—বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম| ঢাকা
বিশেষ দ্রষ্টব্য: শাহ আব্দুল করিম গান গেয়েছিলেন মরমী সাধনায়, আর আমাদের নেতারা গান গেয়ে শোনান ‘ভোটের সাধনায়’। করিমের নাও (নৌকা) ছিল ভবপারের তরী, আর নেতাদের নাও হলো বৈতরণী পার হওয়ার সিঁড়ি। তফাত শুধু ওইটুকুই—করিমের গানে শান্তি মেলে, আর নেতাদের গানে কেবল ভ্রান্তি!বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ২০২৬-এর জন্য ভোটার সচেতনতা বাড়াতে অধিকারপত্রের এক বিশেষ উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই ফিচার। সাথে শাহ আব্দুল করিমের সেই অমর সুরগুলোকে একটু ‘ভেজাল’ মিশিয়ে বর্তমান রাজনীতির রসে জারিত করে একটি প্যারোডি গান । হালকা‑ঝাল‑মজাদার ভঙ্গিতে টিউন করা প্যারোডির হাস্যরসাত্মক গানে রয়েছে প্যারালাল গভীর অর্থ। ফিচারটি পড়ুন। আর গানটি শুনুন বুঝুন উপভোগ করুন এবং এরপরে দেশ গড়তে আত্ম নিয়োাগ করুন। তবে বসন্তের কোকিলদের ভোটদানে বিরত থাকুন, নিজের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য। ফিচারের সাথে বোনাস হিসেবে আছে “ভোটের বাউলা গান ২.০: নেতার নাও ও বাউল বয়ান (শাহ আব্দুল করিমের সুরে ভোটের প্যারোডি – হাস্যরসে ঘরভরা সংস্করণ)”, যাতে পাঠকরা “হাসতে হাসতে ভোটের ভেলকিবাজি” বুঝে ফেলতে পারে। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ২০২৬-এর জন্য ভোটার সচেতনতা বাড়াতে অধিকারপত্রের এক বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে মিউজিক ভিডিও —ভোটের বাউলা গান ২.০: নেতার নাও ও বাউল বয়ান (শাহ আব্দুল করিমের সুরে ভোটের প্যারোডি – হাস্যরসে ঘরভরা সংস্করণ)।
বসন্তের কোকিল ও নেতার ডিজিটাল উছিলার ‘মায়া’: ভোটের আগে ও পরে শাহ করিমের গান
শীতের আমেজ কাটতে না কাটতেই প্রকৃতিতে এখন ফাল্গুনের আগাম হাওয়া।, ডালে ডালে যখন কচি পাতার মেলা, তখনই পাড়ার মোড়ে মোড়ে একঝাঁক ‘বসন্তের কোকিলের’ আগমন ঘটেছে। এদের গলার আওয়াজ অবশ্য কুহু-কুহু নয়, বরং অনেকটা ‘ভোট চাই, দোয়া চাই’ মার্কা। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম হয়তো জানতেন না যে, তার অমর সৃষ্টিগুলো একদিন আমাদের রাজনীতির এই সার্কাসকে এভাবে ব্যাখ্যা করবে। আসলে এই হাওয়া শুধু গাছের পাতায় নয়, লেগেছে সমাজের অলিতে-গলিতেও। কারণ সামনে নির্বাচন। আর নির্বাচন মানেই আমাদের চারপাশের সেই চিরচেনা ‘বসন্তের কোকিল’দের আগমন। শাহ আব্দুল করিমের গানের পঙক্তিগুলো যেন আজ আমাদের রাজনীতির এই বিচিত্র সার্কাসকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
বসন্ত বাতাসে নেতার আগমন: হঠাৎ করেই পাড়ার মোড়ে বড় বড় ডিজিটাল ব্যানারে নেতা হাসিমুখে হাত নেড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অথচ গত চার বছর তার ‘টিকিটা’ও কেউ দেখেনি। শাহ আব্দুল করিমের ভাষায় এখন সবার মনে বেজে উঠছে— ‘বসন্ত বাতাসে সই গো, বসন্ত বাতাসে...’। নেতার গায়ের দামি পারফিউমের গন্ধে এলাকার ধুলোবালিও যেন হঠাৎ সুগন্ধি হয়ে উঠেছে। এই বসন্তের কোকিলরা এখন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে কুহু কুহু রবে উন্নয়নের গান গাইছেন। বিরহী ভোটার, যে এতদিন না পাওয়ার যন্ত্রণায় দগ্ধ ছিল, সেও খানিকটা নড়েচড়ে বসছে।
মায়া লাগিয়ে পগারপার: ভোটের আগে নেতাদের জনসংযোগ দেখলে মনে হয়, এর চেয়ে আপন মানুষ আর দুনিয়াতে নেই। রিকশাওয়ালার কাঁধে হাত রাখা, বস্তির ঝুপড়িতে বসে চা খাওয়া—সবই যেন এক স্বর্গীয় প্রেমের অভিনয়। ভোটারদের মনে তখন গান বাজে— ‘বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে...’। নেতার এই ক্ষণস্থায়ী ভালোবাসার মায়ায় পড়ে সাধারণ মানুষ আবারও স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, এই ‘মায়া’ কেবল নির্বাচনের দিন পর্যন্তই। ভোট শেষ তো পিরিতও শেষ। বিচ্ছেদের সুর বাজতে তখন আর দেরি হয় না।
হারানো দিনের সেই সম্প্রীতি: নেতাদের এই বিভাজনের রাজনীতির ভিড়ে বড় বেশি মনে পড়ে করিমের সেই আর্তি— ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান মিলেমিশে যে সমাজ গড়ে উঠেছিল, ভোটের হাওয়া আসতেই সেখানে এখন স্বার্থের ভাগাভাগি। নেতারা এসে পাড়ায় পাড়ায় বিভেদের দেয়াল তুলে দেন। অথচ করিমের গানে ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের এক নিটোল ছবি। সেই সম্প্রীতির দিনগুলো আজ যেন কেবলই স্মৃতি, বর্তমানটা দখল করে নিয়েছে ভোটের স্বার্থে তৈরি করা কৃত্রিম কোলাহল।
আজব কারিগর ও ভোটের তরী: নির্বাচনের আগে কত রকমের ইশতেহার, কত রঙের প্রতিশ্রুতি! সাধারণ মানুষ অবাক হয়ে ভাবে, এই উন্নয়নের তরীটি কোন জাদুমন্ত্রে তৈরি? মনে পড়ে যায় করিমের সেই অমোঘ প্রশ্ন— ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইছে, কেমন দেখা যায়...’। নেতারা এমন সব ‘ডিজিটাল’ আর ‘স্মার্ট’ তরীর নকশা দেখান যেগুলোর পাল আছে কিন্তু হাল নেই। এই তরী কি আদেও মাঝ দরিয়া পার করতে পারবে, নাকি মাঝপথেই ভোটারদের ডুবিয়ে দিয়ে মেস্তরি সাহেব নতুন কোনো প্রজেক্টে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
গাড়ি চলে না, চলে না...:সবচেয়ে করুণ দৃশ্যটি দেখা যায় নির্বাচনের ঠিক ছয় মাস পর। ভোটের পর সেই বসন্তের কোকিলেরা ডানা মেলে উড়াল দেন শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অট্টালিকায়। গ্রামের ভাঙা রাস্তা আর আগের মতোই থেকে যায়। সাধারণ মানুষের জীবন দর্শনে তখন কেবল একটি গানই হাহাকার হয়ে বাজে— ‘গাড়ি চলে না চলে না, চলে না রে...’। উন্নয়নের চাকা থেমে যায়, কিন্তু মানুষের জীবনযুদ্ধের গাড়িটি কোনোমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে। যে নেতার পেছনে মানুষ একদিন পাগল হয়ে ঘুরেছিল, আজ সেই নেতাই ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই যেন আমাদের সমাজের এক চিরন্তন অসংগতি।
শুনুন ও উপভোগ করুন দ্বিতীয় গানটি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে: হাসতে হাসতে ভোটের ভেলকিবাজি (শাহ আব্দুল করিমের সুরে ভোটের প্যারোডি – হাস্যরসে ঘরভরা সংস্করণ)”, শুনুন ও উপভোগ করুন দ্বিতীয় গানটি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে: হাসতে হাসতে ভোটের ভেলকিবাজি (শাহ আব্দুল করিমের সুরে ভোটের প্যারোডি – হাস্যরসে ঘরভরা সংস্করণ)”,
অধিকারপত্রের সাথে আগামীর জাতীয় নির্বাচনে অবতীর্ণ হওয়া এক নেতার কাল্পনিক সাক্ষাৎকার
আপনার সম্মতি পেয়ে খুব আনন্দিত হলাম! শাহ আব্দুল করিমের কালজয়ী গানগুলোকে আমাদের সমাজের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বসিয়ে একটি রসালো অথচ গভীর জীবনবোধ সম্পন্ন ফিচার নিচে দেওয়া হলো:
- বসন্ত বাতাসে সই গো—নেতার আগাম সুবাস: চার বছর এমপি মহোদয়সহ তার চেলা চামন্ডা মেম্বার-চেয়ারম্যানের টিকিটা দেখা না গেলেও, ফাল্গুন আসতেই এলাকায় যেন পারফিউমের ঢল নেমেছে। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর দামী গাড়ির বহর দেখে মনে মনে বেজে ওঠে— “বসন্ত বাতাসে সই গো, বসন্ত বাতাসে... প্রাণের বন্ধু আসিবে কি না, আসিবে কি না গো...।” ভোটাররা জানে, ‘বন্ধু’ এসেছে ঠিকই, তবে সেটা প্রাণের টানে নয়, ব্যালট বক্সের টানে। এই বসন্তের হাওয়া কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে পাড়ার চায়ের দোকানে আজ বড় বেশি সংশয়।
- বন্দে মায়া লাগাইছে—প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে: নির্বাচনের আগে নেতার সে কী ভালোবাসা! রিকশাচালককে জড়িয়ে ধরা, বস্তির মাসির হাতে চা খাওয়া—সবই যেন এক স্বর্গীয় মায়ার খেলা। নেতা এমনভাবে চোখে চোখ রেখে কথা বলেন যে মনে হয়— “বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে, দেওয়ানা বানাইছে কি দিয়া...”। সাধারণ মানুষ সেই মায়ায় পড়ে ভুলে যায় গত চার বছরের অভাব-অনটন। এই সাময়িক পিরিতি যে আসলে ‘ডিজিটাল মোহ’, তা বুঝতে আমাদের আরও একটা বছর সময় লেগে যায়।
- কোন মেস্তরি নাও বানাইছে— ইশতেহারের রহস্য: নেতারা যখন বিশাল বিশাল উন্নয়নের ইশতেহার নিয়ে হাজির হন, তখন সাধারণ মানুষের চোখ ছানাবড়া। এমন সব ব্রিজের কথা বলেন যেখানে নদী নেই, এমন সব চাকরির কথা বলেন যেখানে লোক নেই। তাদের এই আজব উন্নয়নের তরী দেখে মনে প্রশ্ন জাগে— “কোন মেস্তরি নাও বানাইছে কেমন দেখা যায়, ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায়...।” বাহ্যিক চাকচিক্যে ভরা এই উন্নয়ন-তরীটি যে আসলে নির্বাচনের পর মাঝদরিয়ায় ভোটারদের ডুবিয়ে দেবে না, তার গ্যারান্টি সেই মেস্তরি সাহেবও দিতে পারেন না।
- আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম—স্মৃতির রোমন্থন: ভোটের বাজারে এখন বিভাজনের খেলা। পাড়ায় পাড়ায় দলাদলি, অমুক ভাইয়ের লোক আর তমুক ভাইয়ের গ্রুপিং। এসব দেখে বয়স্ক মানুষগুলো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবেন— “আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম... গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর ঘাটু গান গাইতাম।” এখন গানের বদলে চলে গালিগালাজ, আর সম্প্রীতির বদলে চলে স্বার্থের কামড়াকামড়ি। নেতারা আসেন সম্প্রীতির কথা বলে, কিন্তু দিয়ে যান বিভক্তির বিষ।
- গাড়ি চলে না চলে না—নির্বাচনের পরবর্তী বাস্তবতা: নির্বাচন শেষ। ফল ঘোষণা হলো। ‘বসন্তের কোকিল’ সাহেব এবার বিমানে চেপে বসলেন। এলাকার সেই ভাঙা রাস্তা আর আগের মতোই থেকে গেল। ভোটাররা ধুলোবালি মেখে রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় আফসোস করে গায়— “গাড়ি চলে না চলে না, চলে না রে... আমার দেহ-গাড়ি চলে না।” উন্নয়নের চাকা সেই যে নির্বাচনের দিন থমকে দাঁড়িয়েছে, আগামী পাঁচ বছরের আগে তা আর নড়বে বলে মনে হয় না। করিমের দেহতত্ত্ব যেন এখানে এসে সমাজের ‘উন্নয়নতত্ত্ব’ হয়ে দাঁড়ায়।
শেষ কথা
ভোট আসবে, যাবে। কিন্তু করিমের গানগুলো আমাদের কানে সবসময় এক কঠিন সত্যের সুর বাজিয়ে যাবে। নেতারা বসন্তের কোকিল হয়ে আসবে, আমাদের মায়ায় জড়াবে, কিন্তু দিনশেষে সেই সাধারণ মানুষের ‘গাড়ি’ আর চলবে না। তাই এবার মায়ায় পড়ার আগে অন্তত ‘মেস্তরি’ কে, তা যাচাই করা বড় বেশি প্রয়োজন।
নির্বাচন আসবে, নির্বাচন যাবে। বসন্তের কোকিলেরা আসবে আবার চলেও যাবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের চাকা কি আসলেও ঘুরবে? শাহ আব্দুল করিমের গানগুলো আমাদের শিখিয়ে দেয় জীবন দর্শন আর বাস্তবতার কঠোর সত্য। নেতারা যখন মায়া লাগিয়ে বিচ্ছেদ ঘটান, তখন করিমের গানই হয়ে ওঠে আমাদের একমাত্র আশ্রয়। আগামী নির্বাচনেও হয়তো নতুন কোনো ‘বসন্তের কোকিল’ আসবে, তবে ভোটাররা কি এবার আর সেই পুরোনো মায়ায় ভুলবে?
বি.দ্র:এই প্রতিবেদনটি রাজনীতির নয়, মানবতার কাহিনি। এটি একটি বাস্তবতার রম্য গল্প, যাদের চোখে আলো নেই, কিন্তু যাদের সাহস আছে আলো হয়ে ওঠার।
-অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: