নিজস্ব প্রতিবেদক | অধিকার পত্র ডটকম
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সমাজব্যবস্থায় বৈষম্য ও আর্থিক সংকটের মধ্যে বেড়ে ওঠা নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই পেয়েছেন ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার রক্ষা এবং যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিনের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ পুরস্কার দিয়েছে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) পুরস্কার ঘোষণার পর ৮৫ বছর বয়সী এই আইনজ্ঞকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে কাজ করা থেকে শুরু করে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার এবং আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন—দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
তবে তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্তি রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি করেছে। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের প্রেক্ষাপটে পুরস্কারটি নতুন করে আন্তর্জাতিক আইন ও ভূরাজনীতি নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
## ট্রাম্পকে নিয়ে রসিকতা, আলোচনায় নাভি পিল্লাই
নোবেল শান্তি পুরস্কারের খবর পাওয়ার পর জার্মানির নুরেমবার্গে একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশে রসিকতা করেন পিল্লাই। তাঁকে ঘিরে করতালির মধ্যে তিনি বলেন, আরও জোরে হাততালি দিলে পুরস্কারটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন।
ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আগ্রহের প্রসঙ্গ টেনে করা এই মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়। তবে নোবেল পুরস্কার আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেই দেওয়া হয়; এটি অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ নেই।
গাজা নিয়ে তদন্ত, ইসরায়েলের সমালোচনা
নাভি পিল্লাই ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, পূর্ব জেরুজালেম ও ইসরায়েলবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। কমিশন ২০২৫ সালে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ইসরায়েল এ মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করেছে।
পিল্লাইয়ের নোবেল জয়কে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সমালোচনা আসে। দেশটির কর্মকর্তারা তাঁর নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিশনের অবস্থান নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন মহল পুরস্কারটিকে জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে স্বীকৃতি হিসেবে দেখেছে।
এখানে উল্লেখ্য, তদন্ত কমিশনের মূল্যায়ন এবং কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায় এক বিষয় নয়। গাজা নিয়ে কমিশনের প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক রয়েছে।
শৈশব: বৈষম্য ও আর্থিক সংকটের মধ্যে বেড়ে ওঠা
নাভানেথেম পিল্লাই ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার বর্ণবাদী শাসনামলে জাতিগত বৈষম্যের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেছে। তাঁর বাবা ছিলেন বাসচালক।
আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান পিল্লাই। স্থানীয় সম্প্রদায়ের সহায়তা ও বৃত্তির মাধ্যমে তাঁর শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেওয়ার কথা বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উঠে এসেছে। পরে তিনি নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন।
১৯৬৭ সালে তিনি নাটাল প্রদেশে নিজস্ব আইনচর্চা শুরু করেন। সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সমাজব্যবস্থায় একজন অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে আইন পেশায় প্রতিষ্ঠা পাওয়া ছিল কঠিন চ্যালেঞ্জ। বৈষম্য ও বাধা সত্ত্বেও তিনি আইনজীবী হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন ও বন্দিদের অধিকার
আইনজীবী হিসেবে পিল্লাই বর্ণবাদবিরোধী কর্মীদের পক্ষে কাজ করেন এবং রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখেন। রোবেন দ্বীপে বন্দিদের আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ ও আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকারের প্রশ্নেও তিনি কাজ করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর ১৯৯৫ সালে তিনি দেশটির হাইকোর্টে বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি হন দেশটির হাইকোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী বিচারক। এই নিয়োগ তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারব্যবস্থায় প্রতিনিধিত্ব ও বৈষম্যবিরোধী অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
রুয়ান্ডার গণহত্যা মামলায় ঐতিহাসিক ভূমিকা
পিল্লাই জাতিসংঘের রুয়ান্ডা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে ট্রাইব্যুনালের সভাপতি হন। ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যা-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৯৮ সালে *আকায়েসু* মামলার ঐতিহাসিক রায়ে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে গণ্য করার আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ রায় সংঘাতের সময় যৌন সহিংসতার বিচার এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত।
পিল্লাইয়ের বিচারিক কাজ আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা, যৌন অপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার পথ তৈরি করতে সহায়তা করে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও জাতিসংঘে দায়িত্ব
২০০৩ সালে পিল্লাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ছিলেন।
এই দায়িত্বে থাকাকালে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘন, সংঘাত, বৈষম্য এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের সর্বজনীন নীতি বাস্তবায়নের পক্ষে তাঁর অবস্থান কর্মজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, পূর্ব জেরুজালেম ও ইসরায়েলবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এই কমিশনের গাজা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন তাঁকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় বিচারকের দায়িত্ব
পিল্লাই বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলায় *ad hoc* বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মামলাটি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত কথিত গণহত্যা এবং গণহত্যা সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে।
এ ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিচারিক। তাঁকে রোহিঙ্গাদের আইনজীবী বা সরাসরি প্রতিনিধি হিসেবে বর্ণনা করা সঠিক নয়। মামলাটি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে গণহত্যা সনদের অধীনে মিয়ানমারের দায় নিয়ে আইনি প্রশ্ন বিবেচনা করা হচ্ছে।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের তাৎপর্য
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি জানিয়েছে, শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রসারে অবদানের জন্য পিল্লাইকে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা পুরস্কার ঘোষণার অন্যতম ভিত্তি।
তাঁর জীবনপথ দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সমাজে বৈষম্যের অভিজ্ঞতা থেকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে পৌঁছানোর এক দীর্ঘ যাত্রা। একই সঙ্গে তাঁর কাজ দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ শুধু আদালতের আইনি প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; তা বিশ্বরাজনীতি, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রগুলোর জবাবদিহির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল জয় তাই একজন আইনজ্ঞের ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিচার, মানবাধিকার এবং যুদ্ধাপরাধের দায় নির্ধারণ নিয়ে চলমান বৈশ্বিক বিতর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
