অধিকারপত্র ডটকম আন্তর্জাতিক ডেক্স
ইরানের আঞ্চলিক কৌশল ও মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডকে ঘিরে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন চাপের মুখে পড়েছে। আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি, সৌদি আরবে হামলা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা ইরান-উপসাগরীয় সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি উত্তেজনা কমানোর একটি কাঠামো তৈরি হয়েছিল। তবে চলতি বছরের সামরিক উত্তেজনা ও ইয়েমেনভিত্তিক হুথিদের হামলার কারণে সেই সম্পর্কের ওপর আবারও চাপ তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইয়েমেনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে সৌদি ভূখণ্ডে
আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৮ সেপ্টেম্বর হুথিরা সৌদি আরবের আবহা, খামিস মুশাইত, জিজান ও নাজরানসহ বিভিন্ন এলাকায় ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এর আগে ও পরেও ইয়েমেনে সৌদি ও হুথি বাহিনীর মধ্যে সংঘাত তীব্র হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা সৌদি আরবের খামিস মুশাইত এলাকায় হামলার দাবি করেছে। একই সময়ে ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রগতি এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন পাল্টা হামলার ঘটনাও সামনে এসেছে।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দুই সপ্তাহে ইয়েমেনে সংঘাতের কারণে অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। প্রায় ৩ হাজার মানুষ সমুদ্রপথে জিবুতিতে পালিয়ে গেছেন।
হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব নিয়ে বাড়ছে কৌশলগত গুরুত্ব
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে সীমিত হয়েছে। এর ফলে সৌদি আরবের বিকল্প রপ্তানি পথ হিসেবে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির গুরুত্ব বেড়েছে।
একই সময়ে ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রগতি বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। আল জাজিরার পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা মায়ুন দ্বীপসহ বাব আল-মান্দাবের আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
ফলে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব—মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পরস্পরের সঙ্গে আরও বেশি সম্পর্কিত হয়ে উঠছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ওমানের আলোচনা স্থগিত
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ওমানে নির্ধারিত আলোচনা স্থগিত হওয়ার ঘটনাও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল জাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক দেশগুলোর উদ্বেগের পর আলোচনাটি স্থগিত করা হয়। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি জানান, আঞ্চলিক ঐকমত্যের স্বার্থে বৈঠকটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ও জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছিল। প্রণালিটি যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল।
ইরানের জন্য কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ
আল জাজিরার বিশ্লেষণে মূল প্রশ্ন হিসেবে উঠে এসেছে—ইরান আঞ্চলিক চাপ ও মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে কৌশলগত প্রভাব ধরে রাখার পাশাপাশি সৌদি আরবসহ আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে স্থিতিশীল কূটনৈতিক সম্পর্ক কতটা বজায় রাখতে পারবে।
বিশ্লেষকের মতে, সৌদি ভূখণ্ডে হামলা, বাব আল-মান্দাবে হুথিদের অবস্থান শক্ত হওয়া এবং হরমুজ ঘিরে উত্তেজনা একসঙ্গে চলতে থাকলে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা সহযোগিতা ও কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশে পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে হুথিদের প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্ত ইরান সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে কি না—এটি আলাদা প্রশ্ন। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হুথিদের কর্মকাণ্ড ইরানের বৃহত্তর কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এসব কর্মকাণ্ডের ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা হিসাব কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে।
সূত্র
আল জাজিরা, রয়টার্স
ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে বাড়ছে চাপ
#ইরান #সৌদি_আরব #হুথি #হরমুজ_প্রণালি #বাবআলমান্দাব #অধিকারপত্র
