— রম্য ব্যঙ্গাত্মক উপসম্পাদকীয়
বাঙালির মুখে বড় বড় কথা আর কাজের বেলায় সটকে পড়ার স্বভাব নিয়ে একটি বিস্তারিত ব্যঙ্গাত্মক ফিচার। বিপদে কেন চেনা মানুষ অচেনা হয়ে যায় এবং আমাদের হীন মানসিকতা কীভাবে সমাজকে পঙ্গু করছে, তা দেখুন।
ডিসক্লেমার: সমাজের অন্তর্গত অসঙ্গতি ও নেতিবাচক প্রবণতার প্রতি সচেতন দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে এই নিবন্ধটি ব্যঙ্গাত্মক ও রম্য আঙ্গিকে রচিত। এখানে ব্যবহৃত মন্তব্য, রূপক কিংবা ইঙ্গিত—সবই সামাজিক বাস্তবতার বিচ্যুতি তুলে ধরার প্রয়াসমাত্র; এর কোনো অংশই ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান বা মানহানির উদ্দেশ্যে নিবেদিত নয়। লেখাটি কোনো বাস্তব ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রতিচিত্র তুলে ধরার দাবি করে না।
বাঙালির মতো ‘টক-শো’ বিশেষজ্ঞ জাতি এই গ্রহে দ্বিতীয়টি নেই। আমাদের পাড়ার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ড্রয়িংরুমের সোফা—সবখানেই আমরা বিশ্ব রাজনীতির সমাধান দিয়ে ফেলি। আমাদের কথা শুনলে মনে হবে, জো বাইডেন থেকে শুরু করে পুতিন সাহেব পর্যন্ত সবাই আমাদের পরামর্শ নিয়ে চলেন। কিন্তু ট্র্যাজেডিটা হলো, যে বাঙালি মুখে মুখে হিমালয় জয় করে ফেলে, সেই বাঙালিই যখন দেখে তার পাশের ফ্ল্যাটে চোর ঢুকেছে বা তার বন্ধু বিপদে পড়েছে, তখন সে হঠাৎ ‘মৌনীবাবা’ হয়ে যায়। আজ আমরা বাঙালির সেই জগতবিখ্যাত হীন মানসিকতা এবং ‘বিপদে সটকে পড়ার’ অলিম্পিক-জয়ী প্রতিভার ব্যবচ্ছেদ করব।
১. কথার তুবড়ি বনাম কাজের খরা
বাঙালি চেনে না এমন কোনো বিষয় পৃথিবীতে নেই। ধর্ম, রাজনীতি, খেলাধুলা, এমনকি মহাকাশ বিজ্ঞান—সবকিছুতেই আমাদের অগাধ পাণ্ডিত্য। আমরা যখন আড্ডা দিই, তখন আমাদের একেকজনের তর্জনী হেলনে ব্রহ্মাণ্ড কেঁপে ওঠে। "আরে ভাই, ওটা তো কোনো ব্যাপারই না, আমি থাকলে এক তুড়িতে সমাধান করে দিতাম"—এই ডায়লগটি আমাদের জাতীয় স্লোগান হওয়া উচিত।
কিন্তু মুশকিল হলো, এই ‘তুড়ি’ মারার শক্তিটা আমাদের কেবল ড্রয়িংরুমের এসি হাওয়াতেই কাজ করে। যেই মুহূর্তেই বাস্তব কোনো সমস্যা সামনে আসে, অমনি আমাদের হাঁটু কাঁপতে শুরু করে। আমাদের বীরত্ব তখন কেবল ফেসবুকের স্ট্যাটাসে সীমাবদ্ধ থাকে। আমরা অন্যের বিপদে ‘রিঅ্যাক্ট’ দিতে ওস্তাদ, কিন্তু হাত বাড়াতে গেলেই আমাদের পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়ে। এই যে মুখে বড় বড় কথা আর কাজের বেলায় লবডঙ্কা—এটাই আমাদের হীন মানসিকতার প্রথম ধাপ।
২. বিপদে ‘অদৃশ্য’ হওয়ার জাদুকরী বিদ্যা
বাঙালির হীন মানসিকতার সবচেয়ে বড় প্রকাশ ঘটে বিপদের সময়। ধরুন, আপনার এক বন্ধু আপনার সাথে ২৪ ঘণ্টা আঠার মতো লেগে থাকে। সে আপনার জন্য রক্ত দিয়ে দেবে, জীবন দিয়ে দেবে—এমন সব প্রতিশ্রুতি সে প্রতিদিন দেয়। কিন্তু যেই আপনি একদিন তাকে ফোন করে বললেন, "বন্ধু, আমি একটা সমস্যায় পড়েছি, একটু আসতে পারবে?" অমনি দেখবেন তার ফোনের নেটওয়ার্ক ‘এরিনা’র বাইরে চলে গেছে।
বিপদে সটকে পড়ার ক্ষেত্রে আমাদের এই সুহৃদরা হ্যারি পটারের ‘ইনভিজিবিলিটি ক্লক’ বা অদৃশ্য হওয়ার চাদরের চেয়েও শক্তিশালী প্রযুক্তি ব্যবহার করে। হঠাৎ করে তাদের শাশুড়ির পিত্তথলিতে ব্যথা ওঠে, অথবা তাদের অফিসের এমন এক জরুরি ফাইল হারায় যা উদ্ধার করতে তাদের মঙ্গল গ্রহে যেতে হয়। চেনা মানুষগুলো কীভাবে চোখের পলকে অচেনা হয়ে যায়, তা দেখতে হলে আপনার একবার অর্থনৈতিক বা সামাজিক বিপদে পড়া দরকার। বাঙালির এই হীন মানসিকতা আসলে এক ধরনের আত্মকেন্দ্রিক ভীরুতা, যা আমরা ‘ব্যস্ততা’র প্রলেপ দিয়ে ঢেকে রাখতে চাই।
৩. নীচু মনের পরিচয়: অন্যের ক্ষতিতে স্বর্গীয় সুখ
বাঙালির হীনম্মন্যতার আরেক নাম হলো ‘পরশ্রীকাতরতা’। আমরা নিজের উন্নতিতে যতটা না খুশি হই, তার চেয়ে ঢের বেশি পরম আনন্দ পাই যখন দেখি আমাদের পাশের বাড়ির মোতালেব সাহেবের ছেলে পরীক্ষায় ফেল করেছে। এই যে অন্যের কষ্টে নিজের মনের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে ওঠা—এটাই আমাদের নীচু মনের পরিচয়।
আমরা মুখে মুখে বলি "সবার মঙ্গল চাই", কিন্তু মনে মনে জপ করি—"হে ভগবান, ওর যেন ওটা না হয়।" আপনি যদি নতুন একটা গাড়ি কেনেন, তবে আপনার পরিচিত মানুষগুলো আপনার সামনে বলবে, "বাহ! খুব সুন্দর গাড়ি।" কিন্তু আপনি ঘর থেকে বের হতেই তারা একে অপরের কান ফিসফিস করবে, "নিশ্চয়ই ঘাপলা আছে, এত টাকা পেল কোথায়?" এই হীন মানসিকতা আমাদের ডিএনএ-তে এমনভাবে ঢুকে গেছে যে, আমরা কারো সাফল্যকে নির্মলভাবে অভিনন্দন জানাতে ভুলে গিয়েছি।
৪. হিরোইজম বনাম ভীরুতা: আমরা ও আমাদের সমাজ
আমরা সিনেমা দেখি হিরোদের, কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রত্যেকেই একেকজন ‘সাইড ক্যারেক্টার’ হয়ে থাকতে ভালোবাসি। যখন রাস্তায় কোনো মেয়ে উত্ত্যক্ত হয়, অথবা কোনো বৃদ্ধ দুর্ঘটনার শিকার হন, তখন আমাদের প্রথম কাজ হলো মোবাইল বের করে ভিডিও করা। আমরা ভাবি—"আমি কেন ঝামেলায় জড়াব? আমার তো পরিবার আছে।"
এই যে নিজের পিঠ বাঁচিয়ে চলা এবং দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া, এটাই আমাদের জাতীয় চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা মুখে নীতির কথা বলি, কিন্তু নীতির প্রয়োগ যখন নিজের ওপর আসে, তখন আমরা ‘অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র’ সেজে বসে থাকি। চেনা মানুষটি যখন বিপদে পড়ে আপনার দিকে হাত বাড়ায়, আপনি তখন সেই হাতটা ধরার বদলে ঘড়ি দেখেন। এই যে বিপদের সময় স্বার্থপরতার চরম বহিঃপ্রকাশ, এটাই আমাদের হীন মানসিকতার চূড়ান্ত নমুনা।
৫. কুৎসা রটানো ও চরিত্রের ব্যবচ্ছেদ
বাঙালি কুৎসা রটাতে এবং অন্যের চরিত্রের পোস্টমর্টেম করতে খুব ভালোবাসে। আপনি যদি ভালো কাজ করেন, তবে তারা আপনার ভালো কাজের পেছনের ‘খারাপ উদ্দেশ্য’ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আর আপনি যদি একটু ভুল করেন, তবে সেই তিলকে তাল বানিয়ে তারা সারা পাড়ায় ঢোল পিটিয়ে বেড়াবে।
আমাদের আড্ডার প্রধান মশলাই হলো অন্যের নামে নিন্দা করা। আমরা যখন কারো সাথে দেখা করি, তখন আমরা খুব মিষ্টি করে কথা বলি। আর সে চলে যেতেই আমরা শুরু করি তার গীবত গাইতে। এই দ্বিমুখী আচরণ আমাদের সমাজকে এক বিষাক্ত নরকে পরিণত করেছে। আমরা মুখে সবিই করে ফেলি, কিন্তু অন্তরে পুষে রাখি ঘৃণা আর হীনম্মন্যতা।
৬. চেনা মানুষের রূপবদল: একটি সামাজিক ট্র্যাজেডি
অদ্ভূত এই দেশে যখন আপনার সময় ভালো থাকবে, তখন আপনার চারপাশ থাকবে চাটুকারে ঠাসা। সবাই বলবে আপনিই তাদের আইডল। কিন্তু যেই আপনার সময়টা একটু খারাপ হবে, আপনি দেখবেন সেই মানুষগুলোই আপনার বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। বিপদে পড়ার পর মানুষ যখন বুঝতে পারে যে তার এতদিনকার চেনা মানুষগুলো আসলে স্রেফ মুখোশ পরে ছিল, তখন সেই আঘাত সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই যে চেনা মানুষের অচেনা হওয়া—এটা কেবল ব্যক্তিগত বিচ্ছেদ নয়, এটা একটি সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র। আমাদের মূল্যবোধ এখন আর মনুষ্যত্বের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, দাঁড়িয়ে আছে স্বার্থের ওপর। যার থেকে কাজ আদায় করা যাবে, সে আমার ‘ভাই’। আর যার থেকে পাওয়ার কিছু নেই, সে আমার ‘কেউ না’। এই হীন মানসিকতা আমাদের মানবিক বন্ধনগুলোকে সুতোর মতো আলগা করে দিচ্ছে।
৭. সাহায্যের বদলে পা টেনে ধরা
আপনি যদি কোনো মহৎ কাজ করতে চান, বাঙালি আপনাকে সাহায্য করার বদলে কেন সেই কাজটা হবে না—তার এক হাজার একটা যুক্তি দেবে। তারা আপনাকে নিরুৎসাহিত করতে কোমর বেঁধে নামবে। সাহায্য চাওয়া তো দূরের কথা, তারা উল্টো আপনার পথে কাঁটা বিছিয়ে দেবে।
বিপদে কেউ নেই, কিন্তু আপনার ভুল ধরতে সবাই লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাহায্যের হাত বাড়াতে পকেট খালি হয়ে যায়, কিন্তু সমালোচনা করতে কোনো খরচ লাগে না। এই যে মুখ দিয়ে পাহাড় সমান প্রতিশ্রুতি দেওয়া আর বাস্তব ময়দানে শূন্য হাতে দাঁড়ানো—এটাই আমাদের হীন মানসিকতার শ্রেষ্ঠ প্রতিফলন।
৮. সমাধান কোথায়? নাকি এভাবেই চলবে?
আমরা কি চিরকালই এই হীন মানসিকতা নিয়ে বাঁচব? আমাদের বিবেক কি কোনোদিন ওই স্বার্থপরতার দেয়াল ভেদ করে বেরিয়ে আসবে না? আসলে আমাদের দরকার একটি ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ নয়, একটি ‘মেন্টাল ডিটক্স’। আমাদের শিখতে হবে যে, অন্যের উন্নতিতে খুশি হওয়াটাই আসল আভিজাত্য।
বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো দয়া নয়, এটা মানুষের কর্তব্য। আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত মুখোশ খুলে আয়নার সামনে দাঁড়াতে না পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই হীনম্মন্যতার হাত থেকে বাঁচতে পারব না। আমাদের সন্তানদের জিপিএ-৫ পাওয়ার শিক্ষার পাশাপাশি ‘মানুষের পাশে দাঁড়ানো’র শিক্ষাও দিতে হবে।
শেষ কথা: আয়নার সামনে বাঙালি
পরিশেষে বলতে চাই, বাঙালির এই হীন মানসিকতা ও নীচু মনের পরিচয় দূর করতে হলে আগে নিজের ভেতরে তাকাতে হবে। অন্যের বিপদে সটকে না পড়ে সাহস করে দাঁড়াতে শিখতে হবে। কথা কম বলে কাজ বেশি করতে হবে।
মুখে বড় বড় বুলি আউড়ানো সহজ, কিন্তু একজন মানুষের দুর্দিনে তার হাতটা শক্ত করে ধরা অনেক কঠিন। আমরা কি সেই কঠিন কাজটা করতে পারব? নাকি চিরকাল সেই ‘কথার তুবড়ি’ ছুটিয়েই জীবন পার করে দেব? বিপদে চেনা মানুষ অচেনা হওয়ার এই ট্র্যাজেডি যদি আমরা বন্ধ করতে না পারি, তবে একদিন আমাদের এই সমাজটা হবে এক বিশাল ‘মরুভূমি’—যেখানে বালু আছে অনেক, কিন্তু এক ফোঁটা প্রাণ নেই।
আসুন, হীন মানসিকতা ছেড়ে উদার হই। অন্তত বিপদের সময় চেনা মানুষটি যেন আপনাকে তার পাশে পায়, সেই চেষ্টাটুকু করি। তা না হলে আমাদের এই প্রবৃদ্ধি, এই উন্নয়ন আর এই বড় বড় কথা সবই একদিন ইতিহাসের ডাস্টবিনে স্থান পাবে। হীনম্মন্যতা কাটিয়ে প্রকৃত মানুষ হওয়াই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
— অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#BengaliSatire #SocialCritique #Hypocrisy #BengaliCulture #Satire #ModernSociety #HumanNature #BanglaFeature

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: