বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মায়েদের নিরব অথচ অদম্য সংগ্রাম, অসীম ত্যাগ ও অনন্য মাতৃত্বকে সম্মান জানাতে এক আবেগঘন ও মানবিক আয়োজনের সাক্ষী হলো রাজধানী ঢাকা। বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর ডিজঅ্যাবিলিটি প্রফেশনালস (বিএনএডিপি) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে যেন এক ছাদের নিচে জড়ো হয়েছিল না বলা কষ্ট, অশ্রু, সাহস, ভালোবাসা ও আশার অসংখ্য গল্প।
গত ১৫ মে শুক্রবার ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডে অবস্থিত গ্রীন সিড আর্লি লার্নিং সেন্টার প্রাঙ্গণে “বিশ্ব মা দিবস” উপলক্ষে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মায়েদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে অংশ নেন বিশেষ শিশুদের মা-বাবা, প্রতিবন্ধিতা পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ এবং বিএনএডিপি’র সম্মানিত সদস্যবৃন্দ। পুরো আয়োজনজুড়ে বিরাজ করছিল এক গভীর আবেগঘন ও পারিবারিক পরিবেশ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনএডিপি’র প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তাঁর উপস্থিতি এবং বক্তব্য পুরো আয়োজনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। তিনি বিশেষ শিশুদের মায়েদের উদ্দেশ্যে বলেন,
“শত বাধা-বিপত্তি আসলেও আমাদের দমে গেলে চলবে না, সামনে এগিয়ে যেতে হবে। বিশেষ শিশুদের এই মায়েরা একেকজন অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা। সন্তানকে গড়ে তুলতে তাদের যে আত্মত্যাগ, তা সত্যিই অতুলনীয়।”
তিনি আরও বলেন, সমাজে অনেক সময় বিশেষ শিশুদের পরিবারকে নানাভাবে অবহেলা, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু এই মায়েরা সমস্ত প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে সন্তানের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক শক্তি, ধৈর্য ও মমত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করছেন।
ব্যতিক্রমী এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মায়েদের অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্ব। সেখানে একের পর এক উঠে আসে সংগ্রামের গল্প—কখনও সমাজের অবজ্ঞা, কখনও চিকিৎসা ও শিক্ষার অনিশ্চয়তা, আবার কখনও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্ঘুম রাতের কথা। কিন্তু সেই গল্পগুলোর ভেতরেই ছিল অদম্য সাহস, মাতৃত্বের অশেষ শক্তি এবং সন্তানের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার দীপ্ত উদাহরণ। অনেক মায়ের কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠেছিল স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে; আবার অনেকেই সন্তানের ছোট্ট অর্জনের গল্প বলতে গিয়ে হাসিতে ভরে তুলেছিলেন পুরো মিলনায়তন। উপস্থিত অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে বিশেষ শিশুদের মায়েদের হাতে সম্মাননা স্মারক উত্তরীয় ও বিশেষ উপহার তুলে দেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। সম্মাননা গ্রহণের সময় অনেক মায়ের চোখে আনন্দাশ্রু দেখা যায়। তারা জানান, সমাজে তাদের সংগ্রাম খুব কমই দৃশ্যমান হয়; তাই এমন স্বীকৃতি তাদের নতুন করে শক্তি ও প্রেরণা জোগাবে।
আয়োজকরা জানান, এই আয়োজন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সম্মাননা অনুষ্ঠান নয়; বরং এটি বিশেষ শিশুদের পরিবারগুলোর প্রতি সমাজের সহমর্মিতা, সম্মান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির একটি মানবিক প্রয়াস। অনুষ্ঠানে উপস্থিত মায়েরা বিএনএডিপি’র প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
লেখক: শাম্মী হুমায়রা পারভিন এবং ফারহানা রহমান, সহসভাপতি, বিএনএডিপি

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: