odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 7th May 2026, ৭th May ২০২৬
নিষেধাজ্ঞার পাহাড়, প্রযুক্তি অবরোধ ও বৈশ্বিক একঘরে করার নীতি চূর্ণ করে ইরান যেভাবে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও দেশীয় উদ্ভাবনের এক বিকল্প মাপকাঠি নির্মাণ করেছে—তা বাংলাদেশের জন্যও এক গভীর নীতিগত পাঠ।

প্রাচীরের গায়ে লেখা ‘অসম্ভব’কে যারা সম্ভব করেছে│ অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক │ইরান সিরিজ পর্ব -০৪

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৭ May ২০২৬ ০৪:৩৯

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৭ May ২০২৬ ০৪:৩৯

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকইরান সিরিজ পর্ব -০৪

এই পর্বে আলোচিত হয়েছে কীভাবে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তি অবরোধ, গবেষণা বিচ্ছিন্নতা ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও ইরান শিক্ষা, বিজ্ঞান, ন্যানোটেকনোলজি, মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসা প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক শিল্পে আত্মনির্ভরতার পথ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থার জন্য এতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—সংকটকে কীভাবে উদ্ভাবনের শক্তিতে রূপান্তর করা যায়।

শুরুতেই প্রাচীরের গল্প

একটি প্রাচীরের কথা ভাবা যাক। এটি কোনো কংক্রিটের প্রাচীর নয়, নয় ইস্পাতের তৈরি দৃশ্যমান কোনো দেয়াল। এই প্রাচীর তৈরি হয়েছে নিষেধাজ্ঞার কাঁটাতারে, প্রযুক্তি স্থানান্তর বন্ধের কঠোর ব্যবস্থায়, ব্যাংকিং অবরোধের অদৃশ্য শিকলে, গবেষণা-সহযোগিতা বিচ্ছিন্নতার নীরব দেয়ালে এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার অসম রাজনীতির ভারী পাথরে। প্রাচীরটির এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে পশ্চিমা সামরিক-অর্থনৈতিক জোট, আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা, প্রযুক্তির একচেটিয়া মালিকানা এবং ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের দীর্ঘ ছায়া। অন্য পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইরান—অবরুদ্ধ, সন্দেহের চোখে দেখা, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বহু দরজা থেকে ফিরিয়ে দেওয়া, কিন্তু আত্মসমর্পণ না করা এক রাষ্ট্র।

বহু বিশ্লেষক একসময় মনে করেছিলেন, এই প্রাচীর এত উঁচু যে ইরানের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তির স্বপ্ন তার ওপর দিয়ে উড়তে পারবে না। প্রযুক্তি আসবে না, যন্ত্রাংশ আসবে না, সফটওয়্যার আসবে না, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আসবে না—তাহলে বিজ্ঞান কীভাবে এগোবে? কিন্তু ইরান সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে অন্য ভাষায়। তারা যেন বলেছে, “যে প্রাচীর আমাদের আটকে রাখতে চায়, আমরা সেই প্রাচীরকেই গবেষণাগারের ব্ল্যাকবোর্ড বানাব। নিষেধাজ্ঞার গায়ে হাত বুলিয়ে খুঁজে বের করব নতুন প্রযুক্তির বীজমন্ত্র।”

এই ফিচার সেই প্রাচীরের গল্প। একই সঙ্গে এটি এমন এক রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ও বিজ্ঞান দর্শনের কাহিনি, যেখানে সংকট কেবল বঞ্চনার ইতিহাস নয়; তা হয়ে উঠেছে স্বনির্ভরতার কঠিন বিদ্যালয়। ইরানের অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—নিষেধাজ্ঞা কোনো দেশের জন্য ভয়াবহ প্রতিবন্ধকতা, কিন্তু দূরদর্শী নেতৃত্ব, গবেষণায় বিনিয়োগ, শিক্ষিত মানবসম্পদ, দেশীয় শিল্প এবং জাতীয় আত্মমর্যাদার সম্মিলন ঘটলে সেই প্রতিবন্ধকতাই কখনো কখনো উদ্ভাবনের সবচেয়ে কঠিন কিন্তু কার্যকর পাঠশালায় পরিণত হতে পারে।

প্রযুক্তি অবরোধের কালো সূর্য ইরানের দীর্ঘ পথচলা

১৯৮০-এর দশক থেকে ইরান যে নিষেধাজ্ঞার জালে আটকে পড়ে, তা প্রথমে প্রধানত তেল, অস্ত্র ও কৌশলগত বাণিজ্যকে ঘিরে ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জাল ঘন হতে থাকে। এর বিস্তার ঘটে শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা, বিমান চলাচল, প্রযুক্তি আমদানি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, এমনকি ডিজিটাল সেবা ও বৈজ্ঞানিক সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা কেবল পণ্য আমদানি-রপ্তানির ওপর সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা ধীরে ধীরে জ্ঞানপ্রবাহ, প্রযুক্তি-প্রবেশ এবং বৈশ্বিক গবেষণা যোগাযোগের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে।

ইরানি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরে অংশগ্রহণ অনেক সময় কঠিন হয়ে ওঠে। গবেষণাপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের পরিচয়ের কারণে সন্দেহ, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ভিসা জটিলতা, পশ্চিমা ল্যাবরেটরিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা এবং গবেষণা-উপকরণ সংগ্রহে সীমাবদ্ধতা—এসব মিলিয়ে ইরানি বিজ্ঞানীদের সামনে তৈরি হয় এক ধরনের জ্ঞান-অবরোধ। এমনকি প্রকৌশল, সিমুলেশন, ডেটা বিশ্লেষণ বা ল্যাবরেটরি গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু সফটওয়্যার ও যন্ত্রাংশের প্রবেশাধিকারও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত হয়ে পড়ে।

এই অবরোধের সবচেয়ে কঠিন দিক ছিল সন্দেহের রাজনীতি। ইরান যদি কোনো উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করতে চায়, সেটিকে প্রায়শই সামরিক সম্ভাবনার চোখে দেখা হয়েছে। চিকিৎসা গবেষণা, কৃষি প্রযুক্তি, জৈবপ্রযুক্তি বা শিল্পোৎপাদনের প্রয়োজনে তৈরি কোনো সরঞ্জামও কখনো কখনো নিরাপত্তা-ঝুঁকির ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফলে ইরানি বিজ্ঞানীদের সামনে প্রশ্ন দাঁড়ায়—অপেক্ষা করবে, নাকি নিজেই তৈরি করবে? বাইরে থেকে প্রযুক্তি না এলে দেশীয় গবেষণা কি স্থবির হয়ে যাবে, নাকি সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নতুন রাস্তা তৈরি হবে?

এখানেই ইরানের শিক্ষা ও গবেষণা দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর ঘটে। নিষেধাজ্ঞা তাদের সামনে এক কালো সূর্যের মতো উদিত হয়েছিল; তার আলো ছিল না, ছিল উত্তাপ। কিন্তু সেই তাপেই তারা নিজেদের গবেষণা-ইস্পাতকে পুড়িয়ে, গলিয়ে, নতুন আকার দিতে শুরু করে। সংকটকে তারা কেবল কষ্ট হিসেবে দেখেনি; দেখেছে আত্মনির্ভরতার জরুরি অনুশীলন হিসেবে।

যখন নাপরিণত হয় নিজস্বশব্দে

ইরানের প্রথম প্রতিক্রিয়া নিশ্চয়ই হতাশার ছিল। কোনো দেশই স্বেচ্ছায় প্রযুক্তি অবরোধ, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা বা গবেষণা নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নেয় না। কিন্তু দীর্ঘদিনের চাপ ইরানের ভেতরে একটি নতুন মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটায়। “যা পাওয়া যাবে না, তা তৈরি করতে হবে”—এই বাক্যটি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাননীতি, বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি এবং গবেষণা-চেতনার কেন্দ্রে জায়গা নিতে শুরু করে।

বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা ‘জিহাদ-ই-দানেশগাহি’ বা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্যোগ ইরানের এই আত্মনির্ভরতার গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর লক্ষ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা। শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান উৎপাদন নয়, বাস্তব সমস্যার দেশীয় প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি—এই নীতিই ধীরে ধীরে ইরানি গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।

ফলে ইরান ন্যানোটেকনোলজি, জৈবপ্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট ব্যবস্থা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং তথ্যপ্রযুক্তির নানা ক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলতে শুরু করে। দেশীয় জ্ঞানভিত্তিক কোম্পানির উত্থান এই প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করে। এসব প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাকে বাজারযোগ্য পণ্য, শিল্প-সমাধান ও প্রযুক্তিগত সেবায় রূপান্তরের চেষ্টা করে। নিষেধাজ্ঞা ইরানকে বিশ্ববাজারের ওপর নির্ভরশীলতার আরাম থেকে ঠেলে বের করে এনে স্থানীয় প্রযুক্তি উন্নয়নের কঠিন বাস্তবতায় দাঁড় করায়।

এখানে একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। উন্মুক্ত বাজারে সহজে প্রযুক্তি আমদানি করা যায় বলে অনেক দেশ নিজস্ব গবেষণা সক্ষমতা গড়ে তোলার জরুরি প্রয়োজন অনুভব করে না। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে বাইরের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভেতরের দরজা খুলতে হয়েছে। সেই ভেতরের দরজাই তাকে ‘হোমগ্রোন’ প্রযুক্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই দেশীয়করণের প্রক্রিয়া নিখুঁত নয়, সীমাবদ্ধতাহীনও নয়; কিন্তু এটি রাষ্ট্রীয় আত্মমর্যাদা, বৈজ্ঞানিক অভিযোজন এবং সংকট-উদ্ভাবনের এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

ন্যানো থেকে নভোনিষেধাজ্ঞার অন্ধকারে মহাকাশযাত্রা

ইরানের ন্যানোটেকনোলজি নিয়ে আগের পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এবার দেখা যাক মহাকাশ গবেষণার দিকে। মহাকাশ প্রযুক্তি এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, প্রকৌশল দক্ষতা, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, সামরিক-নিরাপত্তা বিবেচনা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি এক জটিল বন্ধনে যুক্ত থাকে। ইরানের ক্ষেত্রে এই ক্ষেত্রটি আরও জটিল, কারণ মহাকাশ প্রযুক্তির সঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির সম্ভাব্য সম্পর্ক দেখিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ইরান আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সহজে স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, উৎক্ষেপণযানের অংশ বা উন্নত প্রকৌশল সহায়তা পায়নি। কিন্তু তারা অপেক্ষা করেনি। দেশীয় গবেষণা, প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাষ্ট্রীয় মহাকাশ উদ্যোগের সম্মিলনে তারা নিজস্ব মহাকাশ কর্মসূচি এগিয়ে নেয়। ইরান স্পেস এজেন্সির প্রতিষ্ঠা এবং দেশীয় রকেট উন্নয়নের মধ্য দিয়ে দেশটি ধীরে ধীরে মহাকাশ প্রযুক্তিতে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়।

২০০৯ সালে ‘ওমিদ’ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ইরানের জন্য কেবল প্রযুক্তিগত ঘটনা ছিল না; এটি ছিল প্রতীকী আত্মপ্রকাশ। এক অবরুদ্ধ দেশ যেন পৃথিবীকে জানিয়ে দিল—প্রাচীর যতই উঁচু হোক, আকাশের সঙ্গে কথা বলার ভাষা আমরা শিখে ফেলেছি। এরপর আরও কয়েকটি স্যাটেলাইট কর্মসূচি ইরানের দেশীয় সক্ষমতাকে দৃশ্যমান করে। প্রতিটি সাফল্যের পেছনে ছিল দেশীয় বিজ্ঞানী, স্থানীয় গবেষণা অবকাঠামো, সীমিত সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক চাপের মধ্যে প্রযুক্তিগত স্থিতিস্থাপকতা।

বাংলাদেশের জন্য এখানে একটি তুলনামূলক পাঠ আছে। বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মহাকাশযাত্রায় প্রবেশ করেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মাইলফলক। কিন্তু তার নকশা, নির্মাণ ও উৎক্ষেপণ প্রধানত বিদেশি প্রযুক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এতে কোনো অসম্মান নেই; প্রযুক্তি হস্তান্তর ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা উন্নয়নশীল দেশের জন্য স্বাভাবিক পথ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্ন থাকে—আমরা কি শুধু ব্যবহারকারী রাষ্ট্র হব, নাকি নির্মাতা রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্নও দেখব? ইরানের অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রযুক্তির প্রকৃত স্বাধীনতা আসে তখনই, যখন ব্যবহার থেকে নির্মাণে, আমদানি থেকে উদ্ভাবনে, নির্ভরতা থেকে জ্ঞান-ক্ষমতায় উত্তরণ ঘটে।

চিকিৎসা প্রযুক্তি, স্টেম সেল মহামারির পাঠ

ইরানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের ক্ষেত্র হলো চিকিৎসা প্রযুক্তি ও জৈবপ্রযুক্তি। নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ওষুধ কোম্পানি, উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম, জিন থেরাপি, ক্যান্সার চিকিৎসা, বিশেষায়িত ডায়াগনস্টিক যন্ত্র এবং গবেষণা উপকরণ সংগ্রহে ইরান বহুবার জটিলতার মুখোমুখি হয়েছে। এই সীমাবদ্ধতা সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তা দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যালস, বায়োটেক গবেষণা এবং চিকিৎসা প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য এক ধরনের বাধ্যতামূলক তাগিদ তৈরি করেছে।

ইরানের রয়ান ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টেম সেল গবেষণা, প্রজনন চিকিৎসা, জেনেটিক গবেষণা এবং পুনর্জনন চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই ধরনের প্রতিষ্ঠান শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের জন্য কাজ করেনি; বরং চিকিৎসা ব্যবস্থায় দেশীয় জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষেত্রও তৈরি করেছে। উন্নত চিকিৎসা যদি বাইরে থেকে সহজে না আসে, তবে ভেতরে গবেষণা করতে হবে—এই রাষ্ট্রীয় উপলব্ধিই ইরানের জৈবপ্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নেয়।

করোনা মহামারির সময় ইরানের অভিজ্ঞতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং জটিলতা এবং বৈশ্বিক টিকা-রাজনীতির কারণে প্রথম দিকে টিকা সংগ্রহে দেশটি কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা দেশীয় টিকা উন্নয়নের চেষ্টা করে এবং স্থানীয় গবেষণা সক্ষমতাকে কাজে লাগায়। এই সাফল্য নিখুঁত ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু সংকটকালে দেশীয় গবেষণা অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা যে কত বড়, তা ইরান দেখিয়েছে।

বাংলাদেশের করোনা-অভিজ্ঞতাও এখানে প্রাসঙ্গিক। আমরা টিকা সংগ্রহে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আমদানি, চুক্তি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিলাম। আমাদের ওষুধশিল্প শক্তিশালী হলেও উচ্চপর্যায়ের জৈবপ্রযুক্তি গবেষণা, টিকা উন্নয়ন এবং মৌলিক চিকিৎসা-প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এখনও পর্যাপ্ত নয়। ইরান আমাদের শেখায়—স্বাস্থ্য নিরাপত্তা শুধু হাসপাতাল নির্মাণের বিষয় নয়; এটি গবেষণা, বিজ্ঞাননীতি, শিল্প সক্ষমতা এবং জাতীয় প্রস্তুতির প্রশ্ন।

ইরানের সীমাবদ্ধতা: গৌরবের পাশে অস্বস্তির ছায়া

নিরপেক্ষ আলোচনায় ফিরে আসা জরুরি। ইরানের সাফল্য যেমন বাস্তব, তেমনি সীমাবদ্ধতাও গভীর। নিষেধাজ্ঞা তাকে আত্মনির্ভরতার পথে ঠেলে দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে তাকে বহু ক্ষেত্রে পিছিয়েও দিয়েছে। অত্যাধুনিক কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, বিশেষায়িত জিন সিকোয়েন্সিং যন্ত্র, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গবেষণা সরঞ্জাম এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাভিত্তিক বৃহৎ বিজ্ঞান প্রকল্পে ইরান এখনও সীমাবদ্ধতার মুখে আছে। কারণ বিজ্ঞান আজ একক রাষ্ট্রের নিভৃত সাধনা নয়; এটি বৈশ্বিক সহযোগিতা, তথ্যপ্রবাহ, যন্ত্রাংশ, ভাষা, পুঁজি এবং মেধা-অদলবদলের ওপর নির্ভরশীল।

আন্তর্জাতিক জার্নালে ইরানি গবেষণার দৃশ্যমানতাও নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গবেষণাপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা, সাইটেশন নেটওয়ার্কে দুর্বলতা, যৌথ গবেষণার সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক একাডেমিক পরিসরে কম উপস্থিতি গবেষণার প্রভাবকে কমিয়ে দিতে পারে। বিজ্ঞান শুধু আবিষ্কার নয়; বিজ্ঞান হলো দৃশ্যমানতা, যাচাই, সমালোচনা, পুনরুৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিরও ক্ষেত্র।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাষা। স্কুল পর্যায়ে ফার্সি ভাষার ওপর নির্ভরতা ইরানের নিজস্ব সাংস্কৃতিক শক্তি হলেও উচ্চতর বিজ্ঞানচর্চায় ইংরেজি ভাষার সীমাবদ্ধতা অনেক সময় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরিভাষা, আন্তর্জাতিক জার্নাল, গবেষণা ডেটাবেস, প্রযুক্তিগত ম্যানুয়াল এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার ভাষা হিসেবে ইংরেজির ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। তাই জাতীয় ভাষা ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানভাষার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা না গেলে বিজ্ঞান শিক্ষায় একটি অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি হয়।

এই সীমাবদ্ধতাগুলো আমাদের শেখায়—স্বনির্ভরতা মানে আত্মবিচ্ছিন্নতা নয়। দেশীয় উদ্ভাবন জরুরি, কিন্তু আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও সমান জরুরি। জাতীয় ভাষা জরুরি, কিন্তু বিজ্ঞানভাষায় বিশ্বে প্রবেশের সক্ষমতাও অপরিহার্য। ইরানের গৌরব তাই আমাদের যেমন অনুপ্রাণিত করে, তেমনি তার সীমাবদ্ধতা আমাদের সতর্কও করে।

ইরানের স্টিলথ ইনোভেশন’: বাংলাদেশের জন্য এক কেস স্টাডি

ইরানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় শিক্ষা হলো—উদ্ভাবন সবসময় বড় আলো, বড় মঞ্চ বা আন্তর্জাতিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে আসে না। কখনো তা জন্ম নেয় গোপন পরিশ্রমে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অচেনা ল্যাবে, অপ্রতুল বাজেটের গবেষণা কক্ষে, তরুণ প্রকৌশলীর অস্থির নোটবুকে, কিংবা সংকটে পড়া কোনো শিল্পকারখানার জরুরি চাহিদা থেকে। এই অদৃশ্য, নিঃশব্দ, ধৈর্যশীল উদ্ভাবনকেই আমরা বলতে পারি ‘স্টিলথ ইনোভেশন’—যে উদ্ভাবন প্রথমে চোখে পড়ে না, কিন্তু একসময় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার দৃশ্যমান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ায়।

ইরান দেখিয়েছে, সীমাবদ্ধতা যদি পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থা, প্রযুক্তি-নীতি, গবেষণা তহবিল এবং শিল্প-সংযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তা অগ্রগতির চালিকাশক্তি হতে পারে। নিষেধাজ্ঞার অন্ধকারে তারা ধীরে ধীরে এমন কিছু সক্ষমতা গড়ে তুলেছে, যা বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায়নি। একসময় দেখা গেছে, তারা ড্রোন প্রযুক্তিতে এগিয়েছে; আবার দেখা গেছে, তাদের নারী বিজ্ঞানীরা চিকিৎসা ও ক্যান্সার গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন; দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়-সংযুক্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারযোগ্য প্রযুক্তিপণ্য তৈরি করছে।

বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন এখানেই। আমাদের তরুণরা মেধাবী, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্ভাবনাময়, আমাদের ওষুধশিল্প ও আইটি খাতের ভিত্তি আছে, আমাদের প্রবাসী গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের বিশাল নেটওয়ার্ক আছে। কিন্তু আমরা কি সংকটকে গবেষণার প্রশ্নে রূপান্তর করতে শিখেছি? আমরা কি আমদানিনির্ভরতার বাইরে গিয়ে নির্মাণনির্ভর প্রযুক্তি-মানসিকতা গড়ে তুলেছি? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কি কেবল সনদ প্রদান করে, নাকি স্থানীয় সমস্যার দেশীয় সমাধান তৈরি করে? আমাদের গবেষণা নীতি কি কাগজে আছে, নাকি শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য, জলবায়ু, দুর্যোগ ও জাতীয় নিরাপত্তার বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত?

ইরান আমাদের সামনে আয়না ধরে। সেই আয়নায় আমরা দেখি—শুধু মুক্ত বাজার, বিদেশি অনুদান, আমদানি ও প্রকল্পনির্ভর উন্নয়ন দিয়ে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র তৈরি হয় না। তার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা সংস্কৃতি, ব্যর্থতাকে সহ্য করার রাজনৈতিক মানসিকতা, দেশীয় যন্ত্রপাতি তৈরির সাহস, মেধাকে দেশে ধরে রাখার ব্যবস্থা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনশীল জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত করার নীতি।

বাংলাদেশের জন্য নীতিগত শিক্ষা

ইরানের অভিজ্ঞতা অনুকরণ করার বিষয় নয়; বরং তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিষয়। বাংলাদেশ কোনো নিষেধাজ্ঞাবদ্ধ রাষ্ট্র নয়, এবং আমাদের পথ অবশ্যই হবে উন্মুক্ত, সহযোগিতামূলক, গণতান্ত্রিক ও বৈশ্বিক জ্ঞানপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ইরানের আত্মনির্ভরতার পাঠ থেকে আমরা কয়েকটি জরুরি নীতিগত দিক শিখতে পারি।

  • প্রথমত, বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী জাতীয় গবেষণা তহবিল জরুরি, যা রাজনৈতিক পরিবর্তন, বিদেশি সহায়তা বা প্রকল্পনির্ভরতার বাইরে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা অর্থায়ন নিশ্চিত করবে। গবেষণা যদি শুধু ব্যক্তিগত আগ্রহ, বিদেশি অনুদান বা বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে জাতীয় প্রযুক্তি সক্ষমতা তৈরি হয় না। কৃষি, স্বাস্থ্য, জলবায়ু, জ্বালানি, শিক্ষা প্রযুক্তি, প্রতিবন্ধিতা সহায়ক প্রযুক্তি, নদী ব্যবস্থাপনা, নগরায়ণ ও শিল্প উৎপাদনের জন্য দেশীয় গবেষণা তহবিলকে কৌশলগতভাবে বিনিয়োগ করতে হবে।
  • দ্বিতীয়ত, বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশি গবেষক, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের দেশে ফেরানোর জন্য বাস্তবসম্মত ‘রিভার্স ব্রেন ড্রেইন’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। শুধু আবেগ দিয়ে মেধা ফেরানো যায় না; প্রয়োজন মানসম্মত গবেষণা অবকাঠামো, মর্যাদাপূর্ণ বেতন, স্বচ্ছ নিয়োগ, স্বাধীন গবেষণার সুযোগ এবং প্রশাসনিক জটিলতা থেকে মুক্ত কাজের পরিবেশ।
  • তৃতীয়ত, প্রযুক্তি পার্ক ও স্টার্টআপ নীতিকে কেবল ভবন নির্মাণ বা প্রদর্শনীমূলক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সরকারি ক্রয়নীতির মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। দেশীয় উদ্ভাবনকে বাজারে আনার পথ না থাকলে গবেষণা ল্যাবেই আটকে যায়।
  • চতুর্থত, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষায় শুধু সনদ নয়, উদ্ভাবনকে মূল্যায়নের পদ্ধতি চালু করতে হবে। শিক্ষার্থীরা কত নম্বর পেল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তারা কোনো যন্ত্র বানাল কি না, কোনো স্থানীয় সমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধান দিল কি না, কোনো পেটেন্ট করল কি না, কোনো কৃষক, শিক্ষক, চিকিৎসক বা প্রতিবন্ধী মানুষের বাস্তব জীবন সহজ করল কি না—এসবকেও শিক্ষার মূল্যায়নে গুরুত্ব দিতে হবে।
  • পঞ্চমত, প্রযুক্তি শিক্ষা ও ইংরেজি ভাষা দক্ষতার সমন্বয় জরুরি। মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানভাষার সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের গবেষণা, জার্নাল, ডেটাবেস ও প্রযুক্তি-ম্যানুয়াল থেকে দূরে পড়ে যায়। তাই বাংলাভিত্তিক ধারণাগত শিক্ষা এবং ইংরেজিভিত্তিক বৈশ্বিক গবেষণা-প্রবেশ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য গড়ে তুলতে হবে।
  • ষষ্ঠত, শিক্ষার্থীদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে সমস্যা সমাধান শেখাতে হবে। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ‘সংকট-সিমুলেশন চ্যালেঞ্জ’ আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সীমিত বাজেট, সীমিত উপকরণ, বিদ্যুৎ সংকট, আমদানি অনিশ্চয়তা বা দুর্যোগ পরিস্থিতির মধ্যে স্থানীয় সমাধান তৈরি করবে। কারণ বাস্তব পৃথিবী কখনো পূর্ণ সুবিধার ল্যাবরেটরি নয়; বাস্তব পৃথিবী হলো অসম্পূর্ণ উপকরণের মধ্যে সৃজনশীল সমাধান খোঁজার কঠিন ক্ষেত্র।

শেষকথা: প্রাচীর ভাঙার অন্য নাম স্বনির্ভরতা

নিষেধাজ্ঞা কোনো দেশের কাম্য পথ নয়। ইরানও নিশ্চয়ই সেই পথ বেছে নেয়নি। নিষেধাজ্ঞা মানুষের জীবনকে কঠিন করে, অর্থনীতিকে সংকুচিত করে, চিকিৎসা ও গবেষণাকে বিপন্ন করে, সাধারণ নাগরিককে মূল্য দিতে বাধ্য করে। তাই নিষেধাজ্ঞাকে রোমান্টিক করে দেখা ভুল। কিন্তু ইতিহাসের বিস্ময় এখানেই—যে প্রাচীর অন্যেরা বন্দিত্বের জন্য তোলে, কোনো কোনো জাতি সেই প্রাচীরের গায়ে মই বানায়।

ইরান সেই জাতিগুলোর একটি, যারা অবরোধের অন্ধকারে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিক্ষার ভেতর দিয়ে আত্মনির্ভরতার আলো খুঁজেছে। তাদের পথ নিখুঁত নয়, বিতর্কমুক্ত নয়, সীমাবদ্ধতাহীন নয়। কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—রাষ্ট্র যদি শিক্ষাকে কেবল চাকরির সিঁড়ি না ভেবে জ্ঞান-সার্বভৌমত্বের ভিত্তি হিসেবে দেখে, গবেষণাকে যদি বিলাসিতা না ভেবে জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে, তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সৃজনশীল শক্তি জন্ম নিতে পারে।

বাংলাদেশ নিষেধাজ্ঞার কঠিন বাস্তবতার মধ্যে নেই। আমাদের সামনে বিশ্ব খোলা, প্রযুক্তির দরজা খোলা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ খোলা। অথচ এই উন্মুক্ত স্বাচ্ছন্দ্য অনেক সময় আমাদের আত্মনির্ভরতার ক্ষুধাকে দুর্বল করে দেয়। আমরা আমদানি করি, ব্যবহার করি, প্রকল্প নিই, চুক্তি করি—কিন্তু নির্মাণ করি কতটা? আমরা প্রযুক্তি কিনি, কিন্তু প্রযুক্তির ভাষা শিখি কতটা? আমরা স্যাটেলাইট ব্যবহার করি, কিন্তু স্যাটেলাইট বানানোর বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প ইকোসিস্টেম গড়ি কতটা?

প্রাচীরের গায়ে হাত রেখে ইরান যে গল্প লিখেছে, সেটি কেবল ইরানের রাষ্ট্রীয় ইতিহাস নয়; এটি উন্নয়নশীল বিশ্বের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাবনার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ উপাখ্যান। এটি বেঁচে থাকার গল্প, কিন্তু তার চেয়েও বেশি—এটি বেঁচে থেকে উঠে দাঁড়ানোর গল্প। বাংলাদেশকে ইরান হতে হবে না; আমাদের পথ আমাদেরই তৈরি করতে হবে। তবে ইরানের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা অন্তত এটুকু শিখতে পারি—স্বনির্ভরতা কোনো স্লোগান নয়, এটি গবেষণাগারে ঘাম ঝরানো, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন জাগানো, শিল্পে ঝুঁকি নেওয়া, রাষ্ট্রে দূরদর্শী নীতি তৈরি করা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জ্ঞানকে জাতীয় শক্তিতে রূপান্তর করার দীর্ঘ সাধনা।

যে জাতি প্রাচীর দেখে থেমে যায়, তার ইতিহাস অন্যেরা লেখে। যে জাতি প্রাচীরের গায়ে ‘অসম্ভব’ শব্দটি দেখে সেটির ওপর নিজের হাতের লেখা বসায়—তারাই একদিন অসম্ভবকে সম্ভবের ভাষায় অনুবাদ করে।

অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#প্রাচীর_ভাঙা_ইরান #নিষেধাজ্ঞার_জয়গান #ইরানের_উদ্ভাবন #স্টেমসেল_গবেষণা #মহাকাশে_ইরান #বাংলাদেশের_করণীয় #KnowledgeBasedCompanies #স্থানীয়_উদ্ভাবন #শিক্ষা_ও_প্রযুক্তি #ফিচার_সিরিজ_পর্ব_৪

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহি- ইরান সিরিজের পূর্বে প্রকাশিত ফিচারসমূহ:

  1. শিক্ষার আয়নায় ইরান ও বাংলাদেশ: শিক্ষানীতির ভিন্ন দুই মানচিত্রে আদর্শ, রাষ্ট্র ও ভবিষ্যৎ নাগরিকের সন্ধান — শিক্ষাযাত্রার তুলনামূলক পাঠ │ইরান সিরিজ পর্ব -০৩ │১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী ইরান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণে উঠে আসে—ধর্ম, রাষ্ট্র, পাঠ্যক্রম, জ্ঞানসৃষ্টি ও নাগরিক নির্মাণের দুই ভিন্ন পথ, দুই ভিন্ন সংকট এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষার এক অভিন্ন প্রশ্ন https://odhikarpatra.com/news/35047
  2. বিপ্লব উত্তর ইরান: চার দশকের শিক্ষা ব্যবস্থার বিবর্তন ও আদর্শিক রূপান্তর│অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক │ইরান পর্ব -০২ │বিপ্লবের পাঠশালায় ইরানের শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রমের ইসলামীকরণ │১৯৭৯-পরবর্তী ইরানে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত রূপান্তর, পাঠ্যক্রমের ইসলামীকরণ, নারীশিক্ষার বিস্তার, বিজ্ঞানচর্চার উত্থান এবং নতুন প্রজন্মের প্রশ্ন—আদর্শ দিয়ে কি সত্যিই একটি জাতির মন নিয়ন্ত্রণ করা যায়? https://odhikarpatra.com/news/34850
  3. নিষেধাজ্ঞার আগুনে পুড়েও যে দেশ গড়েছে অদম্য প্রগতি: শিক্ষার শক্তিতে বাংলাদেশ কোথায়?│অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের নতুন আয়োজন │পর্ব -০১│নিষেধাজ্ঞা, বিচ্ছিন্নতা ও সংকটের ভেতর থেকেও ইরান কীভাবে শিক্ষা, বিজ্ঞান, নারীশিক্ষা, গবেষণা ও কারিগরি দক্ষতাকে জাতীয় শক্তিতে রূপ দিয়েছে, আর সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারকে কী প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। https://odhikarpatra.com/news/34840
  4. শিক্ষার নদী: প্রবহমান রাখো — ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ │ সিরিজ সম্পাদকীয় ভূমিকা (Editor's Note) │ অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের নতুন আয়োজন│ নিষেধাজ্ঞার পাহাড় আর উন্মুক্ত সাগর—দুই ভিন্ন ভূগোলের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যকার তুলনার আয়না —অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের নতুন সিরিজ https://odhikarpatra.com/news/34822


আপনার মূল্যবান মতামত দিন: