odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 5th May 2026, ৫th May ২০২৬
তিস্তা, সীমান্ত, সিএএ-এনআরসি ও দিল্লী-ঢাকা সম্পর্কের জটিল সমীকরণে পশ্চিমবঙ্গের পালাবদল বাংলাদেশের জন্য কতটা স্বস্তি, আর কতটা নতুন কূটনৈতিক উদ্বেগ?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন: বাংলাদেশের জন্য স্বস্তি না নতুন সংকট? নবরূপে ভবিতব্য│সম্পাদকীয়

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৫ May ২০২৬ ০৩:১৮

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৫ May ২০২৬ ০৩:১৮

অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয়

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের তিস্তা চুক্তি, সীমান্তনীতি, বাণিজ্য ও দিল্লী-ঢাকা সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলতে পারে—তার গভীর সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ।

পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতা কাহার হস্তে ন্যস্ত হইবে, এই প্রশ্ন কেবল ভাগীরথী-তীরবর্তী জনপদের নহে। উহা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলেও গভীর উদ্বেগের কারণ হইয়া থাকে। কারণ, চতুঃসহস্রাধিক কিলোমিটার বিস্তৃত সীমারেখা, চুয়ান্নটি অভিন্ন নদনদী এবং ভাষা-সংস্কৃতির নিবিড় বন্ধন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বায়ুপ্রবাহকে বাংলাদেশের অন্তঃপুরে প্রবেশ করাইয়া দেয়। সম্প্রতি এইরূপ জিজ্ঞাসা উত্থিত হইয়াছে যে, তৃণমূল কংগ্রেসের পরিবর্তে যদি অপর কোনো রাজনৈতিক দল, বিশেষতঃ ভারতীয় জনতা পার্টি, নবান্নের অধিকারী হয়, তবে তাহা ঢাকার পক্ষে মঙ্গলজনক হইবে, নাকি নবতর সঙ্কটের সূচনা করিবে? 

এই প্রশ্নের উত্তর একবাক্যে প্রদান করা দুঃসাধ্য। তথাপি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাস, চলমান ঘটনাপ্রবাহ এবং ক্ষেত্রবিশেষের বাস্তবতা পর্য্যালোচনা করিলে প্রতীয়মান হয় যে, অদূর ও মধ্যম মেয়াদে এই পরিবর্তন বাংলাদেশের পক্ষে অস্বস্তিই অধিক পরিমাণে আনয়ন করিবে। দীর্ঘ মেয়াদে যদিও কিঞ্চিৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হইতে পারে, তথাপি তাহা সম্পূর্ণরূপে দিল্লীর সদাশয়তার উপর নির্ভরশীল। কলিকাতা এস্থলে নিয়ামক নহে, কেবল অনুঘটকমাত্র। 

তিস্তা-প্রসঙ্গ: এক দ্বার রুদ্ধ হইলে অন্য দ্বার কি উন্মুক্ত হইবে

তিস্তা নদীর জলবণ্টন চুক্তি বিগত এক যুগের অধিককাল যাবৎ অমীমাংসিত রহিয়াছে, এবং ইহার প্রধান অন্তরায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তি। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহুবার ঘোষণা করিয়াছেন যে, উত্তরবঙ্গের কৃষককুলকে বঞ্চিত করিয়া তিনি জলপ্রদান করিতে অক্ষম। সুতরাং কেন্দ্রীয় সরকারের সদিচ্ছা সত্ত্বেও রাজ্যের বাধায় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় নাই। 

এক্ষণে যদি ভারতীয় জনতা পার্টি রাজ্যে ক্ষমতাসীন হয়, তবে কেন্দ্র-রাজ্য বিরোধের অবসান ঘটিবে বলিয়া অনুমিত হয়। ইহাতে চুক্তি সম্পাদনের পথের প্রধানতম প্রতিবন্ধক অপসারিত হইবে। কিন্তু বাস্তবতা এতাদৃশ সরল নহে। ভারতীয় জনতা পার্টির রাজ্য নেতৃবৃন্দও নির্বাচনী প্রচারণায় ‘বাংলার স্বার্থ সর্বাগ্রে’ এই ধ্বনি উচ্চারণ করিয়াছেন। জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের কৃষকগণের মনস্তুষ্টি ব্যতিরেকে কোনো দলই তিস্তার জল পরিত্যাগ করিতে সমর্থ হইবে না। অতএব, বিজেপি ক্ষমতায় আসিলেও বাংলাদেশ সম্ভবতঃ প্রত্যাশিত পঞ্চাশ শতাংশের স্থলে পঞ্চবিংশতি শতাংশ জল প্রাপ্ত হইবে। অর্থাৎ অচলাবস্থার অবসান ঘটিলেও ঢাকার অভীষ্ট সিদ্ধ হইবে না। পক্ষান্তরে, কংগ্রেস অথবা বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসিলে তাহারা ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল হইলেও, দিল্লীতে ক্ষমতাহীন থাকিবার কারণে চুক্তি কার্যকর করিবার সামর্থ্য তাহাদের থাকিবে না। সুতরাং তিস্তার হিসাবে পালাবদলের অর্থ ‘গুরুতর মন্দ হইতে ঈষৎ লঘু মন্দ’। 

সীমান্তের রাজনীতি: বাণিজ্য বৃদ্ধি পাইবে, কিন্তু বন্দুকের নলও উত্তপ্ত হইবে 

পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়া বৎসরে প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ সহস্র কোটি টাকার বাণিজ্য সম্পাদিত হয়। তৃণমূল শাসনামলে এই বন্দরে স্থানীয় পর্যায়ে বলপূর্বক অর্থ আদায় ও পণ্যবাহী যান আটকাইয়া রাখা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বিজেপি ক্ষমতায় আসিলে ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’র কারণে স্থলবন্দরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পাইবে এবং পরিকাঠামো নির্মাণে কেন্দ্রীয় অর্থ বরাদ্দ সহজসাধ্য হইবে। ফলতঃ বৈধ বাণিজ্য বিশ হইতে ত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাইতে পারে। ইহা বাংলাদেশের অর্থনীতির পক্ষে শুভ সংবাদ। 

কিন্তু মুদ্রার অপর পৃষ্ঠও বিদ্যমান। বর্তমানে সীমান্ত হত্যা লইয়া ঢাকা সোচ্চার হইলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। ইহা বাংলাদেশকে একপ্রকার কূটনৈতিক আবরণ প্রদান করে। রাজ্যে বিজেপি আসিলে কেন্দ্র ও রাজ্য একযোগে বক্তব্য প্রদান করিবে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কার্যকলাপে নিয়ন্ত্রণ আরোপের রাজনৈতিক চাপ হ্রাস পাইবে। তদপেক্ষা গুরুতর আশঙ্কা সিএএ ও এনআরসি লইয়া। পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি প্রবর্তনের প্রস্তাব উত্থাপিত হইলেই ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ বিতর্ক পুনরায় মস্তক উত্তোলন করে। এই বাগাড়ম্বর ঢাকার রাজনীতিতে অগ্নিসংযোগ করে। বিরোধী দল তখন সরকারকে ‘ভারতের ক্রীড়নক’ বলিয়া অপপ্রচার চালায়। সরকার জনসমর্থন রক্ষার্থে দিল্লী হইতে দূরত্ব সৃষ্টি করিতে বাধ্য হয়। পরিণামে সন্ত্রাসবাদ দমন, ট্রানজিট ও নদী ব্যবস্থাপনার ন্যায় সহযোগিতার ক্ষেত্রসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

সম্পর্কের রসায়ন: পরিচিত মিত্রের প্রস্থানে শূন্যতা কে পূরণ করিবে

মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সহিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত হৃদ্যতা বিগত পঞ্চদশ বর্ষে বহু ক্ষুদ্র সঙ্কটকে বৃহৎ আকার ধারণ করিতে দেয় নাই। উভয় নেত্রীই ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির পক্ষপাতী এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে দৃঢ়। এই অন্তরালবর্তী যোগাযোগের সূত্র ছিন্ন হইলে ঢাকাকে তখন প্রত্যক্ষভাবে দিল্লীর সহিত বোঝাপড়া করিতে হইবে। 

বিজেপি ক্ষমতায় আসিলে আদর্শগত দূরত্ব বৃদ্ধি পাইবে। বিজেপির হিন্দুত্ববাদী পরিচিতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে গলগ্রহস্বরূপ হইয়া দাঁড়ায়। তখন সরকারকে জনসমর্থন অক্ষুণ্ণ রাখিতে ভারত হইতে ইচ্ছাকৃতভাবেই কিঞ্চিৎ দূরে সরিয়া যাইতে হয়। অপরদিকে, কংগ্রেস বা বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসিলে মানসিক স্বস্তি থাকিলেও তাহারা দিল্লীতে ক্ষমতাহীন। ফলতঃ ঢাকা তখন বিকল্প হিসাবে চীনের দিকে অধিকতর ঝুঁকিয়া পড়িতে পারে। 

শেষ কথা: কলিকাতা নহে, দৃষ্টি রাখিতে হইবে দিল্লীর প্রতি 

সর্বোপরি, পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতার হস্তান্তর বাংলাদেশের জন্য আগামী এক হইতে তিন বৎসর পর্যন্ত অস্বস্তিই বহন করিয়া আনিবে। সীমান্তে কড়াকড়ি বৃদ্ধি পাইবে, সিএএ-এনআরসি বিতর্কে ঢাকার রাজনীতি উত্তপ্ত হইবে, এবং পরিচিত কূটনৈতিক যোগসূত্রটি বিচ্ছিন্ন হইবে। তিস্তা বিষয়ে সামান্য অগ্রগতি হইলেও রাজনৈতিক মূল্য তাহার তুলনায় অধিক প্রদান করিতে হইবে। 

তথাপি পঞ্চবর্ষ পরবর্তী চিত্র ভিন্ন হইতে পারে। যদি দিল্লী অভিলাষ করে, তবে কেন্দ্র-রাজ্যের ঐক্যের সুবাদে তিস্তা চুক্তি, গঙ্গা চুক্তি নবায়ন এবং বিবিআইএন মোটর ভেহিকেল চুক্তি দ্রুত কার্যকর করা সম্ভবপর হইবে। তাহাতে বাংলাদেশের অর্থনীতি লাভবান হইবে। কিন্তু শর্ত একটিই: দিল্লীকে তাহার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হিসাব-নিকাশ দূরে সরাইয়া প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার প্রদান করিতে হইবে। 

অতএব, পরিশেষে জিজ্ঞাস্য এই নহে যে, পশ্চিমবঙ্গে কে শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হইল। প্রকৃত জিজ্ঞাস্য হইল, দিল্লী বাংলাদেশকে কোন দৃষ্টিতে অবলোকন করিবে। কলিকাতায় সরকার পরিবর্তন কেবল ঝুঁকির মাত্রা বৃদ্ধি করে। লাভ অথবা ক্ষতি, সেই লেখনীর কালি প্রকৃতপ্রস্তাবে দিল্লীর করকমলেই ন্যস্ত রহিয়াছে।

 অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#পশ্চিমবঙ্গ_রাজনীতি #বাংলাদেশ_ভারত_সম্পর্ক #তিস্তা_চুক্তি #দিল্লী_ঢাকা_কূটনীতি #সীমান্ত_রাজনীতি #সিএএ_এনআরসি #নবান্ন_পালাবদল #বাংলাদেশের_কূটনীতি #ভারত_বাংলাদেশ_সম্পর্ক #অধিকারপত্র_সম্পাদকীয়

কীওয়ার্ড: পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, তিস্তা জলবণ্টন, সিএএ-এনআরসি, সীমান্ত বাণিজ্য


আপনার মূল্যবান মতামত দিন: