odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 21st May 2026, ২১st May ২০২৬
বৈশ্বিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বেইজিং-মস্কো জোট: জ্বালানি, এআই ও প্রযুক্তি খাতে ২০টিরও বেশি চুক্তি স্বাক্ষর

চীন-রাশিয়া সম্পর্ক: ভূ-রাজনীতি, কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং পশ্চিমা বিশ্বের চ্যালেঞ্জ

Special Correspondent | প্রকাশিত: ২০ May ২০২৬ ২৩:৫০

Special Correspondent
প্রকাশিত: ২০ May ২০২৬ ২৩:৫০

নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র

ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে চীন ও রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সম্প্রতি দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিংয়ে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বেইজিংয়ের বিখ্যাত গ্রেট হলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে দুই রাষ্ট্রপ্রধান বৈশ্বিক রাজনীতি ও দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের পাশাপাশি বাণিজ্য, জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও প্রযুক্তি খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন।

সম্পর্কের নতুন শিখর এবং সীমাহীন বন্ধুত্ব

সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সর্বোচ্চ স্তরের সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, চীন ও রাশিয়া সমান মর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একে অপরের সঙ্গে আচরণ করেছে এবং এই সম্পর্ক এখন একটি নতুন সূচনা বিন্দুতে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়া-চীন সম্পর্ককে ‘আধুনিক বিশ্বে আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের একটি মডেল’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এই অংশীদারত্ব সমান অধিকার, পারস্পরিক সমর্থন এবং অকৃত্রিম বন্ধুত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। উল্লেখ্য চলতি বছর দুই দেশ কৌশলগত অংশীদারত্বের সমন্বয় প্রতিষ্ঠার ৩০তম বার্ষিকী এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের ২৫তম বার্ষিকী উদ্‌যাপন করছে। এটি পুতিনের ২৫তম চীন সফর, তবে দুই নেতা এ পর্যন্ত ৪০ বারেরও বেশি সাক্ষাৎ করেছেন।

জঙ্গলের আইন এবং মার্কিন নীতির সমালোচনা

যৌথ ঘোষণায় দুই নেতাই কোনো দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে ঔপনিবেশিক মানসিকতাসম্পন্ন কিছু দেশের তীব্র সমালোচনা করেন। শি জিনপিং বলেন, বিশ্ব আবারও জঙ্গলের আইনে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে এবং কিছু দেশ আন্তর্জাতিক বিষয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ইঙ্গিত মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। ঘোষণায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করে বলা হয়, এই পরিকল্পনা বিশ্বের কৌশলগত স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এছাড়া, গত ফেব্রুয়ারিতে মেয়াদ শেষ হওয়া পারমাণবিক অস্ত্র সীমিত রাখার চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’ (New START)-এর মেয়াদ বাড়াতে ট্রাম্পের অস্বীকৃতিকে যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কাকতালীয়ভাবে, পুতিনের এই সফরের মাত্র ছয় দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের শীর্ষ প্রযুক্তি কর্মকর্তাদের (যার মধ্যে NVIDIA-এর সিইও জেনসেন হুয়াং-ও ছিলেন) নিয়ে বেইজিং সফর করেছিলেন। তবে ট্রাম্পের সেই সফরে বড় কোনো চুক্তি সম্পন্ন হয়নি।

চুক্তি ও সহযোগিতার প্রধান ক্ষেত্রসমূহ

ক্রেমলিন জানিয়েছে, শুরুতে প্রায় ৪০টি চুক্তি স্বাক্ষরের আলোচনা থাকলেও আপাতত ২০টির বেশি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, বাকিগুলো পরে ঘোষণা করা হবে। উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রগুলো হলো:

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI): দুই দেশ এআই এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়াবে। বিশেষ করে, আধুনিক চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে প্রয়োজনীয় বিরল খনিজের (Rare Earth Minerals) বৈশ্বিক সরবরাহে চীনের আধিপত্য নিয়ে আলোচনা হয়।

জ্বালানি সংযোগ: রাশিয়া চীনে তেল ও গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ পাইপলাইন প্রকল্প (যা মঙ্গোলিয়া হয়ে রাশিয়া থেকে চীনে বছরে ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ করবে) এগিয়ে নিতে উভয় পক্ষ একটি সাধারণ সমঝোতায় পৌঁছেছে।

অন্যান্য খাত: বৈজ্ঞানিক গবেষণা, গণমাধ্যম, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং বহিরাগত চাপ থেকে মুক্ত থেকে বাণিজ্যিক লেনদেন নিশ্চিত করা।

অসমতা ও রাশিয়ার নির্ভরশীলতার ঝুঁকি

দুই দেশের সম্পর্ককে সীমাহীন বন্ধুত্ব বলা হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্ক অত্যন্ত অসম এবং এর অর্থনৈতিক ভিত্তি মূলত চীনের শর্তে নির্ধারিত হচ্ছে। কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের পরিচালক আলেকজান্ডার গাবুয়েভ বলেন, রাশিয়া পুরোপুরি চীনের প্রভাবে আছে এবং শর্ত নির্ধারণ করতে পারে চীন। চীনের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাত্র ৪ শতাংশ রাশিয়ার সঙ্গে, অথচ চীন এখন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে মস্কো বেইজিংয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়া তার নিষিদ্ধ প্রযুক্তির ৯০ শতাংশের বেশি চীন থেকে আমদানি করছে। এমনকি যুক্তরাজ্যের ৫জি নেটওয়ার্ক থেকে বাদ পড়া হুয়াওয়ে এখন রাশিয়ার টেলিযোগাযোগ খাতের মূল স্তম্ভ।

তবে রাশিয়া কোনোভাবেই চীনের অধীনস্ত বা 'জুনিয়র পার্টনার' হতে রাজি নয়। রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের সভাপতি দিমিত্রি ট্রেনিনের মতে, রাশিয়া একটি বৃহৎ শক্তি এবং এই সম্পর্ক সমান ভিত্তিতেই থাকতে হবে। বেইজিংয়ের বাইরে মস্কোর কার্যকর বিকল্প খুব কম হলেও, নিজের অবস্থানে অটল থাকার ক্ষমতাই মস্কোকে চীনের সম্পূর্ণ আধিপত্য থেকে রক্ষা করছে। পশ্চিমাদের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বৈরিতার এই সময়ে বেইজিং ও মস্কো একে অপরকে রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে, যা আগামী দিনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।

--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: