ধারাবাহিক অনুসন্ধানী শিক্ষা সংস্কার সিরিজ│“শিক্ষার সন্ধিক্ষণ—পাঠ্যবই থেকে জাতি গঠন” —১ম পর্ব
পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা কেবল জ্ঞান নয়, নির্মাণ করে একটি জাতির চিন্তা, চেতনা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ। অথচ গবেষণাহীন নীতিনির্ধারণ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং নেতৃত্বের সংকটের কারণে বাংলাদেশের শিক্ষাক্রম সংস্কার বারবার ঘুরে ফিরে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে—আমরা কি সত্যিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছি?জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) একটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অন্যতম। কারণ একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাসবোধ, নৈতিকতা, নাগরিকত্ব, সামাজিক মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তি নির্মিত হয় পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষাক্রম সংস্কারকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক, নীতিগত অস্থিরতা, গবেষণার ঘাটতি এবং বাস্তবায়ন সংকট বিদ্যমান। কেন বারবার পরিবর্তন করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না? কেন পাঠ্যবই নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়? কেন শিক্ষাক্রম সংস্কার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের শিকার হয়ে পড়ে? এই অনুসন্ধানী ধারাবাহিক ফিচার সিরিজে এনসিটিবির কাঠামো, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন প্রক্রিয়া, শিক্ষাক্রম সংস্কারের ইতিহাস, গবেষণার অভাব, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত বাস্তবতা ও সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।কারখানা।এই ধারাবাহিক ফিচার সিরিজে আমি অনুসন্ধান করার চেষ্টা করছি—এনসিটিবির প্রকৃত ভূমিকা কী, কেন শিক্ষাক্রম সংস্কার বারবার ব্যর্থ হয়, গবেষণাহীন নীতিনির্ধারণের মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে এবং কীভাবে একটি প্রমাণভিত্তিক, টেকসই ও ভবিষ্যতমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। কারণ পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠায় লেখা প্রতিটি শব্দই শেষ পর্যন্ত একটি জাতির আগামী দিনের ইতিহাস হয়ে ওঠে।
একটি জাতি কীভাবে নিজেকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের দৃষ্টি শেষ পর্যন্ত এসে থামে একটি শ্রেণিকক্ষের সামনে, একটি পাঠ্যবইয়ের পাতায়, কিংবা একজন শিশুর হাতে ধরা প্রথম বইটির দিকে। কারণ জাতি গঠনের প্রকৃত যুদ্ধ শুরু হয় সীমান্তে নয়, সংসদে নয়, বরং বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসে থাকা শিক্ষার্থীর মনের ভেতরে।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা গত কয়েক দশকে বহু সংস্কার, পরিবর্তন ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। কখনও সৃজনশীল পদ্ধতি, কখনও যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম, কখনও মূল্যায়ন ব্যবস্থার পরিবর্তন—প্রতিটি উদ্যোগের পেছনে ছিল উন্নত শিক্ষার প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ সংস্কারই স্থায়ী ইতিবাচক ফলাফল সৃষ্টি করতে পারেনি। বরং প্রতিটি নতুন উদ্যোগের সঙ্গে জন্ম নিয়েছে নতুন বিতর্ক, নতুন অনিশ্চয়তা এবং নতুন প্রশ্ন।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কেবল একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারখানা। এখানেই নির্ধারিত হয় আগামী প্রজন্ম কী শিখবে, কীভাবে শিখবে, কী বিশ্বাস করবে এবং কোন মূল্যবোধ ধারণ করবে। অথচ বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গবেষণার সংস্কৃতি, প্রয়োজন নিরূপণ (Needs Assessment), দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এখনও পর্যাপ্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এই ধারাবাহিক ফিচার সিরিজে আমরা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করব—এনসিটিবির প্রকৃত ভূমিকা কী, কেন শিক্ষাক্রম সংস্কার বারবার ব্যর্থ হয়, গবেষণাহীন নীতিনির্ধারণের মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে এবং কীভাবে একটি প্রমাণভিত্তিক, টেকসই ও ভবিষ্যতমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। কারণ পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠায় লেখা প্রতিটি শব্দই শেষ পর্যন্ত একটি জাতির আগামী দিনের ইতিহাস হয়ে ওঠে।
জাতি গঠনের নীরব স্থপতি নাকি সংকটের কারিগর? এনসিটিবি, পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রম সংস্কারের অজানা গল্প
একটি জাতির ভবিষ্যৎ কোথায় লেখা হয়? সংসদ ভবনের নীতিপত্রে, মন্ত্রণালয়ের ফাইলে, নাকি কোনো রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রে? আধুনিক শিক্ষা গবেষণা বলছে, একটি জাতির ভবিষ্যতের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রূপরেখা লেখা হয় স্কুলের পাঠ্যবইয়ের পাতায়। কারণ শিশুরা রাষ্ট্রকে প্রথম চিনতে শেখে পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে, ইতিহাসকে জানতে শেখে পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে, নাগরিকত্ব, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, গণতন্ত্র এবং মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত হয় পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমেই। সেই অর্থে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কেবল একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণের অন্যতম প্রধান কারিগর।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে। যে প্রতিষ্ঠান একটি দেশের কোটি কোটি শিশুর শেখার পথ নির্ধারণ করে, সেই প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তগুলো কতটা গবেষণাভিত্তিক? পাঠ্যবই পরিবর্তন, শিক্ষাক্রম সংস্কার, মূল্যায়ন পদ্ধতির রূপান্তর কিংবা নতুন শিক্ষাদর্শনের প্রবর্তনের আগে কতটা গভীর গবেষণা, প্রয়োজন নিরূপণ (Needs Assessment), পাইলটিং, পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন করা হয়? বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি বড় শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের পরই নতুন বিতর্ক, নতুন প্রশ্ন এবং নতুন সংকটের জন্ম হয়েছে। ফলে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—এনসিটিবি কি জাতি গঠনের নীরব স্থপতি, নাকি অনিচ্ছাকৃতভাবে পুনরাবৃত্ত সংকটেরও একটি উৎস?
একটি পাঠ্যবই কখনোই কেবল কিছু অধ্যায়, ছবি বা অনুশীলনীর সমষ্টি নয়। এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নাগরিকের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রেরিত একটি দীর্ঘমেয়াদি বার্তা। একটি শিশু তার দেশের ইতিহাস সম্পর্কে কী জানবে, কোন মূল্যবোধকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে, বিজ্ঞানকে কীভাবে দেখবে, ভিন্নমতকে কতটা সম্মান করবে, নারী-পুরুষ সম্পর্ক, পরিবেশ, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহনশীলতা কিংবা বৈশ্বিক নাগরিকত্ব সম্পর্কে কী ধারণা গড়ে তুলবে—এসবের বীজ অনেকাংশেই পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে রোপিত হয়। ফলে পাঠ্যবই রচনা এবং শিক্ষাক্রম উন্নয়ন কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়; এটি জাতি নির্মাণের একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক, গবেষণাভিত্তিক এবং নৈতিক দায়িত্ব।
দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের অনেক অধ্যায়ে গবেষণার চেয়ে তাড়াহুড়া, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত এবং প্রমাণভিত্তিক নীতির চেয়ে প্রশাসনিক নির্দেশনার প্রভাব বেশি দৃশ্যমান হয়েছে বলে সমালোচকরা মনে করেন। নতুন শিক্ষাক্রম চালুর আগে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থার প্রস্তুতি কতটা রয়েছে, নতুন পদ্ধতির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো কতটা বিদ্যমান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কতটা কার্যকর, এবং সংস্কারের সম্ভাব্য ঝুঁকি কী হতে পারে—এসব প্রশ্ন অনেক সময় সংস্কার-পরবর্তী বাস্তবতায় এসে সামনে আসে। ফলে যে সংস্কার শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন ঘটানোর কথা ছিল, তা কখনো কখনো নতুন বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়।
বিশ্বের অনেক দেশ শিক্ষাক্রম উন্নয়নকে একটি দীর্ঘ গবেষণামূলক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক শিক্ষা কেন্দ্র, মনোবিজ্ঞানী, মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ এবং বিষয়ভিত্তিক গবেষকরা দীর্ঘ সময় ধরে একসঙ্গে কাজ করেন। একটি নতুন পাঠ্যবই বা শিক্ষাক্রম জাতীয়ভাবে বাস্তবায়নের আগে বহুবার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ, সংশোধন এবং পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। কারণ তারা জানে, একটি ভুল অর্থনৈতিক নীতি হয়তো কয়েক বছরে সংশোধন করা যায়, কিন্তু একটি দুর্বল শিক্ষাক্রমের প্রভাব একটি প্রজন্মের ওপর স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক উন্নয়নের সঙ্গে দেশের শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক কতটা দৃঢ়? দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা বিষয়ে গবেষণা, কারিকুলাম স্টাডিজ, শিক্ষামনোবিজ্ঞান, মূল্যায়ন ও শিক্ষক শিক্ষার বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান কতটা কাজে লাগানো হয়? শিক্ষা সংস্কার কি একটি জাতীয় গবেষণা উদ্যোগের ফল, নাকি এটি প্রায়শই কিছু সীমিত পরিসরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যেই আবদ্ধ থাকে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক সংকটের শিকড় হয়তো পাঠ্যবইয়ের কোনো অধ্যায়ে নয়, বরং সেই পাঠ্যবই তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
প্রকৃতপক্ষে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির নকশা যখন গবেষণার পরিবর্তে অনুমান, অভিজ্ঞতার পরিবর্তে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন শিক্ষা ব্যবস্থা বারবার একই ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়। তখন শিক্ষাক্রম বদলায়, পাঠ্যবই বদলায়, পরীক্ষার ধরন বদলায়; কিন্তু শিক্ষার মৌলিক চ্যালেঞ্জগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অপরিবর্তিত থেকে যায়। ফলে সংস্কার আসে, বিতর্ক আসে, আবার নতুন সংস্কার আসে—কিন্তু কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর অধরাই থেকে যায়।
এ কারণেই এনসিটিবিকে ঘিরে আলোচনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের আলোচনা নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা। কারণ একটি জাতির আগামী দিনের নাগরিক, কর্মশক্তি, নেতৃত্ব এবং সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তি নির্মিত হয় যে প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে, সেই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে প্রশ্ন তোলা মানে আসলে জাতির ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন তোলা। আর সেই কারণেই এনসিটিবি, পাঠ্যবই এবং শিক্ষাক্রম সংস্কারের ইতিহাস শুধু শিক্ষা প্রশাসনের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের জাতি নির্মাণের ইতিহাসও।
পাঠ্যবইয়ের পাতা থেকে নির্মিত হয় একটি জাতির ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই সাধারণত আমরা শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পরীক্ষা, ফলাফল, কোচিং, বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষানীতির কথা বলি। কিন্তু খুব কম মানুষই সেই প্রতিষ্ঠানটির কথা ভাবেন, যার নীরব সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয় একটি শিশুর প্রথম অক্ষরজ্ঞান থেকে শুরু করে তার ইতিহাসচেতনা, বিজ্ঞানমনস্কতা, নৈতিক মূল্যবোধ, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ জীবনদর্শনের ভিত্তি। সেই প্রতিষ্ঠানটির নাম জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড—এনসিটিবি।
প্রতিবছর জানুয়ারির প্রথম দিনে যখন দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই পৌঁছে যায়, তখন আমরা আনন্দ উৎসব দেখি, রঙিন প্রচ্ছদ দেখি, নতুন শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার উচ্ছ্বাস দেখি। কিন্তু খুব কম মানুষ উপলব্ধি করেন, সেই বইগুলোর প্রতিটি পৃষ্ঠার পেছনে লুকিয়ে থাকে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষাগত দর্শন। একটি রাষ্ট্র তার আগামী প্রজন্মকে কী শেখাতে চায়, কী ধরনের নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, কোন মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষ দেখতে চায়—সেই সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ঘটে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে। আর সেই কারণেই এনসিটিবি কেবল একটি বই প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি মূলত একটি জাতি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান।
একটি শিশুর জীবনের প্রথম বিদ্যালয় হয় তার পরিবার। কিন্তু তার চিন্তার জগৎকে সংগঠিতভাবে নির্মাণ করতে শুরু করে বিদ্যালয় এবং বিদ্যালয়ের প্রধান হাতিয়ার হলো পাঠ্যপুস্তক। একটি শিশুর কাছে ইতিহাস কী, বিজ্ঞান কী, দেশপ্রেম কী, মানবতা কী, নাগরিক দায়িত্ব কী, বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান কী—এসবের প্রথম আনুষ্ঠানিক পরিচয় আসে পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে। সে কারণে পাঠ্যবই কেবল তথ্যের সমষ্টি নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের দলিল।
বাংলাদেশের মতো একটি নবীন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে একটি দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্রের সংগ্রাম এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা—এসবের সম্মিলিত উত্তরাধিকার বহন করছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র। এই উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক। ফলে এনসিটিবির ভূমিকা কখনোই কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি মূলত সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল একটি নতুন জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। পাকিস্তানি শাসনামলের শিক্ষাব্যবস্থা উপনিবেশিক ও বৈষম্যমূলক নানা সীমাবদ্ধতায় আক্রান্ত ছিল। একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক এবং মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজন ছিল নতুন শিক্ষাদর্শন। সেই প্রয়োজন থেকেই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং পরবর্তীতে এনসিটিবি জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় কারিগরি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
গত কয়েক দশকে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব ও গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, পাঠ্যপুস্তক উন্নয়ন, শিক্ষক সহায়ক উপকরণ তৈরি, শিক্ষাসামগ্রী প্রস্তুতকরণ এবং পাঠ্যবই বিতরণের মতো বিশাল দায়িত্ব পালন করছে এনসিটিবি। বিশ্বের বৃহত্তম বিনামূল্যের পাঠ্যবই বিতরণ কর্মসূচিগুলোর একটি পরিচালনা করে এই প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সংখ্যার বিশালতার আড়ালে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন রয়ে যায়—এই বইগুলোর মাধ্যমে আমরা কেমন বাংলাদেশ নির্মাণ করছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের পাঠ্যবইকে শুধুমাত্র বই হিসেবে নয়, বরং একটি সামাজিক দলিল হিসেবে দেখতে হবে। পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি অধ্যায়, প্রতিটি গল্প, প্রতিটি কবিতা, প্রতিটি ছবি এবং প্রতিটি উদাহরণ শিশুদের মনে একটি নির্দিষ্ট ধরনের পৃথিবী নির্মাণ করে। সেখানে কোন ইতিহাস থাকবে, কোন ইতিহাস থাকবে না; কোন বীরের গল্প বলা হবে, কোন মানুষের অবদান উপেক্ষিত হবে; নারীকে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে; প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, শ্রমজীবী মানুষ বা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে কীভাবে চিত্রিত করা হবে—এসবের প্রতিটি সিদ্ধান্ত গভীরভাবে রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো অনেক আগেই উপলব্ধি করেছে যে শিক্ষাক্রম একটি জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের অন্যতম শক্তিশালী উপকরণ। তাই তারা শিক্ষাক্রম উন্নয়নকে একটি দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণাভিত্তিক এবং বিশেষজ্ঞ-নির্ভর প্রক্রিয়া হিসেবে পরিচালনা করে। ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা কানাডার মতো দেশগুলোতে শিক্ষাক্রম সংস্কার কয়েক বছরের গবেষণা, পাইলটিং, শিক্ষক পরামর্শ এবং শিক্ষার্থী মূল্যায়নের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। সেখানে শিক্ষাক্রম পরিবর্তন কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি একটি জাতীয় একাডেমিক প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিক্ষাক্রম প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে। নতুন শিক্ষাক্রম, পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু, ইতিহাসের উপস্থাপন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উপাদানের ভারসাম্য কিংবা মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে প্রায়ই তর্ক-বিতর্ক দেখা যায়। এর ফলে এনসিটিবি অনেক সময় শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন এমন হয়?
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শিক্ষা সংস্কারকে আমরা প্রায়ই গবেষণাভিত্তিক সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং প্রশাসনিক কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করি। শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের আগে কতটুকু গবেষণা হয়েছে, শিক্ষকদের মতামত নেওয়া হয়েছে কি না, পাইলটিং কতটা সফল হয়েছে, বাস্তবায়নের জন্য কী প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্ন অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। ফলাফল হিসেবে সংস্কার নিয়ে অনিশ্চয়তা, বিভ্রান্তি এবং জনআস্থার সংকট তৈরি হয়।
আসলে শিক্ষাক্রম উন্নয়ন একটি অত্যন্ত জটিল কাজ। এটি কেবল সিলেবাস তৈরি নয়; বরং শিশুর মনস্তত্ত্ব, শেখার ধরণ, ভাষাগত সক্ষমতা, সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, সামাজিক প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ দক্ষতার সমন্বিত বিশ্লেষণ। একটি সফল শিক্ষাক্রমের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা মনোবিজ্ঞান, শিক্ষাতত্ত্ব, মূল্যায়ন বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার সম্পর্কে গভীর জ্ঞান। ফলে এনসিটিবির কার্যক্রমকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা সম্ভব নয়।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়েছে। আগামী দিনের শিক্ষার্থীদের এমন দক্ষতা প্রয়োজন যা মুখস্থ বিদ্যার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। তাদের প্রয়োজন সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, সৃজনশীলতা, সহযোগিতামূলক কাজের দক্ষতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের যোগ্যতা। ফলে এনসিটিবির দায়িত্ব এখন শুধু পাঠ্যবই তৈরি করা নয়; বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য মানবসম্পদ তৈরির রূপরেখা নির্ধারণ করা।
তবে শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো অন্তর্ভুক্তি। একটি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য নয়; এটি সকল শিক্ষার্থীর জন্য। প্রতিবন্ধী শিশু, আদিবাসী শিশু, সুবিধাবঞ্চিত শিশু, লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক পটভূমির শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা আধুনিক শিক্ষার মৌলিক শর্ত। পাঠ্যবইয়ের ভাষা, ছবি, গল্প এবং উদাহরণের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার বিশাল সুযোগ রয়েছে এনসিটিবির সামনে।
ডিজিটাল যুগে এনসিটিবির ভূমিকা আরও পরিবর্তিত হচ্ছে। ভবিষ্যতের পাঠ্যবই কেবল কাগজের বই হবে না। ই-বুক, অডিওবুক, ভিডিওভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী, ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষণ সহায়ক উপকরণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে এনসিটিবিকে একটি ঐতিহ্যগত পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে ধীরে ধীরে জ্ঞান ও শিক্ষাসামগ্রী উন্নয়নকেন্দ্রিক আধুনিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে হবে।
কিন্তু এই রূপান্তর কি সম্ভব হবে? উত্তর নির্ভর করছে আমরা এনসিটিবিকে কীভাবে দেখি তার ওপর। যদি আমরা এটিকে কেবল একটি সরকারি দপ্তর হিসেবে দেখি, তবে হয়তো পরিবর্তন সীমিত থাকবে। কিন্তু যদি আমরা এটিকে জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করি, তবে এর নেতৃত্ব, কাঠামো, গবেষণা সক্ষমতা এবং নীতিগত স্বাধীনতা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে হবে।
আজ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ দক্ষতার চাহিদা; অন্যদিকে রয়েছে সামাজিক ন্যায়বিচার, জাতীয় পরিচয় এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রয়োজন। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার দায়িত্ব অনেকাংশে এনসিটিবির ওপর বর্তায়।
তাই এনসিটিবি নিয়ে আলোচনা মানে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের আলোচনা নয়। এটি মূলত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় তার পাঠ্যবইয়ের পাতায় লেখা স্বপ্ন, আদর্শ এবং জ্ঞানের মধ্য দিয়েই। আর সেই কারণেই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে ঘিরে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে—এটি কি কেবল পাঠ্যবই প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠান, নাকি জাতি গঠনের নীরব স্থপতি? বাংলাদেশের আগামী দিনের উত্তর অনেকাংশে নির্ভর করছে এই প্রশ্নের সঠিক জবাবের ওপর।
পাঠ্যবই শুধু বই নয়: ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির নকশায় একটি জাতির আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের নীরব কারিগর
একটি শিশু যখন প্রথমবারের মতো বিদ্যালয়ে যায়, তখন তার হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি বই। সেই বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় হয়তো লেখা থাকে বাংলা বর্ণমালা, কোনো কবিতা, একটি গল্প অথবা একটি ছবি। বাইরে থেকে এটি একটি সাধারণ বই বলে মনে হলেও বাস্তবে সেটি কেবল কাগজে মুদ্রিত কিছু শব্দের সমষ্টি নয়; বরং সেটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের নকশা। একটি শিশু কী শিখবে, কীভাবে চিন্তা করবে, কাদেরকে শ্রদ্ধা করবে, কিসের জন্য গর্ববোধ করবে, কীকে সত্য মনে করবে এবং কোন আদর্শকে ধারণ করে বড় হবে—তার প্রথম আনুষ্ঠানিক ভিত্তি নির্মিত হয় পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে।
এই কারণেই বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রই পাঠ্যপুস্তককে শুধুমাত্র শিক্ষাসামগ্রী হিসেবে দেখে না। পাঠ্যপুস্তক আসলে একটি জাতির সামাজিক চুক্তি, সাংস্কৃতিক স্মৃতিভাণ্ডার এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার লিখিত রূপ। একটি দেশের পাঠ্যবই পড়লে সেই দেশের রাজনৈতিক দর্শন, জাতীয় আকাঙ্ক্ষা, সাংস্কৃতিক অগ্রাধিকার এবং মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। পাঠ্যবই একটি আয়নার মতো, যেখানে একটি জাতি নিজেকে দেখে; আবার একটি জানালার মতো, যার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম পৃথিবীকে দেখতে শেখে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বাস্তবতা আরও গভীর। কারণ এই রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে ভাষার জন্য সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের দাবি এবং স্বাধীনতার যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ফলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নতুন প্রজন্মকে কেবল জ্ঞান প্রদান করা নয়; বরং তাকে তার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রের জন্মকাহিনির সঙ্গে পরিচিত করে তোলা। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদার মতো বিষয়গুলো পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এই অর্থে পাঠ্যবই একটি জাতীয় স্মৃতির ধারক।
তবে পাঠ্যবইয়ের কাজ কেবল অতীতকে সংরক্ষণ করা নয়; এটি ভবিষ্যৎও নির্মাণ করে। একজন শিশু যখন বইয়ে পড়ে যে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদার অধিকারী, তখন তার মধ্যে লিঙ্গসমতার ধারণা জন্ম নেয়। যখন সে শেখে যে প্রতিবন্ধিতা কোনো অভিশাপ নয়, বরং মানব বৈচিত্র্যের একটি অংশ, তখন তার মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক মানসিকতা তৈরি হয়। যখন সে পরিবেশ সংরক্ষণ, মানবাধিকার, সহনশীলতা কিংবা বৈশ্বিক নাগরিকত্ব সম্পর্কে পড়ে, তখন ধীরে ধীরে তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়। অর্থাৎ পাঠ্যবই কেবল জ্ঞান দেয় না; এটি মূল্যবোধও তৈরি করে।
এখানেই পাঠ্যবইকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম হয়। কারণ একটি জাতি কী ধরনের মূল্যবোধ ধারণ করবে, তা নির্ধারণের প্রশ্ন কখনোই নিরপেক্ষ নয়। পাঠ্যবইয়ে কোন ইতিহাস থাকবে, কোন ইতিহাস বাদ পড়বে; কোন ব্যক্তিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, কার অবদান আড়ালে থাকবে; ধর্ম, সংস্কৃতি, জাতীয়তাবাদ এবং নাগরিকত্ব কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে—এসব সিদ্ধান্তের মধ্যেই নিহিত থাকে ক্ষমতা, আদর্শ এবং সমাজ নির্মাণের প্রশ্ন।
বাংলাদেশে পাঠ্যবই নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস বর্ণনা, জাতীয় ব্যক্তিত্বের উপস্থাপন, ধর্মীয় বিষয়বস্তু, সাহিত্য নির্বাচন এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় পাঠ্যবইয়ের ভাষা ও উপস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে—পাঠ্যবই কি রাষ্ট্রের আদর্শিক হাতিয়ার, নাকি গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ বাস্তবতা হলো পাঠ্যবই উভয় ভূমিকাই পালন করে। এটি যেমন শিক্ষার উপকরণ, তেমনি জাতি গঠনেরও উপকরণ। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় তখন, যখন গবেষণা ও শিক্ষাবিজ্ঞানের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনা পাঠ্যবই উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। তখন পাঠ্যবই শিক্ষার্থীর শেখার প্রয়োজনের চেয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাগুলো এই কারণে পাঠ্যবই উন্নয়নকে একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাভিত্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালনা করে। একটি পাঠ্যবই তৈরির আগে শিক্ষার্থীদের শেখার ধরণ, ভাষাগত সক্ষমতা, সামাজিক বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ দক্ষতার চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়। শিক্ষক, গবেষক, মনোবিজ্ঞানী, বিষয় বিশেষজ্ঞ এবং কারিকুলাম বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে কাজ করেন। ফলে পাঠ্যবই একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাঠ্যবই উন্নয়ন নিয়ে গবেষণার সংস্কৃতি এখনও খুব শক্তিশালী নয়। আমরা পাঠ্যবই লিখি, মুদ্রণ করি এবং বিতরণ করি; কিন্তু পাঠ্যবই বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, কোন অংশ তাদের কাছে বোধগম্য হচ্ছে না, কোন বিষয় তাদের চিন্তাশক্তি বিকাশে সহায়ক হচ্ছে—এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা খুবই সীমিত। ফলে অনেক সময় পাঠ্যবই উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক গবেষণাপ্রক্রিয়ার পরিবর্তে প্রকল্পভিত্তিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পাঠ্যবইয়ের ভাষা। একটি শিশুর চিন্তার জগৎ গঠনে ভাষার ভূমিকা অপরিসীম। ভাষা যদি জটিল হয়, তাহলে শেখা কঠিন হয়ে যায়। ভাষা যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলে শিশুর চিন্তাও পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে ওঠে। ভাষা যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না। ফলে পাঠ্যবইয়ের ভাষা নির্বাচনের প্রশ্নটি কেবল সাহিত্যিক নয়; এটি শিক্ষাগত ও নৈতিক প্রশ্নও।
একবিংশ শতাব্দীতে পাঠ্যবইয়ের আরেকটি নতুন চ্যালেঞ্জ হলো ডিজিটাল রূপান্তর। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা শুধু বই পড়ে না; তারা ভিডিও দেখে, ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শেখে। ফলে পাঠ্যবইকে আর একমাত্র জ্ঞানের উৎস হিসেবে দেখা যায় না। বরং এটি একটি বৃহত্তর শিক্ষাব্যবস্থার অংশ। ভবিষ্যতের পাঠ্যবই হবে বহুমাত্রিক—যেখানে মুদ্রিত বইয়ের পাশাপাশি থাকবে ডিজিটাল কনটেন্ট, অডিও, ভিডিও, ভার্চুয়াল ল্যাব এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ শিক্ষাসামগ্রী।
কিন্তু প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রার মাঝেও একটি বিষয় অপরিবর্তিত থাকবে। তা হলো পাঠ্যবইয়ের মূল্যবোধগত ভূমিকা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মানবিকতা শেখাতে পারে না। ইন্টারনেট জ্ঞান দিতে পারে, কিন্তু জাতীয় পরিচয় নির্মাণ করতে পারে না। প্রযুক্তি দক্ষতা বাড়াতে পারে, কিন্তু নৈতিক বোধ তৈরি করতে পারে না। এই কাজ এখনো পাঠ্যবই এবং শিক্ষকের যৌথ দায়িত্ব।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের প্রশ্নেও পাঠ্যবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি একটি জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবনী, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক রাষ্ট্র গড়তে চাই, তবে আমাদের পাঠ্যবইকেও সেই লক্ষ্য ধারণ করতে হবে। সেখানে শুধু পরীক্ষায় ভালো করার উপকরণ নয়, বরং চিন্তা করার ক্ষমতা, প্রশ্ন করার সাহস, বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলার উপাদান থাকতে হবে।
আজ যখন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নতুন সংস্কার, নতুন শিক্ষাক্রম এবং নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, তখন আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে পাঠ্যবই নিয়ে। কারণ পাঠ্যবই কেবল বই নয়। এটি আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্মাণের নকশা। আজকের পাঠ্যবইয়ের পাতায় যে স্বপ্ন লেখা হবে, আগামী দিনের বাংলাদেশ অনেকাংশে সেই স্বপ্নেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে। তাই পাঠ্যবই নিয়ে আলোচনা মানে কেবল শিক্ষা নিয়ে আলোচনা নয়; এটি জাতি নিয়ে আলোচনা, ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা এবং বাংলাদেশ কেমন হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আলোচনা।নিচে ধারাবাহিকের তৃতীয় পর্বের জন্য একটি সংবাদপত্রের বিশেষ ফিচার নিবন্ধের খসড়া প্রদান করা হলো।
কেন ব্যর্থ হয় শিক্ষাক্রম সংস্কার? —গবেষণাহীন নীতিনির্ধারণের মূল্য এবং বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পুনরাবৃত্ত সংকট
বাংলাদেশে শিক্ষাক্রম পরিবর্তন এখন আর কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। প্রায় প্রতি দশকেই নতুন কোনো শিক্ষাক্রম, নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থা, নতুন পাঠ্যবই কিংবা নতুন শিক্ষা সংস্কারের ঘোষণা আসে। সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়, সেমিনারে আলোচনা হয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ শুরু হয়, নতুন বই ছাপা হয় এবং শিক্ষার্থীরা নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু কয়েক বছর না যেতেই আবার নতুন পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়। ফলে একটি প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে—বাংলাদেশে শিক্ষাক্রম সংস্কার কি সত্যিই শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য, নাকি এটি একটি অবিরাম পরীক্ষাগারের চক্র, যেখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বারবার পরীক্ষার বিষয়বস্তুতে পরিণত হন?
২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষা অঙ্গনে যে বিতর্ক সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে, তার অন্যতম হলো জাতীয় শিক্ষাক্রম নিয়ে বিতর্ক। ২০২৩ সালের দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের অল্প সময়ের মধ্যেই এর বিরুদ্ধে সমালোচনা শুরু হয়। শিক্ষকরা প্রস্তুতির অভাবের কথা বলেন, অভিভাবকরা বিভ্রান্তির কথা বলেন, শিক্ষার্থীরা মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে। পরবর্তীতে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই শিক্ষাক্রম আংশিকভাবে স্থগিত বা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই ঘটনাটি কেবল একটি শিক্ষাক্রমের সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের গভীরতর একটি সমস্যার প্রতিফলন।
সমস্যাটি হলো—আমরা শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করি, কিন্তু শিক্ষাক্রম নিয়ে গবেষণা করি না।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে একটি শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের আগে বহু বছরের গবেষণা পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীদের শেখার ধরন, শিক্ষকদের সক্ষমতা, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, সামাজিক বাস্তবতা, শ্রমবাজারের চাহিদা এবং ভবিষ্যৎ দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর পরীক্ষামূলকভাবে কিছু বিদ্যালয়ে পাইলটিং করা হয়। পাইলটিংয়ের ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়। শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা গবেষকদের মতামত নেওয়া হয়। প্রয়োজন হলে সংশোধন করা হয়। তারপর ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন শুরু হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, শিক্ষাক্রম প্রণয়নের চেয়ে বাস্তবায়নের গতি বেশি গুরুত্ব পায়। একটি নতুন ধারণা আসে, একটি কমিটি গঠিত হয়, কয়েকটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়, কিছু বিশেষজ্ঞ মতামত দেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে সেটি জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে বাস্তবতার সঙ্গে নীতির একটি ফাঁক তৈরি হয়। কাগজে যে শিক্ষাক্রম কার্যকর বলে মনে হয়, শ্রেণিকক্ষে গিয়ে সেটি প্রায়ই ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।
এর অন্যতম কারণ হলো "নিডস অ্যাসেসমেন্ট" বা চাহিদা নিরূপণের সংস্কৃতির অভাব। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আসলে কী শিখতে চায়? শিক্ষকরা কী ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন মনে করেন? গ্রামীণ বিদ্যালয় ও নগর বিদ্যালয়ের বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য কতটা? প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কী ধরনের অভিযোজন দরকার? ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা সম্ভব?—এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনেই অনেক সময় শিক্ষাক্রম পরিকল্পনা করা হয়।
শিক্ষাক্রম সংস্কারের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো ধারাবাহিকতার অভাব। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে একাধিক শিক্ষানীতি, একাধিক শিক্ষাক্রম এবং একাধিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। প্রতিটি পরিবর্তনই নতুন সম্ভাবনার কথা বলেছে, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়নের মাধ্যমে দেখা হয়েছে যে পূর্ববর্তী সংস্কার কতটা সফল বা ব্যর্থ ছিল। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি "policy amnesia" বা নীতিগত বিস্মৃতি তৈরি হয়েছে। আমরা নতুন নীতি তৈরি করি, কিন্তু পুরোনো নীতির শিক্ষা গ্রহণ করি না।
এই প্রবণতার একটি গুরুতর প্রভাব পড়ে শিক্ষকদের ওপর। কারণ যেকোনো শিক্ষাক্রমের প্রকৃত বাস্তবায়নকারী হচ্ছেন শিক্ষক। কিন্তু অনেক সময় শিক্ষকদের যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়াই নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কয়েক দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে ধরে নেওয়া হয় যে একজন শিক্ষক সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাদর্শন, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শ্রেণিকক্ষ কৌশল আয়ত্ত করে ফেলবেন। বাস্তবে তা ঘটে না। ফলে শিক্ষক নিজেই অনিশ্চয়তায় ভোগেন এবং সেই অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের শেখার ওপর প্রভাব ফেলে।
২০২৩ সালের দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম বিতর্ক আমাদের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে—একটি শিক্ষাক্রম কি শুধুমাত্র শিক্ষাবিদদের প্রকল্প, নাকি এটি একটি সামাজিক চুক্তি? শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, নিয়োগকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ কতটা ছিল—এই প্রশ্নগুলো আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ শিক্ষা একটি জাতীয় বিষয়। এর সফলতা নির্ভর করে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর।
শিক্ষাক্রম সংস্কারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরেকটি দুর্বলতা হলো গবেষণা ও বাস্তবায়নের মধ্যে দুর্বল সংযোগ। দেশে শিক্ষা গবেষণা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাপত্র লেখা হয়, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রকল্প পরিচালনা করে; কিন্তু সেই গবেষণার ফলাফল কতটা নীতিনির্ধারণে ব্যবহার হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক সময় শিক্ষানীতি গবেষণার ওপর নয়, বরং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা আন্তর্জাতিক প্রবণতার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
বিশ্বব্যাপী বর্তমানে Evidence-Based Education Policy বা প্রমাণভিত্তিক শিক্ষা নীতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর মূল ধারণা হলো—শিক্ষা সংস্কারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত গবেষণালব্ধ তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রহণ করতে হবে। কোন পদ্ধতি কার্যকর, কোনটি অকার্যকর, কোন কৌশল শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল উন্নত করে—এসবের উত্তর গবেষণার মাধ্যমে খুঁজতে হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যেমন ওষুধ অনুমোদনের আগে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়, তেমনি শিক্ষা সংস্কারেও গবেষণা ও পরীক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনো একটি শক্তিশালী "Curriculum Research Culture" গড়ে ওঠেনি। এনসিটিবি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা অংশীদারিত্ব খুব সীমিত। পাঠ্যবই বাস্তবায়নের ওপর জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত গবেষণা হয় না। শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়নের জন্য স্বাধীন গবেষণা তহবিলও কার্যত অনুপস্থিত।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন একটি জাতীয় শিক্ষা গবেষণা অবকাঠামো গড়ে তোলা। এনসিটিবির অধীনে একটি স্থায়ী Curriculum Research Unit প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ এবং অন্যান্য শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা নেটওয়ার্ক গঠন করা যেতে পারে। প্রতিটি শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের আগে বাধ্যতামূলক গবেষণা, পাইলটিং এবং স্বাধীন মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষাক্রমকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাইরে নিয়ে যাওয়া। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পাঁচ বছর অন্তর মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে না। শিক্ষা সংস্কারের জন্য অন্তত ১৫ বছরের একটি জাতীয় ঐকমত্যভিত্তিক রোডম্যাপ প্রয়োজন। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু শিক্ষার্থীর শেখার অধিকার পরিবর্তিত হওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কোনো শিক্ষাক্রম কেবল ভালো ধারণা দিয়ে সফল হয় না; এটি সফল হয় গবেষণা, প্রস্তুতি, অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিকতার মাধ্যমে। একটি নতুন শিক্ষাক্রমের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় শ্রেণিকক্ষে, শিক্ষার্থীর শেখায় এবং সমাজের ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে।
আজ যখন বাংলাদেশ আবারও শিক্ষাক্রম পুনর্বিবেচনার পথে হাঁটছে, তখন আমাদের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। আমরা চাইলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারি। আমরা চাইলে গবেষণাভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি টেকসই শিক্ষাক্রম গড়ে তুলতে পারি। আর যদি তা না করি, তবে শিক্ষাক্রম সংস্কারের নাম করে আমরা কেবল নতুন নতুন পরীক্ষা চালিয়ে যাব, যার মূল্য দিতে হবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং পুরো জাতিকে। কারণ শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করা সহজ; কিন্তু একটি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য অনেক বেশি।
শেষ কথা ও চূড়ান্ত প্রতিফলন
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট মূলত পাঠ্যবইয়ের সংকট নয়, শিক্ষাক্রমের সংকট নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গির সংকট। আমরা প্রায়ই শিক্ষাকে একটি প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে দেখি; অথচ শিক্ষা মূলত একটি জাতি নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ। যে রাষ্ট্র তার শিক্ষাক্রমকে গবেষণার ওপর দাঁড় করাতে পারে না, যে রাষ্ট্র তার পাঠ্যপুস্তক উন্নয়নকে প্রমাণভিত্তিক করে তুলতে পারে না, যে রাষ্ট্র শিক্ষা প্রশাসনে শিক্ষাবিদদের যথাযথ নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে পারে না, সে রাষ্ট্রকে বারবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে হয়।
এখন সময় এসেছে শিক্ষাকে রাজনৈতিক মেয়াদ, প্রশাসনিক সুবিধা কিংবা প্রকল্পভিত্তিক সাফল্যের সীমা অতিক্রম করে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষা রূপকল্প, শক্তিশালী গবেষণা অবকাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষা গবেষণা নেটওয়ার্ক, স্বাধীন মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং শিক্ষা প্রশাসনে প্রকৃত শিক্ষাবিদদের কার্যকর অংশগ্রহণ। কারণ একটি উন্নত জাতির স্বপ্ন কখনোই দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে বাস্তবায়িত হতে পারে না।
একটি শিশুর হাতে দেওয়া পাঠ্যবই আসলে কাগজের কয়েকটি মলাটবন্দী পৃষ্ঠা নয়; সেটি একটি জাতির ভবিষ্যতের নকশাপত্র। সেই নকশা যদি গবেষণাহীন হয়, যদি তা বাস্তবতার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়, যদি তা সাময়িক সিদ্ধান্তের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি শিক্ষাবর্ষ নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি প্রজন্ম, একটি সমাজ, এমনকি একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।
আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো শিক্ষাক্রম কী হবে, কোন বই পড়ানো হবে কিংবা কোন পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া হবে—সেটি নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, আমরা কি শিক্ষাকে সত্যিই জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে দেখতে প্রস্তুত? আমরা কি শিক্ষা ব্যবস্থাকে গবেষণা, জবাবদিহি, পেশাদারিত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে প্রস্তুত?
যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে এখনই সময় নীরব ঝুঁকি ঝেড়ে ফেলে পাঠ্যবই, শিক্ষাক্রম এবং শিক্ষা প্রশাসনের কেন্দ্রে প্রকৃত শিক্ষাবিদ, গবেষক ও পেশাজীবীদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করার। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শ্রেণিকক্ষে; আর শ্রেণিকক্ষের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় আজকের সিদ্ধান্তে।
আগামী পর্ব
“শিক্ষার চালকের আসনে কে? শিক্ষাবিদ, আমলা নাকি অন্য কেউ—এনসিটিবি, শিক্ষা প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণে নেতৃত্বের সংকট
শিক্ষাবিদ, আমলা নাকি অন্য কেউ—কেন নীতনির্ধারণের বাইরে বাংলাদেশের শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা?
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা কমিশন এবং শিক্ষা প্রশাসনের নেতৃত্বে কারা থাকবেন—এ প্রশ্ন শুধু নিয়োগের প্রশ্ন নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে শিক্ষাক্রম, মূল্যায়ন, শিক্ষক শিক্ষা ও শিক্ষা গবেষণার মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রগুলোর নেতৃত্বে থাকেন শিক্ষা বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু বাংলাদেশে কি সেই চিত্র দেখা যায়?
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত শিক্ষা প্রশাসনের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা কেমন ছিল? কেন শিক্ষা গবেষক, Curriculum Specialist, Educational Psychologist, Assessment Expert কিংবা Teacher Educator-রা নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র থেকে ক্রমেই দূরে সরে গেছেন? কেন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা অনুষদ এবং আইইআরসমূহ জাতীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না?
পরবর্তী পর্বে আমরা অনুসন্ধান করব—
- শিক্ষার ক্ষেত্রে Technical Leadership বনাম Administrative Leadership বিতর্ক;
- কেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান পদে শিক্ষা বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ থাকা প্রয়োজন;
- আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষাক্রম উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে কারা থাকেন;
- বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশাসনে শিক্ষাবিদদের প্রান্তিকীকরণের ইতিহাস;
- এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রক্ষায় কী ধরনের নেতৃত্ব সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
একটি রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে যেমন অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসা কাউন্সিলের নেতৃত্বে যেমন চিকিৎসাবিদ এবং কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে যেমন কৃষিবিজ্ঞানী থাকেন, তেমনি প্রশ্ন উঠছে—জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে কি শিক্ষা বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞদের থাকা উচিত নয়? কারণ প্রশ্নটি শুধু একটি পদ নিয়ে নয়; প্রশ্নটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কে নির্ধারণ করবে—তা নিয়ে।
পরবর্তী পর্বে থাকছে তথ্য, ইতিহাস, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং কঠিন কিছু প্রশ্নের অনুসন্ধানী উত্তর।
চলবে...
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শিক্ষার_সন্ধিক্ষণে_বাংলাদেশ #শিক্ষা_সংস্কার #এনসিটিবি #শিক্ষাক্রম_সংস্কার #পাঠ্যবইয়ের_পাতায়_ভবিষ্যৎ #গবেষণাভিত্তিক_শিক্ষা #শিক্ষাবিদদের_নেতৃত্ব #EducationReformBD #EvidenceBasedEducation #FutureOfBangladesh
আরো পড়ুন: পাঠ্যবই থেকে জাতি গঠন: NCTB শিক্ষাক্রম ও শিক্ষা সংস্কারের ভবিষ্যৎ│ জাতীয় শিক্ষাক্রম পাঠ্যপুস্তক শিক্ষা প্রশাসন গবেষণা ও নীতিনির্ধারণের অন্তরালের বাস্তবতা নিয়ে অনুসন্ধানী ধারাবাহিক শিক্ষার সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: পাঠ্যবই পাঠক্রম নাকি রাজনীতি—কার হাতে গড়ছে আগামী প্রজন্ম? │“শিক্ষার সন্ধিক্ষণ—পাঠ্যবই থেকে জাতি গঠন” ধারাবাহিকের ১ম পর্ব অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক শিক্ষার_সন্ধিক্ষণে_বাংলাদেশ এনসিটিবি

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: