—বর্তমান যুগের ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ সংস্কৃতি নিয়ে একটি ছোট রম্য গল্প
সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক, ফিল্টার আর ভুয়া সুখের পেছনে লুকানো বাস্তবতা নিয়ে প্রবাদভিত্তিক রম্য গল্প—ডিজিটাল যুগের হাঁদা ভোলা। এটি এমন এক গল্প, যা আমাদের শেখায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় যা দেখা যায়, তা সব সময় সত্য নয়। লাইক, ছবি বা বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে মানুষ বা জীবনকে বিচার করা উচিত নয়। প্রকৃত মূল্য আসে মানুষের কাজ, আচরণ ও বাস্তব জীবনের দায়িত্ববোধ থেকে। তাই সকলের বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের উচিত ভার্চুয়াল দুনিয়ার প্রদর্শনের চেয়ে সততা, পরিশ্রম ও বাস্তব দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া। মনে রাখতে হবে—দেখাতে ভালো হওয়া নয়, ভালো মানুষ হওয়াই আসল সাফল্য।
ডিজিটাল যুগের ‘হাঁদা ভোলা’
আজকালকার দুনিয়াটা সত্যিই বড় অদ্ভুত। মানুষ এখন আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে না, মোবাইলের ফ্রন্ট ক্যামেরায় দেখে। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা—সবকিছুর প্রমাণ রাখতে হয় ছবিতে, ভিডিওতে, স্ট্যাটাসে। চোখে দেখা বাস্তব নয়, স্ক্রিনে দেখা সত্য। এই যুগে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, “তুমি কেমন আছ?”—তার আসল মানে হয়, “তোমার সাম্প্রতিক পোস্টে কয়টা লাইক পড়েছে?”
এই উপলব্ধিটা আমার হাড়ে হাড়ে ঢুকল সেদিন, আমার বন্ধু মহেশের কাণ্ড দেখে।
মহেশ আমার বহুদিনের বন্ধু। বন্ধুত্বের বয়স যতটা পুরোনো, তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের সংখ্যাও প্রায় ততটাই। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, থ্রেডস—যা নেই তা বোধহয় টেলিগ্রাফ। সে বিশ্বাস করে, পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্বের প্রমাণ জন্মসনদে নয়, প্রোফাইল পিকচারে।
সেদিন আমরা দু’জন একটা নামকরা রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম। ঢুকেই দেখি মহেশের চোখ চকচক করছে—খাবারের দিকে নয়, আলো আর ব্যাকগ্রাউন্ডের দিকে। ওয়েটার মেনু ধরিয়ে দিল, কিন্তু মহেশ সেটা না দেখে চারদিকে তাকাতে লাগল। চেয়ার ঠিক করছে, টেবিলের কোণ ঘোরাচ্ছে, লাইটের নিচে প্লেট বসাচ্ছে। মনে হলো খাবার নয়, কোনো সিনেমার দৃশ্য সাজাচ্ছে।
খাবার এল। গরম গরম। ধোঁয়া উঠছে। আমার পেট তখন বিপ্লব ঘোষণা করার পথে। আমি বললাম— “খাবি কখন?”
মহেশ গম্ভীর মুখে বলল,— “আগে পোস্ট করি। মানুষ দেখুক আমি কী খাচ্ছি। ছবির ইমপ্যাক্ট বুঝিস? একটা ছবিই বলে দেবে আমি কতটা সুখে আছি!”
এই বলে সে খাবারের চারপাশে ঘুরে ঘুরে ছবি তুলতে লাগল। ওপর থেকে, পাশ থেকে, তির্যক কোণ থেকে। একসময় খাবার ঠান্ডা হয়ে গেল, কিন্তু মহেশের উৎসাহ কমল না। সে ফিল্টার বদলাচ্ছে, ক্যাপশন ভাবছে, হ্যাশট্যাগ সাজাচ্ছে।
আমি চুপচাপ বসে ভাবলাম—ব্যাটা তো দিনরাত স্ট্যাটাস দেয় মানুষের সেবা করবে, সমাজ বদলাবে, দেশ গড়বে। কিন্তু বাস্তবে নিজের প্লেটের মাছির দিকেও নজর নেই। একেই বলে, “Actions speak louder than words।” মুখে বড় বড় বুলি, কাজের বেলায় ঢনঢন।
এমন সময় পাশের টেবিলে চোখ গেল। এক ভদ্রলোক বসে আছেন। গায়ে খুব সাধারণ, একটু মলিন পাঞ্জাবি। পায়ে স্যান্ডেল। দেখে মনে হয় যেন এই রেস্তোরাঁর পাশের গলিতেই তাঁর দোকান। মহেশ তাঁকে দেখে নাক সিঁটকে বলল,— “দেখেছিস? নিশ্চয়ই কোনো গরিব মানুষ ভুল করে দামী রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়েছে!”
আমি কিছু বললাম না। অপেক্ষা করলাম। কারণ অভিজ্ঞতা বলে, বাস্তব জীবনে নাটক সবচেয়ে ভালো হয় শেষ দৃশ্যে।
খাবার শেষে বিল এল। ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা চকচকে আইফোন বের করলেন। কিউআর কোড স্ক্যান করে কয়েক হাজার টাকার বিল মুহূর্তে মিটিয়ে দিলেন। তারপর শান্তভাবে উঠে গেলেন।
আমি মহেশের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললাম,— “Don’t judge a book by its cover।”
মহেশ একটু লজ্জা পেল। তার ফিল্টার দেওয়া দুনিয়ায় বাস্তবটা হঠাৎ ঢুকে পড়েছে।
ঠিক তখনই মহেশের ফোনে নোটিফিকেশন বেজে উঠল। সে স্ক্রিনে চোখ রাখতেই মুখটা কুঁচকে গেল।— “ধুর! আমার ওই পুরোনো বন্ধুটা এখানে চেক-ইন দিয়েছে।”
আমি বললাম,— “তো? তাতে কী?”
মহেশ ফিসফিস করে বলল,— “ও তো একেবারেই অযোগ্য। কিছুই পারেনি জীবনে। দেখ দেখ, অযোগ্য লোকগুলো সব এখানে ভিড় করছে!”
আমি আর পারলাম না। বলেই ফেললাম,— “Birds of a feather flock together। তোরা সব একই স্বভাবের মানুষ বলেই তো একই জায়গায় এসে জুটেছিস!”
মহেশ কিছু বলল না। শুধু ফোনে চোখ রেখে অন্যদের পোস্ট স্ক্রল করতে লাগল। কার ছবি কত সুন্দর, কার লাইফ কত পারফেক্ট—এই হিসাবেই তার সময় কাটে।
রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে আমরা হাঁটতে হাঁটতে বাসস্ট্যান্ডের দিকে রওনা হলাম। হঠাৎ মহেশ ভারী গলায় বলল,— “দোস্ত, অনেক দেরি হয়ে গেল জীবনে। কিছুই করতে পারলাম না।”
আমি একটু থেমে বললাম,— “আরে ধুর! Better late than never। আজ থেকে শুরু কর।”
মহেশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিন্তু তার চোখে তখনো ফোনের আলো। সে হয়তো ভাবছে—এই দুঃখের কথাটা কীভাবে স্টোরিতে দেবে।
হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এল। ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। আমি ভিজে যাচ্ছি, তাতে তেমন মাথাব্যথা নেই। কিন্তু মহেশ একেবারে দিশেহারা। সে এক হাতে ফোনটা বুকে চেপে ধরে দৌড়াচ্ছে। নিজের শরীর ভিজুক, তাতে আপত্তি নেই—ফোন ভিজলেই সর্বনাশ।
আমি হেসে বললাম,— “চিন্তা করিস না। Every cloud has a silver lining। এই বৃষ্টির ছবি তুলেই তুই ফেসবুকে হাজারটা লাইক পাবি!”
মহেশ থেমে গেল। বৃষ্টির মাঝেই সেলফি তুলতে শুরু করল। পেছনে মেঘ, সামনে তার মুখ—ক্যাপশন নিশ্চয়ই হবে, “Rainy mood.”
বাস এলো। ভিড় ঠেলে উঠতে গিয়ে হঠাৎ মহেশের পাঞ্জাবির একটা সেলাই ছিঁড়ে গেল। আমি বললাম,— “বাসায় গিয়েই সেলাই করে নিস। A stitch in time saves nine। এখন ঠিক না করলে কাল পুরোটা ছিঁড়ে যাবে।”
মহেশ বিরক্ত হয়ে বলল,— “তোর ওই প্রবাদগুলো তোর কাছেই রাখ!”
তারপর একটু থেমে যোগ করল,— “এই ডিজিটাল যুগে All that glitters is not gold—সেটা তোর ওই ফিল্টার দেওয়া ছবিগুলো দেখলেই বোঝা যায়!”
আমি চুপ করে রইলাম। কারণ বুঝলাম—মহেশ নিজেই জানে সে কী। তবু সে বদলায় না। কারণ বদলাতে গেলে আগে ফোন নামাতে হয়, চোখ তুলতে হয়, বাস্তব দেখতে হয়। আর সেটাই এই যুগের সবচেয়ে কঠিন কাজ।
ডিজিটাল যুগের হাঁদা ভোলা আসলে কেউ আলাদা মানুষ নয়। সে আমরা সবাই। যে লাইককে ভালোবাসা ভাবি, ফলোয়ারকে সাফল্য ভাবি, আর ফিল্টার দেওয়া হাসিকে সুখ বলে মেনে নিই। বাস্তবটা ততক্ষণ বিরক্তিকর, যতক্ষণ না সেটাকে পোস্ট করা যায়।
এই যুগে হাঁদা ভোলা মানে বোকা নয়। হাঁদা ভোলা মানে—সব জানে, তবু বোঝে না। সব দেখে, তবু দেখে না। বাস্তব হাতছাড়া হয়ে গেলেও স্ক্রিন আঁকড়ে ধরে থাকে।
আর তাই এই গল্প শুধু মহেশের নয়। এটা আমাদের সবার।
এই গল্পের মূল শিক্ষা হলো—সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলক আর বাস্তব জীবনের সত্য এক নয়। বাহ্যিক চাকচিক্য, ফিল্টার দেওয়া ছবি বা অনলাইন স্ট্যাটাস দেখে মানুষ, সুখ বা সাফল্যকে বিচার করা ভুল। কাজ, আচরণ ও বাস্তব জীবনই মানুষের প্রকৃত পরিচয়। ডিজিটাল যুগে সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমত্তা হলো—দেখে নয়, বুঝে বিশ্বাস করা।
- অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#ডিজিটালযুগ #হাঁদাভোলা #সোশ্যালমিডিয়াসংস্কৃতি #রম্যগল্প #ব্যঙ্গরচনা #ফেসবুকজীবন #ফিল্টারবাস্তবতা #সমসাময়িকগল্প #নগরজীবন #SocialMediaLife #DigitalSatire #HumorStory #ModernLife

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: