অধিকারপত্র ডটকমে, বিনোদন ডেক্স:
মুক্তির পর নানি অভিনীত ‘দ্য প্যারাডাইস’ নিয়ে দর্শক-সমালোচকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র আলোচনা। অভিনয়, নির্মাণ ও অ্যাকশন দৃশ্যের প্রশংসার পাশাপাশি গল্পের দুর্বলতা, অতিরিক্ত সহিংসতা এবং নারী চরিত্রের উপস্থাপনাকে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
দক্ষিণ ভারতের বহুল আলোচিত সিনেমা ‘দ্য প্যারাডাইস’ মুক্তির আগে থেকেই দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছিল। ‘দশরা’ সিনেমার সাফল্যের পর অভিনেতা নানি ও পরিচালক শ্রীকান্ত ওডেলার পুনর্মিলন, ১৯৮০-এর দশকের সেকেন্দ্রাবাদের প্রেক্ষাপট, প্রান্তিক একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও অধিকার ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম, বড় পরিসরের অ্যাকশন এবং অনিরুদ্ধ রবিচন্দরের সংগীত—সব মিলিয়ে সিনেমাটি নিয়ে প্রত্যাশা ছিল বেশ উঁচু।
২৪ সেপ্টেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর সেই প্রত্যাশার সঙ্গে দর্শক-সমালোচকদের প্রতিক্রিয়ায় অবশ্য পার্থক্য দেখা যায়। নানির অভিনয়, সিনেমাটোগ্রাফি, আবহ ও অ্যাকশন দৃশ্যের প্রশংসা করেছেন অনেকে। অন্যদিকে গল্প বলার ধরন, অতিরিক্ত সহিংসতা, দ্বিতীয়ার্ধের দুর্বলতা এবং নারী চরিত্রের উপস্থাপনাকে ঘিরে সমালোচনাও হয়েছে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর গল্প থেকে সহিংসতার বিতর্ক
‘দ্য প্যারাডাইস’-এর গল্প ১৯৮০-এর দশকের সেকেন্দ্রাবাদে বসবাসকারী ‘সাভারি’ নামের একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে। সরকারি স্বীকৃতি ও নিজস্ব পরিচয়ের সংকটে থাকা এই জনগোষ্ঠীর জীবন প্রভাবশালী সামন্ততান্ত্রিক চরিত্র মালিকের নিয়ন্ত্রণে।
দীর্ঘদিন পর নিজের সম্প্রদায়ে ফিরে আসে নানির অভিনীত জাডাল চরিত্র। এরপর পরিবার ও সম্প্রদায়ের ওপর চলা নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার অবস্থান নেওয়ার মধ্য দিয়ে গল্প এগিয়ে যায়।
পরিচালক শ্রীকান্ত ওডেলার বক্তব্য অনুযায়ী, এটি শুধু প্রতিশোধের গল্প নয়; বরং পরিচয়, মর্যাদা ও অধিকার ফিরে পাওয়ার সংগ্রামের গল্প। তবে মুক্তির পর কিছু সমালোচক প্রশ্ন তুলেছেন, এই বক্তব্যকে পর্দায় কতটা গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
‘দ্য নিউজ মিনিট’-এর পর্যালোচনায় দাবি করা হয়েছে, নিপীড়িত মানুষের জীবন ও আবেগের গভীরে যাওয়ার বদলে সিনেমার কিছু অংশ অতিরিক্ত সহিংসতা ও অ্যাকশনের দিকে চলে গেছে। দুর্বল লেখা, সম্পাদনার অসংগতি ও অতিরঞ্জিত অ্যাকশন নিয়েও সেখানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
নানির অভিনয়ের প্রশংসা, চিত্রনাট্য নিয়ে প্রশ্ন
নানির অভিনয় নিয়ে একাধিক পর্যালোচনায় ইতিবাচক মন্তব্য এসেছে। বিশেষ করে অ্যাকশন দৃশ্যে তাঁর প্রস্তুতি ও অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন সমালোচকদের কেউ কেউ।
তবে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, জাডাল চরিত্রটির জন্য লেখা চিত্রনাট্য নানির অভিনয়-সক্ষমতাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। সিনেমার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ইঙ্গিতও প্রত্যাশিত গভীরতা তৈরি করতে পারেনি বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিনেমার দ্বিতীয়ার্ধ নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। প্রথম অংশে সাভারি সম্প্রদায়ের জীবন, জাডালের ফিরে আসা এবং মালিকের নিয়ন্ত্রণের পরিবেশ দর্শকের আগ্রহ তৈরি করলেও পরবর্তী অংশে সেই গতি ধরে রাখা যায়নি বলে বিভিন্ন পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’র পর্যালোচনায়ও নানির অভিনয় ও সিনেমার নির্মিত জগতের প্রশংসা করা হলেও গল্প একপর্যায়ে নিজের গতিপথ হারিয়ে ফেলে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
নারী চরিত্র নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠেছে?
‘দ্য প্যারাডাইস’ নিয়ে বিতর্কের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি কায়াদু লোহার অভিনীত সুব্বলক্ষ্মী চরিত্র।
সিনেমায় সুব্বলক্ষ্মী দরিদ্র পরিবারের এক তরুণী। অর্থের প্রয়োজনে সে ইঙ্গিতপূর্ণ ভিডিও তৈরি করে বিক্রি করে। সমালোচনার একটি জায়গা হলো—কেন সে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে, তার নিজের ইচ্ছা কী এবং এই বাস্তবতার সঙ্গে তার লড়াই কীভাবে এগোয়, সেসব বিষয় পর্যাপ্তভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যে সিনেমা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের পরিচয় ও মর্যাদার কথা তুলে ধরতে চায়, সেখানে নারী চরিত্রকে যথেষ্ট ব্যক্তিসত্তা দেওয়া হয়েছে কি না।
একটি সংলাপও বিতর্ককে আরও বাড়িয়ে দেয়। সুব্বলক্ষ্মীর মা তাঁকে ‘সিঙ্গেল শট অভিনেত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করেন। চরিত্রটির শরীর ও ভিডিও তৈরির বিষয়টি যেভাবে পর্দায় উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটিকে কিছু সমালোচক নারীকে পণ্য হিসেবে দেখানোর উদাহরণ হিসেবে দেখেছেন।
নির্মাতাদের বক্তব্যে নতুন ব্যাখ্যা
এই বিতর্কের বিষয়ে পরে অভিনেতা নানি ও পরিচালক শ্রীকান্ত ওডেলাকে বক্তব্য দিতে হয়েছে।
২৮ সেপ্টেম্বর দেওয়া বক্তব্যে তাঁরা জানান, বিতর্কিত দৃশ্যটির পেছনে আরও কিছু প্রেক্ষাপট ছিল। কিন্তু সম্পাদনার সময় সেই অংশ বাদ পড়ে যাওয়ায় দর্শকের কাছে দৃশ্যটির অর্থ ভিন্নভাবে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ নির্মাতাদের উদ্দেশ্য এবং চূড়ান্তভাবে পর্দায় উপস্থাপিত দৃশ্যের অর্থের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছিল—এমন ব্যাখ্যাই দিয়েছেন তাঁরা।
মুক্তির আগেই আদালতের নিষেধাজ্ঞা
‘দ্য প্যারাডাইস’ নিয়ে আইনি বিতর্কও তৈরি হয়েছিল মুক্তির আগেই। বেঙ্গালুরুর একটি আদালত সিনেমাটিকে ঘিরে ক্ষতিকর বা মানহানিকর কনটেন্ট প্রকাশ ও ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।
প্রযোজকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, সিনেমা মুক্তির আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্ট, মন্তব্য ও লিংকের মাধ্যমে মিথ্যা ও অবমাননাকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছিল। এতে সিনেমার ব্যবসা ও সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেন।
পরে নানি জানান, আদালতের পদক্ষেপ প্রকৃত সিনেমা-সমালোচনা বন্ধ করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এআই বা বট ব্যবহার করে তৈরি মিথ্যা ও মানহানিকর কনটেন্ট ঠেকাতেই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
বুকমাইশোতে রিভিউ বন্ধ নিয়ে আলোচনা
মুক্তির পর নতুন করে আলোচনায় আসে বুকমাইশোতে ‘দ্য প্যারাডাইস’-এর রেটিং ও রিভিউ বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি। সেখানে ‘রেটিং অ্যান্ড রিভিউ ডিজেবলড’ বার্তা দেখা যায়।
ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে আসে, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনেমাটি নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ছিল। তবে বুকমাইশো ঠিক কী কারণে এবং কার অনুরোধে রেটিং ও রিভিউ বন্ধ করেছিল, সে বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সমালোচনা নিয়ে নানির প্রতিক্রিয়া
তীব্র সমালোচনার মধ্যেও দর্শকের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলেছেন নানি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, দর্শকের ভালোবাসার পাশাপাশি ট্রল ও সমালোচনাও তিনি দেখেছেন। সমালোচকদের চিহ্নিত করা কিছু ত্রুটি থেকেও শেখার কথা বলেছেন তিনি।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নানি বলেন, ১৮ বছরের ক্যারিয়ারে ৩৩টি সিনেমা করার পর এই প্রথম তিনি এত তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন।
সিনেমাটি পছন্দ না করা দর্শকদের প্রতিক্রিয়ার মধ্যেও যে আবেগ ও সততা রয়েছে, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন অভিনেতা।
বক্স অফিসে কেমন চলছে সিনেমাটি?
সমালোচনা থাকলেও বক্স অফিসে শুরুটা ভালো হয়েছে বলে শিল্প-ট্র্যাকার স্যাকনিল্কের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মুক্তির প্রথম দিনে ভারতে ‘দ্য প্যারাডাইস’ প্রায় ৩৪ কোটি ৬৫ লাখ রুপি নেট আয় করে। এটি নানির ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ উদ্বোধনী আয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় দিনে আয় কমে প্রায় ১৪ কোটি ৯০ লাখ রুপি হয়। তৃতীয় দিনে আয় কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ কোটি ২৫ লাখ রুপি। তৃতীয় দিন শেষে ভারতে সিনেমাটির মোট নেট আয় প্রায় ৭৬ কোটি ৪০ লাখ রুপি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে বিশ্বব্যাপী সিনেমাটির আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৯ কোটি ৫০ লাখ রুপি।
মুক্তির পর ‘দ্য প্যারাডাইস’কে ঘিরে তাই একদিকে যেমন নানির অভিনয় ও নির্মাণশৈলী নিয়ে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে নারী চরিত্রের উপস্থাপনাসহ গল্প ও সহিংসতার ধরন নিয়েও চলছে বিতর্ক।
দ্য প্যারাডাইস বিতর্ক দ্য প্যারাডাইস নারী চরিত্র দ্য প্যারাডাইস বিতর্ক নানি সিনেমা দ্য প্যারাডাইস নারী চরিত্র শ্রীকান্ত ওডেলা নানি সিনেমা The Paradise controversy শ্রীকান্ত ওডেলা নানি দ্য প্যারাডাইস The Paradise controversy The Paradise movie নানি দ্য প্যারাডাইস Nani The Paradise The Paradise movie দ্য প্যারাডাইস সিনেমা Nani The Paradise দ্য প্যারাডাইস সিনেমা
