odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Wednesday, 22nd July 2026, ২২nd July ২০২৬
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি সরকারের শাসনামলে শিক্ষা অবদানের একটি তথ্যনির্ভর, গবেষণাভিত্তিক ও নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ—যেখানে শিক্ষা রাজনীতির নয়, জাতি গঠনের ধারাবাহিক অভিযাত্রা হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছে।

৫৫ বছরের শিক্ষা উন্নয়নের ঐতিহাসিক আমলনামা—শিক্ষা সংস্কারের ইতিহাসে কোন সরকার কী করেছে? বঙ্গবন্ধু থেকে বর্তমান—কোন সরকার কী রেখে গেছে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায়? (একটি নিরপেক্ষ ইতিহাস, একটি জাতীয় আত্মসমালোচনা, একটি ভবিষ্যতের রূপরেখা)

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২২ July ২০২৬ ২০:৪৫

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২২ July ২০২৬ ২০:৪৫

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক গবেষণাধর্মী বিশেষ ফিচার —৫৫ বছরের শিক্ষা উন্নয়ন আমলনামা

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ কি কোনো একক সরকারের অবদান, নাকি এটি একাধিক সরকারের ধারাবাহিক নীতি, সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের সম্মিলিত ফল? এই বিশেষ ফিচার নিবন্ধে ১৯৭২ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে শিক্ষা খাতে গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার, আইন, নীতিমালা, প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, নারী শিক্ষা, গণসাক্ষরতা, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, উপবৃত্তি কর্মসূচি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, ডিজিটাল শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, গবেষণা, উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের মতো যুগান্তকারী উদ্যোগগুলোর একটি তথ্যনির্ভর, গবেষণাভিত্তিক ও নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক মূল্যায়ন উপস্থাপন করা হয়েছে। নিবন্ধটি কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক বা দলীয় অবস্থান গ্রহণ করে না; বরং শিক্ষা নীতিকে রাষ্ট্র গঠন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং টেকসই জাতীয় উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি হিসেবে বিশ্লেষণ করে। একই সঙ্গে এতে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে বিভিন্ন সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ একে অপরের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে এবং কেন ভবিষ্যতের শিক্ষা সংস্কারে ধারাবাহিকতা, প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ, গবেষণা, শিক্ষক প্রস্তুতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং জাতীয় ঐকমত্য অপরিহার্য। শিক্ষা নিয়ে আগ্রহী গবেষক, নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক এবং সচেতন নাগরিকদের জন্য এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী শিক্ষা সংস্কারের একটি বিস্তৃত, প্রামাণ্য ও বিশ্লেষণধর্মী রেফারেন্স।

নিবন্ধের দ্ধতিগত ঘোষণা (Methodological Note)

এই নিবন্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের ক্ষমতাকালে গৃহীত শিক্ষা সংস্কার ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগসমূহ একটি ঐতিহাসিক ও নীতিগত পর্যালোচনার আলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে। নিবন্ধটির উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক সরকার, দল বা নেতৃত্বের সমালোচনা কিংবা তুলনামূলক রাজনৈতিক মূল্যায়ন নয়; বরং প্রতিটি সরকারের সময়ে শিক্ষা খাতে গৃহীত ইতিবাচক নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অবদানকে তথ্য, ইতিহাস ও গবেষণালব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা। কারণ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থান কোনো একক সরকার বা সময়কালের সৃষ্টি নয়; বরং ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সময়ে গৃহীত নীতিগত সিদ্ধান্ত, সংস্কার এবং বিনিয়োগের সম্মিলিত ফল। তাই এই নিবন্ধে প্রতিটি শাসনামলের শিক্ষা-সংক্রান্ত ইতিবাচক উদ্যোগকে যথাযথ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষা বিকাশের ধারাবাহিক যাত্রাপথ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

মেঘে মেঘে অনেক বেলা: পঞ্চান্ন বছরের শিক্ষা-অভিযাত্রার প্রতি এক বিনম্র শ্রদ্ধা

মেঘে মেঘে অনেক বেলা কেটে গেছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা অর্জনের পর থেকে ২০২৬ সাল—এই পঞ্চান্ন বছরের দীর্ঘ যাত্রাপথে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বহু বাঁক পেরিয়েছে। কখনও আশা, কখনও হতাশা; কখনও সাহসী সংস্কার, কখনও বিতর্ক; কখনও সাফল্যের উজ্জ্বল আলো, কখনও আবার সীমাবদ্ধতার দীর্ঘ ছায়া—এই দুইয়ের সমন্বয়েই রচিত হয়েছে বাংলাদেশের শিক্ষা উন্নয়নের ইতিহাস।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় অনেক অপূর্ণতা রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন, উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ, কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ এবং শিক্ষায় বিনিয়োগ—এসব ক্ষেত্র এখনও আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, স্বাধীনতার সময় যে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সম্পদহীন দেশটির শিক্ষা অবকাঠামো প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, সেই বাংলাদেশ আজ সাক্ষরতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ, নারী শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকার, উচ্চশিক্ষার বিস্তার এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে এক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে।
এই দীর্ঘ অভিযাত্রার জন্য কৃতিত্ব কোনো একক ব্যক্তি, সরকার কিংবা রাজনৈতিক দলের নয়। এটি একটি ধারাবাহিক জাতীয় নির্মাণের ইতিহাস। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের দীর্ঘ সময়—প্রায় তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি—দেশ পরিচালনার দায়িত্ব প্রধানত দুটি রাজনৈতিক ধারার নেতৃত্বের হাতেই ছিল। তবে তবে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ সময় রাষ্ট্র পরিচালনা এবং শিক্ষা নীতি ও শিক্ষা সংস্কারের নেতৃত্ব প্রধানত দুটি রাজনৈতিক পরিবারের নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোর হাতেই ছিল। এর বাইরেও যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন, তাদের প্রত্যেকের শাসনামলে শিক্ষা খাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে; আবার কিছু সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতাও ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। শিক্ষা ব্যবস্থা কখনোই শূন্য থেকে গড়ে ওঠে না; একটি সরকারের নেওয়া উদ্যোগের ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী সরকার নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তাই ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে হলে আমাদের প্রত্যেক সময়ের ইতিবাচক অবদান এবং সীমাবদ্ধতা—উভয়কেই তথ্যভিত্তিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
এই নিবন্ধ কোনো রাজনৈতিক বিচার নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা উন্নয়নের একটি ঐতিহাসিক ইতিবাচক আমলনামা নির্মাণের প্রচেষ্টা। এখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম সরকার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান সরকারের সময়ে শিক্ষা সংস্কার ও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোকে একটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পর্যালোচনা করার চেষ্টা করা হবে।
এই লেখা শুরু করার আগে আমি তাদের সকলের অবদানকেই স্বীকার করছি। এবং একই সাথে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সেই বীর শহীদদের, যাঁদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। তাঁদের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন, জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র। একই সঙ্গে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশের শিক্ষা কমিশনগুলোর সদস্যবৃন্দ, শিক্ষাবিদ, শিক্ষা পরিকল্পনাবিদ, গবেষক, নীতিনির্ধারক, প্রশাসক এবং সর্বোপরি দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষককে। তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টা, মতভেদ, বিতর্ক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সাফল্য ও ব্যর্থতার সম্মিলিত অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়েই আজকের বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নির্মিত হয়েছে।
আমাদের বিশ্বাস, একটি জাতি তখনই ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করতে পারে, যখন সে তার অতীতকে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে শেখে। যে জাতি তার অবদান রাখা মানুষদের ন্যায্য স্বীকৃতি দিতে পারে না, সে জাতি নতুন অবদানের সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে পারে না। তাই এই নিবন্ধে আমরা কেবল সমস্যার তালিকা তৈরি করব না; বরং পঞ্চান্ন বছরের শিক্ষা সংস্কারের অর্জন, সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতার একটি তথ্যভিত্তিক দলিল উপস্থাপনের চেষ্টা করব—যাতে এটি ভবিষ্যতের গবেষক, শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক এবং শিক্ষা সংস্কারকর্মীদের জন্য একটি কার্যকর রেফারেন্স হিসেবে কাজ করতে পারে।

উপক্রমণিকা

বাংলাদেশের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক পালাবদলের ইতিহাস নয়; এটি শিক্ষা, জ্ঞান, মানবসম্পদ এবং জাতি গঠনেরও ইতিহাস। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি সরকার—রাজনৈতিক আদর্শ, দর্শন ও অগ্রাধিকার ভিন্ন হলেও—কোনো না কোনোভাবে শিক্ষা ব্যবস্থায় নিজেদের স্বাক্ষর রেখে গেছে। কোথাও প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ, কোথাও গণসাক্ষরতা আন্দোলন; কোথাও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, কোথাও নারী শিক্ষায় বৈপ্লবিক উপবৃত্তি; কোথাও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা, কোথাও ডিজিটাল শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, আবার কোথাও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে এক দীর্ঘ ধারাবাহিক নীতিগত অভিযাত্রার মধ্য দিয়ে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের জনপরিসরে শিক্ষা নিয়ে আলোচনা প্রায়ই রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। ফলে একটি সরকারের ইতিবাচক অবদান অন্য সরকারের সমর্থকদের কাছে অস্বীকারিত হয়, আবার পরবর্তী সরকার পূর্বসূরিদের অনেক অর্জনকে পর্যাপ্ত স্বীকৃতি দেয় না। অথচ রাষ্ট্রবিজ্ঞান, শিক্ষা নীতি ও জননীতি বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা সংস্কার একটি ক্রমবিবর্তনশীল (evolutionary) প্রক্রিয়া; এটি কোনো একক সরকার, ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের একক কৃতিত্ব নয়। প্রতিটি সময়ের সংস্কার, সাফল্য, অভিজ্ঞতা এবং সীমাবদ্ধতা পরবর্তী সময়ের নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করে।

এই নিবন্ধে তাই কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক, দোষারোপ বা নেতিবাচক মূল্যায়নের পথে না গিয়ে স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের শাসনামলে গৃহীত ইতিবাচক শিক্ষা সংস্কার, নীতিগত উদ্যোগ, প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি অবদানকে তথ্য, গবেষণা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের আলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে। লক্ষ্য একটিই—দেখানো যে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আজকের অবস্থান একটি সম্মিলিত জাতীয় যাত্রার ফল, যেখানে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার নিজ নিজ অবদান রেখে গেছে।

শিক্ষার ইতিহাসকে যদি আমরা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার চোখে নয়, বরং রাষ্ট্র নির্মাণের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে শিখি, তবে ভবিষ্যতের শিক্ষা সংস্কার আরও প্রমাণভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

সমস্যার চশমা খুলে একবার সাফল্যের দিকে তাকাই

বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই আমাদের চোখের সামনে প্রথমে ভেসে ওঠে সমস্যার তালিকা। কোথাও শিক্ষার মান নিয়ে অভিযোগ, কোথাও প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোথাও শিক্ষক সংকট, কোথাও আবার বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি কিংবা নীতির ব্যর্থতা। এমন এক মানসিক সংস্কৃতি যেন তৈরি হয়েছে—শিক্ষা মানেই সমস্যা, শিক্ষা মানেই সংকট। ফলে অনেকের কাছেই মনে হয়, স্বাধীনতার পর পঞ্চান্ন বছরে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বুঝি অর্জনের কোনো ইতিহাসই নেই।

কিন্তু শিক্ষাবিজ্ঞানের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো—যে সমাজ শুধু সমস্যার দিকে তাকিয়ে থাকে, সে সমাজ সমাধানের পথও খুঁজে পায় না। কারণ, উন্নয়নের জন্য যেমন সমস্যার বিশ্লেষণ প্রয়োজন, তেমনি সাফল্যের উৎসও শনাক্ত করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। কী সফল হয়েছে, কেন সফল হয়েছে, কার নেতৃত্বে সফল হয়েছে এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের জন্য কী শেখা যায়—এগুলোই টেকসই নীতিনির্ধারণের ভিত্তি।

বাস্তবতা হলো, ১৯৭২ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে হাজার হাজার ঘণ্টার সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালা, কমিশন রিপোর্ট এবং নীতিগত আলোচনা হয়েছে। প্রতিটি সময়েই সমস্যার তালিকা তৈরি হয়েছে; নতুন নতুন সুপারিশ এসেছে; আবার নতুন সমস্যাও সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন খুব কমই করা হয়েছে—এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা কী কী অর্জন করেছি? কোন নীতি সফল হয়েছে? কোন সংস্কার ভবিষ্যতের জন্য অনুসরণযোগ্য?

এই নিবন্ধ সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি ছোট প্রচেষ্টা।

স্বাধীনতার প্রাক্কালে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বের অনেকেই আশাবাদী ছিলেন না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে একসময় ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, এটি হবে একটি "Bottomless Basket"—একটি এমন রাষ্ট্র, যা চিরকাল বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল থাকবে এবং কখনোই আত্মনির্ভরশীল হতে পারবে না। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, কৃষি উৎপাদনের বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশ দুর্ভিক্ষের নির্মম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও গেছে।

কিন্তু ইতিহাসের সৌন্দর্য হলো—সে অনেক সময় ভবিষ্যদ্বাণীকে ভুল প্রমাণ করে। আজ স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরে আমরা এমন এক বাংলাদেশকে দেখি, যে দেশ দ্বিগুণেরও বেশি জনসংখ্যাকে খাদ্য জোগাতে সক্ষম। ১৯৭১ সালে যেখানে দেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় সাত কোটি, বর্তমানে তা প্রায় আড়াই গুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অথচ একই সঙ্গে বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়েছে। প্রশ্ন হলো—এটি কীভাবে সম্ভব হলো?

এর উত্তর কেবল কৃষির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীরে রয়েছে শিক্ষা, গবেষণা, বিজ্ঞান এবং জ্ঞানভিত্তিক উদ্ভাবনের দীর্ঘ বিনিয়োগ। উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন, সেচ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের জ্ঞান স্থানান্তর, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা, কৃষিবিদদের প্রশিক্ষণ এবং কোটি কোটি কৃষকের শেখার সক্ষমতা—এসবই একটি শিক্ষা ও গবেষণানির্ভর রাষ্ট্রের প্রতিফলন। স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টি ছাড়া এত বড় কৃষি বিপ্লব সম্ভব হতো না। অর্থাৎ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গল্প আসলে শিক্ষারও একটি সাফল্যের গল্প।

একইভাবে আজ বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, আন্তর্জাতিক গবেষণায় তাদের অবদান এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। অনেকে এটিকে "ব্রেইন ড্রেইন" বলে দেখেন। সেটি অবশ্যই একটি নীতিগত উদ্বেগ। কিন্তু এর আরেকটি দিকও রয়েছে—বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন মানবসম্পদ তৈরি করতে পেরেছে, যারা বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। অর্থাৎ আমাদের সমস্যা কেবল মানবসম্পদ তৈরি নয়; বরং সেই মানবসম্পদকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা।

এই কারণেই বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসকে কেবল ব্যর্থতার ইতিহাস হিসেবে দেখা ন্যায়সঙ্গত হবে না। আবার একে নিখুঁত সফলতার গল্প বলাও বাস্তবসম্মত নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘ অভিযাত্রা—যেখানে সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা পাশাপাশি এগিয়েছে।

এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য তাই কোনো সরকারকে মহিমান্বিত করা কিংবা কাউকে খাটো করা নয়। বরং স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন এবং বর্তমান সরকারের সময়ে শিক্ষা সংস্কার ও উন্নয়নে যে ইতিবাচক উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় মূল্যায়ন করা।

শিক্ষাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—কোনো শিক্ষা ব্যবস্থা শূন্য থেকে শুরু হয় না; প্রতিটি সংস্কার পূর্ববর্তী অর্জনের ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যায়। Nothing builds on zero. ফলে একটি সরকারের সফল উদ্যোগ পরবর্তী সরকারের জন্য ভিত্তি তৈরি করে; আবার একটি ব্যর্থতা ভবিষ্যতের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে।

একই সঙ্গে আরেকটি নৈতিক প্রশ্নও এখানে প্রাসঙ্গিক। যে জাতি তার অবদান রাখা মানুষদের ন্যায্য স্বীকৃতি দিতে পারে না, সেই জাতি ভবিষ্যতে নতুন অবদান সৃষ্টির প্রেরণাও হারিয়ে ফেলে। তাই শিক্ষা পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে, যে সরকারের যে অবদান রয়েছে, তাকে তথ্যভিত্তিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়াই একজন গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং ইতিহাস-সচেতন সমাজের দায়িত্ব।

হয়তো এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই আমাদের শিক্ষা সংস্কারের নতুন পথ দেখাতে পারে। কারণ, অতীতের সফল উদ্যোগগুলো শনাক্ত করতে পারলে সেগুলোকে নতুন বাস্তবতায় পুনরায় প্রয়োগ (replicate), অভিযোজিত (adapt) এবং আরও উন্নত (improve) করা সম্ভব হবে। আর সেখান থেকেই উন্মোচিত হতে পারে বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের আগামী অধ্যায়।

বিভিন্ন ব্যক্তির শাসনামল শিক্ষা ব্যবস্থার সম্পর্ক: একটি ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, দেশের শিক্ষা সংস্কারের গতিপথ কোনো একক সরকার, রাজনৈতিক দল বা নেতার অবদান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং প্রতিটি শাসনামল তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং জাতীয় অগ্রাধিকারের আলোকে শিক্ষা খাতে কিছু মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন, আইন, প্রতিষ্ঠান, কর্মসূচি এবং সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কোথাও প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ, কোথাও গণসাক্ষরতা, কোথাও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, কোথাও নারী শিক্ষায় উপবৃত্তি, কোথাও উচ্চশিক্ষার বহুমুখীকরণ, আবার কোথাও ডিজিটাল শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কিংবা দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা একটি ধারাবাহিক নীতিগত বিবর্তনের (Policy Evolution) মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন তাই আমাদের শেখায় যে শিক্ষা সংস্কার কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান রাষ্ট্র নির্মাণের প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ পরবর্তী সরকারের জন্য ভিত্তি নির্মাণ করেছে। সেই কারণে বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসকে প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক কৃতিত্বের তালিকা হিসেবে নয়, বরং ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, নীতিগত অভিযোজন এবং সম্মিলিত জাতীয় অগ্রযাত্রার ইতিহাস হিসেবে মূল্যায়ন করাই অধিকতর যুক্তিসংগত ও গবেষণাসম্মত।

সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক টাইমলাইন

বাংলাদেশের শিক্ষাসংস্কার উদ্যোগকে বিভিন্ন ক্ষমতাসীনদের সময়কালে বিবেচনা করে একটি ঐতিহাসিক টাইমলাইন তৈরি করা যায়:

  • ১৯৭২–১৯৭৫: রাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন শিক্ষা পুনর্গঠনের যুগ
  • ১৯৭৫–১৯৮১: গণসাক্ষরতা ও উৎপাদনমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণের যুগ
  • ১৯৮২–১৯৯০: শিক্ষা নীতির বিতর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্প্রসারণের যুগ
  • ১৯৯১–১৯৯৬ এবং ২০০১–২০০৬: নারী শিক্ষা ও উপবৃত্তিভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণের যুগ
  • ১৯৯৬–২০০১: প্রাথমিক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা সংস্কারের ভিত্তি নির্মাণ
  • ২০০৯–জুলাই ২০২৪: ডিজিটাল রূপান্তর, শিক্ষা সম্প্রসারণ ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সংস্কারের যুগ
  • আগস্ট ২০২৪–ফেব্রুয়ারি ২০২৬: পুনর্মূল্যায়ন, নীতিগত পুনর্বিন্যাস ও সংস্কার-সংঘাতের যুগ যুগ
  • ফেব্রুয়ারি ২০২৬–বর্তমান: পুনর্গঠন ও ভবিষ্যতমুখী শিক্ষা সংস্কারের যুগ

১৯৭২১৯৭৫বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে শিক্ষা সংস্কার–স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষা পুনর্গঠন জাতীয় শিক্ষাদর্শের ভিত্তি নির্মাণ

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের সামনে অবকাঠামো পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি একটি নতুন, যুগোপযোগী ও জাতীয় চেতনা-ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাকিস্তান আমলে প্রচলিত শিক্ষানীতি ছিল ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামো ও কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রদর্শনের প্রতিফলন, যা বাঙালির ভাষা আন্দোলন, গণআন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিকশিত জাতীয় আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তাই এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল, যা একই সঙ্গে গণমুখী, বিজ্ঞানমনস্ক, কর্মমুখী, অসাম্প্রদায়িক এবং জাতীয় সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধনির্ভর হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষা খাতকে কেবল একটি সামাজিক সেবা হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রগঠন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর শিক্ষা দর্শনে মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—শিক্ষার লক্ষ্য ও চরিত্র নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, "সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ গড়তে হবে", আর সেই মানুষ গড়ার প্রধান মাধ্যম হলো শিক্ষা।

দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন দিনের মধ্যে, ১৯৭২ সালের ১৫ জানুয়ারি, তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের বকেয়া বেতন ও ফি মওকুফের ঘোষণা দেন এবং পরে শিক্ষক-কর্মচারীদের যুদ্ধকালীন নয় মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা করেন। মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৬ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা এবং শত শত কলেজ ভবনের পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসনও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম দ্রুত পুনরায় চালু করা স্বাধীন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রথম মানবিক ও প্রশাসনিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

সংবিধানে শিক্ষার সাংবিধানিক ভিত্তি: ১৯৭২ সালের সংবিধানে শিক্ষাকে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিশেষ করে অনুচ্ছেদ১৫ও১৭-এ শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পায়। অনুচ্ছেদ ১৭ অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়—

  • গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা;
  • আইন দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা নিশ্চিত করা;
  • সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা ও দক্ষ নাগরিক গড়ে তোলা;
  • নিরক্ষরতা দূরীকরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

একই সঙ্গে সংবিধানের অন্যান্য ধারার মাধ্যমে বৈষম্যহীন ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার সাংবিধানিক ভিত্তিও সুসংহত করা হয়। এর ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রথমবারের মতো একটি সুস্পষ্ট সাংবিধানিক দিকনির্দেশনা লাভ করে।

শিক্ষায় বিনিয়োগ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রশাসনিক ভিত্তি নির্মাণ

পাকিস্তান আমলে প্রতিরক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিপরীতে বঙ্গবন্ধু সরকার স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে প্রতিরক্ষার তুলনায় অধিক গুরুত্ব প্রদান করে শিক্ষা-কেন্দ্রিক উন্নয়ন দর্শনের সূচনা করেন। ১৯৭২–১৯৭৬ সালের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও শিক্ষা ছিল অন্যতম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত। এই সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, নারী শিক্ষার সম্প্রসারণ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ কর্মসূচি, মাদ্রাসা শিক্ষা পুনর্গঠন, নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রাথমিক শিক্ষার সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা হয়।

১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-খুদা-এর নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশনের দায়িত্ব ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জাতীয় চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি আধুনিক শিক্ষা কাঠামো প্রণয়ন করা। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ১৯৭৪ সালে সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়। এতে শিক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা, নারী শিক্ষা, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মতো সুদূরপ্রসারী সুপারিশ করা হয়। ৎকই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি সুসংহত জাতীয় দর্শনের ওপর পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে কমিশন তার প্রতিবেদনে বাংলাকে শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা, বিজ্ঞানমনস্ক ও উৎপাদনমুখী শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষার সর্বজনীনীকরণ, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী সুপারিশ প্রদান করে। পরবর্তী কয়েক দশকের অধিকাংশ শিক্ষা নীতি ও সংস্কার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই কমিশনের সুপারিশ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শিক্ষা পরিকল্পনার ইতিহাসে এই কমিশন একটি মৌলিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭৩ প্রণয়ন এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে তিনি উচ্চশিক্ষাকে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে একাডেমিক স্বাধীনতার ভিত্তিতে পরিচালনার নীতি গ্রহণ করেন। পাশাপাশি তিনি চিকিৎসা, কৃষি, প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।

প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রের শিক্ষা-দায়বদ্ধতার সূচনা

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে শিক্ষা পুনর্গঠন ছিল রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত শিক্ষা ব্যবস্থা, বিপর্যস্ত অবকাঠামো এবং সীমিত অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শিক্ষাকে জাতি গঠনের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। সেই প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ দায়িত্বের আওতায় আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় Primary Schools (Taking Over) Act, 1974 (Act No. XXVII of 1974) প্রণয়ন করা হয়, যার মাধ্যমে দেশের ৩৬,১৭৫টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ করা হয় এবং এক লক্ষেরও বেশি শিক্ষক সরকারি চাকরির আওতায় অন্তর্ভুক্ত হন। এর ফলে শিক্ষকতার পেশায় চাকরির নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়, বিদ্যালয় পরিচালনায় কেন্দ্রীয় সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সারা দেশে তুলনামূলকভাবে সমতাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে।

এই সময়ে সরকার শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, মৌলিক শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ এবং দরিদ্র শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে পুষ্টি-সহায়তার অংশ হিসেবে বিস্কুটসহ বিভিন্ন স্কুল পুষ্টি কর্মসূচির প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এসব পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য ছিল আর্থিক কারণে কোনো শিশুর যেন বিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন না হয় এবং শিক্ষার সুযোগ ধীরে ধীরে সর্বজনীন করা।

সব মিলিয়ে এই সময়কালকে স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে "রাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন শিক্ষা পুনর্গঠন, প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ এবং জাতীয় শিক্ষা দর্শন প্রতিষ্ঠার যুগ" হিসেবে অভিহিত করা যায়। এই সময়ে গৃহীত নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তগুলো পরবর্তী পাঁচ দশকের শিক্ষা সম্প্রসারণ, শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি, সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা এবং শিক্ষা সংস্কারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালকে বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে "জাতীয় শিক্ষাদর্শ প্রতিষ্ঠা, সাংবিধানিক ভিত্তি নির্মাণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠনের যুগ" হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এই সময়ে গৃহীত সাংবিধানিক, আইনগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত পদক্ষেপগুলো পরবর্তী পাঁচ দশকের শিক্ষা সংস্কারের ভিত্তি নির্মাণ করে। স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যে গণমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও রাষ্ট্রনির্ভর উন্নয়ন কাঠামোর দিকে অগ্রসর হয়, তার বীজ রোপিত হয় এই সময়েই। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শনের অন্যতম স্থায়ী অবদান ছিল শিক্ষা, রাষ্ট্র এবং সমাজকে একটি অভিন্ন উন্নয়নদর্শনের মধ্যে সংযুক্ত করার প্রচেষ্টা, যার প্রভাব বাংলাদেশের শিক্ষা নীতির পরবর্তী বিকাশেও সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

১৯৭৫১৯৮১রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে শিক্ষা সংস্কারবাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণসাক্ষরতা উৎপাদনমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণের যুগ

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারিত হয়। এ সময় শিক্ষা নীতির আদর্শিক ভিত্তিতে পরিবর্তন এনে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ আত্মনির্ভরতার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনের একটি কার্যকর উপায় হিসেবে পুনর্বিবেচনা করা হয়।

এই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল দেশব্যাপী গণসাক্ষরতা অভিযান। প্রাপ্তবয়স্ক নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনতে সরকার ব্যাপক গণশিক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করে, যার উদ্দেশ্য ছিল নিরক্ষরতা হ্রাস, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আত্মনির্ভর সমাজ গঠন। যদিও এই কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল অঞ্চলভেদে ভিন্ন ছিল, তবুও এটি স্বাধীনতার পর প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রথম বৃহৎ জাতীয় উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার শিক্ষকদের বেতনে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি অনুমোদন করে। এর ফলে শিক্ষক পেশায় স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য Directorate of Inspection and Audit (DIA)-এর মাধ্যমে বিদ্যালয় নিরীক্ষা (School Audit) ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হয়।

পাঠ্যক্রমেও বাস্তবধর্মী পরিবর্তন আনা হয়। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির চাহিদা বিবেচনায় কৃষিশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদনমুখী শিক্ষার ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরিবর্তে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। এই সময়ে শিক্ষা ও জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

নারীর ক্ষমতায়নেও এ সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে নারীদের জন্য সংরক্ষিত কোটা (quota) ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়। পরবর্তী দশকগুলোতে নারী শিক্ষার বিস্তারে এই নীতিগত পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক বিকাশের লক্ষ্যে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে "নতুন কুঁড়ি" অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম জাতীয় টেলিভিশনভিত্তিক শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্য, অভিনয় এবং অন্যান্য সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে এটি শিক্ষা ব্যবস্থার সহশিক্ষা (co-curricular education)-কে নতুন মাত্রা প্রদান করে এবং অসংখ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

সব মিলিয়ে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে "বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণসাক্ষরতা, শিক্ষক কল্যাণ এবং উৎপাদনমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণের যুগ" হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এ সময়ে শিক্ষা নীতির আদর্শিক পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি শিক্ষক কল্যাণ, গণশিক্ষা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, নারীর অংশগ্রহণ এবং কারিগরি ও উৎপাদনমুখী শিক্ষার ওপর যে গুরুত্ব আরোপ করা হয়, তা পরবর্তী দশকগুলোর শিক্ষা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করতে সহায়তা করে।

ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের (১৯৭৫–১৯৮১) শাসনামলকে শিক্ষা সম্প্রসারণের পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয় উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতির সঙ্গে অধিকতর সংযুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরপর্ব হিসেবে মূল্যায়ন করা যায়। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠনের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এই সময়ে শিক্ষাকে গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি, কারিগরি দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। একই সঙ্গে গণসাক্ষরতা কর্মসূচি, শিক্ষক কল্যাণে বেতন বৃদ্ধি, শিক্ষা প্রশাসনে তদারকি ও জবাবদিহিতা শক্তিশালীকরণ, নারী শিক্ষার অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণের মতো উদ্যোগ শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এই সময়ে শিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে অধিক গুরুত্ব লাভ করে। যদিও পরবর্তী সময়ে শিক্ষা খাতে আরও বিস্তৃত সংস্কার সংঘটিত হয়েছে, তবুও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলকে "উৎপাদনমুখী, উন্নয়নমুখী ও মানবসম্পদকেন্দ্রিক শিক্ষা সম্প্রসারণের যুগ" হিসেবে চিহ্নিত করা যৌক্তিক। তাঁর সময়ে গৃহীত নীতিগত ও প্রশাসনিক উদ্যোগগুলো পরবর্তী দশকগুলোতে শিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়নের সম্পর্ককে আরও সুসংহত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

১৯৮২১৯৯০রাষ্ট্রপতি লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে শিক্ষা সংস্কারবাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, নারীশিক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা নীতিকে ঘিরে বিতর্কের যুগ

১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একদিকে যেমন কাঠামোগত ও প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়, অন্যদিকে শিক্ষা নীতির আদর্শিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক কিছু প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে ব্যাপক জাতীয় বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এই সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের বিভিন্ন প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হলেও সেগুলোর কিছু শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়। ফলে এই সময়কাল বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে একই সঙ্গে সংস্কার ও প্রতিরোধের যুগ হিসেবে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

১৯৮২১৯৮৩মজিদ খান শিক্ষা নীতি এবং জাতীয় বিতর্ক:

রাষ্ট্রপতির শিক্ষা উপদেষ্টা ড. আবদুল মজিদ খান ১৯৮২ সালে একটি নতুন শিক্ষা নীতির খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপন করেন, যা পরবর্তীকালে মজিদ খান শিক্ষা নীতি নামে পরিচিত হয়। এই প্রস্তাবে প্রথম শ্রেণি থেকে আরবি ভাষাকে বাধ্যতামূলক বিষয় এবং দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষার অর্থায়নে পরিবারের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ বহনের ধারণাও উপস্থাপন করা হয়। নীতির সমর্থকেরা এটিকে সম্পদ সংকট মোকাবিলা ও শিক্ষার বহুমুখীকরণের উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, সমালোচকেরা এটিকে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ এবং সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধির আশঙ্কা হিসেবে দেখেন।

এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী ছাত্র, শিক্ষক ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মধ্যে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েকজন শিক্ষার্থী নিহত হন। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাবিধুর অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয় এবং পরবর্তীকালে মজিদ খান শিক্ষা নীতি বিরোধী আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। শেষ পর্যন্ত সরকার প্রস্তাবিত শিক্ষা নীতি কার্যকর করা স্থগিত রাখে এবং বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা সংস্কার প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন

প্রাথমিক পর্যায়ের বিতর্ক সত্ত্বেও এরশাদ সরকারের সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়িত হয়, যার অনেকগুলোর প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশকেও বিদ্যমান থাকে। ১৯৮৮ সালের মফিজউদ্দিন শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ এবং পরবর্তী নীতিগত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রাথমিক শিক্ষার সম্প্রসারণ, নারী শিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হয়।

এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন, ১৯৯০ প্রণয়ন, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের সকল শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি পরবর্তী সময়ে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

নারী শিক্ষার প্রসারে সরকার গ্রামীণ এলাকার ছাত্রীদের জন্য অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা চালু করে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল বিদ্যালয় ত্যাগের হার কমানো, অল্পবয়সে বিবাহ প্রতিরোধ এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা। পরবর্তী দশকে নারী শিক্ষায় বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পেছনে এই নীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

এ সময়ে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কর্মসূচি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে এবং ধীরে ধীরে এটি জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত হয়। একই সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষায় কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়, যাতে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করা যায়।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক উদ্যোগ ছিল "পথকলি ট্রাস্ট" প্রতিষ্ঠা, যার মাধ্যমে পথশিশু, গৃহহীন এবং প্রান্তিক শিশুদের জন্য রাষ্ট্রের অর্থায়নে মৌলিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এটি বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা চিন্তার প্রাথমিক প্রাতিষ্ঠানিক উদাহরণগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

সব মিলিয়ে ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে এক দ্বৈত বৈশিষ্ট্যের সময়কাল। একদিকে মজিদ খান শিক্ষা নীতিকে ঘিরে আদর্শিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক, ছাত্র আন্দোলন এবং শিক্ষা নীতির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তীব্র সংঘাত দেখা যায়; অন্যদিকে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, নারীশিক্ষা সম্প্রসারণ, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক, কারিগরি শিক্ষা এবং প্রান্তিক শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা উদ্যোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও বাস্তবায়িত হয়। তাই এই সময়কে যথার্থভাবেই "শিক্ষা নীতির বিতর্ক, সামাজিক প্রতিরোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সম্প্রসারণের যুগ" হিসেবে অভিহিত করা যায়।

১৯৯১১৯৯৬ এবং ২০০১২০০৬প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে শিক্ষা সংস্কারনারী শিক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন শিক্ষা সম্প্রসারণের যুগ

১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার শিক্ষা খাতকে মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে। বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, নারী শিক্ষা এবং প্রাথমিক শিক্ষার সর্বজনীনীকরণকে কেন্দ্র করে একাধিক নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার গ্রহণ করা হয়। শিক্ষা ব্যবস্থাকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, অর্থনৈতিক প্রণোদনা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে এই সময়কাল বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।

  • নারী শিক্ষায় বৈপ্লবিক প্রণোদনা কর্মসূচি: এই সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল ১৯৯৪ সালে গ্রামীণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি কর্মসূচি (Female Secondary School Assistance Programme) চালু করা। বিনামূল্যে শিক্ষা, মাসিক উপবৃত্তি এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী শিক্ষার্থীদের আর্থিক প্রণোদনার সমন্বয়ে গঠিত এই কর্মসূচি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অন্যতম সফল সামাজিক নীতি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। বিশ্বব্যাংক, ইউনেস্কো, ইউনিসেফ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নে দেখা যায়, এই কর্মসূচি মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ভর্তির হার বৃদ্ধি, বিদ্যালয় ত্যাগের হার হ্রাস, বাল্যবিবাহ বিলম্বিতকরণ এবং নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। পরবর্তীকালে সরকার মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু করে, যা ধীরে ধীরে উচ্চমাধ্যমিক (দ্বাদশ শ্রেণি) পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। এর ফলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশগুলোর একটি হিসেবে মাধ্যমিক শিক্ষায় নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য ভারসাম্য অর্জন করে। ২০০১–২০০৬ সময়কালে মাদ্রাসা শিক্ষায় অধ্যয়নরত ছাত্রীদেরও উপবৃত্তি কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যার মাধ্যমে রক্ষণশীল ও গ্রামীণ পরিবারের মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পায়।
  • প্রাথমিক শিক্ষা দারিদ্র্য বিমোচনভিত্তিক উদ্যোগ: সরকার বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন কার্যকর বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয় এবং ১৯৯২–১৯৯৩ সাল থেকে দেশের সব জেলায় প্রাথমিক শিক্ষার সর্বজনীনীকরণে প্রশাসনিক উদ্যোগ জোরদার করে। বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে "খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা" (Food for Education Programme) কর্মসূচি চালু করা হয়। এ কর্মসূচির আওতায় নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য খাদ্যশস্য প্রদান করা হতো। পরবর্তীকালে ২০০২ সালে এই কর্মসূচি প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি (Primary Education Stipend Programme)-তে রূপান্তরিত হয়, যেখানে খাদ্যশস্যের পরিবর্তে সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান শুরু হয়। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IFPRI)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, এই কর্মসূচি বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি ও নিয়মিত উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে।
  • উচ্চশিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন: উচ্চশিক্ষার দ্রুত সম্প্রসারণ এবং ক্রমবর্ধমান শিক্ষার্থীসংখ্যার চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে Private University Act, 1992 প্রণয়ন করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তি সৃষ্টি হয়, যা উচ্চশিক্ষায় নতুন বিনিয়োগ, বৈচিত্র্য এবং আসনসংখ্যা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে। একই বছরে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (Bangladesh Open University) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা দূরশিক্ষা, কর্মজীবী মানুষ, নারী এবং প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা ও জীবনব্যাপী শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। প্রাথমিক শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা এবং গণশিক্ষা কার্যক্রমকে আরও বিশেষায়িত ও কার্যকরভাবে পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ সময় চট্টগ্রামে Asian University for Women প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারি জমি বরাদ্দের সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়, যা পরবর্তীকালে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নারীদের উচ্চশিক্ষা ও নেতৃত্ব বিকাশের একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়।
  • দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মূল্যায়ন: এই সময়ে শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং নারী শিক্ষা, উপবৃত্তি, প্রাথমিক শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণে ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা প্রদান করা হয়। বিশেষ করে নারী শিক্ষায় উপবৃত্তি কর্মসূচি বাংলাদেশের অন্যতম সফল জননীতি (public policy innovation) হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং পরবর্তীকালে বহু উন্নয়নশীল দেশ এই মডেল অনুসরণ করে নিজ নিজ কর্মসূচি গ্রহণ করে। দীর্ঘমেয়াদে এসব উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গসমতা (Gender Parity) অর্জনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করে এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (MDGs)-এর শিক্ষা-সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি লক্ষ্য নির্ধারিত সময়ের আগেই অর্জনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধন করে।
  • ঐতিহাসিক মূল্যায়ন: সব মিলিয়ে ১৯৯১–১৯৯৬ এবং ২০০১–২০০৬ সময়কালকে বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে "নারী শিক্ষা, উপবৃত্তিভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং উচ্চশিক্ষার বহুমুখীকরণের যুগ" হিসেবে অভিহিত করা যায়। এই সময়ে শিক্ষা কেবল একটি সামাজিক সেবা নয়, বরং দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান নীতিগত হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৯৬২০০১: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শিক্ষা সংস্কারপ্রাথমিক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা সংস্কারের ভিত্তি নির্মাণ

১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষা খাতকে মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সময়ে প্রাথমিক শিক্ষার সর্বজনীনীকরণ, উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ, তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার সূচনা, বিজ্ঞান শিক্ষা এবং শিক্ষা প্রশাসনের আধুনিকীকরণের ভিত্তি স্থাপনের জন্য একাধিক নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

  • প্রাথমিক শিক্ষার সর্বজনীনীকরণ: সরকার বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন, ১৯৯০-এর কার্যকর বাস্তবায়নে নতুন গতি প্রদান করে এবং বিদ্যালয়ে ভর্তি ও উপস্থিতি বৃদ্ধি, বিদ্যালয় অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (PEDP)-এর বাস্তবায়ন জোরদার করে। এই সময়ে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের সংখ্যা কমতে শুরু করে।
  • উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ: উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে নতুন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা, শিক্ষক উন্নয়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকারি বিনিয়োগও বৃদ্ধি পেতে থাকে।
  • তথ্যপ্রযুক্তি বিজ্ঞান শিক্ষার ভিত্তি: বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশকে সামনে রেখে বিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির নীতিগত ভিত্তি এই সময়েই গড়ে ওঠে। বিজ্ঞান শিক্ষা, কম্পিউটার শিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিকে ভবিষ্যৎ জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যা পরবর্তীকালে "ডিজিটাল বাংলাদেশ" কর্মসূচির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
  • নারী শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচির সম্প্রসারণ: পূর্ববর্তী সরকারের সময় চালু হওয়া মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী করা হয়। ফলে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ভর্তির হার বৃদ্ধি পায় এবং বিদ্যালয় ত্যাগের হার কমতে থাকে। নারী শিক্ষায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এই সময়ের নীতিগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • জাতীয় শিক্ষা কমিশন (শামসুল হক কমিশন): ১৯৯৭ সালে সরকার জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করে, যার সভাপতি ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। কমিশন শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, বিজ্ঞানমনস্কতা, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ, গুণগত শিক্ষা এবং একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বিস্তৃত সুপারিশ প্রদান করে। যদিও কমিশনের সব সুপারিশ তখন বাস্তবায়িত হয়নি, তবে পরবর্তীকালে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়নে এই কমিশনের সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ইনক্লুশনের সূচনা: এই সময়কালে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ইনক্লুসিভ এডুকেশনের সূচনা ঘটে।
  • ঐতিহাসিক মূল্যায়ন: ১৯৯৬–২০০১ সময়কালকে বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে "প্রাথমিক শিক্ষা শক্তিশালীকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণ এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষা সংস্কারের প্রস্তুতির যুগ" হিসেবে অভিহিত করা যায়। এই সময়ে গৃহীত নীতিগত পদক্ষেপগুলো পরবর্তী দশকে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০, ডিজিটাল শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সংস্কারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।

২০০৯জুলাই ২০২৪: শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদে শিক্ষা সংস্কারডিজিটাল রূপান্তর, শিক্ষা সম্প্রসারণ দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সংস্কারের যুগ

২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কর্মসূচির সূচনা হয়, যার লক্ষ্য ছিল শিক্ষাকে ডিজিটাল বাংলাদেশ, পরবর্তীকালে স্মার্ট বাংলাদেশ এবং রূপকল্প–২০৪১-এর মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। এ সময়ে শিক্ষা সম্প্রসারণ, শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, নারী শিক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, গবেষণা এবং দক্ষতাভিত্তিক মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন মূল্যায়নে এই সময়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বিশেষভাবে স্বীকৃতি লাভ করে।

  • জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০স্বাধীনতার পর অন্যতম বিস্তৃত শিক্ষা সংস্কার: এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত মাইলফলক ছিল জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন। স্বাধীনতার পর এটি ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বিস্তৃত ও সমন্বিত শিক্ষা নীতিগুলোর একটি। এতে বিজ্ঞানমনস্কতা, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ, তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে দক্ষতাভিত্তিক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক করার রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়।
  • বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণবিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষা কর্মসূচি: সরকারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ। প্রতিবছর কোটি কোটি বই একযোগে বিতরণের এই কর্মসূচি বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র-পরিচালিত পাঠ্যপুস্তক বিতরণ উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এর ফলে বিশেষ করে দরিদ্র ও গ্রামীণ পরিবারের ওপর শিক্ষার আর্থিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং বিদ্যালয়ে ভর্তি ও উপস্থিতি বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
  • বিজ্ঞান, প্রযুক্তি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির জন্য বিনিয়োগ: চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং ভিশন–২০৪১ বাস্তবায়নের লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে। এ সময়ে ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বা কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করা হয়। পাশাপাশি আইসিটি শিক্ষা, ডিজিটাল ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞান মেলা, আইসিটি মেলা এবং কম্পিউটার শিক্ষার সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিদ্যালয় পর্যায়ে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা হয়।
  • কারিগরি বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ: কর্মসংস্থানমুখী মানবসম্পদ গঠনের লক্ষ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ধাপে ধাপে বিভিন্ন উপজেলায় কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, পলিটেকনিক ও টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ সম্প্রসারণ এবং দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মবাজার উপযোগী জনশক্তি তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
  • অন্তর্ভুক্তিমূলক লিঙ্গ-সংবেদনশীল শিক্ষা: নারী শিক্ষায় পূর্ববর্তী উপবৃত্তি কর্মসূচিগুলোকে আরও সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল পাঠ্যপুস্তক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি এবং শিক্ষায় লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় Gender Parity Index (GPI) অর্জনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য প্রদর্শন করে।
  • শিক্ষা প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর: এই সময়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা, কলেজে ভর্তি, ফলাফল প্রকাশ, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা প্রশাসনের বহু কার্যক্রম অনলাইনে নিয়ে আসা হয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে "আমার ঘরে আমার স্কুল", অনলাইন ক্লাস এবং ডিজিটাল শিক্ষক প্রশিক্ষণ শিক্ষা ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • উচ্চশিক্ষা, গবেষণা মাননিশ্চয়ন: উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণে নতুন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে Institutional Quality Assurance Cell (IQAC), Higher Education Quality Enhancement Project (HEQEP), বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল, ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক প্রবর্তন এবং গবেষণা অনুদান বৃদ্ধির মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা অবকাঠামো, ডিজিটাল লাইব্রেরি, গবেষণাগার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়।
  • মাদ্রাসা শিক্ষা ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকীকরণ: এই সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষায় বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও সাধারণ বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণ করা হয়। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমানের স্বীকৃতি প্রদান এবং মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
  • প্রতিবন্ধী ও সমাজে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির নতুন অধ্যায়:  সময়কাল বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে একীভূত শিক্ষা (Inclusive Education)-কে জাতীয় শিক্ষা নীতির মূলধারায় নিয়ে আসার জন্য। এই সময়ে সরকার শিক্ষা নীতি ২০১০-এর আলোকে প্রতিবন্ধী শিশু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশু, চর, হাওর, পাহাড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের শিশু, পথশিশু, শ্রমজীবী শিশু এবং অন্যান্য সমাজে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একাধিক নীতি, কর্মসূচি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি সম্প্রসারণ, ব্রেইল বই ও সহায়ক শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ, প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (PEDP)-এর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ২০২২ সালে Special Education Needs and Disability (SEND) Framework প্রণয়নের মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শনাক্তকরণ, রেফারেল ব্যবস্থা, অন্তর্ভুক্তিমূলক পাঠদান এবং বিদ্যালয়ে ধরে রাখার জন্য একটি জাতীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।  এই সময়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ধারণা কেবল নীতিপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ের বাস্তবতায়ও তার প্রতিফলন ঘটতে শুরু করে। সরকারি পরিসংখ্যানে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পৃথকভাবে অন্তর্ভুক্ত করে তথ্য সংগ্রহ, অটিজম, শারীরিক, দৃষ্টি, শ্রবণ, বাক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতাসহ বিভিন্ন ধরনের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে ভর্তির তথ্য সংরক্ষণ এবং মূলধারার বিদ্যালয়ে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা, ব্রেইল ও বৃহৎ অক্ষরের পাঠ্যপুস্তক, উপবৃত্তি কর্মসূচি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা দর্শনকে আরও শক্তিশালী করে। যদিও শিক্ষকের সক্ষমতা, সহায়ক প্রযুক্তি, বিদ্যালয়ের শারীরিক প্রবেশগম্যতা এবং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে, তবুও এই সময়কালকে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ও সমাজে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার অধিকারকে রাষ্ট্রের মূলধারার উন্নয়ন এজেন্ডায় প্রতিষ্ঠিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে মূল্যায়ন করা যায়।
  • অটিস্টিক ও স্নায়ু বিকাশগনিত প্রতিবন্ধিতা আক্রান্ত শিশুদের শিক্ষায় নতুন দিগন্ত: এই সময়কালে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাকে কল্যাণমূলক (welfare-based) দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ধীরে ধীরে অধিকারভিত্তিক (rights-based) দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপান্তরের একটি নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা লক্ষ করা যায়। এর অংশ হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যাশনাল একাডেমি ফর অটিজম অ্যান্ড নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটিজ (NAAND) প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি অটিজম ও নিউরোডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০,০০০ জন শিক্ষক, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একই সঙ্গে একাডেমিটি সচেতনতা বৃদ্ধি, কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শমূলক সেবার মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য একটি জাতীয় সম্পদকেন্দ্র (national resource centre) হিসেবে কাজ করছে। যদিও এই উদ্যোগগুলো এখনও পূর্ণাঙ্গ অধিকারভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়, তবুও এগুলো বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী শিক্ষার নীতিগত রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
  • নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন: এই দীর্ঘ সংস্কারপর্বের শেষ দিকে ২০২৩ সালে নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়। এর লক্ষ্য ছিল মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে অভিজ্ঞতাভিত্তিক (Experiential Learning), দক্ষতাভিত্তিক (Competency-based Learning), সমস্যা সমাধান, সহযোগিতামূলক শিখন এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন-ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষার চাপ কমানো, সৃজনশীলতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ দক্ষতা উন্নয়নের উদ্দেশ্যে মূল্যায়ন ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়েই শিক্ষক প্রস্তুতি, মূল্যায়ন কাঠামো, পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু, বিদ্যালয়ের সক্ষমতা এবং অংশীজনদের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যাপক জাতীয় বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ফলে এই সময়কে বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে "দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা মূল্যায়ন সংস্কারের পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নের যুগ" হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
  • ঐতিহাসিক মূল্যায়ন: ২০০৯ থেকে জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত সময়কালকে বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে "ডিজিটাল শিক্ষা, শিক্ষা সম্প্রসারণ, গবেষণা ও বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সংস্কারের যুগ" হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এই সময়ে শিক্ষা খাতে প্রবেশাধিকার, অবকাঠামো, প্রযুক্তির ব্যবহার, নারী শিক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ এবং গুণগত মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়। একই সঙ্গে এই সময়ের শেষ পর্যায়ে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শিক্ষা সংস্কারের পরবর্তী ধাপ নিয়ে একটি বিস্তৃত জাতীয় বিতর্কের সূচনা করে, যা বাংলাদেশের শিক্ষা নীতির ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের ভিত্তি রচনা করে।

জুলাই ২০২৪ফেব্রুয়ারি ২০২৬: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপিদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে শিক্ষা সংস্কারপুনর্মূল্যায়ন, নীতিগত পুনর্বিন্যাস সংস্কার-সংঘাতের যুগ যুগ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিক্ষা খাতকে জাতীয় পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার পরিবর্তে তা অনেক ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক সংকট ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল—এমন একটি ধারণা শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের একাংশের মধ্যে ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে।

  • অরাজকতার সময়: দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, নিয়মিত পাঠদান ও মূল্যায়ন ব্যাহত হওয়া, অটোপাস বা শিথিল মূল্যায়নের প্রবণতা, পরীক্ষা গ্রহণে পরিকল্পনাহীনতা এবং শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত একাডেমিক প্রস্তুতি ছাড়াই পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বাধ্য করার অভিযোগ শিক্ষা ব্যবস্থার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতাকে দুর্বল করে। এ সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থবিরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা, মব-চাপ, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাহীনতা এবং পরীক্ষার ফলাফলকে কেন্দ্র করে অনিয়ম বা অযাচিত চাপের সংস্কৃতি শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিক্ষা সংস্কারের জন্য সুস্পষ্ট রূপরেখা, শিক্ষক প্রস্তুতি, শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি পুনরুদ্ধার, পাঠ্যক্রমের ধারাবাহিকতা এবং প্রতিষ্ঠানসমূহে স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি ছিল; কিন্তু এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত মনোযোগ ও কার্যকর নেতৃত্বের অভাব শিক্ষাকে শুধু বাহ্যিকভাবে নয়, ভেতর থেকেও দুর্বল করে দিয়েছে। ঐতিহাসিক বিচারে এই সময়কে তাই শিক্ষা সংস্কারের অগ্রগতির চেয়ে নীতিগত অনিশ্চয়তা, একাডেমিক স্থবিরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক আস্থাহ্রাসের একটি উদ্বেগজনক অধ্যায় হিসেবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
  • ঐতিহাসিক মূল্যায়ন : ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে আগস্ট ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সময়কাল বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি গভীর রূপান্তর, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বিন্যাসের সময় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শিক্ষা সংস্কারকে একটি সুসংহত দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখার আওতায় এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, পূর্ববর্তী নীতির পুনর্মূল্যায়ন এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অধিক গুরুত্ব পায়। এ সময়ে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়, বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি পূরণের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা দৃশ্যমান ছিল না। বিভিন্ন স্তরে পরীক্ষা আয়োজন, ফলাফল ব্যবস্থাপনা এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তি কার্যক্রমকে ঘিরে বিতর্ক ও প্রশাসনিক জটিলতা শিক্ষার প্রতি জনআস্থা ক্ষুণ্ন করে। একই সঙ্গে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক অস্থিরতা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য অনিরাপদ পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাভাবিকতা ব্যাহত হওয়ার ঘটনাও শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে এই সময়ে শিক্ষা সংস্কারের মূল লক্ষ্য—শিখনের মানোন্নয়ন, গবেষণার বিকাশ, শিক্ষক পেশার শক্তিশালীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি—কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। সামগ্রিকভাবে, এই সময়কাল বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে "নীতিগত পুনর্বিন্যাস, প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষা সংস্কারের গতি মন্থর হওয়ার একটি অধ্যায়" হিসেবে মূল্যায়িত হতে পারে। একই সঙ্গে এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে যে, শিক্ষা খাতে টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং প্রমাণভিত্তিক সংস্কার অপরিহার্য।

ফেব্রুয়ারি ২০২৬বর্তমান: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে শিক্ষা সংস্কারের নতুন রূপরেখা – নতুন আশা, নাকি পুরোনো হতাশা

২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষা খাতকে জাতীয় উন্নয়নের একটি কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে পুনর্গঠনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সরকারের প্রাথমিক বক্তব্য ও ঘোষণায় শিক্ষাকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা, গবেষণা ও সৃজনশীল চর্চার স্বাধীনতা রক্ষা, কর্মসংস্থানের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সংযোগ স্থাপন এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব লক্ষ করা যায়। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন; একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের উপযোগী নাগরিক গঠনে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও উদ্ভাবনকে সমন্বিত করার পরিকল্পনাও তুলে ধরেছেন।

  • রূপরেথা ঘোষণা: বর্তমান সরকারের ঘোষিত শিক্ষা রূপরেখায় নারী শিক্ষার সম্প্রসারণ, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সহায়তা, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল সুযোগ বৃদ্ধির বিষয়গুলো বিশেষভাবে দৃশ্যমান। সরকার পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পোশাক প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে এবং নারী শিক্ষাকে স্নাতক বা উচ্চতর স্তর পর্যন্ত অবৈতনিক করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। পাশাপাশি কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসায় বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই, স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং মাদ্রাসা শিক্ষায় কারিগরি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা-সুযোগের সম্প্রসারণ, ডিজিটাল বৈষম্য হ্রাস এবং শিক্ষার সঙ্গে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সম্পর্ক শক্তিশালী হতে পারে।
  • পর্যবেক্ষণের বিষয়: তবে শিক্ষা সংস্কার শুধু নতুন কর্মসূচি বা রাজনৈতিক ঘোষণার সমষ্টি নয়; এর সাফল্য নির্ভর করবে নীতির ধারাবাহিকতা, পর্যাপ্ত বাজেট, দক্ষ শিক্ষক, স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতি, প্রমাণভিত্তিক শিক্ষাক্রম, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক স্বাধীনতা বাস্তবে কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর। একই সঙ্গে গ্রাম ও শহর, সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষা, মাদ্রাসা ও মূলধারা, নারী ও পুরুষ এবং প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের মধ্যকার বৈষম্য কমানোও হবে এই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। পরিকল্পনাগুলো কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে টিকে থাকবে এবং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখনফলে প্রতিফলিত হবে—তা এখনো পর্যবেক্ষণের বিষয়।
  • ঐতিহাসিক মূল্যায়ন: তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মেয়াদ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় এর শিক্ষা সংস্কারকে চূড়ান্তভাবে ঐতিহাসিক মূল্যায়নের সময় আসেনি। বর্তমান ঘোষণাগুলো একটি দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর, তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার সম্ভাব্য রূপরেখা নির্দেশ করে; কিন্তু ঘোষিত অভিপ্রায় ও বাস্তব পরিবর্তনের মধ্যে ব্যবধান কতটা কমানো সম্ভব হবে, সেটিই হবে প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড। ভবিষ্যতে দেখা যাবে এই সময়কাল কি শুধু প্রতিশ্রুতি ও কর্মপরিকল্পনার অধ্যায় হয়ে থাকে, নাকি শিক্ষক মর্যাদা, শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা, সমতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা এবং শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতায় দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনার একটি নতুন যুগে পরিণত হয়। তাই ইতিহাসের বিচারে এখন সবচেয়ে সংগত মন্তব্য হলো—মূল্যায়নের সময় এখনো আসেনি; সময়ই বলে দেবে তারেক রহমানের শাসনামল বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে কী পরিচয়ে স্থান পাবে।

সব শাসনামল পেরিয়ে একই প্রশ্ন: সংস্কার হয়েছে, কিন্তু শিক্ষা কি সত্যিই বদলেছে?

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসের দিকে দীর্ঘ দৃষ্টিতে তাকালে একটি বিস্ময়কর বৈপরীত্য চোখে পড়ে। প্রায় প্রতিটি সরকারই শিক্ষা সংস্কারের ভাষা ব্যবহার করেছে; কমিশন গঠন করেছে, আইন প্রণয়ন করেছে, নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছে, উপবৃত্তি দিয়েছে, বই বিতরণ করেছে, প্রযুক্তি সংযোজন করেছে এবং দক্ষতা, সমতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি উচ্চারণ করেছে। তবু পাঁচ দশকের বেশি সময় পরও জাতিকে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে—এত সংস্কারের পরও কেন শিক্ষার মান, শিক্ষকতার মর্যাদা, গবেষণা, মূল্যায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একটি সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার তালিকায় নেই; বরং উত্তরটি লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের পুনরাবৃত্ত প্রবণতা, ধারাবাহিকতার ঘাটতি, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং বাস্তবায়ন-সংকটের মধ্যে।

বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের প্রথম বৃহৎ প্রবণতা হলো, প্রতিটি শাসনামল শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও উন্নয়নমূলক পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা করেছে। স্বাধীনতার পর প্রথম পর্যায়ে শিক্ষা ছিল রাষ্ট্র পুনর্গঠন, সাংবিধানিক অধিকার, প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ এবং জাতীয় শিক্ষাদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রকল্প। পরবর্তী পর্যায়ে শিক্ষা গণসাক্ষরতা, উৎপাদনশীলতা, কৃষি, কর্মসংস্থান ও জাতীয় আত্মনির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত হয়। এরশাদ আমলে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, নারীশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটলেও শিক্ষা নীতির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নও সামনে আসে। নব্বইয়ের দশকে শিক্ষা সামাজিক সুরক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়—বিশেষত নারীশিক্ষা, উপবৃত্তি, খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা এবং দূরশিক্ষা সম্প্রসারণের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল প্রশাসন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্রীয় ভাষা হয়ে ওঠে। অর্থাৎ বিভিন্ন সরকারের অগ্রাধিকার ভিন্ন হলেও, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে একাধিক শাসনামলের উদ্যোগের ওপর স্তরে স্তরে নির্মিত হয়েছে। দলিলটিও যথার্থভাবে দেখিয়েছে যে, প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ থেকে নারী উপবৃত্তি, বাধ্যতামূলক শিক্ষা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ডিজিটাল শিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম—সব মিলিয়ে এটি একটি দীর্ঘ নীতিগত বিবর্তনের ইতিহাস।

তবে শাসনামলগুলোর মধ্যে যত পার্থক্যই থাকুক, তাদের মধ্যে কয়েকটি গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। প্রথমত, অধিকাংশ সরকার শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিদ্যালয় জাতীয়করণ, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, উপবৃত্তি, দূরশিক্ষা, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল সুবিধা—সবই শিক্ষার দরজা আরও বেশি মানুষের জন্য উন্মুক্ত করেছে। দ্বিতীয়ত, প্রায় প্রতিটি সরকারই শিক্ষাকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবসম্পদ তৈরির সঙ্গে যুক্ত করেছে; পার্থক্য শুধু ভাষায়—কখনো উৎপাদনমুখী শিক্ষা, কখনো কর্মমুখী শিক্ষা, কখনো দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, আবার কখনো চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী মানবসম্পদ। তৃতীয়ত, নারী শিক্ষার অগ্রগতি কোনো একক সরকারের অর্জন নয়; প্রাথমিক নীতিগত সূচনা, অবৈতনিক শিক্ষা, উপবৃত্তি সম্প্রসারণ এবং ধারাবাহিক সামাজিক বিনিয়োগের সম্মিলিত ফলেই বাংলাদেশ লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে পৌঁছেছে। চতুর্থত, প্রত্যেক সরকারই পূর্ববর্তী শাসনের অন্তত কিছু উদ্যোগকে নতুন নামে, নতুন প্রকল্পে বা সম্প্রসারিত কাঠামোয় অব্যাহত রেখেছে—যদিও রাজনৈতিক ভাষ্যে সেই ধারাবাহিকতা প্রায়ই স্বীকার করা হয়নি।

অসাদৃশ্যগুলোও সমান তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গবন্ধুর সময়ে শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্র ছিল রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা, জাতীয়করণ এবং স্বাধীন দেশের শিক্ষাদর্শ নির্মাণ। জিয়াউর রহমানের সময়ে শিক্ষা অধিকতর উৎপাদন, গ্রামীণ উন্নয়ন, গণসাক্ষরতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার সঙ্গে যুক্ত হয়। এরশাদ আমলে আইনি বাধ্যবাধকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্প্রসারণের পাশাপাশি শিক্ষা নীতির বৈধতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন সামনে আসে। খালেদা জিয়ার শাসনামলে শিক্ষা সংস্কারের বিশেষত্ব ছিল অর্থনৈতিক প্রণোদনা, নারী শিক্ষা, দরিদ্র পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি খাতের প্রবেশ। শেখ হাসিনার বিভিন্ন মেয়াদে শিক্ষা সম্প্রসারণের সঙ্গে প্রযুক্তি, জাতীয় শিক্ষানীতি, ডিজিটাল প্রশাসন, অন্তর্ভুক্তি, গবেষণার অবকাঠামো এবং শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের বৃহৎ প্রকল্প যুক্ত হয়। অন্তর্বর্তী পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের তুলনায় পুনর্মূল্যায়ন, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা ও সংকট ব্যবস্থাপনা বেশি দৃশ্যমান ছিল বলে দলিলে প্রতীয়মান হয়েছে। বর্তমান সরকারের ঘোষণায় প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষা ও কারিগরি আধুনিকায়নের প্রত্যাশা দেখা গেলেও তার বাস্তব ও ঐতিহাসিক মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট সময় এখনো অতিক্রান্ত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় সত্য সাফল্যের তালিকায় নয়; অনুপস্থিতির তালিকায় আমাদের সংস্কারের সবচেয়ে বড় শূন্যতা হলো—

  • প্রথমত. প্রায় প্রতিটি সরকার শিক্ষার্থী নিয়ে কথা বলেছে, কিন্তু শিক্ষককে সংস্কারের কেন্দ্রে স্থাপন করেনি। শিক্ষক নিয়োগ, পেশাগত মানদণ্ড, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, গবেষণাভিত্তিক পেশাগত উন্নয়ন, ন্যায্য পদোন্নতি, কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদাকে একত্র করে কোনো স্থায়ী জাতীয় শিক্ষকনীতি কার্যকর করা যায়নি। পাঠ্যক্রম বারবার পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক সেই পরিবর্তনের জন্য সময়, প্রশিক্ষণ, উপকরণ ও পেশাগত সহায়তা পাননি। ফলে শিক্ষাক্রম আধুনিক হয়েছে কাগজে, কিন্তু পাঠদান বহু ক্ষেত্রে পুরোনো অভ্যাসেই আটকে থেকেছে।
  • দ্বিতীয় বড় শূন্যতা হলো প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণের অভাব। বাংলাদেশে শিক্ষা কমিশনের অভাব নেই, নীতিমালারও অভাব নেই; অভাব হলো পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন, স্বাধীন মূল্যায়ন, ফলাফলের প্রকাশ এবং ব্যর্থ নীতি সংশোধনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি। কোনো শিক্ষাক্রম চালুর আগে পর্যাপ্ত পাইলট, শিক্ষক প্রস্তুতি, বিদ্যালয়ের সক্ষমতা যাচাই ও সামাজিক সংলাপ প্রয়োজন; কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই প্রথমে জাতীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পরে সমস্যা দেখা দিলে সংশোধন শুরু হয়। এই উল্টো প্রক্রিয়া শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরীক্ষাগারে এবং শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার উপাদানে পরিণত করে।
  • তৃতীয়ত, প্রবেশাধিকার ও মানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ব্যবধান রয়ে গেছে। বাংলাদেশ শিক্ষার্থী ভর্তি, বই বিতরণ, উপবৃত্তি, বিদ্যালয় নির্মাণ ও পরীক্ষার্থী বৃদ্ধিতে সাফল্য দেখিয়েছে; কিন্তু একটি শিশু বিদ্যালয়ে আছে মানেই সে শিখছে—এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। শিখনঘাটতি, ভাষা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা নিয়ে ধারাবাহিক জাতীয় সংকট রয়েছে। আমাদের শিক্ষা প্রশাসন এখনো অনেক সময় উপস্থিতি, পরীক্ষার ফল, পাসের হার ও অবকাঠামোকে সাফল্যের সূচক হিসেবে দেখে; প্রকৃত শিখনফল, মানসিক বিকাশ ও নাগরিক সক্ষমতাকে নয়।
  • চতুর্থ শূন্যতা হলো মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা। একদিকে পরীক্ষানির্ভর শিক্ষা কমানোর কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে পরীক্ষার ফলই এখনো সামাজিক মর্যাদা, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ এবং কর্মসংস্থানের প্রধান দরজা। কখনো অটোপাস, কখনো অতিরিক্ত নম্বরকেন্দ্রিকতা, কখনো অস্বাভাবিক পাসের হার, কখনো প্রস্তুতিহীন মূল্যায়ন সংস্কার—এসব সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের কাছে একটি বিপজ্জনক বার্তা পাঠায়: শেখার চেয়ে ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে নৈতিকতা, পরিশ্রম, একাডেমিক সততা এবং মূল্যায়নের ওপর সামাজিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • পঞ্চমত, শিক্ষা প্রশাসনকে পেশাগত নেতৃত্বের পরিবর্তে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক ও প্রকল্পনির্ভর রাখা হয়েছে। বড় প্রকল্প এসেছে, বিদেশি অর্থায়ন এসেছে, প্রযুক্তি এসেছে, প্রশিক্ষণ হয়েছে; কিন্তু প্রকল্প শেষ হলে কতটুকু পরিবর্তন স্থায়ী হয়েছে, সেই প্রশ্ন প্রায়ই অনুত্তরিত। শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, শিক্ষা গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে নীতিনির্ধারণের সহ-নেতা না বানিয়ে প্রশাসনিক নির্দেশের গ্রহীতা হিসেবে রাখা হয়েছে। ফলে সংস্কারের মালিকানা মাঠপর্যায়ে তৈরি হয়নি।
  • ষষ্ঠত, বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার এখনো কটি বিভক্ত ব্যবস্থাকে একটি অভিন্ন জাতীয় মানের অধীনে আনতে পারেনি। সাধারণ, মাদ্রাসা, ইংরেজি মাধ্যম, কারিগরি এবং বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঠ্যক্রম, শিক্ষকমান, শিক্ষাব্যয়, সুযোগ ও ফলাফলে গভীর বৈষম্য রয়েছে। শহর ও গ্রাম, ধনী ও দরিদ্র, মূলধারা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ও অপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতাও এক নয়। একই দেশের শিশুরা যেন ভিন্ন ভিন্ন মানের রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে বেড়ে উঠছে।
  • সপ্তমত, উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটেছে, কিন্তু জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতা সমানতালে বাড়েনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা, বিভাগ ও শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পেলেও গবেষণা বাজেট, গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, গবেষণা নৈতিকতা, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং শিল্প–বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা এখনো দুর্বল। উচ্চশিক্ষাকে ডিগ্রি প্রদানকারী ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ রেখে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি নির্মাণ সম্ভব নয়।
  • অষ্টমত, প্রায় সব শাসনামলই সংস্কারের কথা বলেছে, কিন্তু শিক্ষাকে দলীয় পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে একটি জাতীয় চুক্তিতে রূপ দিতে পারেনি। সরকার বদলালে পাঠ্যক্রম, ইতিহাসের ভাষ্য, প্রশাসনিক অগ্রাধিকার, প্রতিষ্ঠানপ্রধান এবং নীতির ব্যাখ্যা বদলে যায়। ফলে শিক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, অনেক সময় রাজনৈতিক মেয়াদভিত্তিক প্রকল্প হিসেবে পরিচালিত হয়। এটাই বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে গভীর কাঠামোগত অসুখ।

অতএব, বিস্ফোরক হলেও সত্য কথাটি হলো—বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের অভাব নেই; অভাব আছে সংস্কারকে টেকসই, প্রমাণভিত্তিক, শিক্ষকনেতৃত্বাধীন এবং রাজনৈতিক পালাবদলের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার। আমরা বিদ্যালয় বাড়িয়েছি, কিন্তু সব বিদ্যালয়ে শেখা নিশ্চিত করিনি; বই দিয়েছি, কিন্তু পাঠাভ্যাস তৈরি করিনি; প্রযুক্তি দিয়েছি, কিন্তু শিক্ষণ-পদ্ধতি রূপান্তর করিনি; বিশ্ববিদ্যালয় বাড়িয়েছি, কিন্তু গবেষণার সংস্কৃতি গড়িনি; পরীক্ষা বদলেছি, কিন্তু মূল্যায়নের ওপর আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি; নীতি লিখেছি, কিন্তু বাস্তবায়নের ধারাবাহিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করিনি।

ইতিহাসের সামগ্রিক রায় তাই দ্বিমুখী। বাংলাদেশের প্রতিটি শাসনামল শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইট স্থাপন করেছে; কিন্তু কেউই এখনো সম্পূর্ণ স্থাপত্য নির্মাণ করতে পারেনি। এক সরকার ভিত্তি দিয়েছে, আরেক সরকার প্রবেশাধিকার বাড়িয়েছে, কেউ নারীশিক্ষায় বিপ্লব ঘটিয়েছে, কেউ প্রযুক্তি ও উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ করেছে, কেউ নতুন শিক্ষাক্রমের সাহসী চেষ্টা করেছে। কিন্তু এই বিচ্ছিন্ন অর্জনগুলোকে একটি অভিন্ন, স্থিতিশীল ও মানসম্পন্ন জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। বাংলাদেশের আগামী শিক্ষা সংস্কারের মূল প্রশ্ন তাই আর কোন সরকার কী করেছে?” নয়; বরং—রাষ্ট্র কি এবার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণ করবে, যা সরকার বদলালেও দিক হারাবে না?”

সার্বিক আমলনামাপঞ্চান্ন বছরে বাংলাদেশের শিক্ষা সার্বিক উন্নয়নের আমূল বদল: অর্জনের মহাকাব্য, নাকি নতুন চ্যালেঞ্জের সূচনা?

স্বাধীনতা থেকে বর্তমান পর্যন্ত (১৯৭১-২০২৬) বিভিন্ন সূচকে পরিসাংখ্যিক পর্যালোচনা করলে একবারেই হতাশ হতে হয় না। কেননা এই সময়কালে বাংলাদেশের বিশেষ করে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে অনেক অর্জন রয়েছে।  নিবন্ধের এই অংশটি  বাংলাদেশের জনসংখ্যা, শিক্ষা এবং আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির একটি দীর্ঘমেয়াদি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে — স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭১ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য পর্যন্ত। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার: শিক্ষাসংক্রান্ত অধিকাংশ সূচকের জন্য প্রকৃত অর্থে "২০২৬ সালের তথ্য" এখনো পাওয়া যায় না। প্রশাসনিক ও আন্তর্জাতিক উপাত্তভাণ্ডারগুলো সাধারণত এক থেকে তিন বছরের বিলম্বে প্রকাশিত হয়। তাই এই প্রতিবেদনে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যানকেই ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রতিটি তথ্যের প্রকৃত সময়কাল স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় — নিট ভর্তির হার, ধারাবাহিকতা, সমাপনী হার, ঝরে পড়ার হার, লিঙ্গসমতা সূচক কিংবা মডেল-নির্ভর বেকারত্বের হারের মতো অনেক আধুনিক সূচক ১৯৭১ সালে জাতীয় পর্যায়ে তুলনাযোগ্যভাবে পরিমাপই করা হয়নি। এসব ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত নিকটতম পুরনো তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে; অন্যথায় স্পষ্টভাবে লেখা হয়েছে যে তুলনাযোগ্য ভিত্তি-তথ্য "পাওয়া যায় না" — কোনো কাল্পনিক সংখ্যা বসানো হয়নি।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তির প্রাক্কালে বাংলাদেশের শিক্ষা ও সামগ্রিক উন্নয়নের দিকে ফিরে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এটি কেবল পরিসংখ্যানের পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত, দারিদ্র্যপীড়িত রাষ্ট্র থেকে মানবসম্পদনির্ভর উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে উত্তরণের ইতিহাস। ১৯৭১ সালে যেখানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৯ লাখ, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লাখে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ দশকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে অতিরিক্ত প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ মানুষের জন্য সম্প্রসারণ করতে হয়েছে। এই বিপুল জনসংখ্যাগত চাপ সত্ত্বেও শিক্ষা, সাক্ষরতা, নারীর অংশগ্রহণ, উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ এবং দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন গবেষণায় একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।  

স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১৭.৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে চারজনই পড়তে বা লিখতে পারতেন না। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০২২ সালে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯ শতাংশে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, নারীদের সাক্ষরতার হার, যা স্বাধীনতার শুরুর দিকে আনুমানিক ১০–১৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, বর্তমানে ৭৬.৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে— যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক।এটি কেবল শিক্ষা বিস্তারের নয়; বরং নারী শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সম্মিলিত সাফল্যের প্রতিফলন। আর এই অগ্রগতির পেছনে কাজ করেছে বিদ্যালয়ে ভর্তির সম্প্রসারণ, মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি কর্মসূচি, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি, জন্মহার হ্রাস, পরিবারের প্রত্যাশার পরিবর্তন, এবং সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি।

প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অগ্রগতি অভূতপূর্ব। স্বাধীনতার পর যেখানে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াই ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে নিট ভর্তি হার ৯৭–৯৮ শতাংশের কাছাকাছি। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হারও ১৯৯০ সালের ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশে বিদ্যালয়ে শিশুদের প্রবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। তবে এই সাফল্যের মধ্যেও একটি বাস্তবতা রয়ে গেছে—এখনও প্রতি দশজন শিশুর মধ্যে প্রায় একজন সময়মতো প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে না। পরিসংখ্যান প্রাথমিক শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখানোর পরেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে:

১. শিশুরা যেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়ে থেকে যায়;
২. তারা যেন মৌলিক পঠন ও গণিত দক্ষতা অর্জন করে;
৩. তারা যেন সফলভাবে মাধ্যমিক শিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়; এবং
৪. দারিদ্র্য, প্রতিবন্ধকতা, কর্মসংস্থান, অভিবাসন, জলবায়ু-জনিত বিপর্যয় কিংবা বাল্যবিবাহের কারণে যেন তারা বিদ্যালয় ত্যাগ না করে।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাথমিক সমাপনী হার ১৯৯০ সালের চৌত্রিশ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে নব্বই শতাংশে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বিশাল অগ্রগতি, তবে এর অর্থ এটাও যে প্রতি দশজন শিশুর মধ্যে প্রায় একজন এখনও যথাসময়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করতে পারছে না।

উপরের ধরন থেকে বোঝা যায়, নীতিনির্ধারণে এখন আর নিছক প্রাথমিক ভর্তি বাড়ানোর প্রচারণার ওপর জোর না দিয়ে বরং কৈশোরকালীন সময়ে ঝরে পড়ার কারণগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে এমন কিছু পদক্ষেপ হলো — লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা ও উপবৃত্তি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নিরাপদ যাতায়াত ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা, প্রতিকারমূলক শিক্ষা সহায়তা, ক্যারিয়ার পরামর্শ, কর্মজীবী শিক্ষার্থীদের জন্য নমনীয় শিক্ষাপথ, এবং প্রকৃত শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সংযুক্ত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা।

উপাত্ত থেকে একটি স্পষ্ট যে চিত্র সামনে আসে তা হলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান সংকটবিন্দু হিসেবে এখনো অবস্থান করছে মাধ্যমিক শিক্ষা। যদিও প্রাথমিক স্তরে ভর্তি প্রায় সর্বজনীন হয়ে গেছে। প্রাথমিক সমাপনী হারও যথেষ্ট উঁচু। কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে নিট ভর্তির হার তুলনামূলকভাবে কম, প্রায় সত্তর থেকে পঁচাত্তর শতাংশ। অপরদিকে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ধরে রাখার হার এবং সমাপনী হার আরও দুর্বল — সমাপনী হার আনুমানিক পঞ্চাশ থেকে ষাট শতাংশের মধ্যে। সবচেয়ে আশংকার বিষয় হলো, উচ্চশিক্ষায় উত্তরণ আরও সীমিত; উচ্চশিক্ষায় মোট ভর্তির হার মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের তুলনায় অনেক কম।

শিক্ষার পরিমাণগত সম্প্রসারণের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাধীনতার সময় দেশে ছিল মাত্র ছয়টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৭০-এরও বেশি। একইভাবে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিস্তার বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভৌগোলিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনেক বেশি বিস্তৃত করেছে। তবে এই সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রশ্নও সামনে এসেছে—গুণগত মান, গবেষণার সক্ষমতা, দক্ষ শিক্ষক, সুশাসন এবং আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা। এই সম্প্রসারণের পাশাপাশি এখন নীতিনির্ধারণী চ্যালেঞ্জ হলো মান নিশ্চিতকরণ — শিক্ষকদের সক্ষমতা, গবেষণার মান, স্নাতকদের কর্মসংস্থানযোগ্যতা, স্বীকৃতি প্রক্রিয়া, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, এবং গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সমতাভিত্তিক প্রবেশাধিকার।

বাংলাদেশের আরেকটি অসাধারণ সাফল্য হলো শিক্ষায় লিঙ্গসমতা অর্জন। একসময় বিদ্যালয়ে মেয়েদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলে ও মেয়েদের অংশগ্রহণ প্রায় সমান, আর মাধ্যমিক পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েদের অংশগ্রহণ ছেলেদের সমপর্যায়ে বা তারও বেশি। নারী শিক্ষায় উপবৃত্তি কর্মসূচি, সামাজিক সচেতনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বিনিয়োগ এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। তবে শুধু ভর্তি হার বৃদ্ধি মানেই প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমনটি বলা যায় না। বিদ্যালয়ে নিরাপত্তা, শিক্ষার মান, উচ্চশিক্ষায় অগ্রগতি এবং শ্রমবাজারে সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভর্তির ক্ষেত্রে সমতা অর্জনকেই সম্পূর্ণ লিঙ্গসমতা বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। এখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায় — মেয়েরা কি ছেলেদের সমান হারে বিদ্যালয় সম্পূর্ণ করছে? তারা কি একই মানের শিক্ষা লাভ করছে? বিদ্যালয়ে এবং যাতায়াতের সময় তারা কি নিরাপদ? মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্তি কি তাদের উচ্চশিক্ষা ও শোভন কর্মসংস্থানে নিয়ে যাচ্ছে? বাল্যবিবাহ ও বিনা পারিশ্রমিকের গৃহস্থালি কাজ তাদের সুযোগকে কতটা সীমিত করছে?

তবে এই দীর্ঘ অগ্রযাত্রার মধ্যেও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট আজ আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি নয়; বরং মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে সফল রূপান্তর নিশ্চিত করা। তথ্য বলছে, প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তি প্রায় সর্বজনীন হলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে নিট ভর্তি হার নেমে আসে প্রায় ৭০–৭৫ শতাংশে, আর সম্পূর্ণ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করতে পারে মাত্র ৫০–৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, নিরাপত্তাহীনতা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক চাপ এবং শিক্ষার সঙ্গে শ্রমবাজারের দুর্বল সংযোগ—এসব কারণ এখনও শিক্ষাব্যবস্থার বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে রয়ে গেছে।

অন্যদিকে শিক্ষা ব্যবস্থার এই বিশাল সম্প্রসারণের তুলনায় সরকারি বিনিয়োগ এখনও সীমিত। পরিসংখ্যানিক তুলনামূলক বিশ্লেষণে স্পষ্টত দেখা যায়, নিম্ন শিক্ষা ব্যয় সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। ২০২৪ সালে শিক্ষাখাতে সরকারি ব্যয় ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) মাত্র ২.০৩ শতাংশ, যা একটি বৃহৎ শিক্ষার্থী জনগোষ্ঠী, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, শিক্ষক উন্নয়ন, ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণ এবং উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত নয়। ফলে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং প্রতিটি টাকার কার্যকর ব্যবহার, জবাবদিহিতা, শিক্ষক সহায়তা, শিক্ষার্থীর শেখার ফলাফল এবং প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। যদিও সঠিক লক্ষ্যমাত্রা রাজস্ব পরিস্থিতি ও কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করে, তবুও এই মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম বলে বিবেচিত হয়, বিশেষত যখন দেশকে একইসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে —

  • অতি বৃহৎ শিক্ষার্থী জনগোষ্ঠী;
  • অবকাঠামো ও জলবায়ু-সহনশীলতার প্রয়োজন;
  • শিক্ষক প্রশিক্ষণের চাহিদা;
  • শিখন-ঘাটতি পূরণ;
  • ডিজিটাল প্রবেশাধিকারের ব্যবধান; এবং
  • কারিগরি ও উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ।

শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। অতিরিক্ত তহবিল যেন স্বচ্ছ বিদ্যালয়-পর্যায়ের বরাদ্দ, শিক্ষক সহায়তা, শিখন পরিমাপ, উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, অন্তর্ভুক্তি এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা কিশোর-কিশোরীদের জন্য প্রমাণ-ভিত্তিক কর্মসূচির সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করা দরকার।

কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যের প্রেক্ষাপট (যার সাথে শিক্ষার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে) পর্যালোচনায় দেথা যায়, ২০২৫ সালে মডেল-নির্ভর বেকারত্বের হার ছিল প্রায় তিন দশমিক সাত আট শতাংশ। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাকে শ্রমবাজারের শক্তিশালী অবস্থার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। যেসব অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাত বিশাল, সেখানে অধিকাংশ মানুষ পুরোপুরি বেকার থাকার সামর্থ্য রাখে না — বরং তারা স্বল্প-উৎপাদনশীল, অনিশ্চিত বা স্বল্প বেতনের কাজে নিয়োজিত হয়। দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে, ১৯৭১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সরাসরি শতাংশ-পয়েন্ট তুলনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন বিশ্লেষক একটি সুসংগত মানদণ্ড বেছে নেবেন — যেমন জাতীয় ঊর্ধ্ব দারিদ্র্যসীমা, জাতীয় নিম্ন দারিদ্র্যসীমা, অথবা বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক চরম দারিদ্র্যসীমা। সময়ের সঙ্গে দারিদ্র্যসীমা, ক্রয়ক্ষমতা সমতা রূপান্তর, জরিপ পদ্ধতি এবং জাতীয় হিসাব পদ্ধতি — সবকিছুই পরিবর্তিত হয়েছে। তবে মূল সিদ্ধান্তটি দৃঢ়: বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য হ্রাসে বড় সাফল্য অর্জন করেছে, যদিও ঝুঁকিপূর্ণতা এখনও যথেষ্ট রয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে পঞ্চান্ন বছরে বাংলাদেশের শিক্ষা ও সামগ্রিক উন্নয়নের গল্প নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ রূপান্তরের ইতিহাস। স্বাধীনতার পর যেখানে লক্ষ্য ছিল বিদ্যালয়ের দরজা খুলে দেওয়া, আজকের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি শিক্ষার্থীকে মানসম্মত শিক্ষা, জীবনদক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের উপযোগী মানবসম্পদে রূপান্তর করা। অর্থাৎ আগামী বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু আর কেবল Access নয়; বরং Quality, Equity, Learning Outcomes, Employability এবং Lifelong Learning। স্বাধীনতার প্রথম পঞ্চান্ন বছর ছিল শিক্ষার বিস্তারের যুগ; আগামী পঞ্চান্ন বছর হতে হবে শিক্ষার উৎকর্ষ, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার যুগ।

তুলনামূলক সারণি:
  স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশের শিক্ষা সার্বিক উন্নয়নের চিত্র (১৯৭১সর্বশেষ প্রাপ্য তথ্য, ২০২৬ পর্যন্ত)
 

সূচক

স্বাধীনতার সময় (১৯৭১ বা নিকটবর্তী বছর)

সর্বশেষ প্রাপ্য তথ্য (২০২২২০২৫)

পরিবর্তন বিশ্লেষণ

মোট জনসংখ্যা

৭.০৯ কোটি

১৭.৫৭ কোটি (২০২৫)

বৃদ্ধি প্রায় ১০.৪৮ কোটি (≈১৪৮%)

প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার (১৫+)

১৭.৬%

৭৯.০% (২০২২)

বৃদ্ধি ৬১.৪ শতাংশ পয়েন্ট

নারী সাক্ষরতার হার (১৫+)

আনুমানিক ১০–১৫%

৭৬.৫% (২০২২)

নারীর শিক্ষায় বৈপ্লবিক অগ্রগতি

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

৬টি

১৭০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় (সরকারি ও বেসরকারি)

উচ্চশিক্ষায় ব্যাপক সম্প্রসারণ

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

তুলনাযোগ্য তথ্য নেই

৬৫,০০০+

সারাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার

মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

তুলনাযোগ্য তথ্য নেই

২০,০০০+

মাধ্যমিক শিক্ষার উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ

কলেজ

তুলনাযোগ্য তথ্য নেই

৩,০০০+

উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক শিক্ষার বিস্তার

প্রাথমিক স্তরে নিট ভর্তি হার

তুলনাযোগ্য তথ্য নেই

৯৭–৯৮%

প্রাথমিক শিক্ষা এখন প্রায় সর্বজনীন

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার

তুলনাযোগ্য তথ্য নেই

প্রায় ৯০% (২০২৪)

১৯৯০ সালের ৩৪% থেকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি

প্রাথমিক ঝরে পড়ার হার

তুলনাযোগ্য তথ্য নেই

১০–১৫%

অতীতের তুলনায় কমলেও এখনও উদ্বেগজনক

প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে উত্তরণের হার

তুলনাযোগ্য তথ্য নেই

৯০%+

অধিকাংশ শিক্ষার্থী মাধ্যমিকে যাচ্ছে

মাধ্যমিকে নিট ভর্তি হার

তুলনাযোগ্য তথ্য নেই

৭০–৭৫%

প্রাথমিকের তুলনায় কম অংশগ্রহণ

মাধ্যমিক সমাপ্তির হার

তুলনাযোগ্য তথ্য নেই

৫০–৬০%

শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট

মাধ্যমিক ঝরে পড়া

তুলনাযোগ্য তথ্য নেই

তুলনামূলকভাবে উচ্চ

দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, পরীক্ষার চাপ প্রধান কারণ

প্রাথমিকে লিঙ্গ সমতা (GPI)

তুলনাযোগ্য তথ্য নেই

≈১.০

ছেলে-মেয়ের অংশগ্রহণ প্রায় সমান

মাধ্যমিকে লিঙ্গ সমতা (GPI)

তুলনাযোগ্য তথ্য নেই

≈১.১

মেয়েদের অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়ে বেশি

শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান

তুলনাযোগ্য তথ্য নেই

PTI, TTC ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক

শিক্ষক উন্নয়ন অবকাঠামো সম্প্রসারিত

সরকারি শিক্ষা ব্যয় (GDP-এর শতাংশ)

তুলনাযোগ্য তথ্য নেই

২.০৩% (২০২৪)

শিক্ষার চাহিদার তুলনায় এখনও কম

চরম দারিদ্র্য

উচ্চ (তুলনাযোগ্য আন্তর্জাতিক তথ্য নেই)

উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস

দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য কমেছে, তবে ঝুঁকি রয়ে গেছে

বেকারত্বের হার
তুলনাযোগ্য তথ্য নেই
৩.৭৮% (২০২৫, ILO মডেল)
অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থলের কারণে সতর্কতার সঙ্গে ব্যাখ্যা প্রয়োজন
 
বি.দ্র. উপাত্তের মান সংক্রান্ত সতর্কতা

১. "২০২৬" বলতে বোঝানো হয়েছে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য, কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়। বেশিরভাগ শিক্ষা-সূচক আসলে ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ হয়।

২. প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সংজ্ঞার ওপর নির্ভরশীল — কোনো গণনায় মাদ্রাসা, কারিগরি, এনজিও, বেসরকারি, সংযুক্ত বা নতুন স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত বা বাদ থাকতে পারে।

৩. ১৯৭১ সালের শিক্ষা-সূচকগুলো আজকের প্রমিত সংজ্ঞা অনুযায়ী সংগৃহীত হয়নি। তাই তুলনাযোগ্য ভিত্তি-তথ্য না থাকা সূচকের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পরিবর্তনের হিসাব করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

৪. কম বেকারত্বের হার কর্মসংস্থানের মান নির্দেশ করে না। এর পরিপূরক হিসেবে যুব বেকারত্ব, অনিয়মিত কর্মসংস্থান, অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োগ, প্রকৃত মজুরি এবং শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-কর্মসংস্থান বহির্ভূত তরুণদের (এনইইটি) হার বিবেচনা করা প্রয়োজন।

৫. লিঙ্গসমতা সমান ফলাফলের প্রমাণ নয়। সমাপনী হার, শিখন মান, নিরাপত্তা, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার এবং শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ — এসব পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা উচিত।

মূল বার্তা (Key Takeaways)

  • জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় . গুণ, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সম্প্রসারিত হয়েছে।
  • সাক্ষরতার হার ১৭.৬% থেকে ৭৯%-এ পৌঁছেছে—স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় সামাজিক অর্জন।
  • নারী শিক্ষা বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে সফল রূপান্তরগুলোর একটি।
  • প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকার এখন প্রায় সর্বজনীন।
  • মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়া এখনও সবচেয়ে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ।
  • বিশ্ববিদ্যালয় ৬টি থেকে ১৭০টিরও বেশি হওয়া উচ্চশিক্ষার বিস্তৃত প্রবেশাধিকার নির্দেশ করে, যদিও গুণগত মান নিশ্চিত করা এখন প্রধান অগ্রাধিকার।
  • শিক্ষায় সরকারি ব্যয় এখনও তুলনামূলকভাবে কম, যা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় সীমাবদ্ধতা।

উপরের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন-কাহিনি মূলত সাক্ষরতা, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকার, মেয়েদের অংশগ্রহণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং দারিদ্র্য হ্রাসের এক ব্যাপক সম্প্রসারণের গল্প। উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে শিখনের মান, কিশোর-কিশোরীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্তি, কর্মমুখী দক্ষতা, শিক্ষক উন্নয়ন এবং আরও শক্তিশালী শিক্ষা অর্থায়নের ওপর। সার্বিক বিবেচনা করলে বলা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ একটি বড় ধরনের কাঠামোগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। দেশের জনসংখ্যা ১৯৭১ সালের প্রায় সাত কোটি ৯ লাখ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লাখে — অর্থাৎ প্রায় দশ কোটি পাঁচ লাখ মানুষের সংযোজন। এই বিপুল জনসংখ্যাগত চাপ সত্ত্বেও দেশের সামাজিক অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার স্বাধীনতার সময় ছিল মাত্র আঠারো শতাংশের কাছাকাছি, যা ২০২২ সালে পৌঁছেছে প্রায় ঊনআশি শতাংশে। এর মধ্যে নারী সাক্ষরতার উন্নতি বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো, যদিও নারী-পুরুষের মধ্যে সাক্ষরতার ব্যবধান এখনও পুরোপুরি ঘোচেনি। প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকার এখন প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এবং সাম্প্রতিক সময়ে প্রাথমিক সমাপনী হার দাঁড়িয়েছে প্রায় নব্বই শতাংশে। বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের মধ্যে সমতা মোটামুটিভাবে অর্জিত হয়েছে — বরং অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ ছেলেদের সমান বা তার চেয়েও বেশি। তবে শিক্ষাব্যবস্থার মূল সমস্যা আর নিছক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশাধিকার নয়। এখনকার আসল চ্যালেঞ্জ হলো — শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা, শিক্ষার মান, মাধ্যমিক স্তরে উত্তরণ, এবং শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে যাওয়ার পথের সামঞ্জস্য। এদিকে সরকারি শিক্ষা ব্যয় এখনও তুলনামূলকভাবে কম — ২০২৪ সালে জিডিপির মাত্র প্রায় দুই শতাংশ — যদিও শিক্ষাব্যবস্থাকে আগের চেয়ে অনেক বড় জনগোষ্ঠীর সেবা দিতে হচ্ছে। চরম দারিদ্র্যও দীর্ঘমেয়াদে ব্যাপকভাবে কমেছে, যদিও সরাসরি তুলনা করতে হলে দারিদ্র্যসীমা ও জরিপ পদ্ধতির ধারাবাহিকতা বিবেচনায় রাখতে হবে।

শেষ কথা চূড়ান্ত প্রতিফলন :আগামীর শিক্ষা সংস্কারের নতুন দিগন্ত

শিক্ষা সংস্কার এখন কেবল পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি শিক্ষক শিক্ষা, শিক্ষা প্রশাসন, গবেষণা, প্রযুক্তি, অন্তর্ভুক্তি, জলবায়ু সহনশীলতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ দক্ষতার সমন্বিত রূপান্তরের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক একটি বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরে—শিক্ষা সংস্কার কোনো এককালীন ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান জাতীয় যাত্রা। আগামী দিনের শিক্ষা হবে কেবল বিদ্যালয় বা পরীক্ষাকেন্দ্রিক নয়; বরং গবেষণাভিত্তিক, তথ্যনির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জলবায়ু-সহনশীল, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ এবং মানবিক মূল্যবোধনির্ভর। এই নতুন পর্যায়ে সফল হতে হলে নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি প্রয়োজন শক্তিশালী বাস্তবায়ন, স্বাধীন শিক্ষা গবেষণা, শিক্ষাবিদদের নেতৃত্ব এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের সংস্কৃতি। তাহলেই স্বাধীনতার স্বপ্ন অনুযায়ী এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যা কেবল দক্ষ জনশক্তিই নয়, চিন্তাশীল, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিকও গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—প্রতিটি বড় সংস্কারপর্ব তিনটি স্বাভাবিক ধাপ অতিক্রম করে:

  • স্তম্ভ-০১: উদ্ভাবন (Innovation),
  • স্তম্ভ-০২: বিতর্ক ও অভিযোজন (Contestation and Adaptation), এবং
  • স্তম্ভ-০৩: প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (Institutionalisation)

নেতিবাচকতাকে দূরো সরিয়ে এই নিবন্ধে শিক্ষা সংস্কার প্রক্রিয়াকে অধিকতর কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও গবেষণানির্ভর পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। যে কারণে  এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতের সফল শিক্ষা সংস্কার নির্ভর করবে নীতির ধারাবাহিকতা, শক্তিশালী গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শিক্ষকদের পেশাগত নেতৃত্ব এবং অংশীজনভিত্তিক অংশগ্রহণমূলক বাস্তবায়নের ওপর।

বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—কোনো সরকার একা একটি জাতির শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে না। শিক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ, যার ফল এক সরকারের মেয়াদে নয়; বরং বহু দশকের ধারাবাহিক নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, শিক্ষকসমাজের অবদান, শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায় এবং জনগণের প্রত্যাশার সমন্বয়ে দৃশ্যমান হয়।

বঙ্গবন্ধুর প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গণসাক্ষরতা ও শিক্ষক কল্যাণ উদ্যোগ, রাষ্ট্রপতি এরশাদের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার আইনি ভিত্তি, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নারী শিক্ষা ও উপবৃত্তিভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতীয় শিক্ষানীতি, ডিজিটাল শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক সম্প্রসারণ—প্রতিটি সময়ের ইতিবাচক উদ্যোগ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে ভূমিকা রেখেছে। আবার সাম্প্রতিক শিক্ষা সংস্কার নিয়ে জাতীয় বিতর্কও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শিক্ষা সংস্কার কেবল একটি নীতিপত্র প্রকাশের বিষয় নয়; এটি শিক্ষক প্রস্তুতি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, গবেষণা, পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল একটি জটিল প্রক্রিয়া।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নীতির ধারাবাহিকতা, প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং শিক্ষা নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য। শিক্ষা যেন আর সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বারবার দিক পরিবর্তন না করে; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রদর্শনের ভিত্তিতে এগিয়ে যায়। কারণ সরকার আসে, সরকার যায়—কিন্তু শিক্ষা একটি জাতির শতবর্ষের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। অতএব, বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—শিক্ষা কোনো দলের নয়; শিক্ষা জাতির। শিক্ষা কোনো সরকারের সম্পত্তি নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অঙ্গীকার।

সমাপনী বক্তব্য: সমালোচনা থাকুক, তবে অর্জনের ইতিহাসও যেন বিস্মৃত না হয়

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিখুঁত নয়। এখনও আমাদের সামনে রয়েছে শিক্ষার গুণগত মান, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা, শিক্ষায় বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ, শিক্ষক উন্নয়ন এবং শিক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মতো অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। সমালোচনার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। কিন্তু তাই বলে কি আমরা বলব—বাংলাদেশের শিক্ষায় কিছুই হয়নি?

ইতিহাস তার জবাব দেয় দৃঢ় কণ্ঠে—অনেক কিছুই হয়েছে।

যে দেশ স্বাধীনতার সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত ছিল, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১৭–১৮ শতাংশ, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল হাতে গোনা, যেখানে বিদ্যালয়ে যাওয়া ছিল লাখো শিশুর কাছে এক বিলাসিতা, সেই দেশ আজ প্রায় সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষায় পৌঁছেছে, নারী শিক্ষায় বিশ্বে এক অনুকরণীয় উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, উচ্চশিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষাকে রাষ্ট্রের নীতির অংশ করেছে এবং জ্ঞানভিত্তিক মানবসম্পদ গঠনের দীর্ঘ যাত্রায় একটি নতুন ভিত্তি নির্মাণ করেছে। এই অর্জনগুলো কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; এগুলো পঞ্চান্ন বছরের নিরন্তর প্রচেষ্টা, লক্ষ শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নীতিনির্ধারক এবং কোটি মানুষের সম্মিলিত শ্রমের ফসল।

এই নিবন্ধে তাই আমি কেবল সমস্যার ইতিহাস লিখতে চাইনি; লিখতে চেয়েছি অর্জনেরও ইতিহাস। কারণ, যে জাতি নিজের সাফল্যকে চিনতে শেখে না, সে ভবিষ্যতের সাফল্যের পথও খুঁজে পায় না। আবার যে জাতি নিজের ভুল স্বীকার করে না, সে কখনোই উন্নতির নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে না। আমাদের প্রয়োজন এই দুইয়ের সমন্বয়—আত্মসমালোচনার সাহস এবং অর্জনের প্রতি ন্যায়বিচার।

আর যারা নিরন্তর সমালোচনা করেন—তাঁদের প্রতিও আমার অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। কারণ, গঠনমূলক সমালোচনা না থাকলে উন্নতির পথও অনেক সময় অদৃশ্য হয়ে যায়। সমালোচকেরা আমাদের আত্মতুষ্ট হতে দেন না; তাঁরা আমাদের আরও ভালো করার তাগিদ দেন। তাই তাঁদের প্রতি কোনো ক্ষোভ নয়, বরং কৃতজ্ঞতাই থাকা উচিত। কবি গুরু যেমন লিখেছেন—

"নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো,
যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো।
সবাই মোরে ছাড়তে পারে, বন্ধু যারা আছে,
নিন্দুক সে ছায়ার মতো থাকবে পাছে পাছে।
 
বিশ্বজনে নিঃস্ব করে পবিত্রতা আনে,
নিন্দুক সে জাগিয়ে রাখে আমারও অভিমান।
সত্যের সে ডাইনে বাঁয়ে রাখে সতর্কতায়,
নিন্দুকের দয়ায় আমি চলি আপন পথে সোজায়।"

তাই আসুন, বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসকে আমরা কেবল ব্যর্থতার চশমা দিয়ে না দেখি। সমালোচনা অবশ্যই করব, প্রশ্নও করব, জবাবদিহিতাও চাইব; কিন্তু একই সঙ্গে পঞ্চান্ন বছরের অর্জনকে সম্মান জানাব, যাঁরা এই পথ নির্মাণ করেছেন তাঁদের অবদানকে স্বীকৃতি দেব এবং সফল নীতিগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য আরও ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, গবেষণানির্ভর ও বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলব। কারণ ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা হলো—অতীতকে অস্বীকার করে নয়, অতীতের অর্জন ও সীমাবদ্ধতা উভয়কেই বুঝে ভবিষ্যতের পথ নির্মাণ করা।

অধ্যাপক . মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#বাংলাদেশ, #শিক্ষা_সংস্কার, #বাংলাদেশের_শিক্ষা, #EducationReform, #BangladeshEducation, #জাতীয়_শিক্ষানীতি, #শিক্ষার_ইতিহাস, #EducationPolicy, #শিক্ষা_উন্নয়ন, #PrimaryEducation, #HigherEducation, #DigitalEducation, #InclusiveEducation, #GirlsEducation, #TechnicalEducation, #EducationForAll, #Vision2041, #PublicPolicy, #HumanDevelopment, #অধিকারপত্র, #শিক্ষা_বিশ্লেষণ, #EvidenceBasedPolicy, #BangladeshHistory, #NationBuilding, #EducationLeadership



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: