odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 12th October 2026, ১২th October ২০২৬
সার্ক পুনরুজ্জীবন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, দক্ষ জনশক্তির বিদেশে কর্মসংস্থান এবং রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশের অঙ্গীকার তুলে ধরলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার আঞ্চলিক সহযোগিতা ও নিরাপদ অভিবাসন: শামা ওবায়েদ

odhikarpatra | প্রকাশিত: ১২ October ২০২৬ ২১:৫২

odhikarpatra
প্রকাশিত: ১২ October ২০২৬ ২১:৫২

অধিকারপত্র ডটকম | কুটনৈতিক প্রতিবেদক

ঢাকা, ১২ অক্টোবর ২০২৬ : আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার, বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি, জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হতে হবে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য সুফল নিশ্চিত করা। কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয়তা তখনই প্রকৃত সাফল্যে রূপ নেবে, যখন তা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, জাতীয় উন্নয়ন এবং জনগণের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

## সার্ক পুনরুজ্জীবনে বাংলাদেশের অঙ্গীকার

শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শান্তি প্রতিষ্ঠা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সংহতি এবং অভিন্ন উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।

কার্যকর সংলাপ ও সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে দেশগুলোর মধ্যকার মতপার্থক্য বাধা হওয়া উচিত নয়। পারস্পরিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সংলাপের বিকল্প নেই।

বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা জোরদারে কাজ করছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জোট (আইওআরএ)-এর কার্যক্রমে বাংলাদেশের গঠনমূলক সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরেন।

আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে সম্মিলিত উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন শামা ওবায়েদ।

## বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের সক্রিয়তা

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিকতার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সার্বভৌম সমতা রক্ষা এবং বৈশ্বিক অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততার উদাহরণ হিসেবে ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের (এপিজি) নির্বাহী কমিটিতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি।

তার মতে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারে।

জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অর্থায়নের দাবি

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়টি তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান সীমিত হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটি ব্যাপক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় ন্যায্য অর্থায়ন, অভিযোজন সহায়তা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডে আরও বেশি প্রবেশাধিকার এবং সাশ্রয়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করবে বলেও জানান তিনি।

শামা ওবায়েদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য কেবল পরিবেশগত উদ্বেগের বিষয় নয়; এটি উন্নয়ন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

 দালাল চক্রের শোষণ বন্ধে নিরাপদ অভিবাসন

বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও কর্মীদের মর্যাদা রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালাল চক্রের শোষণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, প্রবাসী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে কর্মীদের দক্ষতা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের জনশক্তির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উন্নত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের কূটনৈতিক কার্যক্রম এখন প্রচলিত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাংস্কৃতিক বিনিময়, ক্রীড়া, সৃজনশীল শিল্প এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হচ্ছে।

জনগণের সমৃদ্ধিই কূটনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জাতীয় উন্নয়নে তার বাস্তব অবদান বিবেচনায় নেওয়ার ওপর জোর দেন শামা ওবায়েদ।

তিনি বলেন, কূটনৈতিক সম্পৃক্ততাকে জাতীয় অর্জনে, অংশীদারত্বকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের উপস্থিতিকে জনগণের জন্য অধিক সুযোগে রূপান্তর করতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু দেশের সাধারণ মানুষ। ফলে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ও কূটনৈতিক উদ্যোগের সুফল যেন সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে কূটনৈতিক উদ্যোগ

রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, টেকসই কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনসহ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক সহযোগিতা ও কার্যকর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে তার বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়।

সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন যারা

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান। তিনি স্বাগত বক্তব্যও দেন।

অনুষ্ঠানে সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির ও ড. সুফিয়া খানম এবং গবেষণা ফেলো এএসএম তারেক হাসান শিমুল ও আয়েশা বিনতে তৌহিদ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

সেমিনারে ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, বিদেশি কূটনীতিক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এই অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির অংশগ্রহণ, জলবায়ু অর্থায়ন প্রাপ্তি এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে নীতিগত অঙ্গীকারের পাশাপাশি বাস্তবায়ন, জবাবদিহি ও জনগণের কাছে সুফল পৌঁছে দেওয়ার ওপর।