবহ, নয় পুনরায় ব্যর্থতার অসার্থক নাটক।
শিক্ষা, স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়: কোন দর্শনে গড়ে উঠবে বাংলাদেশ?
সিলেটের এক কফি হাউসে যখন কয়েকজন তরুণের সাথে আলাপ হচ্ছিল, সেখানে একজন হঠাৎ প্রশ্ন করল, ''স্বাধীনতা মানে কি আমাদের নিজস্ব কোনো শিক্ষা দর্শন তৈরি করাটা জরুরি না? আমরা তো ক্যানবেরা, লন্ডন কিংবা ম্যাসাচুসেটসের মতো ইউনিভার্সিটি দেখে মডেল নিই। কিন্তু সেই শিক্ষা শেষে মেধা পাচার ঠেকাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।'' তার কথার গভীরতা ছিল—যতদিন আমরা জাতীয় চেতনার দেয়াল গড়তে ব্যর্থ হব, ততদিন শিক্ষার আঙিনায় বাড়তে থাকবে পরিচয়হীনতার জঙ্গল।
মুক্তিযুদ্ধের আগে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘শোষণমুক্ত সমাজ’ ও ‘আনন্দের শিক্ষা’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সোনার বাংলা গঠনে শিক্ষা ব্যাবস্থা আমাদের নিতে পারে প্রতিবেশী দেশ ভিয়েতনামের উদাহরণ—যেখানে উপনিবেশবাদের অবসানের পর তারা শিক্ষাকে প্রথম শত্রুমুক্ত করে নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে পাঠ্যসূচি সাজায়। আজ ভিয়েতনামের শিক্ষার্থী জানে কী করে গেরিলা যুদ্ধে তাদের পূর্বপুরুষ প্রকৃতির সম্পদকে ব্যবহার করেছিল, আবার একই সাথে বিশ্বসভায় সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে। বাংলাদেশের শিক্ষা দর্শন এখনও সেই দৃঢ়তার অভাবে ভোগে।
অথচ সম্পদের অভাব নয়, আমাদের মাটিতে লুকিয়ে আছে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ আমর্ত্য সেনের দর্শন—‘শিক্ষা শুধু দক্ষতা নয়, এটি স্বাধীনতার মূল উপকরণ।’ আমাদের শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয় রটনার শৃঙ্খলে বেঁধে। পরীক্ষার পর কোচিং সেন্টারের তালিকা মুখস্থ করা বিদ্যার্থী যখন বাস্তবের তিতাস নদী দেখে, সেই নদীকে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয় কারণ তার বইয়ে তিতাসের জালের কবিতা নেই, নেই সেখানে উপন্যাসের নায়িকা কুসুমের আত্মত্যাগের গল্প—শুধু আছে গাণিতিক সূত্র ও বিরান ইংরেজি বাক্যজাল।
চট্টগ্রামের পাহাড়ি বিদ্যালয়ে পড়েন এক আদিবাসী ছাত্র। সে নিখুঁতভাবে পাঠ করে মৌলবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা, কিন্তু জানে না সেই শব্দগুলো তার মাতৃভাষায় কী অর্থ বহন করে। তার ভাষাটি বিলুপ্তির পথে, অথচ জাতীয় শিক্ষাক্রমে সেই ভাষার আদিবাসী সত্তাকে স্থান দেওয়ার দার্শনিক ভিত্তি নেই। আমাদের জাতীয় চেতনা যদি প্রকৃত অর্থেই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবোধ হয়, তাহলে এই উপেক্ষার নাম কী হবে?
সমস্যা চিহ্নিতকরণ যত জরুরি, সমাধানের রূপরেখা তত বেশি জরুরি। বাংলাদেশের প্রয়োজন ‘বাংলাদেশীয় শিক্ষা দর্শন’—যা হবে দেশীয় শিকড়ে সিক্ত, আবার বিশ্বের সঙ্গে সেতুবন্ধন ঘটাবে। এই দর্শনের ভিত্তি হবে তিনটি স্তম্ভ:
- প্রথম স্তম্ভ: চেতনার গভীরতা। পাঠ্যপুস্তকের প্রতিটি অধ্যায়ে থাকবে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি, নদীমাতৃক ভূগোলের প্রতিচ্ছবি। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল থেকে শুরু করে জসীমউদ্দীনের গান, বিজ্ঞান শেখার সময়ও যেন শিক্ষার্থী আবিষ্কার করে এ দেশের সূর্য কত জৈব শক্তির উৎস।
- দ্বিতীয় স্তম্ভ: যুক্তিবাদী মানসিকতা। আমাদের শিক্ষা দর্শনে প্রশ্ন করার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পরীক্ষায় মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে যুক্তি ও বিশ্লেষণের মূল্যায়ন বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীকে তার সমাজের লিঙ্গবৈষম্য বা দারিদ্র্য নিয়ে ভাবতে হবে বাস্তবসম্মত প্রকল্পের মাধ্যমে, কেবল সংজ্ঞা মুখস্থের বাইরে।
- তৃতীয় স্তম্ভ: মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দৈনন্দিন প্রাত্যহিকতায় ফিরিয়ে আনা। স্বাধীনতা শুধু ইতিহাসে স্মারক অনুষ্ঠান নয়, বরং প্রতিটি শ্রেণিকক্ষের বাতাসে শরীরী অনুশীলন। গণিতের সমস্যাও হতে পারে মুক্তিযুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটভিত্তিক; বিজ্ঞানের পরীক্ষাও হতে পারে ১৯৭১ সালে গেরিলা যোদ্ধাদের আবিষ্কৃত পদ্ধতিকে সম্মান জানিয়ে।
একজন শিক্ষার্থী কেবল তথ্যের ভাণ্ডার নয়, সে এক আগামী প্রজন্মের কান্ডারি। তার যদি বুকের ভেতর বাঙালি জাতীয়তাবাদের অহংকার জাগ্রত না হয়, তবে নিউটনের বলবিদ্যার সূত্র তার হাতে তুলে দিলে সে হয়তো ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়বে, কিন্তু একই মুহূর্তে তার মানসিকতায় বাসা বাধবে নব্য ঔপনিবেশিক স্বপ্ন। সেই অহংকার শিক্ষার্থী পাবে কিনা, তা নির্ভর করবে রাষ্ট্র কীরকম বই তৈরি করে, কীরকম শিক্ষক তৈরি করে, আর কীরকম সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করে।
অবশ্য ইদানীং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কারিকুলামে কিছু পরিবর্তনের কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু পরিবর্তন আনা মানে কেবল বইয়ের ধারাবিবরণী বদলানো নয়; পরিবর্তন মানে শিক্ষাদর্শনের ভিতামূল পরিবর্তন। আমরা এখন সেই সংকটময় স্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে নদীর একপাড়ে ব্রিটিশ দর্শনের অনুবাদ বিদ্যা, আরেকপাড়ে মুক্তিযুদ্ধের লাল সবুজের পতাকা। সেতু কে বানাবে? তৈরি হবে কি সেই অদ্বিতীয় মিশ্রণ, যাকে বলে ‘বাংলাদেশি চেতনা’?
প্রত্যন্ত গ্রামের এক কিশোরী যদি হঠাৎ আবিষ্কার করে তার মায়ের হাতের মেহেদি বা সবজির বাগান কীভাবে জৈব রসায়নের অনন্য উদাহরণ; স্কুলের পরীক্ষায় যদি সেই যন্ত্রশিক্ষার পরিবর্তে তাকে প্রকৃতির রঙে মুখরিত করতে ডাকা হয়; যদি পরীক্ষার রেজাল্ট না হয় সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি, বরং জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি ন্যায় ও সাম্যের বোধ যাচাই হয়—তবে একদিন সেই কিশোরী ফিরে তাকাবে বলবে, ‘আমি আগে শুধু শিখতাম, এখন শেখার ভেতর দিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করি।’
বাংলাদেশকে দরকার ‘আবিষ্কার’-এর এই শিক্ষা। কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন—‘আমার পথিকৃৎ আমি নিজেই’। সেই নিজেকে খুঁজে পাওয়ার আনন্দ ছাড়া শিক্ষা কেবল কৃত্রিম ফুলের মতো সৌন্দর্য বিকিরণ করলেও তার ঘ্রাণ থাকে না। জাতীয় চেতনার পথে বাংলাদেশের শিক্ষাভবনগুলোর দরজা ও জানালা খুলে দিতে হবে। তখনই মিথ্যার আড়ালে নয়, গভীর বাস্তবের নিরিখে তৈরি হবে এক অবিনশ্বর প্রজন্ম—যারা জানবে কীভাবে একসঙ্গে হতে পারে রবীন্দ্রনাথের অমৃতক্ষরণ ও ভ্যাকসিন আবিষ্কারের বিস্ময়। সেখানেই শিক্ষাদর্শনের গলদ ঘুচবে; সেখানেই সোনার বাংলার স্বপ্ন ধরা দেবে নতুন মোড়কে।
চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ: প্রশ্নের উত্তরে একমুঠো অকপট সত্য
হ্যাঁ, প্রশ্নটি এসেই যায়—শত পাণ্ডুলিপি আর কমিশন রিপোর্টের স্তূপের মাথায় দাঁড়িয়ে, দার্শনিক আলোচনার সব আগুনঝরা শব্দের ফাঁক দিয়ে সেই শিশুসুলভ, কিন্তু ভয়ংকর প্রশ্ন: বাংলাদেশ কি আসলেই তার শিক্ষাব্যবস্থার জন্য দার্শনিকভাবে সঠিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে পেরেছে? আর সেই লক্ষ্যে পুরো ব্যবস্থাকে পরিচালিত করতে পেরেছে?
উত্তর হলো—না, পুরোপুরি পারেনি। বরং বলা চলে, স্বাধীনতার পঞ্চাশোর্ধ্ব বছরেও আমরা সেই সন্ধিক্ষণেই দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে পথের দুই ধারের ডাক শুনি, কিন্তু নিজের পায়ের তলার মাটি চিহ্নিত করতে পারি না।
কেন পারেনি?
- প্রথমত, কারণ লক্ষ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াতেই ছিল দার্শনিক স্পষ্টতার অভাব। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পতাকার ভাষ্যতে রাখলেও, শিক্ষার লক্ষ্যে তাকে রূপ দিতে গিয়ে বারবার টেনে এনেছি উপমহাদেশীয় উত্তরাধিকার ও পশ্চিমা পরামর্শকের সূত্র। ১৯৭২ সালের কুদরাত-ই-খুদা কমিশন ছিল ব্যতিক্রম—একটি স্পষ্ট, চেতনাভিত্তিক দর্শন। কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের আগেই ভেঙে যায় ১৯৭৫-এর ঘাতক পরিবর্তনে। এরপর প্রতিটি সরকার নিজের রাজনৈতিক আদর্শকে শিক্ষার ওপর চাপিয়ে দিতে গিয়ে ‘লক্ষ্য’ কে বানিয়েছে দলীয় পত্রের বিজ্ঞপ্তি। তাই লক্ষ্য নির্ধারণ হয় অস্থায়ী, প্রাসঙ্গিক হয় স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ।
- দ্বিতীয়ত, একবার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও সেই লক্ষ্যে পুরো ব্যবস্থাকে পরিচালিত করার ধৈর্য ও একনিষ্ঠতা আমাদের নেই। স্থির দর্শন ছাড়া শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, মূল্যায়ন কাঠামো ও প্রশাসনিক কাঠামো—একসূত্রে গাঁথা যায় না। অথচ এটাই দরকার। যেমন জাপান বা সিঙ্গাপুর শিক্ষা সংস্কারে দর্শনকে স্থির রেখে বাকি সবকিছু ঘুরিয়েছে। আমরা উল্টো করেছি—পরীক্ষার ধরন বদলাই, বইয়ের ছাঁচ বদলাই, কিন্তু ‘কেন পড়াই’ সেই প্রশ্নটির জবাব রয়ে যায় অস্পষ্ট।
- তৃতীয়ত, পরিচালিত করতে ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ হলো ‘শিক্ষার শাসন’ (governance) ও ‘শিক্ষার নেতৃত্ব’-এ দার্শনিক অজ্ঞতা। মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা প্রায়ই সংস্কার করেন ‘যা অন্য দেশ করে’ দেখে, নিজস্ব ভূগোল-ইতিহাস ও মানুষের চাহিদার ভিত্তিতে নয়। ফলে জারি করা নির্দেশনাগুলো ক্ষেত্রবিশেষে পরস্পরবিরোধী হয়ে পড়ে। এক নির্দেশনা বলে—‘সৃজনশীল শিক্ষা দিতে হবে’, আরেক পরিপত্র বলে—‘পরীক্ষার ফল বাড়ানোর জন্য কোচিং সেন্টার বন্ধ করতে হবে না’। দর্শনের খাদে পড়ে ব্যবস্থাপনা হাঁটে পঙ্গুর মতো।
তবু কি কোনো ক্ষীণ আলো দেখা যায়? হ্যাঁ, দেখা যায়। ২০১০-এর শিক্ষানীতি, ২০২১-এর এনসিএফ—এগুলোর শুরুর দর্শন ঠিক ছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের মধ্যপথে তা ভেসে গেছে ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা’ ও ‘স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার’ স্রোতে। ব্যর্থতা এই নয় যে দর্শনের স্বপ্ন ছিল না; ব্যর্থতা এই যে সেই দর্শনকে টিকিয়ে রাখার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা ছিল না।
অতএব—বাংলাদেশ শিক্ষার দার্শনিক লক্ষ্য নির্ধারণের ব্যাপারে ‘আংশিক সচেতন’ কিন্তু ‘পূর্ণ অসমর্থ’। আর সেই লক্ষ্যে ব্যবস্থাকে পরিচালিত করতে গিয়ে ‘স্থিরতা হারিয়েছে’। তবে আশার কথা হলো—প্রশ্নটি এখন জোরালোভাবে উঠেছে। শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, এমনকি সাধারণ অভিভাবকরাও টের পাচ্ছেন ‘গলদ’ টা কোথায়। হয়তো এ উপলব্ধির জোড়েই একদিন বসবে জাতীয় কনসেনসাস, স্থির হবে সেই ‘বাংলাদেশি শিক্ষা দর্শন’। যতদিন না হয়, ততদিন এই কাঠখোট্টা জাহাজ চলতে থাকবে ‘ইঞ্জিন ছাড়া ভেলার’ মতো—সময়ের স্রোতে ভাসবে, কিন্তু গন্তব্য ঠিক হবে না।
প্রশ্নটির উত্তরে চূড়ান্ত ইঙ্গিত এই—আমরা এখনও সঠিক লক্ষ্য পাইনি; যা পেয়েছি তা অস্থায়ী। আর যা চালাইতেছি তা স্রোতে ভাসা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সেই ভাসা থেকে উদ্ধার করতে হলে দরকার সুনির্দিষ্ট দার্শনিক নোঙর। শুধু কমিশন বসালে হবে না, সেই কমিশনের দর্শনকে বাস্তবায়ন করতে হবে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে। তবেই ‘পেরেছি’ বলা যাবে। এখন পর্যন্ত বলতে হয়—‘বাংলাদেশ শিক্ষার দর্শনকে পরিপূর্ণ আয়ত্ত করতে পারেনি; বরং দর্শনের দোলাচলেই পড়ে আছে।’
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সংকট কেবল পাঠ্যক্রম বা পরীক্ষাপদ্ধতির সংকট নয়; এটি মূলত আত্মপরিচয়ের সংকট। স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েও যদি শিক্ষা স্বাধীন চেতনা নির্মাণে ব্যর্থ হয়, তবে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোয় সীমাবদ্ধ থাকে—মানুষের ভেতরে নয়। বারবার শিক্ষানীতি পরিবর্তন, রাজনৈতিক প্রভাব, বিদেশি মডেলের অন্ধ অনুকরণ এবং জাতীয় ঐকমত্যের অভাব শিক্ষাকে এক অনিশ্চিত পরীক্ষাগারে পরিণত করেছে।
এই প্রবন্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন এক স্থায়ী জাতীয় শিক্ষাদর্শন, যা একইসঙ্গে ধারণ করবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবিকতা, যুক্তিবাদ, বৈজ্ঞানিক মনন এবং বৈশ্বিক জ্ঞানের উন্মুক্ততা। শিক্ষা যদি মাটির সঙ্গে সংযোগ হারায়, তবে তা জ্ঞানের আলো নয়, বরং শিকড়হীন আধুনিকতার বিভ্রম তৈরি করে। তাই এখন সময় এসেছে শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেবল চাকরির বাজারের জন্য নয়, বরং মানুষ গড়ার মহাযজ্ঞ হিসেবে পুনর্গঠনের।
লেখক : অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#বাংলাদেশের_শিক্ষা #জাতীয়_চেতনা #শিক্ষাদর্শন #মুক্তিযুদ্ধের_চেতনা #মুখস্থবিদ্যার_সংকট #বাংলা_মাধ্যম #ঔপনিবেশিক_মানসিকতা #EducationCrisis #BangladeshEducation #NationalIdentity #EducationalPhilosophy #FutureGeneration

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: