odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 1st December 2025, ১st December ২০২৫
বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে গ্রিক দর্শনের আলোকে স্বর্গীয় সংলাপ—'অ-পরীক্ষিত জীবন', নৈতিক অবক্ষয় ও রাষ্ট্রের ছায়া-শাসনের ব্যঙ্গাত্মক বিশ্লেষণ।

বাংলাদেশ থেকে ফিরে গিয়ে সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টটলের স্বর্গীয় ডায়ালগ: ‘অ-পরীক্ষিত জীবন’ এবং প্লেটোর গুহার বন্দিত্ব

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৩০ November ২০২৫ ২২:২৮

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৩০ November ২০২৫ ২২:২৮

— চতুর্থ পর্ব: গ্রীক দার্শনিকদের দৃষ্টিতে আজকের বাংলাদেশ এবং সমাজের অসঙ্গতির ফিচার সিরিজ

গ্রিক দর্শনের তিন মহান দার্শনিক—সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টটল বাংলাদেশ পর্যবেক্ষণ শেষে আলোচনায় মিলিত। ‘অ-পরীক্ষিত জীবন’, প্লেটোর ‘গুহা’, এবং নৈতিকতাহীন শিক্ষার প্রেক্ষিতে তারা বিশ্লেষণ করেন বাংলাদেশের সংকট। এই স্বর্গীয় সংলাপে উঠে আসে একটি রাষ্ট্রের আত্মদর্শনের প্রয়োজনীয়তা এবং প্রশ্নহীন সমাজের বিপদ।

বাংলাদেশ থেকে ফিরে গিয়ে সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটলের স্বর্গীয় ডায়ালগ

এই নিবন্ধটিতে গ্রিসের তিন মহান দার্শনিক—সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টটল—বাংলাদেশ থেকে ফিরে গিয়ে তাদের স্বর্গীয় পর্যবেক্ষণ শেষে এক অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ সংলাপে মিলিত হন। সক্রেটিসের চোখে উঠে আসে ‘অ-পরীক্ষিত জীবন’-এর সংকট, প্লেটো তুলে ধরেন রাষ্ট্রের গুহা-সদৃশ শাসনব্যবস্থা, আর এরিস্টটল বিশ্লেষণ করেন নৈতিক ও শিক্ষাব্যবস্থার অবক্ষয়। এটি একটি দার্শনিক পুনরাবিষ্কার—বাংলাদেশ সমাজকে আত্মদর্শনের আয়নায় তুলে ধরার প্রচেষ্টা।

আজকের নিবন্ধটি একটি ধারাবাহিক সিরিজের চতুর্থ পর্ব। পুরোপুরি বোঝার জন্য আমরা পাঠককে অনুরোধ করছি আগের পর্ব-তিনটির কোনোটি না পড়ে থাকলে পড়ার অনুরোধ করছি:

বাংলাদেশ থেকে ফিরে গিয়ে তিন দার্শনিক

স্বর্গের অলিন্দে তখন সূর্যাস্তের রক্তিম আভা। আলো ও ছায়ার এক অপূর্ব মিশ্রণে যেন সেই স্থানটি রূপ নিয়েছে এক নৈঃশব্দ্যের উপাসনালয়ে। সেখানে বসে আছেন মানবসভ্যতার তিন শিখা—সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টটল। পৃথিবীর জীবনের বিভ্রান্তি, অসঙ্গতি ও নৈতিকতার পতন নিয়ে যুগে যুগে যে তিনজন চিন্তার নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁরা মাত্রই ফিরে এসেছেন মর্ত্যের এক অদ্ভুত ভূখণ্ড—বাংলাদেশ—পর্যবেক্ষণ করে। তাঁদের সামনে এখন এক নতুন আলোচনা—কেবল দর্শনের নয়, বরং মানবচেতনার গভীর সংকট ও আত্মদর্শনের প্রশ্ন।

মহাজ্ঞানী এরিস্টটল, দার্শনিক রাজা প্লেটো এবং মানবাত্মার গুরু সক্রেটিস—গ্রীসের এই তিন আলোকবর্তিকা মাত্রই মর্ত্যের এক অদ্ভুত দেশ—বাংলাদেশ—পর্যবেক্ষণ শেষ করে এসেছেন। তাঁদের স্বর্গীয় সভাকক্ষে এখন চলছে এক মন্থন, এক দীর্ঘশ্বাসমিশ্রিত 'ডায়ালগ'। আজকের এই স্বর্গীয় ডায়ালগের বিষয়: অ-পরীক্ষিত জীবন’ এবং প্লেটোর ‘গুহা’—বাংলাদেশে দর্শনের সংকট

. সক্রেটিসের আর্তনাদ: “-পরীক্ষিত জীবন”—আজকের বাংলাদেশে এক হারানো সত্য

সক্রেটিস প্রথমে নীরবতা ভেঙে কথা বললেন। তাঁর কণ্ঠে জ্ঞানের দৃঢ়তা থাকলেও সেখানে মিশে ছিল গভীর বেদনার সুর।

“আমার শিষ্য প্লেটো,” তিনি বলতে শুরু করলেন, “আমি সেই দেশের পথে পথে হাঁটলাম। এবং দেখলাম, যেই একটিমাত্র বাক্য আমি সারা জীবন মানুষকে শিখিয়েছি—‘যে জীবন পরীক্ষা করা হয়নি, সেই জীবন যাপন করার যোগ্য নয়’—সেই বাক্যের সম্পূর্ণ বিপরীত এক বাস্তবতা।”

তিনি চোখ বুজে যেন স্মৃতি পুনর্জাগরণ করলেন।

বাংলাদেশের মানুষ যেন নিজেদের অনুসন্ধানহীন জীবনের এক গভীর কারাগারে বন্দী। সেই কারাগারের নাম—‘ডিজিটাল পরিচয়’। প্রতিটি মানুষের হাতে রয়েছে একটি করে জাদুকরী বাক্স, যেখানে তারা নিজেদের জীবনকে এক কৃত্রিম বাস্তবতায় সাজিয়ে তোলে। সাফল্য সেখানে চেহারার; জ্ঞান নয়, চমক সেখানে মুখ্য। সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ায় মিথ্যা, আর মিথ্যা বলাটাই হয়ে উঠেছে এক নতুন সামাজিক মুদ্রা।”

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করলেন,
“সেই দেশটিতে আমি আরেকটি অসহনীয় দৃশ্য দেখেছি—মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার হারিয়েও প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছে। তাদের কণ্ঠস্বর হরণ করা হয়েছে, কিন্তু তারা নিজেরাই তাদের চোখ-কান বন্ধ করে রেখেছে। যেন তারা নিজেদের জীবনের কোনো বিচার চায় না; সত্যের ছায়ায় দাঁড়াতে ভয় পায়।”

সক্রেটিসের কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো। “ন্যায় বিচার সেখানে অনুপস্থিত নয় শুধু; বরং মানুষ নিজেই বিচার চাইতে ভুলে গেছে। তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে অন্যায়ের সঙ্গে সহাবস্থানে। প্রশ্নহীনতা—এই হলো তাদের দৈনন্দিন অভ্যাস। তাদের জীবন ‘অ-পরীক্ষিত’ হয়ে গেছে সম্পূর্ণভাবে।”

এই কথা বলতে বলতে মনে হলো, সক্রেটিসের চোখে বিষাদের আভা—তিনি যেন অনুভব করছেন সেই দেশের আত্মিক শূন্যতা।

. প্লেটোর আক্ষেপ: বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীগুহার বন্দী, ছায়াকে সত্য গণ্যকারী

সক্রেটিস থেমে গেলে কথা ধরলেন প্লেটো—যিনি রাষ্ট্রদর্শনে আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর চোখে রাষ্ট্র হলো নৈতিকতার উচ্চতম প্রতিষ্ঠান; কিন্তু বাংলাদেশে গিয়ে তিনি দেখলেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

সক্রেটিস, তুমি যা বললে তাতে আমি কোনো আপত্তি করি না,” প্লেটো বললেন, “বরং আমি তোমার কথার চেয়েও ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখেছি। বাংলাদেশে রাষ্ট্রপ্রশাসন ও শাসকগোষ্ঠীর অবস্থান দেখে আমি যেন আমার ‘গুহার রূপক’ বাস্তবে দেখতে পেলাম।”

তিনি ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করলেন,
“সেই দেশের শাসকেরা গুহার বন্দীদের মতো। তারা শুধু ছায়া দেখে, কিন্তু মনে করে সেটিই সত্য। বাস্তবতা বিকৃত হয়ে গেছে—লোভ, ক্ষমতার তৃষ্ণা ও পক্ষপাতিত্ব তাদের দৃষ্টি অন্ধ করে রেখেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো নৈতিক সুর নেই; জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সেখানে নির্বাসিত।”

প্লেটোর কণ্ঠে হতাশা ঘনীভূত হলো।
“আমার ‘দার্শনিক রাজা’ ধারণা সেখানে এক নিষ্ঠুর প্রহসনে পরিণত হয়েছে। শাসকরা জনগণের কল্যাণকে নয়, বরং ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। প্রশাসনের কাঠামো দুর্নীতির আগুনে দগ্ধ, আমলারা সেবা নয়, ক্ষমতার সুযোগসন্ধানী খেলা খেলছে। গুহা থেকে বেরিয়ে আলো দেখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়—তারা আলো দেখার ইচ্ছাও হারিয়ে ফেলেছে।”

তিনি কিছুক্ষণ থেমে বললেন, “যেখানে অন্যায়কারীরা পুরস্কৃত হয় আর সৎ মানুষরা অবদমিত থাকে—সেখানে রিপাবলিক ভেঙে পড়ে, সমাজ ও রাষ্ট্র দুটোই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। আমি দেখেছি ঠিক সেটাই ঘটছে।”

প্লেটো যেন নিজের নির্মিত দর্শনের ব্যর্থতা প্রত্যক্ষ করে ব্যথিত।

. এরিস্টটলের উপলব্ধি: নৈতিকতাহীন শিক্ষাসমাজের ভিত্তির পতন

এরিস্টটল, যিনি বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত, শান্ত কিন্তু নির্ভুল স্বরে কথা বললেন। “প্লেটো, তোমার বিশ্লেষণ যথার্থ,” তিনি বললেন, “তবুও আমি বলব—বাংলাদেশের সংকট কেবল শাসকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমি তো দেখলাম সেই সংকটের শিকড় সমাজের মূলভিত্তি—শিক্ষাব্যবস্থায়।”

এরিস্টটলের দৃষ্টিতে শিক্ষা হলো চরিত্র নির্মাণের চূড়ান্ত পথ। কিন্তু বাংলাদেশে তিনি দেখলেন ঠিক তার উল্টো। “আমি কি দেখলাম?”—তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “উদ্ধত ছাত্র, অবমানিত শিক্ষক, বাণিজ্যিক ডিগ্রি-বাজার, আর জ্ঞানহীন গর্ব। শিক্ষা সেখানে আত্ম-চেতনার উৎস নয়; বরং চাকরির টিকিট।”

তিনি যুক্তি তুলে ধরে বললেন,
“যে জাতি তার শিক্ষককে সম্মান দিতে জানে না, সেই জাতির ভিত কখনোই শক্ত হবে না। আর সেখানে তো শিক্ষকরা নিজেরাই অপমানিত, বঞ্চিত এবং সংকটে। জ্ঞানচর্চার পরিবেশ নেই, সাহস নেই, মধ্যপন্থা—গোল্ডেন মীন—অনুপস্থিত।”

এরিস্টটল পাণ্ডিত্যের সঙ্গে উপসংহার টানলেন, “যেখানে মিথ্যাবাদী, দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা সমাজ পরিচালনার ভার নেয়, সেখানে সত্য কখনোই ‘Dynamis’—সম্ভাবনা—থেকে ‘Energeia’—বাস্তবতায় রূপান্তর লাভ করতে পারে না। সত্যের সম্ভাবনা সেখানে গর্ভেই মরে যায়।”

তাঁর কণ্ঠে ছিল কঠোর যুক্তির শীতলতা, কিন্তু সেখানে লুকিয়ে ছিল নৈতিক শোক।

. তিন দার্শনিকের যৌথ উপলব্ধি: বাংলাদেশ এক সংকটাপন্ন রাষ্ট্র

তিনজনই কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। স্বর্গের আকাশ যেন তাদের নৈঃশব্দ্যকে আরও গভীর করে তুলল। সক্রেটিস শেষে শান্তভাবে বললেন, “সেই রাষ্ট্রটি একটি ভয়াবহ সংকটে রয়েছে। শাসক, আমলা, সাধারণ মানুষ—সবার মনেই প্রশ্নহীনতার সংস্কৃতি। গুহা থেকে বেরোবার সাহস কোনো স্তরেই নেই। সত্যকে অস্বীকার করা যেন এক জাতীয় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।”

তিনি দৃষ্টি তুলে বললেন, “যদি সেই দেশের মানুষ নিজের জীবনকে পরীক্ষা করা শুরু না করে, নিজের ভুলের মুখোমুখি না হয়, তবে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। দাসত্ব সেখানে আরও গভীর হবে—নৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক তিনস্তরেই।”

প্লেটো যোগ করলেন, “গুহা থেকে বের হওয়া ছাড়া তাদের মুক্তি নেই।”

এরিস্টটল ধীরে বললেন, “আর শিক্ষায় সংস্কার ছাড়া, কোনো রাষ্ট্রই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।”

তিনজনের এ এক চূড়ান্ত দার্শনিক সতর্কতা—এক এমন দেশের প্রতি, যা সম্ভাবনাময়, কিন্তু আত্মদর্শনহীন।

. সমাপ্তি: পৃথিবীর দিকে শেষ দৃষ্টি

স্বর্গীয় সভা শেষ হলো। তিন দার্শনিক উঠে দাঁড়ালেন। তাঁদের দৃষ্টিতে পৃথিবীর কোনো এক জনবহুল দেশে তখনো মানুষ নিজের হাতে ধরা ‘ডিজিটাল জাদুকরী বাক্সে’ ডুবে আছে—প্রশ্নহীন, প্রতিবাদহীন, আলোহীন। মানুষ ব্যস্ত তাদের "অ-পরীক্ষিত জীবন" বাঁচাতে—যে জীবন সম্পর্কে সক্রেটিস যুগে যুগে সতর্ক করে গেছেন। তিন আলোকবর্তিকা শেষে ফিরে গেলেন তাঁদের স্বর্গীয় আসনে, সঙ্গে নিয়ে এক বেদনাময় উপলব্ধি: এক দেশে প্রশ্নহীনতা হয়ে উঠেছে সংস্কৃতি, আর গুহার অন্ধকার সত্যের আলোকে পরাজিত করে দিয়েছে

✍️ শেষ কথা

এই প্রবন্ধ কেবল কোনো ভূগোলের বিশ্লেষণ নয়; এটি মানবচেতনার প্রশ্নহীনতার বিরুদ্ধে এক দার্শনিক সতর্কতা। সক্রেটিসের ‘অ-পরীক্ষিত জীবন’, প্লেটোর ‘গুহা’ ও এরিস্টটলের ‘নৈতিক শিক্ষা’—তিনটি ধারণাই আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় এক তীক্ষ্ণ আহ্বান:

জীবনকে, সমাজকে এবং রাষ্ট্রকে—আবারও প্রশ্ন করতে শিখুন

ডিসক্লেইমার: এই লেখাটি কল্পনাপ্রসূত ও রূপকধর্মী। সক্রেটিসের দার্শনিক চিন্তাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের সমসাময়িক বাস্তবতাকে ব্যঙ্গ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। লেখাটির উদ্দেশ্য একমাত্র চিন্তাশীল পাঠের অনুপ্রেরণা দেওয়া, বাস্তব ব্যক্তি বা ঘটনার সঙ্গে মিল কাকতালীয়।

✍️ অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা্ সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

আগামীকাল শেষ পর্বে (পর্ব ৫) চোখ রাখুন: স্রষ্টার হাসি বাংলার নিয়তি: দর্শনের সীমা অলৌকিক সহনশীলতা

#সক্রেটিস #প্লেটো #এরিস্টটল #অপরীক্ষিত_জীবন #প্লেটোর_গুহা #নৈতিকতার_পতন #দার্শনিক_সংলাপ #বাংলাদেশের_রাষ্ট্রনীতি #শিক্ষার_অবক্ষয় #গণতন্ত্র_ব্যর্থতা #দর্শনের_আলোকে_সমাজ



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: