অধিকারপত্র সাহিত্য | ভালোবাসার ভ্রমণ–স্মৃতি
দুইা দৃশ্যে উপস্থাপিত এই ভালোবাসার ভ্রমনকাহিনী আসলে খুঁজে ফিরেছে একটি প্রশ্ন, যার নাম ছিল—চিরকাল। অস্ট্রিয়ার Salzburg-এর Liebesgrotte—যেখানে চুম্বনে প্রেম চিরস্থায়ী হওয়ার লোকবিশ্বাস—থেকে অস্ট্রেলিয়ার Melbourne-এর Evan Walker Bridge-এর Love Locks পর্যন্ত এক ব্যক্তিগত, রোমান্টিক ও আত্মঅনুসন্ধানী ভ্রমণকাহিনি। জীবনসঙ্গিনী দুই যাত্রাতেই সঙ্গে ছিলেন না, তবু তাঁকেই মনে রেখে লেখকের ছুটে যাওয়া। ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, প্রেমের প্রতীক, স্মৃতি ও বাস্তবতার ভেতর দিয়ে শেষ প্রশ্নটি একটাই—ভালোবাসাকে কি সত্যিই পাথর, চুম্বন বা তালা ধরে রাখে, নাকি প্রতিদিন একজন মানুষ আরেকজনকে নতুন করে বেছে নেওয়াই তার প্রকৃত চিরকাল?
ভূমিকা | চিরকাল নামের একটি শব্দের পেছনে ছুটে যাওয়া
মানুষের ভ্রমণ সব সময় কোনো শহর দেখার জন্য হয় না। কখনো কখনো আমরা একটি জায়গায় যাই কোনো পাহাড়, দুর্গ, নদী কিংবা সেতু দেখতে নয়—নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে।
আমার সেই প্রশ্নটির নাম ছিল—চিরকাল।
প্রথমে সালৎসবুর্গ। পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট এক গুহা—Liebesgrotte। সেখানে প্রচলিত বিশ্বাস, প্রিয় মানুষকে চুম্বন করলে ভালোবাসা নাকি চিরস্থায়ী হয়। আমি গেলাম। অথচ যাঁর জন্য এই যাত্রা, সেই জীবনসঙ্গিনীই সেদিন আমার পাশে নেই। গুহার সামনে দাঁড়িয়ে তাই চুম্বনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল অনুপস্থিতি; আর সেই অনুপস্থিতির মধ্যেও তাঁর অদ্ভুত উপস্থিতি।
এরপর মেলবোর্ন। Yarra River-এর ওপর সেই সেতু, যেখানে একসময় হাজার হাজার মানুষ padlock ঝুলিয়ে বিশ্বাস করেছিল—তালা বন্ধ থাকলে ভালোবাসাও থাকবে locked forever। সেখানেও আমি ছুটে গিয়েছিলাম। সেখানেও তিনি সঙ্গে ছিলেন না। অথচ দুই মহাদেশের দুই ভিন্ন প্রেম-লোকবিশ্বাস আমাকে টেনেছিল একই মানুষের জন্য।
তাই এই লেখা শুধু Salzburg কিংবা Melbourne-এর ভ্রমণকাহিনি নয়। এটি একজন মানুষকে সঙ্গে না পেয়েও তাঁকে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীর দুই প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর গল্প। একটি না-দেওয়া চুম্বন, একটি না-ঝোলানো অদৃশ্য তালা এবং মানুষের সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার গল্প—যাকে ভালোবাসি, সে যেন হারিয়ে না যায়।
দৃশ্য-০১
একটি অসম্পূর্ণ চুম্বনের গল্প: সালৎসবুর্গের ‘লাভ গ্রোটো’য় চিরকালের খোঁজে
জীবনসঙ্গিনী সেদিন পাশে ছিলেন না। তবু বহু দূরের এক গুহার কাছে ছুটে গিয়েছিলাম তাঁর জন্যই—ভালোবাসা যদি কোনো অলৌকিক পাথরের স্পর্শে নয়, অন্তত একটি মানুষের বিশ্বাসে চিরকাল বেঁচে থাকে!
কিছু জায়গায় মানুষ যায় দেখার জন্য। কিছু জায়গায় যায় ইতিহাস ছুঁয়ে দেখার জন্য। আবার পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গাও আছে, যেখানে মানুষ যায় কোনো দৃশ্য দেখতে নয়—নিজের মনের ভেতরে বহুদিন ধরে লুকিয়ে থাকা একটি অনুভূতিকে আরেকবার ছুঁয়ে দেখতে।
অস্ট্রিয়ার সালৎসবুর্গে আমার সেই যাত্রাটি ছিল তেমনই।
কোনো একদিন শুনেছিলাম একটি অদ্ভুত গল্প। গল্পটি ভালোবাসার। লোকমুখে প্রচলিত এক বিশ্বাসের। সালৎসবুর্গের পুরোনো শহরে Hohensalzburg Fortress-এর দিকে ওঠার Festungsbahn funicular-এর নিচের স্টেশনের কাছে রয়েছে ছোট্ট একটি গুহা—Liebesgrotte, অর্থাৎ Love Grotto।
সেখানে নাকি ভালোবাসার এক অদ্ভুত প্রতিশ্রুতি অপেক্ষা করে আছে। আর সেই গল্প শোনার পর আমি আর স্থির থাকতে পারিনি। আমি ছুটে গিয়েছিলাম।
যে চুম্বনে ভালোবাসা নাকি শেষ হয় না
গুহাটির সামনে একটি বাক্য লেখা আছে—“Küsst man sich in der k&k Liebesgrotte, wird die Liebe ewig währen.”
সহজ বাংলায় তার অর্থ দাঁড়ায়—এই Love Grotto-তে দুজন যদি পরস্পরকে চুম্বন করে, তবে তাদের ভালোবাসা চিরকাল স্থায়ী হবে।
কী আশ্চর্য এক দাবি! মানুষ কি সত্যিই এমন একটি বাক্য বিশ্বাস করতে পারে?
কোনো পাথর কি ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে? কোনো গুহা কি দুটি মানুষের ভবিষ্যৎ লিখে দিতে পারে? একটি চুম্বন কি সময়, দূরত্ব, অভিমান, বয়স এবং মৃত্যুকেও অতিক্রম করতে পারে?
বুদ্ধি বলে—না। কিন্তু ভালোবাসা সব সময় কি কেবল বুদ্ধির কথা শোনে?
সালৎসবুর্গের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম Salzburger Nachrichten–এর একটি প্রতিবেদনে গুহাটির পাশের সাইনবোর্ডে এই ‘চিরস্থায়ী ভালোবাসা’র কথাটিই উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, গুহাটি Festungsbahn-এর নিচের স্টেশনের পাশের Festungsgasse এলাকায় অবস্থিত এবং পর্যটক যুগলদের কাছে এটি চুম্বন ও এমনকি বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ারও একটি রোমান্টিক স্থান হয়ে উঠেছে।
আর আমি?
আমি গিয়েছিলাম সেই গল্পটির কাছে। কিন্তু একটি সমস্যা ছিল। যাকে চুম্বন করলে ভালোবাসা চিরস্থায়ী হওয়ার কথা, সেই মানুষটিই সেদিন আমার সঙ্গে ছিল না।
সে ছিল না—তবু তার জন্যই যাওয়া
আমার জীবনসঙ্গিনীকে সেই যাত্রায় সঙ্গে নিতে পারিনি। তাহলে আমি গেলাম কেন?
এ প্রশ্নের খুব যুক্তিসংগত উত্তর আমার কাছে আজও নেই। সম্ভবত ভালোবাসার অনেক কাজেরই কোনো কার্যকারণ ব্যাখ্যা থাকে না।
মানুষ কখনো প্রিয়জনের জন্য ফুল কেনে—জানে ফুল শুকিয়ে যাবে।
চিঠি লেখে—জানে কাগজ একদিন পুরোনো হবে।
ছবি তোলে—জানে সেই মুহূর্ত আর ফিরবে না।
কোনো পুরোনো গান শুনে একজন মানুষের কথা মনে করে—যদিও সেই মানুষটি তখন হাজার মাইল দূরে।
তাহলে প্রিয় মানুষটির জন্য পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একটি ছোট্ট গুহার কাছে ছুটে যাওয়াটাই বা এত অযৌক্তিক কেন?
আমি হয়তো মনে মনে বলেছিলাম—তুমি আমার সঙ্গে নেই, কিন্তু আমি এখানে তোমার জন্যই এসেছি। আমার পাশে তখন তার হাত ছিল না। আমার কাঁধে মাথা রেখে সে দাঁড়িয়ে ছিল না। সেই কিংবদন্তির নিয়ম মেনে তাকে চুম্বন করার সুযোগও আমার ছিল না। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার—সেই ছোট্ট জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল, সে আমার সঙ্গে না থেকেও সবচেয়ে বেশি আমার সঙ্গেই আছে। কারণ মানুষের উপস্থিতি কি সব সময় শরীর দিয়ে মাপা যায়?
কখনো কখনো একজন মানুষ এত গভীরভাবে আরেকজনের স্মৃতি ও অনুভূতির মধ্যে বাস করে যে, তার অনুপস্থিতিও এক ধরনের উপস্থিতি হয়ে ওঠে। সেদিন সালৎসবুর্গে আমার সঙ্গে সম্ভবত ঠিক সেটাই ঘটেছিল।
দুর্গ, পাহাড় আর ভালোবাসার ছোট্ট গোপন ঠিকানা
সালৎসবুর্গ নিজেই যেন গল্প বলার জন্য তৈরি একটি শহর। পুরোনো শহরের ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা Hohensalzburg Fortress ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ সংরক্ষিত দুর্গসমষ্টি। দুর্গটির নির্মাণ শুরু হয়েছিল একাদশ শতকে; ১০৭৭ সালে Archbishop Gebhard সেখানে প্রথম দুর্গ-স্থাপনা নির্মাণ করেন। পরবর্তী শতাব্দীগুলোয় সেটি ক্রমে সম্প্রসারিত হয়েছে।
আজ দুর্গের দিকে যাত্রী নিয়ে যাওয়া Festungsbahn-এর নিচের স্টেশন Festungsgasse 4-এ। এই funicular ১৮৯২ সাল থেকে মানুষকে Festungsberg-এর ওপরে নিয়ে যাচ্ছে। —এই বিশাল ইতিহাসের পাশে Love Grotto যেন খুবই ছোট্ট একটি জায়গা। কিন্তু ভালোবাসার গল্পে জায়গার আয়তন কতটুকু, তা কি কখনো গুরুত্বপূর্ণ?
একটি ছোট আংটিতেও তো একটি জীবনভর প্রতিশ্রুতি রাখা যায়। একটি ছোট চিঠিও কখনো একটি মহাকাব্যের চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে। ঠিক তেমনি বিশাল দুর্গ, শতাব্দীর ইতিহাস আর পাহাড়ের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই ছোট্ট গুহাটি মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে এক ধরনের ব্যক্তিগত প্রতীক—The Promise of Eternity বা চিরকালের প্রতিশ্রুতি।

তবে হাজার বছরের গল্পটি কোথায়?
এই জায়গাটিকে ঘিরে একটি বিষয় আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছিল। শোনা গল্পে এর রোমান্টিক বিশ্বাসকে কখনো কখনো সালৎসবুর্গের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের সঙ্গে মেলানো হয়; সেই সূত্রেই একাদশ শতকের কথাও সামনে আসে।—এই Liebesgrotte (Love Grotto)-কে স্থানীয় লোককথায় বলা হয় যেন “The Promise of Eternity”—অনন্ত ভালোবাসার প্রতিশ্রুতির প্রতীক। Salzburg-এর বিখ্যাত Hohensalzburg Fortress-এর কাছে, Festungsbahn funicular-এর পাদদেশে এই স্থানটি ঘিরে বহুদিন ধরে নানা রোমান্টিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষ এমন বিশ্বাস বহন করে নিয়ে যায়—কখনো ইতিহাসের সঙ্গে মিশিয়ে, কখনো নিছক ভালোবাসার গল্প হিসেবে।কিন্তু এখানেই লোককথার সৌন্দর্য। অপরদিকে ইতিহাস দলিল চায়। লোকবিশ্বাস চায় গল্প। আর ভালোবাসা?
ভালোবাসা কখনো কখনো শুধু বিশ্বাস করতে চায়।
মানুষ কেন ‘চিরকাল’ শব্দটি এত ভালোবাসে?
সেই গুহাটির কথা ভাবতে গিয়ে আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল—মানুষ কেন ভালোবাসার সঙ্গে বারবার ‘চিরকাল’ শব্দটি জুড়ে দেয়?
মানুষ তো জানে জীবন সীমিত। আর আমরা জানি বয়স বাড়ে। পরিস্থিতি বদলায়। মানুষ বদলায়। সম্পর্কের ভাষা বদলায়। তবু মানুষ বলে—
- Forever.
- Eternity.
- চিরকাল।
সম্ভবত ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর আকাঙ্ক্ষাটাই এখানে লুকিয়ে আছে। মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারে না। সময়কে থামাতে পারে না। কিন্তু সে তার প্রিয় মানুষটির কাছে অন্তত এই প্রতিশ্রুতিটুকু রাখতে চায়—সময় আমাকে বদলালেও তোমার প্রতি আমার অনুভূতিটাকে যেন পুরোপুরি মুছে দিতে না পারে। তাই পৃথিবীর নানা সংস্কৃতিতে প্রেমকে ঘিরে সেতুতে তালা ঝোলানো হয়, গাছে ফিতা বাঁধা হয়, পাথরে নাম লেখা হয়, আংটি বিনিময় করা হয়, প্রতিজ্ঞা উচ্চারণ করা হয়।—এসবের কোনো কিছুই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয় না। তবু মানুষ করে। কারণ ভালোবাসা শুধু বাস্তবতার বিষয় নয়; ভালোবাসা একই সঙ্গে মানুষের আশা নির্মাণের ক্ষমতা।
একটি অসম্পূর্ণ চুম্বন
আমার Salzburg-এর গল্পে তাই একটি চুম্বন শেষ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। অন্তত সেই গল্পের নিয়ম অনুযায়ী নয়। এর কারণ কী জানেন?
যার সঙ্গে সেখানে দাঁড়ানোর কথা ছিল, সে আমার পাশে ছিল না। কিন্তু আজ মনে হয়—এই অসম্পূর্ণতাটাই হয়তো স্মৃতিটিকে আরও বেশি পূর্ণ করেছে। কারণ যদি আমরা দুজন একসঙ্গে সেখানে যেতাম, হয়তো ছবিটি সুন্দর হতো। আমরা হয়তো হাসতাম, ছবি তুলতাম, সেই বিখ্যাত বাক্যের নিচে দাঁড়িয়ে একটি চুম্বন দিতাম। তারপর ফিরে আসতাম। কিন্তু আমি একা যাওয়ায় ঘটনাটি অন্য কিছু হয়ে গেল। তা হয়ে গেল একটি অপেক্ষা। একটি নীরব স্বীকারোক্তি। একজন অনুপস্থিত মানুষের প্রতি একজন উপস্থিত মানুষের ভালোবাসার সাক্ষ্য। সেদিন সেখানে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল—আমি তোমাকে নিয়ে আসতে পারিনি। তাই তোমার জন্যই এখানে এসেছি। —এ কথাটির ভেতরে হয়তো কোনো অলৌকিকতা নেই। কিন্তু ভালোবাসার সব অলৌকিকতাই কি দৃশ্যমান হতে হয়?
পাথর নয়, মানুষই ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখে
আজ এতদিন পর ভাবলে বুঝি, কোনো গুহা আমাদের ভালোবাসাকে চিরস্থায়ী করে দিতে পারে না। কোনো পাথরের সেই ক্ষমতা নেই। একটি চুম্বনও সম্পর্কের সমস্ত ঝড় ঠেকিয়ে দিতে পারে না। তবে ভালোবাসা টিকে থাকে অন্য জায়গায়—
- একজন আরেকজনকে সম্মান করার মধ্যে,
- কঠিন সময়ে পাশে থাকার মধ্যে,
- অভিমান পেরিয়ে ফিরে আসার মধ্যে,
- স্মৃতি বহন করার মধ্যে, এবং
- প্রতিদিন একই মানুষটিকে নতুন করে বেছে নেওয়ার মধ্যে।
তবু সেই Love Grotto-র প্রয়োজন আছে। কারণ মানুষ কেবল সত্য দিয়ে বাঁচে না। মানুষ গল্প দিয়েও বাঁচে। প্রতীক দিয়ে বাঁচে। স্মৃতি দিয়ে বাঁচে। আর কোনো কোনো দিন, পৃথিবীর অনেক দূরের একটি পাহাড়ি শহরের ছোট্ট গুহার সামনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ নিজের জীবনসঙ্গিনীর কথা মনে করে মনে মনে বলে—“আমাদের ভালোবাসাটা যেন থেকে যায়।”
হয়তো সেটিই সেই গুহার সত্যিকারের ক্ষমতা। পাথর ভালোবাসাকে চিরস্থায়ী করে না। কিন্তু পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে করা একটি নীরব প্রতিজ্ঞা মানুষকে মনে করিয়ে দিতে পারে—সে কাকে এবং কেন ভালোবেসেছিল।
সালৎসবুর্গ থেকে ফিরে এসেছি অনেক আগেই।
Festungsbahn তার পথে এখনও পাহাড়ে ওঠে। Hohensalzburg Fortress এখনও শহরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই ছোট্ট Liebesgrotte-র সামনে হয়তো আজও কোনো অচেনা যুগল এসে দাঁড়ায়। কেউ হয়তো হাসতে হাসতে সেই বাক্যটি পড়ে। কেউ বিশ্বাস করে। কেউ বিশ্বাস করে না। কেউ হয়তো প্রিয় মানুষটির দিকে তাকিয়ে তাকে চুম্বন করে। আর পৃথিবী তার মতোই চলতে থাকে। কিন্তু আমার কাছে জায়গাটি থেকে গেছে অন্যভাবে—
- একটি স্মৃতি।
- একটি নীরব প্রতিশ্রুতি।
- একটি না-দেওয়া চুম্বন। আর
- একজন অনুপস্থিত মানুষের জন্য বহু দূর পর্যন্ত হেঁটে যাওয়ার গল্প।
কারণ কিছু জায়গা মানচিত্রে থাকে। কিছু জায়গা ছবিতে থাকে। আর কিছু জায়গা একদিন মানুষের জীবনের গল্প হয়ে যায়।
Some places remain on the map.
Some remain in memory.
And some become a promise.
দৃশ্য-০২
ভালোবাসায় তালা: মেলবোর্নের এক সেতুতে ‘চিরকাল’ খুঁজতে ছুটে যাওয়া
সালৎসবুর্গের Love Grotto-র পর আরেকদিন শুনলাম—মেলবোর্নে নাকি এমন এক সেতু আছে, যেখানে ভালোবাসার নামে তালা ঝুলিয়ে দিলে সম্পর্কও যেন চিরদিনের জন্য ‘লক’ হয়ে যায়। জীবনসঙ্গিনী সেবারও সঙ্গে ছিলেন না। তবু ছুটে গেলাম। তাঁর জন্যই।
কিছু গল্প একবার মানুষের মনে ঢুকে গেলে তাকে আর স্থির থাকতে দেয় না।
সালৎসবুর্গের Liebesgrotte—Love Grotto-র গল্প শুনে যেমন একদিন ছুটে গিয়েছিলাম, তেমনি আরেকদিন শুনলাম আরেক অদ্ভুত ভালোবাসার রীতির কথা। এবার জায়গাটি অস্ট্রিয়ার পাহাড়ি শহর নয়। শহরটির নাম মেলবোর্ন।
শুনলাম, Yarra River-এর ওপর একটি pedestrian bridge আছে। প্রেমিক-প্রেমিকারা সেখানে যায়, নিজেদের নাম কিংবা আদ্যক্ষর লেখা একটি padlock সেতুর তারে আটকে দেয়, তারপর চাবিটা ছুড়ে দেয় নদীতে।
বিশ্বাসটা খুব সরল—তালা খুলবে না, ভালোবাসাও খুলবে না। চাবি চলে যাবে নাগালের বাইরে; আর সম্পর্ক থেকে যাবে—locked forever।
কথাটি শুনে আবারও আমার সেই পুরোনো রোগটি জেগে উঠল। যেতে হবে। দেখতে হবে।
হয়তো ভালোবাসার জন্য কোনো তালা সত্যিই কাজ করে না; তবু পৃথিবীর মানুষ কোথায় কোথায় ভালোবাসার জন্য কী কী বিশ্বাস তৈরি করেছে—সেসব জায়গায় গিয়ে দাঁড়ানোর মধ্যে আমার কাছে এক ধরনের আনন্দ আছে। আর এবারও যার জন্য যেতে চেয়েছিলাম, তাকে সঙ্গে নিতে পারিনি। তবু ছুটে গেলাম।
Yarra-র ওপর ভালোবাসার সেতু
সেতুটির বর্তমান নাম Evan Walker Bridge। এটি একসময় Southbank Pedestrian Bridge নামে পরিচিত ছিল। Yarra River-এর ওপর দিয়ে এই pedestrian bridge Melbourne-এর CBD-র Flinders Street Station-এর দিককে Southbank precinct-এর সঙ্গে যুক্ত করে।
২০১২ সালের আশপাশ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত জায়গাটি একসময় এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে স্থানীয়ভাবে অনেকে একে Love Lock Bridge বলেই চিনতে শুরু করেছিলেন। হাজার হাজার মানুষ সেখানে এসে একটি ছোট্ট ধাতব তালার ভেতরে নিজেদের সম্পর্কের জন্য ‘চিরকাল’ শব্দটিকে বন্দী করার চেষ্টা করেছিল।
ভাবতে ভালো লাগে—
- কেউ হয়তো প্রথম প্রেমের উত্তেজনায় সেখানে গিয়েছিল।
- কেউ বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পরে।
- কেউ anniversary-তে।
- কেউ হয়তো বহু বছরের সংসারের পরেও একটি তালার গায়ে দুজনের নাম লিখে বলেছিল—“আরও অনেকটা পথ আমরা একসঙ্গে থাকব।”
তারা তালাটি আটকে দিয়েছে। চাবি ছুড়ে দিয়েছে Yarra-র পানিতে। তারপর হয়তো দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়েছে। —সেই মুহূর্তে যুক্তিবাদী পৃথিবী থেকে তারা নিশ্চয়ই একটু দূরে ছিল। কারণ ভালোবাসার কিছু মুহূর্তে মানুষ প্রমাণ চায় না। এর জন্যে একটি প্রতীকই যথেষ্ট।

আমার সঙ্গে সে ছিল না
কিন্তু আমার গল্পটিতে আবারও একটি শূন্যতা ছিল। আমি যার সঙ্গে ভালোবাসাটি ‘লক’ করতে চেয়েছিলাম, সে তখন আমার সঙ্গে মেলবোর্নে ছিল না। সালৎসবুর্গেও ছিল না। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার—এই দুটো জায়গায় যাওয়ার প্রেরণা ছিল একই মানুষ।
আমি ভাবি, পৃথিবীর সব প্রেমের গল্পের কি পাশাপাশি দাঁড়ানো দুটি মানুষের ছবি থাকতেই হবে?
কখনো কখনো ভালোবাসার সবচেয়ে তীব্র মুহূর্তটি তৈরি হয় সেই মানুষটির অনুপস্থিতিতেই। যখন কোনো অপরিচিত শহরে দাঁড়িয়ে হঠাৎ তার কথা মনে পড়ে। যখন কোনো দৃশ্য দেখে প্রথম ইচ্ছে হয়—“ইশ্, সে যদি এখানে থাকত!”
আমার Melbourne-এর সেই যাত্রাটি সম্ভবত ছিল এমনই একটি মুহূর্ত। আমি সেতুটির দিকে যাচ্ছি, আর মনে মনে একজন মানুষকেই সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।
একটি তালার ভেতর মানুষ কী আটকে রাখতে চায়?
Love locks আমাকে সব সময় একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। একটি padlock-এর মধ্যে আসলে মানুষ কী আটকাতে চায়?
- তার সঙ্গীকে?
- সম্পর্ককে?
- নিজের প্রতিশ্রুতিকে?
- নাকি আসলে সময়কে?
কারণ আমরা সবাই জানি, সময়কে তালাবদ্ধ করা যায় না। কেননা:
- মানুষ বদলায়।
- শহর বদলায়।
- সম্পর্ক বদলায়।
- এমনকি সেই তালাটিও একদিন মরিচা ধরে।
তবু মানুষ একটি শক্ত ধাতব বস্তু নিয়ে আসে। তাতে দুটি নাম লেখে। সেতুর সঙ্গে আটকে দেয়। চাবিটা এমন জায়গায় ছুড়ে দেয়, যেখান থেকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। —এ যেন সময়ের উদ্দেশে মানুষের ছোট্ট এক বিদ্রোহ—“তুমি সবকিছু বদলে দিতে পারো, কিন্তু এটুকু যেন বদলাতে না পারো।”
তারপর ভালোবাসাই হয়ে উঠল সেতুর জন্য ভারী
কিন্তু Melbourne-এর Love Lock Bridge-এর গল্পে একসময় রোমান্টিকতার সঙ্গে বাস্তব প্রকৌশলের সংঘর্ষ ঘটল। ২০১৫ সালের মে মাসের মধ্যে সেতুটিতে প্রায় ২০,০০০ padlock জমে গিয়েছিল। অতিরিক্ত ওজনে bridge railing-এর wire cables নিচের দিকে ঝুলে পড়তে শুরু করে। City of Melbourne নিরাপত্তা ও সেতুর structural integrity নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তালাগুলো সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।
এখানে যেন গল্পটি হঠাৎ এক আশ্চর্য irony তৈরি করে। যে তালাগুলো মানুষ ঝুলিয়েছিল সম্পর্ককে আরও শক্ত করার প্রতীক হিসেবে— সেগুলোই একসময় সেতুটিকে দুর্বল করে দিচ্ছিল। প্রায় বিশ হাজার ভালোবাসার প্রতিশ্রুতির ওজন! আরতো কম না, যা বহন করা আসলেই কষ্টকর!
কবিতার ভাষায় শুনতে কী অপূর্ব। কিন্তু একজন engineer-এর চোখে সেটি আর কবিতা নয়—লোড, stress, sagging cable এবং safety risk।
আর চাবিগুলো চলে গিয়েছিল নদীর তলায়
প্রথাটি ছিল—তালা ঝুলিয়ে তার চাবি Yarra River-এ ছুড়ে দেওয়া। ২০১৫ সালে তৎকালীন Lord Mayor Robert Doyle বলেছিলেন, নদীতে ছুড়ে দেওয়া চাবির সংখ্যা প্রায় ৪০,০০০ পর্যন্ত হতে পারে; বিষয়টি পরিবেশগত উদ্বেগও তৈরি করেছিল। ভালোবাসার প্রতীক তৈরির চেষ্টা করতে গিয়ে মানুষ অজান্তেই নদীর তলায় ফেলে যাচ্ছিল হাজার হাজার ধাতব বস্তু।
এখানেও জীবনের একটি অদ্ভুত পাঠ লুকিয়ে আছে। ভালোবাসার নামে আমরা যা করি, তা যদি আরেকজন মানুষের, সমাজের কিংবা প্রকৃতির ক্ষতি করে—তবে সেটি আর শুধু ভালোবাসার সুন্দর প্রতীক থাকে না। প্রতীককেও দায়িত্বশীল হতে হয়।
কিন্তু Melbourne ভালোবাসাগুলোকে আবর্জনায় ফেলেনি
এই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অংশ সম্ভবত এখানেই।
তালা সরিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু মানুষের নাম, তারিখ, initials, ছোট ছোট বার্তা আর স্মৃতি বহন করা প্রায় ২০ হাজার padlock-কে স্রেফ scrap metal হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়নি।
City of Melbourne Craft Victoria-র সঙ্গে মিলে Love Locks Project হাতে নেয়। শিল্পীরা সেই পুরোনো তালাগুলোকে নতুন করে ভাবলেন—কেউ গলালেন, কেউ recast করলেন, কেউ কেটে বা পুনর্গঠন করে sculpture ও jewellery তৈরি করলেন। ২০১৬ সালে সেই কাজগুলো Melbourne Town Hall/City Gallery-তে প্রদর্শিত হয়। অর্থাৎ—তালা সেতু থেকে চলে গেল, কিন্তু ভালোবাসার গল্প মুছে গেল না। তা শিল্প হয়ে ফিরে এল।
এই রূপান্তরটি আমার কাছে অসাধারণ। কারণ সম্পর্কও তো অনেকটা এমন। সব সম্পর্ক একই অবস্থায় সারাজীবন থাকে না। প্রেমের ভাষা বদলায়। উচ্ছ্বাস বদলায়। দুটি মানুষের জীবন বদলায়। কিন্তু যদি সম্পর্কটির গভীরে কিছু সত্য থেকে যায়, তবে সেটি নতুন রূপ নেয়। ঠিক Melbourne-এর সেই তালাগুলোর মতো—Metal থেকে Memory; আর Memory থেকে Art
City of Melbourne-এর সংগ্রহে Louiseann King-এর Forever & Always নামের একটি কাজ এখনও সেই Love Locks Project-এর স্মৃতি বহন করছে। শিল্পী পুরোনো তালায় বারবার লেখা Forever এবং Always শব্দগুলোকে তাঁর শিল্পকর্মের কেন্দ্রে এনেছিলেন।
কী আশ্চর্য! মানুষ হাজার হাজার তালায় শেষ পর্যন্ত একই দুটি শব্দই লিখতে চেয়েছিল—Forever এন্ড Always.
তালা কেটে ফেলা যায়, ভালোবাসা?
২০১৫ সালের পরে নতুন love lock লাগানো নিরুৎসাহিত করা হয়। City of Melbourne-এর বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়েও bridge-এর structural integrity রক্ষার জন্য নতুন লাগানো অল্পসংখ্যক তালা নিয়মিত সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ২০১৮ সালেও এমন তালা অপসারণের বিষয়টি নথিভুক্ত আছে। অর্থাৎ কেউ আজ সেখানে গিয়ে একটি তালা ঝুলিয়ে ভাবতে পারেন—“এটি চিরদিন থাকবে।” কিন্তু council officer এসে হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই সেটি কেটে ফেলবেন।
এখানেই Melbourne-এর Love Lock গল্পটি আমার কাছে আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। কারণ ভালোবাসা যদি সত্যিই শুধু একটি তালার ওপর নির্ভর করে, তবে bolt cutter-এর একটি চাপেই তো তার সমাপ্তি!কিন্তু সত্যিকারের সম্পর্ক কি এত সহজে কাটা যায়?
সম্ভবত নয়।
তালা কেটে নেওয়া যায়।
রেলিং পরিষ্কার করা যায়।
চাবি হারিয়ে যায়।
সেতু সংস্কার হয়।
কিন্তু যে মানুষটির জন্য কেউ পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একটি সেতু খুঁজে বেড়ায়—সেই অনুভূতি অন্য জায়গায় বাস করে।
Salzburg থেকে Melbourne: একই প্রশ্নের দুই উত্তর
আজ ফিরে তাকালে Salzburg-এর Love Grotto আর Melbourne-এর Love Locks আমার কাছে একই গল্পের দুটি অধ্যায় মনে হয়।
Salzburg বলেছিল—একটি চুম্বন ভালোবাসাকে চিরস্থায়ী করবে। আর Melbourne বলেছিল—একটি তালা ভালোবাসাকে চিরদিনের জন্য আটকে রাখবে।
আমি দুটো জায়গাতেই ছুটে গিয়েছিলাম। দুটো জায়গাতেই আমার জীবনসঙ্গিনীকে সঙ্গে নিতে পারিনি। তারপরও দুটো যাত্রাই ছিল তার জন্য। আর সম্ভবত সেই কারণেই জায়গাগুলো আমার মনে রয়ে গেছে। আমি কোনো অলৌকিক শক্তির প্রমাণ খুঁজতে যাইনি। আমি হয়তো খুঁজছিলাম মানুষের সেই প্রাচীন আকাঙ্ক্ষাটাকে—যাকে ভালোবাসি, তাকে যেন হারাতে না হয়।
শেষ পর্যন্ত কোনো তালাই ভালোবাসাকে আটকে রাখতে পারে না
আজ আমার মনে হয়, ভালোবাসাকে ‘লক’ করার সবচেয়ে কার্যকর জায়গা কোনো bridge railing নয়। তা মানুষের আচরণে। সম্মানে। দায়বদ্ধতায়। ক্ষমা করতে শেখায়। কঠিন সময়ে ফিরে আসায়। বছরের পর বছর একই মানুষটিকে নতুন করে চিনতে চাওয়ার মধ্যে। তালা ঝুলিয়ে দেওয়া সহজ। তবে একটি সম্পর্ককে প্রতিদিন বাঁচিয়ে রাখা অনেক কঠিন। তবু আমি সেই মানুষের হাজার হাজার তালাকে তুচ্ছ করতে পারি না। কারণ সেগুলোর প্রত্যেকটির পেছনে কোনো না কোনো মুহূর্তে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে বলেছিল—“আমি চাই তুমি আমার জীবনে থাকো।”
সেই ইচ্ছাটিই সম্ভবত ভালোবাসার সবচেয়ে মানবিক দিক। আমি মেলবোর্নের সেই সেতুতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে তাকে নিতে পারিনি। তবু মনে মনে হয়তো একটি অদৃশ্য তালা সঙ্গে নিয়েছিলাম। তার কোনো ধাতব শরীর ছিল না। কোনো চাবিও ছিল না। কেউ তা কেটে ফেলতে পারত না। শুধু একটি নীরব আকাঙ্ক্ষা ছিল—আমাদের ভালোবাসাটা যেন জীবনের এত পরিবর্তনের মধ্যেও হারিয়ে না যায়। এখন বুঝি, ভালোবাসাকে সেতুর সঙ্গে তালাবদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। সঠিক মানুষটির সঙ্গে তাকে জীবনের ভেতরেই যত্ন করে রেখে দিতে হয়।
শেষকথা | পাথর, তালা ও মানুষের হৃদয়
Salzburg আমাকে একটি অদ্ভুত শিক্ষা দিয়েছিল। সেখানে একটি গুহা আমাকে বলেছিল—একটি চুম্বন নাকি ভালোবাসাকে চিরস্থায়ী করতে পারে।
Melbourne আমাকে আরেকটি প্রতীক দেখিয়েছিল। একটি ছোট padlock সেতুর railing-এ আটকে মানুষ যেন সময়কেই চ্যালেঞ্জ করেছিল—“এ সম্পর্ক আর খুলবে না।” কিন্তু বাস্তবতা আরও নির্মম, আবার আরও সুন্দর।

মেলবোর্নে প্রায় বিশ হাজার love lock একসময় এত ভারী হয়ে উঠেছিল যে সেতুর wire cables ঝুলে পড়ছিল; নিরাপত্তার জন্য তালাগুলো সরাতে হয়েছিল। যে তালা সম্পর্ককে দৃঢ় করার প্রতীক ছিল, সেই তালাই একপর্যায়ে সেতুকে দুর্বল করছিল। অথচ সেই তালাগুলোও শেষ পর্যন্ত নিছক আবর্জনা হয়ে যায়নি—শিল্পে রূপ নিয়ে স্মৃতির আরেক জীবন পেয়েছে।
সেখানেই হয়তো এই দুই শহরের গল্প এক জায়গায় এসে মেলে।
একটি পাথর ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না।
একটি চুম্বন ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নয়।
একটি তালাও সম্পর্ককে আটকে রাখতে পারে না।
তবু মানুষ এসব প্রতীক তৈরি করে। কারণ মানুষের প্রয়োজন শুধু সত্য নয়—স্মৃতি, আশা, প্রতিশ্রুতি এবং গল্পও প্রয়োজন। সালৎসবুর্গের সেই গুহা কিংবা মেলবোর্নের সেই সেতু তাই আমার কাছে অলৌকিক কোনো স্থান নয়। এগুলো বরং আমাকে মনে করিয়ে দেয়—ভালোবাসার সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো বাইরের বস্তুতে নয়।
তা থাকে একজন আরেকজনকে সম্মান করার মধ্যে, কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে, অভিমান পেরিয়ে ফিরে আসার মধ্যে এবং বছরের পর বছর একই মানুষটিকে আবারও নতুন করে বেছে নেওয়ার মধ্যে।
শেষ প্রতিফলন | চিরকাল কোথায় থাকে?
আজ যখন পেছনে তাকাই, Salzburg আর Melbourne আমার কাছে দুটি শহরের নামমাত্র নয়। একটি আমাকে দিয়েছে একটি অসম্পূর্ণ চুম্বনের স্মৃতি। অন্যটি দিয়েছে একটি অদৃশ্য তালার গল্প।
দুটো শহরই যেন শেষ পর্যন্ত আমাকে একই কথাই বলেছে—চিরস্থায়ী ভালোবাসার কোনো জাদুকরী পাথর নেই, কোনো অবিনাশী তালাও নেই। আছে শুধু দুজন মানুষের প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত—আজও আমি তোমাকেই বেছে নিচ্ছি।
দুটি যাত্রাতেই যাঁর জন্য ছুটে গিয়েছিলাম, তিনি শারীরিকভাবে আমার পাশে ছিলেন না। অথচ আজ বুঝি, সেই অনুপস্থিতিই হয়তো যাত্রাগুলোকে এত গভীর করে দিয়েছে। কারণ কখনো কখনো ভালোবাসার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তোলা কোনো ছবি নয়; বরং পৃথিবীর অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হওয়া—“ইশ্, সে যদি এখানে থাকত!”
শেষ পর্যন্ত আমি কোনো জাদুকরী গুহা খুঁজিনি। কোনো অমর তালাও নয়। আমি হয়তো খুঁজেছি সেই মানুষটিকে, যাঁকে দূরত্বের মধ্যেও সঙ্গে বহন করা যায়। আর সেখানেই আমার কাছে ‘চিরকাল’-এর অর্থ বদলে গেছে।
চিরকাল মানে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা নয়।
চিরকাল মানে একই মানুষকে জীবনের পরিবর্তনের মধ্যেও বারবার চিনে নেওয়া।
চিরকাল মানে—আজও, এত কিছুর পরেও, আমি তোমাকেই বেছে নিচ্ছি।
Salzburg-এর পাথর একদিন ক্ষয়ে যাবে।
Melbourne-এর তালা কেটে ফেলা যাবে।
Yarra-র জলে ছুড়ে দেওয়া চাবিও হারিয়ে যাবে।
কিন্তু কিছু প্রতিশ্রুতি মানুষের ভেতরে থেকে যায়। আর হয়তো সেই কারণেই—
Some places remain on the map.
Some locks disappear from bridges.
But some promises remain within us.
এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড-এর সকল প্রেমিক যুগলকে মনে রাখার অনুরোধসহ ভালোবাসার এই ভ্রমণকাহিনী শেষ করব কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষায়:
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা, অধিকারপত্র : odhikarpatranews@gmail.com
#চিরকালের_খোঁজে #ভালোবাসার_ভ্রমণকথা #অধিকারপত্র_সাহিত্য #ভ্রমণস্মৃতি #Salzburg #Liebesgrotte #LoveGrotto #Melbourne #LoveLocks #EvanWalkerBridge #YarraRiver #LoveAndMemory #PromiseOfEternity #ভালোবাসা #স্মৃতি #সম্পর্ক #চিরকাল #OdhikarPatra
