নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্রর
দেশে সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত অপচয় রোধ এবং আড়ম্বর কমানোর লক্ষ্যে অতীতে জারি করা ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আদেশ’ আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিয়ে বা গায়েহলুদের মতো অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জাঁকজমক ও অপচয় রোধে এবার ১০০ জনের বেশি অতিথি থাকলে অতিরিক্ত প্রত্যেক অতিথির জন্য ১ হাজার টাকা করে কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেন সেলিম।
গতকাল শুক্রবার (২৬ জুন) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এই প্রস্তাব দেন। এর আগে গত ২২ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়েও তিনি অতীতে জারি করা ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন’ কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
অপচয় রোধে কর আরোপের প্রস্তাব
সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন বলেন, "দেশে বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং আড়ম্বরপূর্ণ প্রদর্শন দিন দিন বেড়ে চলেছে, যা বড় পরিসরে অপচয়ে রূপ নিচ্ছে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, এসব অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে যার বড় অংশই খাবার ও আয়োজনের অপচয়। বিশেষ করে গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে নাচ-গানের প্রশিক্ষণ ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের প্রবণতাও বাড়ছে।তার মতে, আগে সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিথি নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল। সেই ধারায় ফিরে গিয়ে এখন ১০০ জনের বেশি অতিথি হলে অতিরিক্ত প্রত্যেক অতিথির ওপর ১ হাজার টাকা কর আরোপ করা যেতে পারে।
কী ছিল ১৯৮৪ সালের ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আদেশ’-এ?
দেশে এমন অনেক আইন ও আদেশ আছে, বাস্তবে যার কোনো প্রয়োগ নেই। ১৯৮৪ সালে জারি করা অতিথি নিয়ন্ত্রণ আদেশ (দ্য গেস্ট কন্ট্রোল অর্ডার, ১৯৮৪) তেমনই একটি। দেশের সামগ্রিক খাদ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অপচয় রুখতে ১৯৮৪ সালের ৩ জুলাই বিশেষ এই আদেশটি জারি করেছিল খাদ্য মন্ত্রণালয়। ১৯৫৬ সালের ‘দ্য কন্ট্রোল অব এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট’-এর ৩ (১) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এটি জারি করা হয়।
এই আদেশের মূল নিয়মাবলি ছিল নিম্নরূপ:
১০০ জনের বেশি অতিথি নিষিদ্ধ: কোনো ব্যক্তি বা আয়োজক বিয়ে, জন্মদিন, আকিকা বা যেকোনো সামাজিক, ধর্মীয় ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে ১০০ জনের বেশি অতিথিকে (আয়োজক পরিবার বাদে) চাল বা গমের তৈরি কোনো খাবার পরিবেশন করতে পারবেন না।
বিশেষ অনুমতি ও রাজস্ব: বিশেষ কারণে ১০০ জনের বেশি অতিথিকে খাওয়াতে হলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছ থেকে ‘ফরম-এ’-র মাধ্যমে পূর্ব অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। এছাড়া, ১০০ জনের অতিরিক্ত প্রতি অতিথির জন্য সরকারি কোষাগারে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জনপ্রতি ২৫ টাকা (শুরুতে ছিল ১০ টাকা) ফি জমা দিতে হতো।
তদারকি ও তল্লাশির ক্ষমতা: নিয়ম ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করার জন্য খাদ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শক, পুলিশের গেজেটেড কর্মকর্তা কিংবা জেলা প্রশাসক বা ইউএনও মনোনীত যেকোনো সরকারি কর্মকর্তাকে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ ও তল্লাশি করার আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
শাস্তির বিধান: এই আদেশ অমান্য করা দণ্ডনীয় অপরাধ ছিল। নিয়ম ভাঙলে অনুষ্ঠানের আয়োজক এবং যে স্থানে অনুষ্ঠানটি হচ্ছে (যেমন কমিউনিটি সেন্টার বা কনভেনশন হল) তার মালিকের জরিমানা এবং ক্ষেত্রবিশেষে কারাদণ্ডের বিধান ছিল।
পরবর্তী সংশোধনী ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০০৩ সালে এই আদেশে একটি সংশোধনী এনে মিলাদ মাহফিল, ইফতার পার্টি, কুলখানি, চেহলাম, ওরস বা শ্রাদ্ধের মতো বিশুদ্ধ ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোকে এই অতিথির বাধ্যবাধকতা বা অতিরিক্ত ফির আওতামুক্ত করা হয়।
বর্তমানে আদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা না হলেও যথাযথ প্রয়োগ এবং নজরদারির অভাবে এটি প্রায় পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। দেশের রেস্তোরাঁ, কমিউনিটি সেন্টার বা কনভেনশন সেন্টারে এখন প্রতিদিন হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে রাজকীয় অনুষ্ঠান হলেও অনুমতি নেওয়া বা ফি দেওয়ার নিয়মটি আর চর্চা করা হয় না।
এমতাবস্থায়, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক অপচয় রোধে এই পুরনো আইনটিকে আধুনিক রূপ দিয়ে নতুন করে কর আরোপের এই প্রস্তাব দেশের সচেতন মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: