odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 21st July 2026, ২১st July ২০২৬
বিদ্যালয়ের দরজা সবার জন্য খুলছে, নাকি জ্ঞানের চাবি ধীরে ধীরে কিছু মানুষের হাতেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে?—বাংলাদেশের শিক্ষা, রাষ্ট্র, বৈষম্য ও ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে এক গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ

রাষ্ট্র কি সত্যিই সবার জন্য শিক্ষা চায়, নাকি বৈষম্য জিইয়ে রেখেই ভবিষ্যতের ক্ষমতার মানচিত্র আঁকে?

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২০ July ২০২৬ ২৩:৫০

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২০ July ২০২৬ ২৩:৫০

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকশিক্ষা বিতর্ক-০৩

শিক্ষা কি কেবল মানবাধিকার, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান? রাষ্ট্রের নীতি, বাজেট, পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শিক্ষার বাজারায়নের মধ্য দিয়ে কীভাবে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়, আবার একই সঙ্গে কীভাবে নতুন বৈষম্যও সৃষ্টি হতে পারে—এই গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণধর্মী ফিচারে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা হয়েছে। পিয়ের বুর্দিয়ু, জন রলস, পাওলো ফ্রেইরে, লুই আলথুসার, অমর্ত্য সেন, নির্ভরশীলতা তত্ত্ব এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্লেষণের আলোকে আলোচিত হয়েছে—রাষ্ট্র কি কেবল শিক্ষা বিস্তার করছে, নাকি কখনও কখনও নীতিনির্ধারণ, সম্পদ বণ্টন ও ক্ষমতার কাঠামোর মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগ নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূতও করছে? একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিক্ষা সহযোগিতা, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষা সংস্কারের ভবিষ্যৎ পথও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এই ফিচার নিবন্ধে রাষ্ট্র, শিক্ষা এবং সামাজিক বৈষম্যের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আলোচনায় দেখানো হয়েছে যে শিক্ষা বিস্তারে রাষ্ট্রের ভূমিকা অপরিহার্য হলেও, সম্পদ বণ্টন, নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোর কারণে একই সঙ্গে বৈষম্য পুনরুৎপাদনের ঝুঁকিও সৃষ্টি হতে পারে। পিয়ের বুর্দিয়ু, জন রলস, পাওলো ফ্রেইরে, লুই আলথুসার, অমর্ত্য সেন এবং সমালোচনামূলক শিক্ষাতত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়নের উপায় নয়; এটি রাষ্ট্র, গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের অন্যতম ভিত্তি। নিবন্ধটি উপসংহারে যুক্তি দেয় যে ভবিষ্যতের শিক্ষা সংস্কারকে সমতা (Equality) নয়, বরং ন্যায়সঙ্গত সুযোগ (Equity), জবাবদিহি, অন্তর্ভুক্তি এবং প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, যাতে শিক্ষা সত্যিকার অর্থে সকল নাগরিকের সক্ষমতা বিকাশের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

রাষ্ট্রের ভাবনায় শিক্ষা কি আসলেই তাই?

রাষ্ট্রের ইতিহাসে খুব কম প্রতিষ্ঠানই শিক্ষার মতো এত গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাষ্ট্র সেনাবাহিনী গড়তে পারে, আইন প্রণয়ন করতে পারে, অর্থনীতি পরিচালনা করতে পারে; কিন্তু তার ভবিষ্যৎ নাগরিকের চিন্তা, মূল্যবোধ, দক্ষতা এবং সামাজিক কল্পনাকে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গভীরভাবে গড়ে তোলে শিক্ষাব্যবস্থা। তাই শিক্ষা কেবল বিদ্যালয় নির্মাণ বা পাঠ্যপুস্তক বিতরণের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং ক্ষমতার সম্পর্ক বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

প্রায় প্রতিটি আধুনিক রাষ্ট্রই ঘোষণা করে যে শিক্ষা সবার মৌলিক অধিকার। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায়, শিক্ষা বিস্তার এবং শিক্ষা-নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় একই সঙ্গে চলতে পারে। বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়তে পারে, ভর্তি বৃদ্ধি পেতে পারে, কিন্তু সেই শিক্ষার গুণগত মান, সম্পদের বণ্টন, পাঠ্যক্রম, ভাষা, মূল্যায়ন এবং সুযোগের কাঠামো কি সত্যিই সবার জন্য সমান থাকে? নাকি কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষা এমনভাবেই সংগঠিত হয়, যা বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে অক্ষুণ্ণ রাখে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে শিক্ষাকে কেবল প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে নয়, বরং একটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

রাষ্ট্রের ভূমিকা: শিক্ষা বিস্তারে রাষ্ট্র কি সবসময় সমতার রক্ষক, নাকি কখনও বৈষম্যের পুনর্নির্মাতা?

রাষ্ট্রকে সাধারণত শিক্ষার সর্ববৃহৎ পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেখা হয়। সংবিধান, আইন, বাজেট, বিদ্যালয় নির্মাণ, শিক্ষক নিয়োগ, জাতীয় পাঠ্যক্রম এবং সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা—এসবই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কিন্তু এখানেই বিশ্লেষণের সমাপ্তি নয়। একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়: রাষ্ট্র কি কেবল শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করে, নাকি সেই সুযোগের প্রকৃতি ও বণ্টনও নির্ধারণ করে?

বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখায়, একই রাষ্ট্রের মধ্যেই এমন বিদ্যালয় থাকতে পারে যেখানে আধুনিক বিজ্ঞানাগার, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং সমৃদ্ধ শিক্ষার পরিবেশ বিদ্যমান; আবার এমন বিদ্যালয়ও থাকতে পারে যেখানে শিক্ষকসংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং মৌলিক শিক্ষাসামগ্রীর অভাব দীর্ঘদিন ধরে রয়ে যায়। ফলে শিক্ষা বিস্তার এবং শিক্ষায় ন্যায়সঙ্গত প্রবেশাধিকার সবসময় একই বিষয় নয়।

পিয়ের বুর্দিয়ু (Pierre Bourdieu) দেখিয়েছেন যে শিক্ষাব্যবস্থা অনেক সময় বিদ্যমান সাংস্কৃতিক পুঁজিকে বৈধতা দেয় এবং সামাজিক বৈষম্যকে পুনরুৎপাদন করে। অন্যদিকে জন রলস (John Rawls) যুক্তি দেন, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সবচেয়ে বঞ্চিত মানুষের জন্য সুযোগের ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করা। এই দুই তাত্ত্বিক অবস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্র একই সঙ্গে বৈষম্য কমানোর মাধ্যমও হতে পারে, আবার নীতির ব্যর্থতা বা অসম সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে বৈষম্যকে দীর্ঘস্থায়ীও করতে পারে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—রাষ্ট্র কি কখনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিক্ষার অধিকতর সুযোগ নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করে? এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রকাশ্যে এমন নীতি ঘোষণা করে না। কিন্তু যদি বাজেট, দক্ষ শিক্ষক, প্রযুক্তি, ভাষাগত সুবিধা, উচ্চমানের প্রতিষ্ঠান কিংবা আন্তর্জাতিক সুযোগ ধারাবাহিকভাবে নির্দিষ্ট সামাজিক, ভৌগোলিক বা অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর দিকে বেশি প্রবাহিত হয়, তবে ফলাফল হিসেবে শিক্ষার সুযোগে কাঠামোগত বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে, যদিও সেটি নীতির ঘোষিত উদ্দেশ্য নাও হয়। তাই গবেষণার প্রশ্ন হওয়া উচিত—রাষ্ট্রের নীতি বাস্তবে কারা বেশি উপকৃত হচ্ছে, আর কারা ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে থাকছে।

রাষ্ট্রের ভূমিকার মূল্যায়ন তাই উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে নয়; বরং ফলাফলের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। একটি শিক্ষা নীতি তখনই সফল, যখন তা কেবল বিদ্যালয়ে ভর্তি বাড়ায় না, বরং মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, নিরাপদ পরিবেশ এবং শেখার প্রকৃত সুযোগ সমাজের প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছে দিতে পারে।

শিক্ষায় বৈষম্য: কী রাষ্ট্রসৃষ্ট প্রপঞ্চ, নাকি বৈষম্যের কাছেই রাষ্ট্র অসহায়?

শিক্ষায় বৈষম্য নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—এই বৈষম্য কি কেবল অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার অনিবার্য ফল, নাকি রাষ্ট্রের নীতি, বিনিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই তা পুনরুৎপাদিত হয়? এর উত্তর একরৈখিক নয়। কারণ রাষ্ট্র যেমন বৈষম্য কমানোর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, তেমনি ভুল নীতি, দুর্বল বাস্তবায়ন কিংবা রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের কারণে রাষ্ট্র নিজেও কখনও বৈষম্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে।

একই দেশের ভেতরেই দেখা যায়, কোনো শিশুর বিদ্যালয়ে আধুনিক বিজ্ঞানাগার, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও ডিজিটাল সুবিধা রয়েছে; অন্যদিকে আরেকটি শিশু এমন একটি বিদ্যালয়ে পড়ছে, যেখানে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, শিক্ষকসংকট দীর্ঘদিনের, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটও অনিশ্চিত। দুজন শিক্ষার্থী একই জাতীয় পরীক্ষায় অংশ নেয়, কিন্তু তাদের শেখার সুযোগ কখনোই সমান ছিল না। ফলে ফলাফলের বৈষম্যকে কেবল ব্যক্তিগত মেধা বা পরিশ্রমের পার্থক্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা ন্যায়সংগত নয়।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ো (Pierre Bourdieu) দেখিয়েছিলেন, শিক্ষা অনেক সময় বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্যকে কমানোর পরিবর্তে সাংস্কৃতিক পুঁজির অসম বণ্টনের মাধ্যমে তা পুনরুৎপাদন করে। বিপরীতে, জন রলস (John Rawls)-এর ন্যায়বিচারের তত্ত্ব মনে করিয়ে দেয় যে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সবচেয়ে বঞ্চিত মানুষের জন্য সুযোগের ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করা। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায়, রাষ্ট্র কখনও বৈষম্যের অংশীদার, আবার কখনও বৈষম্য দূর করার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।

তবে রাষ্ট্রকে এককভাবে অভিযুক্ত করাও বাস্তবতাকে সরলীকরণ করা হবে। দারিদ্র্য, নগর-গ্রাম বৈষম্য, পারিবারিক শিক্ষাগত পটভূমি, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা, ভাষাগত বৈচিত্র্য, বাজারের চাপ এবং সামাজিক ক্ষমতার কাঠামো—সব মিলিয়েই শিক্ষাগত বৈষম্য তৈরি হয়। রাষ্ট্র যদি শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, প্রয়োজনভিত্তিক বাজেট বণ্টন এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করতে পারে, তবে এই বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কিন্তু যদি নীতিনির্ধারণে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ প্রাধান্য পায় এবং বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠ অনুপস্থিত থাকে, তবে শিক্ষা সমতার সেতু না হয়ে বৈষম্যের আয়নায় পরিণত হয়। তাই প্রকৃত প্রশ্ন রাষ্ট্র বৈষম্যের শিকার কি না, সেটি নয়; বরং রাষ্ট্র তার নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে কতটা প্রস্তুত এবং কতটা জবাবদিহিমূলক—সেই প্রশ্নই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষা ব্যবস্থায় অসংগতি: ইচ্ছাকৃতভাবেই টিকিয়ে রাখা হচ্ছে, নাকি তা দূর করা হিমালয়সম বাধা?

শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী অসংগতি দেখে অনেকের মনেই সন্দেহ জাগে—এত সমস্যা কি কেবল অদক্ষতার ফল, নাকি এগুলোর কিছু অংশ ইচ্ছাকৃতভাবেই টিকে থাকে? এই প্রশ্নের উত্তরও সরল নয়। কারণ বড় কোনো জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা হাজারো প্রতিষ্ঠান, লক্ষাধিক শিক্ষক, কোটি কোটি শিক্ষার্থী, অসংখ্য প্রশাসনিক স্তর এবং পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। ফলে সংস্কার যেমন প্রয়োজন, তেমনি তা বাস্তবায়ন করাও অত্যন্ত জটিল।

অন্যদিকে ইতিহাস দেখায়, কিছু অসংগতি দীর্ঘদিন ধরে অক্ষত থাকে কারণ সেগুলো থেকে কোনো না কোনো গোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে লাভবান হয়। পরীক্ষাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, অতিরিক্ত কোচিং নির্ভরতা, সনদমুখী শিক্ষা, মুখস্থবিদ্যার বাজার কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা—এসবের চারপাশে কখনও কখনও একটি স্বার্থজাল গড়ে ওঠে। ফলে যে সংস্কার সাধারণ মানুষের জন্য উপকারী হতে পারে, তা অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ, আমলাতান্ত্রিক জড়তা কিংবা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে ধীর হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা নতুন নয়; শিক্ষাবিষয়ক সমালোচনামূলক গবেষণায় বহুবার দেখানো হয়েছে যে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা নিজের স্থিতাবস্থা রক্ষার প্রবণতা রাখে।

তবে এটিও সত্য যে সব সমস্যাকে ষড়যন্ত্রের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার জটিলতা আড়াল হয়ে যায়। একজন শিক্ষককে নতুন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া, পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, মূল্যায়ন সংস্কার, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, ভাষাগত ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য বিবেচনা, আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং কোটি শিক্ষার্থীর জন্য একই সঙ্গে পরিবর্তন কার্যকর করা—এসবই অত্যন্ত কঠিন কাজ। তাই অনেক সংস্কার ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হলেও বাস্তবায়নের পর্যায়ে গতি হারায়।

সম্ভবত সমস্যার মূল উৎস কোনো একক কারণ নয়; বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, আর্থিক অগ্রাধিকার এবং সামাজিক প্রত্যাশার জটিল আন্তঃসম্পর্ক। যদি সমাজ কেবল পরীক্ষার ফলকেই শিক্ষার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে ধরে রাখে, তবে বিদ্যালয়ও সেই চাহিদা পূরণে বাধ্য হবে। আবার যদি রাষ্ট্র, শিক্ষক, অভিভাবক, গবেষক ও নাগরিক সমাজ সম্মিলিতভাবে মানবিক, বৈজ্ঞানিক ও ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষার দাবি তোলে, তবে দীর্ঘদিনের অসংগতিও পরিবর্তিত হতে পারে। হিমালয় যেমন একদিনে অতিক্রম করা যায় না, তেমনি শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংস্কারও কোনো একক সিদ্ধান্তে সম্পন্ন হয় না। কিন্তু কঠিন বলেই তা অসম্ভব নয়; বরং সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অঙ্গীকার, প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ এবং ধারাবাহিক সামাজিক অংশগ্রহণই সেই পথকে বাস্তব করে তুলতে পারে।

শিক্ষার লক্ষ্য কে নির্ধারণ করে, কার জন্য নির্ধারণ করে, আর শেষ পর্যন্ত কাদের স্বার্থই বা রক্ষা করে?

শিক্ষা নিয়ে আলোচনায় আমরা প্রায়ই একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাই—শিক্ষার লক্ষ্য আসলে কে নির্ধারণ করে? আরও গভীর প্রশ্ন হলো, সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় কার জন্য এবং শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য কাদের স্বার্থ রক্ষা করে? আমরা সাধারণত ধরে নিই, শিক্ষার উদ্দেশ্য তো স্বাভাবিকভাবেই মানুষ গড়া, জ্ঞান সৃষ্টি, নৈতিকতা বিকাশ কিংবা জাতীয় উন্নয়ন। কিন্তু ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব এবং শিক্ষাদর্শন আমাদের সতর্ক করে দেয় যে, শিক্ষার লক্ষ্য কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বা রাজনীতিমুক্ত নয়। যে সমাজে ক্ষমতা যার হাতে, শিক্ষার উদ্দেশ্য নির্ধারণের ক্ষমতাও প্রায়শই তার হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকে।

Paulo Freire তাঁর সমালোচনামূলক শিক্ষাতত্ত্বে দেখিয়েছেন, শিক্ষা হয় মানুষের মুক্তির হাতিয়ার, নয়তো বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো টিকিয়ে রাখার মাধ্যম। অন্যদিকে Louis Althusser শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রের অন্যতম আদর্শিক যন্ত্র (Ideological State Apparatus) হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে নাগরিকদের শুধু জ্ঞান নয়, একটি নির্দিষ্ট সামাজিক শৃঙ্খলা মেনে চলার মানসিকতাও গড়ে তোলা হয়। আবার John Dewey যুক্তি দেন, শিক্ষা যদি গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের প্রকল্প না হয়, তবে তা কেবল তথ্য স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রশ্ন আরও প্রাসঙ্গিক। আমাদের শিশুরা বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে কৌতূহল নিয়ে, কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের শেখানো হয় কীভাবে অন্যকে হারাতে হয়। পরীক্ষায় প্রথম হওয়া, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, উচ্চ বেতনের চাকরি পাওয়া—এসবই যেন শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য। খুব কম ক্ষেত্রেই প্রশ্ন করা হয়, এই শিক্ষা কি তাকে একজন ন্যায়পরায়ণ, সহানুভূতিশীল, দায়িত্বশীল এবং সমাজসচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছে? যদি শিক্ষা কেবল প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়ার কৌশল শেখায়, তবে তা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত সাফল্য উৎপাদন করতে পারে; কিন্তু সামাজিক আস্থা, সহযোগিতা এবং মানবিক সংহতি তৈরি করতে পারে না।

অবশ্য এর বিপরীত যুক্তিও রয়েছে। অনেকে বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং উৎকর্ষ অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতা অপরিহার্য। এই যুক্তির ভেতরে আংশিক সত্য রয়েছে। কিন্তু সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন সহযোগিতা, নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা পুরোপুরি প্রতিযোগিতা দখল করে নেয়। সুস্থ প্রতিযোগিতা মানুষকে উৎকর্ষের দিকে নিয়ে যেতে পারে; কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিযোগিতা মানুষকে অন্যকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শেখায়, সহযাত্রী হিসেবে নয়।

অতএব, শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি কেবল কী শেখানো হবে—তা নয়; বরং কেন শেখানো হবে, কার স্বার্থে শেখানো হবে এবং সেই শিক্ষার মাধ্যমে কেমন সমাজ নির্মাণ করা হবে। যদি শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণে কেবল অর্থনীতি, বাজার বা ক্ষমতার চাহিদা প্রাধান্য পায়, তবে শিক্ষা দক্ষ কর্মী তৈরি করবে, কিন্তু পূর্ণ মানুষ নয়। আর যদি শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে মানবমর্যাদা, ন্যায়, সহযোগিতা ও যৌথ কল্যাণ, তবে শিক্ষা শুধু ব্যক্তির ভাগ্যই বদলাবে না; একটি সমাজের নৈতিক ভবিষ্যৎও নির্মাণ করবে।

শিক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: উন্নয়নশীল দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ, নাকি উন্নত বিশ্বের কৌশলগত বিনিয়োগ?

বিশ্বায়নের যুগে শিক্ষা আর কোনো একক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। পাঠ্যক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা কিংবা শিক্ষানীতি—সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু এই সহযোগিতার অন্তরালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—এই অংশীদারিত্ব কি সত্যিই উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য, নাকি এর মধ্যেও বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতি ও স্বার্থের হিসাব লুকিয়ে থাকে?

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ইতিবাচক দিক অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বহু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ বিদ্যালয়ে ভর্তি বৃদ্ধি, নারীশিক্ষার প্রসার, প্রাথমিক শিক্ষার সম্প্রসারণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষা পরিকল্পনার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বহুপাক্ষিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা থেকে বাস্তব উপকার পেয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংঘাত কিংবা মহামারির সময় এই সহযোগিতা অনেক দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতেও সহায়ক হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা বিনিময়, বৃত্তি, যৌথ বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক জ্ঞান আদান-প্রদানও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

কিন্তু সমালোচনামূলক তাত্ত্বিকরা প্রশ্ন তোলেন, সহায়তা কখনও কখনও নিরপেক্ষ থাকে কি? নির্ভরশীলতা তত্ত্ব (Dependency Theory), বিশ্ব-ব্যবস্থা তত্ত্ব (World-Systems Theory) এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্লেষণ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বৈশ্বিক ক্ষমতার সম্পর্ক সব সময় সমান নয়। অনেক ক্ষেত্রেই অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকে নির্দিষ্ট নীতিগত শর্ত, পরামর্শক নিয়োগ, প্রযুক্তি ক্রয়, মূল্যায়ন কাঠামো কিংবা এমন কিছু সংস্কার, যা অর্থদাতা দেশের নীতিগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—সহযোগিতার ভাষা কি কখনও কখনও নীতিগত প্রভাব বিস্তারের একটি কোমল উপায়ে পরিণত হয় না?

অন্যদিকে পাল্টা যুক্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক উন্নয়ন সহযোগী এখন যৌথ মালিকানা (country ownership), স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অংশীদারিত্বভিত্তিক উন্নয়নের ওপর জোর দেয়। বাস্তবে কোনো দেশের সরকারও একতরফাভাবে বাইরের নীতি গ্রহণে বাধ্য নয়; গ্রহণ, সংশোধন বা প্রত্যাখ্যান করার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা তার নিজেরই থাকে। তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে একদিকে নিঃস্বার্থ উদারতা কিংবা অন্যদিকে নিছক আধিপত্যের প্রকল্প হিসেবে দেখলে বাস্তবতার জটিলতা ধরা পড়ে না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—সহযোগিতা কতটা সমমর্যাদার, কতটা প্রমাণভিত্তিক, কতটা স্থানীয় বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীল এবং কতটা সেই দেশের জনগণের দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাগত চাহিদাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে।

শিক্ষায় অনুদান ঋণ: উদার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, নাকি নব্য উপনিবেশবাদের নতুন ভাষা?

শিক্ষাখাতে অনুদান ও ঋণের ইতিহাস প্রায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যবস্থার সমবয়সী। এই অর্থায়নের মাধ্যমে অসংখ্য বিদ্যালয় নির্মিত হয়েছে, শিক্ষক প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়েছে, নতুন পাঠ্যপুস্তক তৈরি হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ শিশু প্রথমবারের মতো বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তাই উন্নয়ন অর্থায়নকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক হিসেবে দেখার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। অনেক দরিদ্র দেশের সীমিত রাজস্ব কাঠামো বিবেচনায় এই সহযোগিতা কখনও কখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তবু সমালোচনামূলক শিক্ষাতত্ত্ব এবং নব্য উপনিবেশবাদ (Neo-colonialism) বিষয়ক গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে—অর্থের সঙ্গে কি ধারণাও আমদানি হয়? ঘানার প্রথম রাষ্ট্রপতি কোয়ামে নক্রুমা (Kwame Nkrumah) নব্য উপনিবেশবাদের ধারণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছিলেন, সরাসরি রাজনৈতিক শাসনের পরিবর্তে অর্থনীতি, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও নীতির ওপর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমেও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারে। শিক্ষা সেই প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে, যদি স্থানীয় ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে একরৈখিক উন্নয়ন মডেল চাপিয়ে দেওয়া হয়।

তবে এই বিশ্লেষণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পাল্টা দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিজে কখনোই ভালো বা মন্দ নয়; এর ফলাফল নির্ভর করে অর্থের ব্যবহারের ধরন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্থানীয় নেতৃত্বের সক্ষমতার ওপর। যে দেশ নিজের জাতীয় শিক্ষা-দর্শন, গবেষণা, তথ্যপ্রমাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে পরিচালিত করতে পারে, সেখানে অনুদান বা ঋণ জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থানীয় বাস্তবতার পরিবর্তে কেবল বাহ্যিক শর্ত ও স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পভিত্তিক সাফল্য স্থান পায়, তাহলে অর্থায়ন অনিচ্ছাকৃতভাবেও নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে।

অতএব প্রশ্নটি অনুদান বা ঋণ গ্রহণের নয়; প্রশ্নটি হলো, কে শিক্ষার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করছে, কার জ্ঞানকে বৈধ বলে গণ্য করা হচ্ছে এবং সংস্কারের দিকনির্দেশনা কতটা দেশের নিজস্ব জনগণ, শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা তখনই প্রকৃত অংশীদারিত্বে রূপ নেয়, যখন তা স্থানীয় জ্ঞানকে প্রতিস্থাপন করে না, বরং শক্তিশালী করে; জাতীয় স্বায়ত্তশাসনকে সংকুচিত করে না, বরং সমৃদ্ধ করে; এবং উন্নয়নের ভাষাকে নির্ভরশীলতার নয়, পারস্পরিক সম্মান ও যৌথ শিক্ষার ভাষায় রূপান্তরিত করে।

 বিত্তবানদের জন্য কি বেশি গুণগতমানসম্পন্ন শিক্ষা? রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে শিক্ষা কি এখন একটি পণ্য?

একসময় শিক্ষা ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের একটি মৌলিক নৈতিক অঙ্গীকার। প্রচলিত ধারণা ছিল—শিক্ষা কোনো বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর জন্য নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের অধিকার এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে বিশ্বাস করত যে শিক্ষা মানুষের জীবন বদলে দেয়, দারিদ্র্যের চক্র ভাঙে, সামাজিক গতিশীলতা সৃষ্টি করে এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে বাজারভিত্তিক অর্থনীতির বিস্তার, বেসরকারি বিনিয়োগের বৃদ্ধি এবং শিক্ষার ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণের প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে—শিক্ষা কি ধীরে ধীরে একটি জনসম্পদ (public good) থেকে একটি বাজারজাত পণ্যে (market commodity) রূপান্তরিত হচ্ছে?

এই প্রশ্ন কেবল অর্থনীতির নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নও। কারণ বাস্তবতা আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর বৈপরীত্য হাজির করে। একই শহরে, কখনো কখনো একই সড়কের দুই পাশে, দুই ধরনের বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব দেখা যায়। একদিকে রয়েছে আধুনিক বিজ্ঞানাগার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষাসুবিধা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ছোট শ্রেণিকক্ষ, আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরামর্শব্যবস্থাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে রয়েছে এমন বিদ্যালয়, যেখানে একটি শ্রেণিকক্ষে সত্তর থেকে আশি জন শিক্ষার্থী, পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, কার্যকর গ্রন্থাগার নেই, বিজ্ঞানাগার নেই, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ অবকাঠামোও অনুপস্থিত। প্রশ্ন হলো—এই দুই পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা কি সত্যিই সমান সুযোগ নিয়ে জীবনের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়?

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ু (Pierre Bourdieu) এই বৈষম্য ব্যাখ্যা করতে সাংস্কৃতিক পুঁজি (Cultural Capital) ধারণার কথা বলেন। তাঁর মতে, বিত্তবান পরিবার শুধু অর্থনৈতিক সম্পদই নয়; ভাষা, সাংস্কৃতিক রুচি, সামাজিক যোগাযোগ, আত্মবিশ্বাস এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশও সন্তানদের কাছে উত্তরাধিকারসূত্রে পৌঁছে দেয়। বিদ্যালয় অনেক সময় অজান্তেই এই অর্জিত সুবিধাগুলোকেই ‘যোগ্যতা’ হিসেবে মূল্যায়ন করে। ফলে যাদের শুরুতেই এগিয়ে থাকার সুযোগ থাকে, তারাই প্রতিযোগিতায় আরও এগিয়ে যায়।

অন্যদিকে স্যামুয়েল বোলস (Samuel Bowles) এবং হার্বার্ট গিন্টিস (Herbert Gintis) তাঁদের Correspondence Theory-তে যুক্তি দিয়েছেন যে অনেক শিক্ষাব্যবস্থা বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন ঘটায় এবং সেই বৈষম্যকেই পুনরুৎপাদন করে। অর্থাৎ শিক্ষা সবসময় বৈষম্য কমানোর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে না; অনেক ক্ষেত্রে এটি বিদ্যমান বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়।

তবে এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে। বাস্তবতা হলো, অনেক বেসরকারি ও স্বাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উদ্ভাবনী শিক্ষণ-পদ্ধতি, দক্ষ শিক্ষক, উন্নত প্রযুক্তি, গবেষণাভিত্তিক পাঠদান এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সফল হয়েছে। ফলে প্রশ্নটি সরকারি বনাম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সরল তুলনায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—গুণগতমানসম্পন্ন শিক্ষা কি শুধুমাত্র অর্থের বিনিময়ে অর্জনযোগ্য একটি সেবা হয়ে উঠবে, নাকি রাষ্ট্র এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলবে যেখানে প্রতিটি শিশু, তার পারিবারিক আর্থিক অবস্থান নির্বিশেষে, ন্যূনতম উচ্চমানের শিক্ষা লাভের নিশ্চয়তা পাবে?

যদি উন্নত শিক্ষা কেবল উচ্চ টিউশন ফি পরিশোধ করতে সক্ষম পরিবারের নাগালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে শিক্ষা আর সামাজিক গতিশীলতার সেতু হিসেবে কাজ করবে না; বরং তা ধীরে ধীরে সামাজিক বিভাজনকে আরও দৃঢ় করবে। তখন বিদ্যালয় হবে কেবল জ্ঞান অর্জনের স্থান নয়, বরং সামাজিক বৈষম্য পুনরুৎপাদনের একটি নীরব প্রতিষ্ঠান।

এই প্রেক্ষাপটে অমর্ত্য সেন (Amartya Sen) এবং মার্থা সি. নুসবাম (Martha C. Nussbaum)-এর Capability Approach বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁদের মতে, উন্নয়ন কেবল জাতীয় আয় বৃদ্ধি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না; প্রকৃত উন্নয়ন তখনই ঘটে, যখন মানুষের বাস্তব সক্ষমতা (capability) বৃদ্ধি পায়। আর সেই সক্ষমতা নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো গুণগতমানসম্পন্ন শিক্ষা। তাই শিক্ষা যদি ক্রমেই একটি বাজারজাত পণ্যে পরিণত হয়, তবে সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিপরীতে, রাষ্ট্র যদি এমন একটি শিক্ষা-ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে যেখানে একজন দরিদ্র কৃষকের সন্তান এবং একজন ধনী শিল্পপতির সন্তান সমান দক্ষ শিক্ষক, নিরাপদ বিদ্যালয়, আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী এবং বিকাশের সমান সুযোগ পায়, তখনই শিক্ষা তার প্রকৃত মানবিক, গণতান্ত্রিক এবং রাষ্ট্রগঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শিক্ষা কি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার মধ্যে থাকবে, নাকি ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বিভক্ত একটি বাজারব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠবে? এই বিতর্কের উত্তর কেবল শিক্ষানীতিকে নয়, ভবিষ্যৎ সমাজের চরিত্রকেও নির্ধারণ করবে।

শেষ পর্যন্ত এটি অর্থের প্রশ্নের চেয়ে অনেক বেশি—এটি রাষ্ট্রের দর্শন, ন্যায়বিচারের ধারণা এবং উন্নয়নের মডেল নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন। আমরা কি এমন একটি সমাজ নির্মাণ করতে চাই, যেখানে ভালো শিক্ষা মূলত বিত্তবানদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে? নাকি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে একজন শিশুর ভবিষ্যৎ তার পরিবারের আয়ের পরিমাণ দিয়ে নয়, তার মেধা, সম্ভাবনা, পরিশ্রম এবং শিক্ষার ন্যায্য সুযোগ দিয়ে নির্ধারিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে—শিক্ষা ভবিষ্যতে একটি বাজারজাত পণ্য হয়ে থাকবে, নাকি একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনসম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

 রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি: বৈষম্যের নতুন মুখ

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি কঠিন বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সংবিধান শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও বাস্তবে শিক্ষার অর্থায়নের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে পরিবার। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট শিক্ষা ব্যয়ের প্রায় ৭১ শতাংশই বহন করতে হয় শিক্ষার্থীদের পরিবারকে, যা বিশ্বের সর্বোচ্চগুলোর মধ্যে অন্যতম। অর্থাৎ রাষ্ট্রের পরিবর্তে পরিবারই এখন শিক্ষার প্রধান অর্থদাতা। এর ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র কি ধীরে ধীরে তার শিক্ষা-সংক্রান্ত দায়িত্ব পরিবারের ওপর স্থানান্তর করছে?

শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি শুধু বিদ্যালয়ের ভর্তি ফি বা মাসিক বেতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট প্রায় প্রতিটি খাতে ব্যয় বেড়েছে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে সহায়ক বই, খাতা, কলম, ক্যালকুলেটর, স্কুলব্যাগ, ইউনিফর্ম, পরিবহন, ডিজিটাল ডিভাইস, ইন্টারনেট, পরীক্ষার ফি, কোচিং এবং প্রাইভেট টিউশন—সব মিলিয়ে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা গ্রহণ এখন একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। ফলে শিক্ষা কেবল একটি অধিকার নয়; অনেক পরিবারের জন্য এটি ক্রমেই একটি অর্থনৈতিক সামর্থ্যের পরীক্ষায় রূপ নিচ্ছে।

এই ব্যয়ের সবচেয়ে বড় উৎসগুলোর একটি হলো বেসরকারি শিক্ষা খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ। সরকারি বিদ্যালয়ে তুলনামূলকভাবে কম ব্যয় হলেও বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম, এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয় এবং বিভিন্ন স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, মাসিক বেতন ও অন্যান্য ফি সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সন্তানের জন্য অপেক্ষাকৃত ভালো শিক্ষার আশায় এই প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে ঝুঁকছে; কিন্তু এর বিনিময়ে তাদের পারিবারিক বাজেটের একটি বড় অংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যয় পরিবারের সঞ্চয়, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনকেও সংকুচিত করে দিচ্ছে।

অন্যদিকে, কোচিং ও প্রাইভেট টিউশন এখন প্রায় একটি সমান্তরাল শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। শ্রেণিকক্ষের পাঠদান অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষামুখী প্রতিযোগিতার চাহিদা পূরণ করতে না পারায় বিপুলসংখ্যক পরিবার অতিরিক্ত কোচিং ও ব্যক্তিগত শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। Education Watch-এর তথ্য অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে পরিবারের শিক্ষা ব্যয় প্রায় ২৫ শতাংশ এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও মানসম্মত ফলাফল অর্জনের জন্য পরিবারের আরেকটি সমান্তরাল শিক্ষা ব্যবস্থার অর্থ জোগাড় করতে হচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষা উপকরণের ক্রমবর্ধমান মূল্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাতা, কলম, জ্যামিতি বক্স, ক্যালকুলেটর, স্কুলব্যাগ, ইউনিফর্মসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণের দাম গড়ে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ডিজিটাল শিক্ষার বিস্তারের ফলে স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যয়ও অনেক পরিবারের জন্য নতুন আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে শিক্ষার প্রকৃত ব্যয় শুধু বিদ্যালয়ের ফি দিয়ে আর পরিমাপ করা যায় না; এটি একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হয়েছে।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে দরিদ্র, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর। যখন পরিবারের আয়ের বড় অংশ শিক্ষার পেছনে ব্যয় করতে হয়, তখন অনেক শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে টিকে থাকতে পারে না। কেউ কোচিংয়ের খরচ বহন করতে না পেরে পিছিয়ে পড়ে, কেউ আবার বই-খাতা বা যাতায়াতের ব্যয় মেটাতে না পেরে বিদ্যালয় ত্যাগ করে। অনেক পরিবার সন্তানের শিক্ষা চালিয়ে নিতে ঋণ গ্রহণ করতেও বাধ্য হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় বেসরকারি শিক্ষায় উচ্চ অংশগ্রহণের কারণে বাংলাদেশে এই আর্থিক চাপ আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। ফলে শিক্ষা, যা সামাজিক বৈষম্য কমানোর অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হওয়ার কথা, অনেক ক্ষেত্রে উল্টো বৈষম্য পুনরুৎপাদনের একটি কাঠামোগত উপাদানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

অবশ্য সরকার এই চাপ কমানোর জন্য উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, বিদ্যালয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষা বাজেট বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবুও শিক্ষা অর্থায়নের সামগ্রিক চিত্রে পারিবারিক ব্যয়ের অংশ এখনও অত্যন্ত উচ্চ। অনেক শিক্ষা অর্থনীতিবিদ মনে করেন, জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও তা এখনও শিক্ষার্থীদের পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে যখন শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদন (GDP)-এর তুলনায় আন্তর্জাতিকভাবে সুপারিশকৃত মানের নিচে অবস্থান করে, তখন পরিবারকেই সেই ঘাটতি পূরণ করতে হয়।

ফলে আজকের বাংলাদেশের শিক্ষা বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নটি হলো—রাষ্ট্র কি শিক্ষার ব্যয় ক্রমশ পরিবারের ওপর স্থানান্তর করবে, নাকি এমন একটি শিক্ষা অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তুলবে যেখানে অর্থনৈতিক সামর্থ্য নয়, নাগরিক অধিকারই হবে মানসম্মত শিক্ষায় প্রবেশের প্রধান ভিত্তি? কারণ শিক্ষা যখন ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন বৈষম্য কেবল আয়েই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা জ্ঞান, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, সামাজিক মর্যাদা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জীবন-সুযোগের মধ্যেও স্থায়ীভাবে বিস্তার লাভ করে। সেই অর্থে শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, সমান সুযোগ এবং রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক চরিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে।

 দারিদ্র্যের কারণে যখন মাধ্যমিকের আগেই থেমে যায় শিক্ষাজীবন: রাষ্ট্র কী করছে?

বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার হার গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক, উপবৃত্তি, বিদ্যালয় অবকাঠামোর সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতা কর্মসূচির ফলে প্রায় সব শিশুই এখন কোনো না কোনোভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশ করছে। কিন্তু একটি কঠিন বাস্তবতা হলো—বিদ্যালয়ে প্রবেশ করা এবং মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা এক বিষয় নয়। দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছানোর আগেই অথবা মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই হারিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের দায় কার? এটি কি কেবল পারিবারিক দারিদ্র্যের ফল, নাকি রাষ্ট্রীয় নীতিরও একটি ব্যর্থতার প্রতিফলন?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০২৫-এর তথ্য একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। জরিপ অনুযায়ী, দেশে নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পেরেছে মাত্র ৬৯.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার হার নেমে এসেছে ৪৩.৮ শতাংশে। অর্থাৎ দেশের অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শিক্ষার পূর্ণ ধাপ অতিক্রম করতে পারছে না। এটি শুধু শিক্ষাব্যবস্থার একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ, দক্ষ কর্মশক্তি এবং সামাজিক গতিশীলতার জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তা।

কেন এমন হচ্ছে? বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান একটি বিষয়েই একমত—মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার সবচেয়ে বড় কারণ পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের অভাব। ইউনেস্কোর তথ্য বিশ্লেষণ দেখায়, প্রাথমিক স্তরের তুলনায় মাধ্যমিক পর্যায়ে পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থান শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা নির্ধারণে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ শিক্ষা যত উপরের স্তরে যায়, অর্থের ভূমিকা ততই নির্ধারক হয়ে ওঠে। ফলে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা একটি অধিকারের চেয়ে বরং একটি কঠিন অর্থনৈতিক সংগ্রামে পরিণত হয়।

এই বৈষম্যের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয় ইউনেস্কো (২০২২)-এর তথ্য বিশ্লেষণে। সেখানে দেখা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ধনী ও দরিদ্র পরিবারের মধ্যে পার্থক্য তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে সেই ব্যবধান দ্রুত বিস্তৃত হয়। প্রাথমিক স্তরে অতি দরিদ্র ও অতি ধনী পরিবারের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সম্পন্ন করার হারের পার্থক্য ছিল প্রায় ১১ শতাংশীয় পয়েন্ট। কিন্তু নিম্ন মাধ্যমিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ শতাংশীয় পয়েন্টে, আর উচ্চ মাধ্যমিকে পৌঁছে ব্যবধান বিস্তৃত হয় ৪৮ শতাংশীয় পয়েন্টে। অর্থাৎ শিক্ষাব্যবস্থা যত এগোয়, বৈষম্যও তত গভীর হয়।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, অতি দরিদ্র পরিবারের মাত্র ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থী নিম্ন মাধ্যমিক এবং মাত্র ১২ শতাংশ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে। বিপরীতে, অতি ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার যথাক্রমে ৮৮ শতাংশ এবং ৬০ শতাংশ। একই দেশের, একই জাতীয় শিক্ষাক্রমের অধীনে থেকেও অর্থনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে এত বড় বৈষম্য একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—রাষ্ট্র কি সত্যিই সবার জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে পেরেছে?

এই বাস্তবতার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো মাধ্যমিক শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। এডুকেশন ওয়াচ–২০২৩ গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালে একজন মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর জন্য পরিবারের বার্ষিক গড় ব্যয় ছিল ২৭,৩৪০ টাকা; শহরাঞ্চলে এই ব্যয় ছিল প্রায় ৩৫,৬৬২ টাকা, আর মফস্বলে ২২,৯০৯ টাকা। কিন্তু মূল্যস্ফীতি, শিক্ষা উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং কোচিংনির্ভরতার কারণে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই ব্যয় প্রায় ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ফলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য মাধ্যমিক স্তরে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

গবেষণাটি আরও একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরে। সারা দেশের আট বিভাগ, ১৬ জেলা, ২৬ উপজেলা এবং পাঁচটি সিটি করপোরেশন থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা যায়, মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ বিদ্যালয়ের পাঠদান অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীর প্রয়োজন পূরণ করতে পারছে না। ফলে পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত কোচিং, প্রাইভেট টিউটর এবং গাইড বইয়ের পেছনে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। যেসব পরিবার এই ব্যয় বহন করতে পারে না, তাদের সন্তানরা ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ই ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

আইইআরের একজন শিক্ষাবিদ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, বাংলাদেশ এখনও মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। তাঁর ভাষায়, অভিভাবক যত বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারবেন, সন্তানের শিক্ষার মানও তত উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতা শিক্ষাকে একটি মৌলিক অধিকার থেকে ক্রমশ একটি ক্রয়ক্ষমতানির্ভর সুবিধায় রূপান্তরিত করছে। তিনি অন্তত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবৈতনিক শিক্ষা, কোচিং ও গাইড বইয়ের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপবৃত্তি বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

তবে সমস্যাটি শুধু পরিবারের আয় বা শিক্ষা ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের প্রশ্নও। বর্তমানে দেশের ২১,২৩২টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ১৯,৯৩৭টিই বেসরকারি, অর্থাৎ প্রায় ৯৪ শতাংশ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র ৬৯৪টি, যার মধ্যে মাত্র ৫৩টি গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত। অথচ দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে। ফলে যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, সেখানে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি সবচেয়ে কম। এটি কেবল পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা নয়; এটি শিক্ষা-সুযোগ বণ্টনের একটি কাঠামোগত বৈষম্য।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গত পাঁচ দশকে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সম্প্রসারণ একই গতিতে হয়নি। ফলে মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যত এমন একটি পর্যায়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রের পরিবর্তে পরিবার এবং বেসরকারি খাতই প্রধান অর্থদাতা ও সেবাদাতা। এর অর্থ হলো, একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্রমেই তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

একজন শিক্ষাবিদ যিনি শিক্ষা বিজ্ঞানের অধ্যাপক। আলোপচনার সময়ে তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণ যথার্থভাবেই তুলে ধরে বলেন, সরকার প্রাথমিক শিক্ষার দায় নীতিগতভাবে গ্রহণ করলেও মাধ্যমিক শিক্ষাকে এখনও একই গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের আওতায় আনতে পারেনি। এমপিওভুক্তির মতো সহায়তা থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। তাঁর মতে, কেবল মাধ্যমিক শিক্ষা অবৈতনিক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা, যেখানে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, গ্রামীণ অঞ্চলে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সম্প্রসারণ, কোচিং ও গাইড বইনির্ভরতা নিয়ন্ত্রণ, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক কার্যকর শিক্ষাদান এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।

সবশেষে প্রশ্নটি অত্যন্ত মৌলিক। যদি একটি শিশু কেবল দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে না পারে, তবে এটি কি তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, নাকি রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতা? একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু বিদ্যালয়ের দরজা খুলে দেওয়া নয়; সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করা প্রতিটি শিশুকে নিরাপদে শিক্ষার গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়াও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। অন্যথায় দারিদ্র্য শুধু একটি প্রজন্মের শিক্ষাকে নয়, পরবর্তী প্রজন্মের জীবন-সুযোগকেও সীমাবদ্ধ করে দেবে। তখন শিক্ষা আর বৈষম্য দূর করার মাধ্যম থাকবে না; বরং বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পুনরুৎপাদনের এক নীরব ব্যবস্থায় পরিণত হবে।

বিদ্যালয়ের দরজা সবার জন্য খুলছে, নাকি জ্ঞানের চাবি ধীরে ধীরে কিছু মানুষের হাতেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে?

এই দীর্ঘ আলোচনার শেষে এসে বিতর্কটি আর কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাজেট, বিদ্যালয় বা পরীক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্নটি আরও গভীরে পৌঁছে যায়—রাষ্ট্র আসলে কী ধরনের সমাজ নির্মাণ করতে চায়? কারণ শিক্ষা কখনোই কেবল জ্ঞান স্থানান্তরের একটি প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া নয়; এটি ভবিষ্যতের নাগরিক, শ্রমশক্তি, নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং ক্ষমতার সম্পর্ক নির্মাণের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের বাস্তবতা একটি দ্বৈত চিত্র তুলে ধরে। একদিকে রাষ্ট্র প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি বৃদ্ধি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক, উপবৃত্তি, বিদ্যালয় নির্মাণ এবং শিক্ষার সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অন্যদিকে একই রাষ্ট্রের ভেতরেই এমন একটি শিক্ষা কাঠামো গড়ে উঠেছে, যেখানে গুণগত শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, প্রযুক্তি, ভাষাগত সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার পরিবেশ এবং উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ ক্রমশ আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পড়ছে। ফলে বিদ্যালয়ের দরজা হয়তো সবার জন্য খুলছে, কিন্তু সেই বিদ্যালয়ের ভেতরে শেখার মান, শেখার সুযোগ এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত থাকছে না।

এখানেই এই ফিচারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণাত্মক প্রশ্নটি উঠে আসে। রাষ্ট্র কি ইচ্ছাকৃতভাবে এই বৈষম্য সৃষ্টি করছে? উপলব্ধ তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো দায়িত্বশীল গবেষণার কাজ নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রকাশ্যে কখনোই বৈষম্য তৈরির নীতি গ্রহণ করে না। তবে সমানভাবে এটিও সত্য যে, রাষ্ট্র অনিচ্ছাকৃতভাবেও বৈষম্যকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে, যদি তার নীতিনির্ধারণ, বাজেট বণ্টন, প্রতিষ্ঠান গঠন, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষা অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নের কাঠামো ধারাবাহিকভাবে কিছু জনগোষ্ঠীকে বেশি সুবিধা দেয় এবং অন্যদের তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রাখে। তখন বৈষম্য ঘোষিত নীতির মাধ্যমে নয়, বরং কাঠামোগত ফলাফলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমালোচনামূলক শিক্ষাতত্ত্ব এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির গবেষণা আমাদের শেখায় যে, ক্ষমতা সবসময় নিজেকে পুনরুৎপাদন করতে চায়। কখনো তা আইন দিয়ে, কখনো অর্থনীতি দিয়ে, কখনো সংস্কৃতি দিয়ে, আবার অনেক সময় শিক্ষা দিয়েও। তবে এটিও সমান সত্য যে, একই শিক্ষা ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতারও শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। তাই শিক্ষা নিজে বৈষম্যের কারণ নয়; প্রশ্ন হলো—শিক্ষার সুযোগ, সম্পদ এবং গুণগত মান কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে।

এই ফিচারে আলোচিত বিভিন্ন তথ্য—পরিবারের ওপর শিক্ষার ব্যয়ের অস্বাভাবিক চাপ, মাধ্যমিক স্তরে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উচ্চ ঝরে পড়ার হার, কোচিংনির্ভর শিক্ষা, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সীমিত বিস্তার, গ্রাম-শহর বৈষম্য, এবং মানসম্মত শিক্ষার ক্রমবর্ধমান বাজারীকরণ—সবকিছু একত্রে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করে। সেই প্রবণতা হলো, শিক্ষায় আনুষ্ঠানিক প্রবেশাধিকারের বিস্তার ঘটলেও গুণগত শিক্ষার বাস্তব সুযোগ ধীরে ধীরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এই প্রবণতা যদি দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকে, তবে বিদ্যালয় সমতার প্রতীক না হয়ে সামাজিক স্তরবিন্যাসের একটি প্রাতিষ্ঠানিক যন্ত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

অতএব, এই ফিচারের বিশ্লেষণ থেকে যে সিদ্ধান্তটি সবচেয়ে যুক্তিসংগতভাবে উঠে আসে, তা হলো—বাংলাদেশে শিক্ষাগত বৈষম্যকে কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, পারিবারিক দারিদ্র্য কিংবা বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক কাঠামোগত প্রশ্ন, যেখানে রাষ্ট্রের নীতি, বাজেট, প্রশাসনিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্ক এবং বাজার—সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। ফলে সমাধানও একক কোনো পদক্ষেপে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, প্রয়োজনভিত্তিক সম্পদ বণ্টন এবং শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক শিক্ষা-শাসন।

শেষ পর্যন্ত এই ফিচার কোনো ষড়যন্ত্রের রায় দেয় না; আবার বিদ্যমান বাস্তবতাকেও নির্দোষ ঘোষণা করে না। বরং এটি একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—

রাষ্ট্র কি কেবল বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়াতে চায়, নাকি প্রতিটি শিশুর জন্য সমান মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে চায়? কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় কতজন শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়েছে, তা দিয়ে নয়; বরং কতজন শিশুকে তার পারিবারিক আয়, জন্মপরিস্থিতি, বসবাসের স্থান বা সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে একই মানের শিক্ষা, একই মর্যাদা এবং একই ভবিষ্যতের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে।

সেই কারণেই এই শিক্ষা বিতর্কের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক আহ্বান—

যদি বিদ্যালয়ের দরজা সবার জন্য খোলে, তবে জ্ঞানের চাবিও সবার হাতেই পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় "সবার জন্য শিক্ষা" একটি নীতিগত ঘোষণা হয়ে থাকবে, কিন্তু "সবার জন্য সমান শিক্ষা" কখনোই বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে না। আর সেই দিন পর্যন্ত শিক্ষা বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতি যেমন বহন করবে, তেমনি অনিচ্ছাকৃতভাবে বৈষম্য পুনর্নির্মাণের ঝুঁকিও বহন করে যাবে।

সমাপনী মন্তব্য করণীয়

শেষ পর্যন্ত এই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি হলো—শিক্ষা নিয়ে আমাদের বিতর্ক কেবল পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা, বাজেট বা বিদ্যালয়ের সংখ্যা নিয়ে নয়; এটি মূলত রাষ্ট্রের চরিত্র, সমাজের ন্যায়বোধ এবং ভবিষ্যৎ নাগরিকের পরিচয় নিয়ে। একটি রাষ্ট্র তার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শুধু তথ্য শেখায় না; সে নির্ধারণ করে কোন জ্ঞানকে মূল্য দেওয়া হবে, কোন দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, কোন ইতিহাস মনে রাখা হবে, কোন কণ্ঠস্বর শোনা হবে এবং শেষ পর্যন্ত কেমন মানুষ ও কেমন সমাজ গড়ে উঠবে। এই কারণেই শিক্ষা কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ কোনো প্রশাসনিক খাত নয়; এটি একই সঙ্গে একটি নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রকল্প।

এই নিবন্ধে আলোচিত প্রশ্নগুলোর সহজ কোনো উত্তর নেই। রাষ্ট্র কখনও শিক্ষার সবচেয়ে বড় রক্ষক, আবার কখনও নীতির সীমাবদ্ধতা, সম্পদের অসম বণ্টন, দুর্বল বাস্তবায়ন বা ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার কারণে বৈষম্য পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্রও হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কখনও উন্নয়নের শক্তি, আবার কখনও নির্ভরশীলতার ঝুঁকিও সৃষ্টি করতে পারে। প্রতিযোগিতা যেমন উৎকর্ষের অনুপ্রেরণা হতে পারে, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিযোগিতা সহযোগিতা ও সামাজিক আস্থাকে দুর্বল করতে পারে। তাই কোনো একটি চরম অবস্থান গ্রহণের পরিবর্তে শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক, সমালোচনামূলক এবং ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।

একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষা সংস্কারের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো একটি জাতীয় শিক্ষা-সমঝোতা (National Education Compact), যেখানে শিক্ষা হবে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের শিকার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়। এই সমঝোতার ভিত্তি হতে হবে সংবিধানসম্মত নাগরিক অধিকার, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক নীতিনির্ধারণ। একই সঙ্গে প্রয়োজন একটি Evidence-Based Education Governance Framework, যেখানে নীতিনির্ধারণ হবে নির্ভরযোগ্য তথ্য, স্বাধীন গবেষণা এবং নিয়মিত মূল্যায়নের ওপর; অনুমান, মতাদর্শ বা স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের ওপর নয়।

ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে কেবল বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রয়োজনভিত্তিক অর্থায়ন, দক্ষ ও অনুপ্রাণিত শিক্ষক, গ্রাম-শহর বৈষম্য হ্রাস, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী অবকাঠামো, মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা, ডিজিটাল বৈষম্য কমানো, নমনীয় মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং Universal Design for Learning-এর মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাদর্শনের বাস্তব প্রয়োগ। একই সঙ্গে শিক্ষার মান নির্ধারণে কেবল পরীক্ষার ফল নয়; সহযোগিতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক মূল্যবোধকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষার শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহি ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং নাগরিক সমাজকে নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়ায় অর্থবহভাবে যুক্ত না করলে শিক্ষা সংস্কার দীর্ঘস্থায়ী হবে না। একটি সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থা তখনই গড়ে ওঠে, যখন রাষ্ট্র নির্দেশ দেয়, কিন্তু সমাজও অংশগ্রহণ করে; সরকার বিনিয়োগ করে, কিন্তু গবেষণা সেই বিনিয়োগের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে; বিদ্যালয় শেখায়, কিন্তু শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতাও নীতিকে সমৃদ্ধ করে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কেবল রাষ্ট্র কতগুলো বিদ্যালয় নির্মাণ করেছে, কতজনকে ভর্তি করিয়েছে কিংবা কত শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে—সেটি নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছে, যেখানে জন্মপরিচয়, অর্থনৈতিক অবস্থান, ভাষা, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা বা ভৌগোলিক অবস্থান কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না? শিক্ষা যদি সত্যিই সামাজিক গতিশীলতার সেতু হয়, তবে তার সাফল্য পরিমাপ করতে হবে কেবল কতজন এগিয়েছে তা দিয়ে নয়; বরং কতজন পিছিয়ে থাকা মানুষকে সামনে আনা গেছে, তা দিয়ে।

সম্ভবত এই নিবন্ধের শেষ প্রশ্নটিও তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আমরা কি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যা কেবল দক্ষ কর্মী তৈরি করবে, নাকি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা স্বাধীনচিন্তার, ন্যায়পরায়ণ, সহমর্মী এবং দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তুলবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের শিক্ষা কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হাতিয়ার হয়ে থাকবে, নাকি একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক সমাজ নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হবে।

চূড়ান্ত প্রতিফলন (Final Reflection)

আগামী দিনের শিক্ষা সংস্কারকে কেবল নতুন পাঠ্যক্রম বা নতুন পরীক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। রাষ্ট্রকে প্রথমে শিক্ষায় বৈষম্যের প্রকৃত উৎস চিহ্নিত করতে হবে এবং প্রমাণভিত্তিক তথ্যের ওপর নির্ভর করে সম্পদ বণ্টন পুনর্বিন্যাস করতে হবে। বাজেট বরাদ্দ, শিক্ষক নিয়োগ, প্রযুক্তি, ভাষাগত সহায়তা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা—এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনভিত্তিক (needs-based) পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

একই সঙ্গে শিক্ষানীতি প্রণয়নে গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, স্বচ্ছ তথ্যব্যবস্থা এবং নিয়মিত স্বাধীন মূল্যায়ন ছাড়া ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও তখনই কার্যকর হবে, যখন তা জাতীয় অগ্রাধিকার, স্থানীয় জ্ঞান এবং দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

শেষ পর্যন্ত শিক্ষা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি বিদ্যালয় নয়; রাষ্ট্রও নয়; বরং সমাজের ভবিষ্যৎ। আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে শিক্ষা কেবল দক্ষ কর্মশক্তি তৈরি করবে, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে শিক্ষা স্বাধীনচেতা, ন্যায়পরায়ণ, সহমর্মী এবং গণতান্ত্রিক নাগরিক গড়ে তুলবে?

রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন, বিদ্যালয়ের সংখ্যা কিংবা পরীক্ষার ফলাফলে নয়; বরং সেই রাষ্ট্র কতজন শিশুকে মর্যাদা, সম্ভাবনা এবং ন্যায্য সুযোগ নিয়ে শেখার পরিবেশ দিতে পেরেছে—সেখানেই তার সাফল্য নিহিত। শিক্ষা তখনই সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণে পরিণত হয়, যখন তা ক্ষমতা রক্ষার উপকরণ নয়, বরং সামাজিক গতিশীলতা, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়ভিত্তিক নাগরিকত্বের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#InclusiveEducation #EducationForAll #SDG4 #SocialJustice #Equity #Equality #EducationReform #UniversalDesignForLearning #CriticalPedagogy #PauloFreire #JohnDewey #HowardGardner #PierreBourdieu #AmartyaSen #CapabilityApproach #বাংলাদেশের_শিক্ষা #শিক্ষা_সংস্কার #অন্তর্ভুক্তিমূলক_শিক্ষা #সামাজিক_ন্যায়বিচার #শিক্ষানীতি #EducationPolicy #FutureOfEducation



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: