odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 20th August 2026, ২০th August ২০২৬
বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, প্রতিবন্ধিতা গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে একটি পথিকৃৎ বিভাগের তিন দশকের অভিযাত্রা, অর্জন, সংকট ও ভবিষ্যৎ করণীয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ শিক্ষা বিভাগ যেভাবে বদলে দিচ্ছে প্রতিবন্ধিতা, শিক্ষা ও উন্নয়নের মানচিত্র

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২০ August ২০২৬ ১৮:৪১

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২০ August ২০২৬ ১৮:৪১

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক: নীরব বিপ্লবের পাঠশালা প্রথম পর্ব

বাংলাদেশের লাখো প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার নিশ্চিত করতে শুধু আইন বা ভাতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক, মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নীতিপরিকল্পনাবিদ, পরিবার-সহায়ক পেশাজীবী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান। এই প্রয়োজন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে ১৯৯৩ সালে যাত্রা শুরু করে বিশেষ শিক্ষা বিভাগ—দেশে এ ধরনের প্রথম উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম। শ্রবণ, দৃষ্টি, বুদ্ধিবৃত্তিক ও স্নায়ুবিকাশজনিত প্রতিবন্ধিতা থেকে শুরু করে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, প্রারম্ভিক হস্তক্ষেপ, যোগাযোগ, আচরণ-সহায়তা, মূল্যায়ন, সহায়ক প্রযুক্তি এবং কর্মজীবনে উত্তরণ—বিস্তৃত ক্ষেত্র নিয়ে বিভাগটি শিক্ষা, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজ করছে। কিন্তু জাতীয় পরিসংখ্যান জানায়, প্রতিবন্ধী শিশুদের বড় অংশ এখনো শিক্ষার বাইরে এবং বিদ্যমান সেবাব্যবস্থা খণ্ডিত ও অসম। এই প্রেক্ষাপটে নিবন্ধটি বিভাগের ইতিহাস, পাঠক্রম, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা, সামাজিক অবদান, স্নাতকদের কর্মক্ষেত্র ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিশ্লেষণ করেছে। একই সঙ্গে দেখিয়েছে—একটি বিভাগের অর্জনকে কীভাবে জাতীয় অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা-ব্যবস্থার চালিকাশক্তিতে রূপ দেওয়া যায় এবং কেন বিশেষ শিক্ষা কোনো প্রান্তিক পেশা নয়, বরং বাংলাদেশের মানবিক ও টেকসই উন্নয়নের কেন্দ্রীয় অবকাঠামো।

১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষ শিক্ষা বিভাগের ইতিহাস, পাঠক্রম, বাংলা ইশারা ভাষা বিকাশে ভূমিকা, গবেষণা, সামাজিক অবদান, পেশার সুযোগ, উচ্চশিক্ষার দিগন্ত, সীমাবদ্ধতা এবং জাতীয় পর্যায়ে নয়টি জরুরি করণীয় নিয়ে এই বিশদ ফিচার।

প্রারম্ভকথা

বাংলাদেশের কোনো প্রত্যন্ত বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে একটি শিশু হয়তো শিক্ষকের কথা স্পষ্ট শুনতে পারে না; আরেকজন বইয়ের অক্ষর দেখতে পায় না; কেউ প্রচলিত পদ্ধতিতে পড়তে বা নিজের প্রয়োজন জানাতে পারে না। তাদের সামনে দাঁড়ানো শিক্ষকটি যদি বৈচিত্র্যময় শিক্ষণ-চাহিদা বুঝতে, উপযোগী উপকরণ তৈরি করতে কিংবা প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে বিনা বেতনের বই, উপবৃত্তি ও বিদ্যালয় ভবন থাকা সত্ত্বেও সেই শিশুর জন্য শিক্ষার দরজা কার্যত বন্ধ থাকে। এখানেই বিশেষ শিক্ষার প্রয়োজন—করুণা হিসেবে নয়, অধিকার বাস্তবায়নের পেশাগত বিজ্ঞান হিসেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের দশটি বিশেষায়িত বিভাগের একটি বিশেষ শিক্ষা বিভাগ তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই অদৃশ্য দরজাগুলোর চাবি তৈরি করছে। শিক্ষক, গবেষক, প্রশিক্ষক, মূল্যায়নকর্মী, নীতিপরিকল্পনাবিদ ও অধিকারকর্মী গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে বিভাগটি নীরবে এমন এক পরিবর্তনের ভিত নির্মাণ করেছে, যার সুফল কেবল প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী নয়, বৈচিত্র্যময় চাহিদাসম্পন্ন প্রতিটি শিক্ষার্থী পেতে পারে। তবে অর্জনের পাশাপাশি রয়েছে জনবল, গবেষণাগার, অর্থায়ন, তথ্য ও কর্মপরিসর সম্প্রসারণের জরুরি প্রশ্ন।

বাংলাদেশের কোনো প্রত্যন্ত বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে একটি শিশু হয়তো শিক্ষকের কথা স্পষ্ট শুনতে পারে না। আরেকজন বইয়ের ছোট অক্ষর দেখতে পায় না। কেউ প্রচলিত পদ্ধতিতে পড়তে পারে না, কেউ আবার নিজের প্রয়োজন কথায় প্রকাশ করতে পারে না। তাদের সামনে দাঁড়ানো শিক্ষকটি যদি বৈচিত্র্যময় শিক্ষণ-চাহিদা বুঝতে, পাঠ অভিযোজন করতে কিংবা উপযুক্ত সহায়তা নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে বিনা মূল্যের বই, উপবৃত্তি ও পাকা বিদ্যালয় ভবন থাকা সত্ত্বেও সেই শিশুর জন্য শিক্ষার দরজা কার্যত বন্ধই থাকে। কাগজে তার নাম শিক্ষার্থীর তালিকায় উঠতে পারে, কিন্তু শেখার আনন্দ, সহপাঠীর বন্ধুত্ব এবং নিজের সামর্থ্য আবিষ্কারের সুযোগ থেকে সে দূরেই থেকে যায়।

এই অদৃশ্য দরজার চাবি তৈরি করে বিশেষ শিক্ষা। এটি করুণা বা দয়ার কোনো কর্মসূচি নয়; এটি শিক্ষা-অধিকার বাস্তবায়নের পেশাগত বিজ্ঞান। একটি শিশুর দৃষ্টি, শ্রবণ, যোগাযোগ, চলাচল, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, আচরণ, সামাজিক অংশগ্রহণ ও শেখার ধরন বুঝে তার জন্য কার্যকর পথ নির্মাণই এর কাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষ শিক্ষা বিভাগ তিন দশকের বেশি সময় ধরে সেই কাজ করে চলেছে। শিক্ষক, গবেষক, প্রশিক্ষক, মূল্যায়নকর্মী, নীতিপরিকল্পনাবিদ এবং অধিকারকর্মী গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে বিভাগটি নীরবে এমন এক পরিবর্তনের ভিত নির্মাণ করেছে, যার সুফল শুধু প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী নয়, বৈচিত্র্যময় চাহিদাসম্পন্ন প্রতিটি শিক্ষার্থী পেতে পারে।

যে শিশুকে ব্যবস্থাই দেখতে পায় না

শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি বড় নদীর সঙ্গে তুলনা করা যায়। মূল স্রোতে যারা সহজে ভাসতে পারে, পাঠ্যবই, পরীক্ষা, শ্রেণিকক্ষ ও সময়সূচি সাধারণত তাদের কথা ভেবেই সাজানো হয়। যে শিশুর শেখার জন্য ব্রেইল, বড় হরফ, ইশারা ভাষা, ছবিভিত্তিক যোগাযোগ, স্পর্শনির্ভর উপকরণ, আচরণগত সহায়তা কিংবা বাড়তি সময় প্রয়োজন, তাকে প্রায়ই নদীর পাড়ে রেখে বলা হয়—সে সাঁতার জানে না। অথচ সমস্যাটি শিশুর নয়; সমস্যা হলো নিরাপদ ঘাট, সেতু ও নৌকা নির্মাণে ব্যবস্থার ব্যর্থতা। সাম্য ও মানবিকতার সুন্দর বাণী তখনই অর্থবহ হয়, যখন বিদ্যালয় শিশুর প্রয়োজনের সঙ্গে নিজেকে বদলাতে শেখে।

সংযুক্ত লেখায় উদ্ধৃত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক জাতীয় জরিপ ২০২১ এবং ইউনিসেফের বিশ্লেষণ একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরে। পাঁচ থেকে সতেরো বছর বয়সী প্রতিবন্ধী শিশুদের বড় অংশ কোনো শিক্ষায় নথিভুক্ত নয়; প্রাথমিক স্তরের তুলনায় মাধ্যমিকে অংশগ্রহণ আরও কমে যায়। যারা বিদ্যালয়ে থাকে, তাদের অনেকেই বয়সের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে শিখন-পিছিয়ে থাকে। কর্মক্ষম বয়সী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মে অংশগ্রহণও প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। প্রতিবন্ধিতার সংজ্ঞা ও পরিমাপপদ্ধতি বদলালে সংখ্যার কিছু হেরফের হতে পারে, কিন্তু মৌলিক সত্য বদলায় না—বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় প্রশিক্ষিত শিক্ষক, মূল্যায়ন-দক্ষতা, সহায়ক প্রযুক্তি এবং সমন্বিত শিক্ষা-সহায়তা মারাত্মকভাবে অপ্রতুল।

একজন শিশু বিদ্যালয়ে না গেলে ক্ষতিটা শুধু তার ব্যক্তিগত নয়। পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার বাড়তি দায়িত্ব নিতে হয়, মা-বাবার কর্মঘণ্টা কমে, দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ে এবং রাষ্ট্র ভবিষ্যতের একজন সম্ভাবনাময় নাগরিকের জ্ঞান, শ্রম ও নেতৃত্ব হারায়। আবার বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও যদি শিশুটি কিছু শিখতে না পারে, তাকে অপমান করা হয় কিংবা মূল্যায়নের পদ্ধতি তার জন্য প্রবেশগম্য না হয়, তাহলে উপস্থিতির সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়িত হয় না। এই কারণেই বিশেষ শিক্ষা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা একই জাতীয় উন্নয়ন-আলোচনার অংশ।

একটি প্রস্তাব থেকে পথিকৃৎ বিভাগের জন্ম

বিশেষ শিক্ষা বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস শুরু হয়েছিল একটি গভীর সামাজিক প্রয়োজনের স্বীকৃতি থেকে। বিভাগীয় নথি অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সুলতানা এস. জামান ১৯৯২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিশেষ শিক্ষা বিভাগ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ও পাঠক্রম জমা দেন। উদ্দেশ্য ছিল শ্রবণ, দৃষ্টি ও শারীরিক প্রতিবন্ধিতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতা, ডাউন সিনড্রোম, সেরিব্রাল পালসি, শিখন-অসুবিধা ও অটিজমসহ বিভিন্ন স্নায়ুবিকাশজনিত অবস্থার ক্ষেত্রে কাজ করতে সক্ষম শিক্ষক ও পেশাজীবী তৈরি করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক প্রক্রিয়া অতিক্রম করে ১৯৯৩ সালে বিভাগটির যাত্রা শুরু হয়। এটি ছিল বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রমের পথিকৃৎ উদ্যোগ।

সময়টি মনে রাখলে উদ্যোগটির দূরদর্শিতা আরও পরিষ্কার হয়। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় প্রতিবন্ধিতাকে প্রধানত চিকিৎসা, দান কিংবা পুনর্বাসনের সংকীর্ণ কাঠামোয় দেখা হতো। শিক্ষা ছিল অনেকাংশে পৃথক প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক; পরিবারকেও প্রায়ই সন্তানের সম্ভাবনার বদলে অক্ষমতার গল্প শোনানো হতো। বিশেষ শিক্ষা বিভাগের সূচনা সেই ধারণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানগত পরিবর্তন ঘটায়। বিভাগটি দেখাতে শুরু করে—প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কোনো ‘সংশোধনের বস্তু’ নন; তিনি উপযুক্ত সহায়তা, সম্মান ও সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকারী শিক্ষার্থী ও নাগরিক।

প্রথম দিকের পথ নিশ্চয়ই সহজ ছিল না। দেশে প্রশিক্ষিত শিক্ষক অল্প, বাংলা ভাষায় উপযুক্ত বই ও মূল্যায়ন-উপকরণ সীমিত, প্রযুক্তি ব্যয়বহুল এবং সামাজিক সচেতনতা কম ছিল। পাঠক্রম তৈরি করার পাশাপাশি শিক্ষকদের মাঠের বাস্তবতা বুঝতে হয়েছে, বিশেষ বিদ্যালয় ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের পেশাগত পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। সেই প্রজন্মের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এক অর্থে প্রস্তুত পথের যাত্রী ছিলেন না; হাঁটতে হাঁটতেই পথ তৈরি করেছেন।

‘বিশেষ’ শিক্ষা মানে আলাদা করে রাখা নয়

‘বিশেষ শিক্ষা’ শব্দটি শুনলে অনেকে কেবল পৃথক বিদ্যালয় বা প্রতিবন্ধী শিশুদের আলাদা শ্রেণিকক্ষ কল্পনা করেন। সমকালীন ধারণায় বিশেষ শিক্ষার প্রধান কাজ কিন্তু নতুন দেয়াল নির্মাণ নয়; বরং সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার দেয়ালগুলোকে প্রবেশযোগ্য করে তোলা। একটি শিশুর শেখার ধরন, যোগাযোগ, ইন্দ্রিয়গত অবস্থা, চলাচল, আচরণ ও সামাজিক অংশগ্রহণের প্রয়োজন বুঝে তাকে উপযুক্ত সহায়তা দেওয়া এর মূল বিষয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষায়িত পরিবেশ বা নিবিড় সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজে অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ এবং যত দূর সম্ভব সমবয়সীদের সঙ্গে শেখা।

জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদের ২৪ অনুচ্ছেদ বৈষম্যহীন ও সমান সুযোগভিত্তিক শিক্ষার অধিকার স্বীকার করে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর দেয়। বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-ও শিক্ষার অধিকার এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সুরক্ষার ভিত্তি তৈরি করেছে। ফলে বিশেষ শিক্ষা বিভাগকে কেবল একটি বিষয়ভিত্তিক একাডেমিক ইউনিট হিসেবে দেখলে তার জাতীয় তাৎপর্য বোঝা যায় না। এটি রাষ্ট্রের আইনি ও নৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদের উৎস।

সাধারণ শিক্ষক যদি অন্তর্ভুক্তির সামনের সারির কর্মী হন, বিশেষ শিক্ষাবিদ তাঁর সহযোদ্ধা। তিনি শিক্ষার্থীর শক্তি ও প্রয়োজন বিশ্লেষণ করেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষণ-পরিকল্পনা তৈরি করেন, পাঠ্যবস্তু ও মূল্যায়ন অভিযোজিত করেন, পরিবারকে পরামর্শ দেন, সহায়ক প্রযুক্তি নির্বাচন করেন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী, অডিওলজিস্ট, স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট বা সমাজকর্মীর সঙ্গে সমন্বয় করেন। সঠিক বিশেষ শিক্ষা তাই বিচ্ছিন্নতার বিপরীত; এটি অন্তর্ভুক্তির সেতুবিদ্যা।

তবে অন্তর্ভুক্তির নামেও ভুল হতে পারে। প্রয়োজনীয় সহায়তা, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও উপকরণ ছাড়াই একটি শিশুকে সাধারণ শ্রেণিকক্ষে বসিয়ে দেওয়া অন্তর্ভুক্তি নয়; সেটি শারীরিক উপস্থিতির আড়ালে শিক্ষাগত অবহেলা। আবার বিশেষায়িত সহায়তার প্রয়োজনকে অজুহাত বানিয়ে সবাইকে পৃথক প্রতিষ্ঠানে পাঠানোও অধিকারভিত্তিক নয়। প্রয়োজন একটি ধারাবাহিক সহায়তাব্যবস্থা—সাধারণ শ্রেণিকক্ষ, সম্পদকক্ষ, ভ্রাম্যমাণ সহায়তা, প্রয়োজনভিত্তিক বিশেষায়িত সেবা এবং পরিবার-সমর্থন—যেখানে সিদ্ধান্ত হবে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, মতামত, অধিকার ও বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে।

পাঠক্রমে মনোবিজ্ঞান থেকে সহায়ক যোগাযোগ

বিশেষ শিক্ষা বিভাগের পাঠক্রমের একটি বড় শক্তি তার আন্তবিষয়ক বিস্তার। মনোবিজ্ঞান, শিশু ও কিশোর বিকাশ, মানবদেহবিদ্যা, শারীরবৃত্ত ও রোগতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, আচরণগত উদ্বেগ ও ব্যবস্থাপনা, প্রারম্ভিক হস্তক্ষেপ বা আর্লি ইন্টারভেনশন, প্রতিবন্ধিতা মূল্যায়ন, যোগাযোগ-কৌশল, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা এবং অটিজম স্পেকট্রাম—সবকিছুই শিক্ষার্থীর বিকাশকে সামগ্রিকভাবে বোঝার ভিত্তি তৈরি করে। পাশাপাশি দৃষ্টি, শ্রবণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষায়িত শিক্ষণ-পদ্ধতির অধ্যয়ন রয়েছে। সময়ের সঙ্গে বৈচিত্র্য, সাম্য, অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণাও পাঠক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ ধরনের পাঠক্রমের উদ্দেশ্য রোগের নাম মুখস্থ করানো নয়। একজন শিক্ষার্থী কেন নির্দিষ্ট কাজে অসুবিধা অনুভব করছে, পরিবেশের কোন বাধা তাকে পিছিয়ে দিচ্ছে এবং কী পরিবর্তন করলে সে অংশ নিতে পারবে—এই প্রশ্ন করার দক্ষতা তৈরি করাই আসল। একই পরিচয়ের দুই শিশুর প্রয়োজনও এক নাও হতে পারে। তাই ‘সব অটিস্টিক শিশুর জন্য একই পদ্ধতি’ বা ‘সব দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য একই উপকরণ’—এমন সরলীকরণ বিশেষ শিক্ষার বৈজ্ঞানিক চেতনার পরিপন্থী। ব্যক্তিকেন্দ্রিক মূল্যায়ন, পর্যবেক্ষণ, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা অপরিহার্য।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনা বা আইইপি এই পেশায় বহুল ব্যবহৃত একটি ধারণা। এতে শিশুর বর্তমান সামর্থ্য, অগ্রাধিকারভিত্তিক লক্ষ্য, প্রয়োজনীয় সহায়তা, শিক্ষণ-কৌশল, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং অগ্রগতি মাপার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। ভালো আইইপি শুধু কাগজপত্র নয়; এটি শিক্ষক, পরিবার, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য পেশাজীবীর যৌথ অঙ্গীকার। শিশুটি নিজের মত প্রকাশ করতে পারলে পরিকল্পনায় তার কণ্ঠও থাকতে হবে। পরিকল্পনা এমন হতে হবে, যা বাস্তব শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করা যায় এবং প্রয়োজন বদলালে সংশোধন করা যায়।

প্রারম্ভিক হস্তক্ষেপের গুরুত্বও এখানে বিশেষ। শিশুর বিকাশগত পার্থক্য যত দ্রুত বোঝা যায় এবং পরিবার যত তাড়াতাড়ি যথাযথ দিকনির্দেশনা পায়, যোগাযোগ, দৈনন্দিন জীবনদক্ষতা, সামাজিক অংশগ্রহণ ও বিদ্যালয়-প্রস্তুতিতে তত ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। তবে দ্রুত শনাক্তকরণ যেন তাড়াহুড়ো করে লেবেল দেওয়ায় পরিণত না হয়। মূল্যায়ন হতে হবে বহুমাত্রিক, সংস্কৃতি ও ভাষাসংবেদনশীল এবং শিশুর শক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া। পরিবারের ওপর দোষ চাপানো বা অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেওয়া পেশাগত নৈতিকতার বিরোধী।

বইয়ের বাইরে বিশেষ শিক্ষা: অনুশীলন, গবেষণাগার ও সমাজসংযোগ

বিশেষ শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষে বক্তৃতা শুনে বা বই পড়ে আয়ত্ত করা যায় না। বাস্তব শিশুর সঙ্গে কাজ না করলে এই জ্ঞান অনেকটা সাঁতারের ব্যাকরণ মুখস্থ করার মতো—পানিতে নামার পরই যার সীমাবদ্ধতা বোঝা যায়। শিশুর সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা, তার আচরণ ও শেখার ধরন পর্যবেক্ষণ করা, প্রয়োজনমাফিক উপকরণ তৈরি, পরিবারকে সংবেদনশীলভাবে পরামর্শ দেওয়া এবং বহুবিষয়ক দলের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার দক্ষতা মাঠপর্যায়েই বিকশিত হয়। তাই বিদ্যালয় পর্যবেক্ষণ, অনুশীলন-শিক্ষণ, কেস স্টাডি, শিক্ষাগত মূল্যায়ন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনা, ইন্টার্নশিপ এবং গবেষণা বিশেষ শিক্ষা পাঠক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একজন প্রশিক্ষণার্থী যখন প্রথমবার ব্রেইল পাঠ প্রস্তুত করেন, কোনো বধির শিক্ষার্থীর সঙ্গে ইশারা ভাষায় যোগাযোগ করেন কিংবা বাক্‌যোগাযোগে অসুবিধা থাকা শিশুর জন্য ছবিভিত্তিক বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করেন, তখনই পাঠ্যবইয়ের তত্ত্ব বাস্তব ও জীবন্ত হয়ে ওঠে।

বিভাগীয় নথিতে স্কুলভিত্তিক অনুশীলন, ইন্টার্নশিপ এবং বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতাকে পেশাগত প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হাইকেয়ার স্কুল, ব্যাপ্টিস্ট সাংঘ স্কুল, কল্যাণী অন্তর্ভুক্তিমূলক স্কুল, প্রয়াস এবং সুইড বাংলাদেশের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, শিশু পর্যবেক্ষণ, শিক্ষণ-পরিকল্পনা, উপকরণ অভিযোজন এবং শিশু ও পরিবারের বাস্তব প্রয়োজন সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনে ইন্টার্নশিপও তাঁদের একাডেমিক শিক্ষা ও পেশাগত জগতের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধ তৈরি করেছে।

তবে মাঠকাজ মানে কোনো শিশুকে পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষার বস্তুতে পরিণত করা নয়। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, অবগত সম্মতি, গোপনীয়তা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা সব সময় নিশ্চিত করতে হবে। অনুমতি ছাড়া শিশুর ছবি, ভিডিও বা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ, অপ্রমাণিত পদ্ধতি প্রয়োগ কিংবা শিশুর উপস্থিতিতে তাকে নিয়ে অসম্মানজনক আলোচনা গুরুতর অনৈতিকতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীদের পেশাগত দক্ষতা শেখানো নয়; সেই দক্ষতা ও ক্ষমতা ব্যবহারের নৈতিক সীমারেখাও স্পষ্ট করা। বিশেষ করে অসহায় অবস্থায় সেবা খুঁজতে আসা পরিবারের আস্থা, দুর্বলতা কিংবা ব্যক্তিগত তথ্যকে গবেষণা, প্রচার বা বাণিজ্যিক সুবিধার উপকরণে পরিণত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ব্যবহারিক শিক্ষা ও গবেষণাকে শক্তিশালী করতে বিভাগীয় নথিতে আইইআর স্পিচ অ্যান্ড হিয়ারিং সেন্টার, স্বল্পদৃষ্টি সম্পদকেন্দ্র এবং স্নায়ুবিকাশজনিত প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের উল্লেখ রয়েছে। সীমিত সম্পদের মধ্যে গড়ে ওঠা এসব সুবিধা শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন-পদ্ধতি, সহায়ক উপকরণ, বিশেষায়িত শিক্ষণ-কৌশল এবং গবেষণার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। প্রয়াত ড. নিরাপদ আনামের স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠিত বিশেষায়িত গ্রন্থাগার এবং আইইআর গ্রন্থাগারের ব্রেইল বইয়ের স্বতন্ত্র সংগ্রহও জ্ঞানের প্রবেশগম্যতার গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

তবে কেবল কেন্দ্র, গবেষণাগার ও গ্রন্থাগারের নামের তালিকা দিয়ে বিভাগের বর্তমান সক্ষমতা মূল্যায়ন করা যায় না। এসব সুবিধা কতটা সচল, যন্ত্রপাতি নিয়মিত হালনাগাদ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে কি না, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় পেশাজীবী রয়েছেন কি না এবং বছরে কতজন শিক্ষার্থী, শিশু ও পরিবার সেবা পাচ্ছেন—এসব তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা ও প্রকাশ করা প্রয়োজন। রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট, মানসম্মত মূল্যায়নবিধি, গবেষণা-নৈতিকতা, তথ্য সুরক্ষা, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং সেবাগ্রহীতার জন্য স্বচ্ছ রেফারেল কাঠামো না থাকলে মূল্যবান অবকাঠামোও একসময় প্রদর্শনীতে পরিণত হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় যেমন মাঠপর্যায়ের প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও পরিবারের অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান গ্রহণ করবে, তেমনি গবেষণার ফলাফল, প্রশিক্ষণ, সহায়ক উপকরণ এবং ব্যবহারযোগ্য উদ্ভাবন সমাজের কাছে ফিরিয়ে দেবে। স্থানীয় শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই; দীর্ঘদিনের অনুশীলনে তাঁরা এমন অনেক কার্যকর সমাধান উদ্ভাবন করেছেন, যা একাডেমিক গবেষণাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। ফলে বিশেষ শিক্ষা বিভাগের সমাজসংযোগ ব্যক্তিনির্ভর বা সাময়িক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত নিয়মিত, প্রবেশগম্য ও জবাবদিহিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে রূপান্তর করা জরুরি। এর মাধ্যমেই বইয়ের বাইরের শিক্ষা একই সঙ্গে শিক্ষার্থী প্রস্তুতি, গবেষণা, জনসেবা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক দায়বদ্ধতার কার্যকর ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

বাংলা ইশারা ভাষার শিক্ষাভিত্তিক বিকাশে স্বেচ্ছাশ্রমের অধ্যায়

বিভাগের ইতিহাসে শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় রচিত হয় নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে। সংযুক্ত নথিতে অংশগ্রহণকারীদের স্মৃতির ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ১৯৯৮-১৯৯৯ সালের দিকে শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা বিষয়ের শিক্ষক ড. নিরাফত আনামের নেতৃত্বে প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাশ্রমে এ কাজে যুক্ত হন। প্রথম ব্যাচের তারেক আহসান ও মনির হোসেন এবং দ্বিতীয় ব্যাচের মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, জাহিদুল কবির টিটু ও তাহমিনা আক্তার পলিসহ আরও কয়েকজন নিয়মিত সময় দিয়ে শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ ও শিক্ষাগ্রহণের বাধাগুলো বোঝার চেষ্টা করেন।

তাদের সামনে বড় প্রশ্ন ছিল ভাষা। বিদ্যালয়ভেদে ব্যবহৃত ইশারায় পার্থক্য, শিক্ষার উপযোগী সুসংগঠিত উপকরণের অভাব এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা শিক্ষাকে দুরূহ করে তুলছিল। এই বাস্তবতা থেকে প্রচলিত ইশারা সংগ্রহ, শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য সংকেত চিহ্নিত করা, ইশারা-সমর্থিত বাংলা যোগাযোগপদ্ধতি বিকাশ এবং সহায়ক উপকরণ তৈরির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। বাংলাদেশের ইশারা ভাষার ইতিহাসে অন্য উদ্যোগও ছিল; তবে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক, শিক্ষামুখী ও ধারাবাহিক স্বেচ্ছাসেবী প্রয়াস হিসেবে এই অধ্যায়ের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

একটি শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোই তার শিক্ষা নিশ্চিত করে না—শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে অর্থপূর্ণ যোগাযোগের ভাষা না থাকলে শ্রেণিকক্ষ তার কাছে কাচের দেয়ালঘেরা ঘরের মতো। এই উপলব্ধিই উদ্যোগটির নৈতিক ভিত্তি। পরবর্তী সময়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থার নানা কর্মসূচি বাংলা ইশারা ভাষা ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করেছে। তবে আজকের অধিকারভিত্তিক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে: বধির জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষাগত পরিচয়, সংস্কৃতি ও নেতৃত্বকে সম্মান করতে হবে। শ্রবণক্ষম মানুষেরা একতরফাভাবে ভাষার মান নির্ধারণ করবে না; বধির ব্যক্তি ও ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী সম্প্রদায়কে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখতে হবে।

গবেষণাগার, রিসোর্স সেন্টার বা সম্পদকেন্দ্র ও জ্ঞানের প্রবেশগম্যতা

সংযুক্ত নথিতে আইইআর স্পিচ অ্যান্ড হিয়ারিং সেন্টার, স্বল্পদৃষ্টি সম্পদকেন্দ্র এবং স্নায়ুবিকাশজনিত প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক গবেষণাগার গড়ে তোলার উদ্যোগের উল্লেখ রয়েছে। সীমিত সম্পদে প্রতিষ্ঠিত এসব সুবিধা মূল্যায়ন, উপকরণ পরিচিতি, শিক্ষণ-সহায়তা ও গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। প্রয়াত ড. নিরাপদ আনামের স্মৃতিতে বিশেষায়িত গ্রন্থাগার এবং আইইআর গ্রন্থাগারে ব্রেইল বইয়ের সংগ্রহ জ্ঞানের প্রবেশগম্যতার প্রতীক। এগুলো দেখায়, বিভাগটি শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠ নয়, শেখার সহায়ক পরিবেশ তৈরিরও চেষ্টা করেছে।

তবে একটি প্রোফাইলের তালিকা দিয়ে কার্যকর সক্ষমতা মাপা যায় না। গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি নিয়মিত হালনাগাদ হচ্ছে কি না, প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ আছেন কি না, রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট আছে কি না, বছরে কতজন শিক্ষার্থী ও সেবাগ্রহীতা সুবিধা পান—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। অবকাঠামো তৈরি করে ছবি তোলা সহজ; দীর্ঘদিন সচল রাখা কঠিন। নৈতিক মূল্যায়নবিধি, মাননিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ রেফারেল ব্যবস্থা এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগ না থাকলে সেবা যেমন দুর্বল হয়, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশেষ শিক্ষা বিভাগের ছয়টি গান- ‍Songs of the Department of Special Education...গান শুনতে ক্লিক করুন

জ্ঞানের প্রবেশগম্যতাও শুধু ব্রেইল বইয়ের একটি তাক দিয়ে শেষ হয় না। ডিজিটাল নথি স্ক্রিন রিডারে পড়া যায় কি না, ভিডিওতে মানসম্মত ক্যাপশন ও প্রয়োজনমতো ইশারা ভাষা আছে কি না, চিত্রের বিকল্প বর্ণনা দেওয়া হয়েছে কি না, শ্রেণিকক্ষের উপস্থাপনা আগেই পাওয়া যায় কি না—এসবও সমান জরুরি। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে প্রতিটি নথির জন্য আলাদা অনুরোধ করতে হলে সেটি পূর্ণ অন্তর্ভুক্তি নয়। প্রবেশগম্যতা শুরু থেকেই নকশার অংশ হওয়া উচিত।

গবেষণা: তথ্যহীন নীতির অন্ধকারে আলোর উৎস

প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে নীতি প্রণয়নে বাংলাদেশের পুরোনো সমস্যা হলো খণ্ডিত তথ্য। চিকিৎসা, সমাজকল্যাণ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতে ভিন্ন সংজ্ঞা ও নিবন্ধনপদ্ধতি ব্যবহৃত হলে একই জনগোষ্ঠীর ভিন্ন ছবি তৈরি হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগ দীর্ঘমেয়াদি তথ্য, গবেষণা-উপকরণ এবং পেশাগত স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পারে; প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেই তার কাজ বন্ধ হওয়ার কথা নয়। এই জায়গায় বিশেষ শিক্ষা বিভাগের জাতীয় দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, বাস্তব শিখনফল, ঝরে পড়া, লিঙ্গ ও অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য, সহায়ক প্রযুক্তির কার্যকারিতা, পরিবারের ব্যয়, নির্যাতন ও নিরাপত্তা, এবং শিক্ষা থেকে কর্মে উত্তরণ—এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা দরকার। শুধু কতজন ভর্তি হলো, তা জানলে হবে না; তারা কী শিখল, কেমন পরিবেশ পেল, পরবর্তী জীবনে সেই শিক্ষা কতটা কাজে লাগল—সেটিও জানতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী ছোট ছোট শ্রেণিতে ভাগ করলেই বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ হয় না; দারিদ্র্য, লিঙ্গ, ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষা ও সামাজিক পরিচয়ের আন্তঃসম্পর্কও দেখতে হবে।

গবেষণায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শুধু ‘বিষয়’ করে রাখার দিন শেষ হওয়া উচিত। গবেষণা প্রশ্ন নির্ধারণ, উপকরণ তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ ও ফল ব্যাখ্যায় তাদের সহগবেষক ও পরামর্শক হিসেবে যুক্ত করা প্রয়োজন। তাদের জীবিত অভিজ্ঞতা ছাড়া গবেষণা অনেক সময় মানচিত্র আঁকে, কিন্তু পথ চিনতে পারে না। সহজ ভাষায় গবেষণার সারাংশ, ব্রেইল বা প্রবেশগম্য ডিজিটাল সংস্করণ এবং ইশারা ভাষায় ফল প্রকাশ করলে জ্ঞান আবার সেই জনগোষ্ঠীর কাছে ফিরে যায়, যাদের জীবন থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছিল।

পরিবার ও সাধারণ শিক্ষকের কাছে একটি বিভাগের অর্থ

শিশুর বিকাশগত ভিন্নতা বোঝার পর একটি পরিবারের সামনে প্রায়ই অনিশ্চয়তার দীর্ঘ পথ খুলে যায়। একই শিশু চিকিৎসাকেন্দ্র, বিদ্যালয়, সমাজসেবা কার্যালয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘুরতে থাকে; কিন্তু তার সামগ্রিক শিক্ষাগত পরিকল্পনার দায়িত্ব কেউ নেয় না। মা-বাবা পরস্পরবিরোধী পরামর্শ, সামাজিক দোষারোপ, অবাস্তব চিকিৎসা-প্রতিশ্রুতি এবং ব্যয়বহুল সেবার মুখোমুখি হন। বিশেষ শিক্ষাবিদ পরিবারকে শিশুর শক্তি ও প্রয়োজন বুঝতে, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে, ঘর ও বিদ্যালয়ের সহায়তায় ধারাবাহিকতা আনতে এবং প্রয়োজনমতো উপযুক্ত পেশাজীবীর কাছে যেতে সাহায্য করতে পারেন।

পরিবারের সঙ্গে কাজের ভাষা হতে হবে সম্মানের। ‘আপনার শিশুটি কিছুই পারবে না’ যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ‘কয়েক মাসেই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে যাবে’ ধরনের নিশ্চয়তাও অনৈতিক। লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুকে অন্য কারও অনুকরণে বদলে দেওয়া নয়; যোগাযোগ, আত্মনির্ভরতা, শেখা, পছন্দ প্রকাশ এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো। বাবা-মায়ের উদ্বেগ শুনতে হবে, কিন্তু সিদ্ধান্তে শিশুর মর্যাদা ও মতামতও গুরুত্ব পাবে। ভাইবোন এবং পরিবারের অন্য পরিচর্যাকারীরাও সহায়তা ও তথ্যের অংশীদার।

সাধারণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক এই বিভাগের সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় অংশীদার। চল্লিশ বা পঞ্চাশ শিক্ষার্থীর শ্রেণিতে একজন শিক্ষককে যদি শুধু বলা হয়, ‘সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করুন’, অথচ কৌশল, সহযোগী জনবল, উপকরণ ও সময় না দেওয়া হয়, তাহলে অন্তর্ভুক্তি তাঁর কাছে আরেকটি অসম্ভব প্রশাসনিক নির্দেশ হয়ে দাঁড়ায়। প্রাথমিক শিক্ষক-প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিদ্যালয়ভিত্তিক অনুশীলন, পরামর্শ এবং ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন প্রয়োজন। বিশেষ শিক্ষা বিভাগ সাধারণ শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা ও অভিভাবকের জন্য স্তরভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং স্কুল-সহায়তা মডেল গড়ে তুলতে পারে। একটি শিশুর পাশে একজন বিশেষজ্ঞ বসানো দরকার হতে পারে; কিন্তু পুরো বিদ্যালয়কে সক্ষম করা অধিক টেকসই সমাধান।

স্নাতক হওয়ার পর পেশার বিস্তৃত দরজা

বিশেষ শিক্ষা নিয়ে পড়লে কেবল একটি বিশেষ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা যায়—এই ধারণা বাস্তব কর্মক্ষেত্রের তুলনায় খুবই সংকীর্ণ। স্নাতকেরা বিশেষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিদ্যালয়ে শিক্ষক বা সম্পদশিক্ষক, পুনর্বাসন ও পরিবার-পরামর্শকেন্দ্রে শিক্ষা-পেশাজীবী, সরকারি-বেসরকারি কর্মসূচিতে প্রশিক্ষক, গবেষণা সহকারী, প্রকল্প কর্মকর্তা, শিক্ষা-পরিকল্পনাবিদ, প্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষা উপকরণ উন্নয়নকর্মী হিসেবে কাজ করতে পারেন। শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা, জাতিসংঘ-সহযোগী প্রকল্প এবং অধিকারভিত্তিক সংগঠনেও তাদের দক্ষতার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। উচ্চতর ডিগ্রির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা ও গবেষণার পথও উন্মুক্ত।

সহায়ক প্রযুক্তি, প্রবেশগম্য ডিজিটাল শিক্ষা, বিকল্প ও সহায়ক যোগাযোগ, ব্রেইল ও স্পর্শনির্ভর উপকরণ, বাংলা ইশারা ভাষাভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী, অন্তর্ভুক্তিমূলক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষা থেকে কর্মজীবনে উত্তরণ-সহায়তা দ্রুত সম্প্রসারিত ক্ষেত্র। পাঠক্রম নির্মাণ, শিক্ষা-প্রযুক্তি, নীতিগবেষণা, কর্মক্ষেত্র অভিযোজন, মনিটরিং ও মূল্যায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ শিক্ষা তাই মানবিক সেবার পাশাপাশি গবেষণা, প্রযুক্তি ও নীতিনির্ধারণের পেশা।

তবে পেশাগত সীমারেখা স্পষ্ট রাখা জরুরি। একটি শিক্ষা ডিগ্রি কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিকিৎসক, ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী, অডিওলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট বা স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট বানায় না। প্রত্যেক পেশার নিজস্ব যোগ্যতা, নৈতিক সীমা এবং কোথাও কোথাও নিবন্ধনব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ শিক্ষাবিদের মূল শক্তি শিক্ষাগত মূল্যায়ন, শিক্ষণ-পরিকল্পনা, পরিবেশগত অভিযোজন, পরিবার-বিদ্যালয় সমন্বয় এবং বহুবিষয়ক দলের অংশ হিসেবে কাজ করা। সেবাগ্রহীতার নিরাপত্তা এবং পেশার মর্যাদার জন্য নিজের দক্ষতার সীমা জানা অপরিহার্য।

এখানে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে। দক্ষ স্নাতক তৈরি করে যদি সরকারি বিদ্যালয়ব্যবস্থায় তাদের জন্য সুস্পষ্ট পদ, কর্মবিবরণী, বেতনকাঠামো ও পদোন্নতির পথ না রাখা হয়, তাহলে অর্জিত জ্ঞান জাতীয়ভাবে ব্যবহৃত হবে না। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সম্পদশিক্ষক, উপজেলা পর্যায়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা সমন্বয়কারী, শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে বিশেষায়িত প্রশিক্ষক এবং পাঠক্রম ও মূল্যায়ন সংস্থায় বিশেষজ্ঞ পদ তৈরি করা যেতে পারে। কর্মদক্ষতা ও নৈতিক মান নিশ্চিত করতে পেশাগত মানদণ্ড এবং ধারাবাহিক উন্নয়নব্যবস্থাও দরকার।

উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক দিগন্ত

বিশেষ শিক্ষায় স্নাতক বা স্নাতকোত্তরের পর উচ্চতর অধ্যয়নের ক্ষেত্র বহুবিস্তৃত। অটিজম, শিখন-প্রতিবন্ধিতা, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতা, দৃষ্টি ও শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, প্রারম্ভিক শৈশব বিশেষ শিক্ষা, গুরুতর ও একাধিক প্রতিবন্ধিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, ট্রানজিশন শিক্ষা, আচরণ বিশ্লেষণ, সহায়ক প্রযুক্তি, ইউনিভার্সাল ডিজাইন ফর লার্নিং, ডিসলেক্সিয়া ও সাক্ষরতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই মাস্টার্স, এমএড, এমফিল, পিএইচডি বা এডডি পর্যায়ে বিশেষায়নের সুযোগ রয়েছে। গবেষণাপদ্ধতি, শিক্ষক শিক্ষা, নীতি ও আইন, নেতৃত্ব, পারিবারিক সহায়তা এবং বৈচিত্র্য-সাম্য-অন্তর্ভুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ উচ্চতর গবেষণার ক্ষেত্র।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার আকর্ষণ শুধু ডিগ্রির নাম নয়। উন্নত গবেষণাগার, বহুবিষয়ক দল, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নেতৃত্ব, বিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা এবং সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। কিন্তু ‘বিদেশ’ নিজে গুণমানের নিশ্চয়তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি, কর্মসূচির পাঠক্রম, শিক্ষক ও গবেষণা-সুবিধা, মাঠকাজের সুযোগ, পেশাগত অনুমোদন, মোট ব্যয় এবং ডিগ্রি দেশে বা গন্তব্য দেশের চাকরিতে কীভাবে স্বীকৃত হবে—সব যাচাই করতে হবে। অনলাইন বিজ্ঞাপন বা এজেন্টের প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর না করে বিশ্ববিদ্যালয় ও বৃত্তি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ সরকারি তথ্য দেখা জরুরি।

ফুলব্রাইট, চেভেনিং, কমনওয়েলথ, এরাসমাস মুন্ডাস, অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ডসসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক বৃত্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা সহকারী বা শিক্ষণ সহকারীর সুযোগ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে পারে। তবে যোগ্যতা, সময়সীমা ও অর্থায়নের ধরন বছরভেদে বদলায়। তাই ভালো একাডেমিক ফলের পাশাপাশি গবেষণা-আগ্রহ, মাঠ-অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব, স্পষ্ট উদ্দেশ্যপত্র, শক্তিশালী সুপারিশ এবং যথাসময়ে প্রস্তুতি জরুরি। সবচেয়ে শক্তিশালী আবেদন সেইটি, যেখানে আবেদনকারী দেখাতে পারেন—কোন সমস্যার সমাধান করতে চান, কেন নির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রয়োজন এবং অর্জিত জ্ঞান কীভাবে মানুষের জীবনে প্রয়োগ করবেন।

দেশে ফিরে আসা বাধ্যতামূলক না হলেও জ্ঞানের সামাজিক দায় এড়ানো যায় না। কেউ দেশে ফিরে শিক্ষকতা বা গবেষণা করতে পারেন, কেউ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও বাংলাদেশি সংগঠনের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারেন, উন্মুক্ত শিক্ষাসামগ্রী তৈরি করতে পারেন কিংবা তরুণ গবেষকদের পরামর্শ দিতে পারেন। মেধাপ্রবাহকে একমুখী ‘ব্রেন ড্রেন’ না বানিয়ে জ্ঞান, নেটওয়ার্ক ও সুযোগের দ্বিমুখী সেতু তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তি: একই সঙ্গে সেতু ও নতুন বাধা

স্ক্রিন রিডার, বাক্‌-থেকে-লিখন, বড় হরফ, ক্যাপশন, স্পর্শনির্ভর চিত্র, বিকল্প যোগাযোগ অ্যাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অভিযোজিত শিক্ষণ অনেক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। একটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ডিজিটাল বই শুনে পড়তে পারে, কথা বলতে না পারা শিশু প্রতীক ছুঁয়ে নিজের পছন্দ জানাতে পারে, বধির শিক্ষার্থী ক্যাপশনের মাধ্যমে বক্তৃতা অনুসরণ করতে পারে। প্রযুক্তি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে নির্ভরতার বদলে স্বাধীনতা বাড়ায়।

কিন্তু বাংলা ভাষায় মানসম্মত ও সাশ্রয়ী সমাধান সীমিত হলে প্রযুক্তি কেবল শহুরে উচ্চ আয়ের পরিবারের সুবিধা হয়ে থাকবে। অনলাইন পরীক্ষা, ডিজিটাল পাঠ্যবই কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শিক্ষা-সরঞ্জামে প্রবেশগম্যতা উপেক্ষা করলে পুরোনো বৈষম্য নতুন পর্দায় ফিরে আসে। দুর্বল ইন্টারনেট, যন্ত্রের দাম, প্রশিক্ষণের অভাব এবং রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যাও বিবেচনায় নিতে হবে। একটি দামি যন্ত্র বিতরণ করলেই কাজ শেষ নয়; ব্যবহারকারী ও শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং নষ্ট হলে মেরামতের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

বিশেষ শিক্ষা বিভাগ প্রকৌশল, কম্পিউটারবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সমাজকল্যাণ ও ব্যবসায় প্রশাসনের সঙ্গে যৌথ উদ্ভাবনকেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে। বাংলা ইশারা ভাষার ডিজিটাল উপকরণ, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর গণিত-বিজ্ঞান শেখার স্পর্শনির্ভর সামগ্রী, কম খরচের যোগাযোগ বোর্ড, প্রবেশগম্য শিক্ষাব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার এবং কর্মক্ষেত্র অভিযোজন নিয়ে গবেষণা জাতীয় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে উদ্ভাবনের নৈতিকতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর তথ্য সংগ্রহে সম্মতি, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; অ্যালগরিদমের ফলকে পেশাগত মূল্যায়নের বিকল্প ভাবা যাবে না। ব্যবহারকারীকে বাদ দিয়ে তৈরি সহায়ক প্রযুক্তি তালাবিহীন দরজার মতো—দেখতে সুন্দর, কাজে অচল।

প্রতিবন্ধিতা, অটিজম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষায় অগ্রসর পাঠক্রম: অ্যাডভান্সড কোর্স অন ডিজঅ্যাবিলিটি, অটিজম অ্যান্ড ইনক্লুসিভ এডুকেশন’

প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও মাঠপর্যায়ের চর্চার মধ্যকার ব্যবধান কমানোর লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) বিশেষ শিক্ষা বিভাগ চালু করে ‘অ্যাডভান্সড কোর্স অন ডিজঅ্যাবিলিটি, অটিজম অ্যান্ড ইনক্লুসিভ এডুকেশন’। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ ধরনের অগ্রসর পাঠক্রম বাংলাদেশের প্রতিবন্ধিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা আন্দোলনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন।একটি ঐতিহাসিক মুহুর্ত: এডভান্সড কোর্সের উদ্বোধন

২০১৯ সালের ১১ জানুয়ারি আইইআরের শহীদ ড. সাদত আলী সম্মেলনকক্ষে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান আনুষ্ঠানিকভাবে কোর্সটির উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইইআরের তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক সৈয়দা তাহমিনা আখতার এবং স্বাগত বক্তব্য দেন বিশেষ শিক্ষা বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও কোর্স সমন্বয়ক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী শিশুদের অভিভাবক এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।

এই কোর্সের লক্ষ্য কেবল সনদ প্রদান নয়; বরং প্রতিবন্ধিতা ও অটিজম সম্পর্কে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা দূর করা, অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বাস্তবায়নের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা। শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পেশাজীবী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের জন্য তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার সংযোগ ঘটানোর সুযোগ তৈরি করে এই পাঠক্রম।

১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আইইআরের বিশেষ শিক্ষা বিভাগের দীর্ঘদিনের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার ধারাবাহিকতায় কোর্সটি প্রমাণ করে—প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা পেশাজীবীর কাজ নয়; প্রয়োজন জ্ঞাননির্ভর, সমন্বিত ও সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ উদ্যোগ।

নীরব সাফল্যের আড়ালে সমালোচনার জায়গা

কোনো পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস সম্মানের দাবি রাখে, কিন্তু ইতিহাস নিজে ভবিষ্যৎ সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। প্রতিষ্ঠার গৌরবকে বর্তমান সক্ষমতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষায়িত কেন্দ্র, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, প্রকাশনা, সরকারি কর্মসূচি এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ—সবই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কিন্তু কোন সুবিধা এখন কতটা সচল, বছরে কতজন সেবা পান, গবেষণার ফল নীতিতে কীভাবে ব্যবহৃত হয়, স্নাতকদের কর্মসংস্থান কেমন এবং শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা কী—এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রকাশ্য উপাত্ত প্রয়োজন। পুরোনো অর্জনের তালিকা নয়, সাম্প্রতিক ফলাফলই জবাবদিহির মানদণ্ড।

শিক্ষকসংখ্যা, দক্ষতার বৈচিত্র্য ও কর্মপরিবেশও বিবেচ্য। বিশেষ শিক্ষা দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্র; একই শিক্ষকের ওপর অতিরিক্ত পাঠদান, গবেষণা, প্রশাসন ও সেবা চাপিয়ে দিলে গুণমান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নতুন শিক্ষক নিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, গবেষণা অনুদান, প্রযুক্তিবিদ ও সহায়ক কর্মী, এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষক-গবেষকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বিভাগের ভবন, শ্রেণিকক্ষ, ওয়েবসাইট, ভর্তি প্রক্রিয়া ও মূল্যায়ন নিজেই যদি প্রবেশগম্য না হয়, তাহলে অন্তর্ভুক্তির শিক্ষা বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।

পাঠক্রমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কণ্ঠ কতটা দৃশ্যমান, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ‘তাদের জন্য’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে ‘তাদের সঙ্গে’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতিতে যেতে হবে। বধির সম্প্রদায়, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি, নিউরোডাইভার্জেন্ট মানুষ, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও পরিবার—সব পক্ষের অভিজ্ঞতা এক নয়। পাঠক্রম পর্যালোচনা, শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণা নৈতিকতা এবং বিভাগীয় পরামর্শ কাঠামোয় তাদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলে জ্ঞান আরও বাস্তব ও গণতান্ত্রিক হবে।

জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের অব্যবহৃত সম্ভাবনা

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা প্রায়ই সামাজিক সুরক্ষা বা কল্যাণ বাজেটে আটকে যায়। অথচ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত একটি শিশু ভবিষ্যতে যে কর্মদক্ষতা, উদ্ভাবন, আয় ও সামাজিক নেতৃত্ব দিতে পারত, তা হারানো জাতীয় অর্থনীতিরও ক্ষতি। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ মানুষকে নির্ভরতা থেকে স্বনির্ভরতার দিকে নিয়ে যায়। অন্যদিকে বিদ্যালয়-বহির্ভূততা পরিবারে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যাব্যয়, কর্মঘণ্টার ক্ষতি এবং দারিদ্র্যের আন্তঃপ্রজন্ম চক্র বাড়াতে পারে। বিশেষ শিক্ষা বিভাগে বিনিয়োগ তাই ক্ষুদ্র একটি জনগোষ্ঠীর জন্য অনুগ্রহ নয়; এটি মানবসম্পদ, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক ন্যায়ের অবকাঠামোয় বিনিয়োগ।

জেলা পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়-সংযুক্ত প্রদর্শনী বিদ্যালয় ও সম্পদকেন্দ্র গড়ে তুললে গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং সেবা একই বৃত্তে যুক্ত হতে পারে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ খাতের মধ্যে রেফারেল প্রটোকল দরকার, যাতে পরিবারকে প্রতিবার শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করতে না হয়। কোন পর্যায়ে কে মূল্যায়ন করবে, কে শিক্ষণ-পরিকল্পনা করবে, কখন অন্য পেশাজীবীর কাছে পাঠানো হবে এবং তথ্য কীভাবে নিরাপদে ভাগ করা হবে—এসব স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

স্নাতকদের কর্মসংস্থান অনুসরণকারী তথ্যভান্ডার গড়ে তোলাও জরুরি। কতজন কোথায় কাজ করছেন, কোন দক্ষতা চাকরিতে বেশি প্রয়োজন, কোথায় ঘাটতি এবং নিয়োগদাতার অভিজ্ঞতা কী—এই তথ্য পাঠক্রম উন্নয়ন ও জনশক্তি পরিকল্পনায় সাহায্য করবে। একই সঙ্গে চাকরিদাতাদের বোঝাতে হবে, বিশেষ শিক্ষা স্নাতকের দক্ষতা কেবল ‘বিশেষ শিশু সামলানো’ নয়; তারা শিক্ষণ নকশা, মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণ, প্রবেশগম্যতা, গবেষণা ও অন্তর্ভুক্তি ব্যবস্থাপনায় মূল্যবান অবদান রাখতে পারেন।

ভবিষ্যতের জন্য নয়টি বাস্তব অগ্রাধিকার

  • প্রথমত, বিভাগের বর্তমান অবকাঠামো, শিক্ষকসংখ্যা, পাঠক্রম, গবেষণা, সেবাগ্রহীতা এবং স্নাতক-কর্মসংস্থানের স্বাধীন সক্ষমতা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। এই নিরীক্ষা দোষ খোঁজার অনুশীলন নয়; শক্তি, ঘাটতি ও বিনিয়োগের অগ্রাধিকার চিহ্নিত করার উপায়। ফল প্রকাশ করলে শিক্ষার্থী, পরিবার, সরকার ও অংশীদারদের আস্থা বাড়বে।
  • দ্বিতীয়ত, শ্রবণ ও যোগাযোগ, স্বল্পদৃষ্টি, স্নায়ুবিকাশ, শিক্ষাগত মূল্যায়ন এবং সহায়ক প্রযুক্তির গবেষণাগার আধুনিক করতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন দরকার। প্রকল্পনির্ভর সাময়িক কেনাকাটার বদলে যন্ত্র হালনাগাদ, সফটওয়্যার লাইসেন্স, মেরামত, দক্ষ প্রযুক্তিবিদ এবং ব্যবহারকারী প্রশিক্ষণের নিয়মিত বাজেট থাকতে হবে।
  • তৃতীয়ত, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অভিভাবকদের পাঠক্রম পর্যালোচনা, গবেষণা-পরামর্শ এবং বিভাগীয় সিদ্ধান্তে অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত। অংশগ্রহণের জন্য শুধু সভায় আমন্ত্রণ যথেষ্ট নয়; প্রবেশগম্য নথি, যুক্তিসঙ্গত সুবিধা, মতামতের প্রভাব এবং প্রয়োজনে সম্মানী নিশ্চিত করতে হবে।
  • চতুর্থত, সাধারণ শিক্ষক শিক্ষার সব বিশেষায়নে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার আবশ্যিক ব্যবহারিক পাঠ যুক্ত করা জরুরি। একটি আলাদা ঐচ্ছিক কোর্স দিয়ে দায়িত্ব শেষ হবে না। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষণ, মূল্যায়ন, শ্রেণি ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যালয় নেতৃত্বের প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যময় শিক্ষার্থীকে বিবেচনা করতে হবে।
  • পঞ্চমত, বিভাগের নেতৃত্বে স্কুলভিত্তিক পরামর্শ ও শিক্ষক-সহায়তার পরীক্ষামূলক মডেল গড়ে ফল মূল্যায়ন করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থী, স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তা, বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং পরিবারের যৌথ দল নির্দিষ্ট অঞ্চলে কাজ করলে বাস্তব সমস্যার ব্যবহারযোগ্য সমাধান তৈরি হবে। সফল মডেল সরকার ধীরে ধীরে সম্প্রসারণ করতে পারে।
  • ষষ্ঠত, সরকারি নিয়োগে বিশেষ শিক্ষাবিদের সুস্পষ্ট পদ, যোগ্যতা, কাজের সীমা এবং পদোন্নতির পথ নির্ধারণ জরুরি। একই পদে অস্পষ্টভাবে নানা পেশার কাজ চাপিয়ে দিলে সেবা ও জবাবদিহি দুটোই দুর্বল হয়। পেশাগত নিবন্ধন বা স্বীকৃতির প্রয়োজন, ধরন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিয়ে অংশীজনভিত্তিক আলোচনা করা যেতে পারে।
  • সপ্তমত, বাংলা ভাষায় বৈধ ও নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন-উপকরণ, প্রবেশগম্য পাঠ্যসামগ্রী এবং সহায়ক যোগাযোগব্যবস্থা তৈরিতে জাতীয় গবেষণা কর্মসূচি দরকার। বিদেশি উপকরণ অনুবাদ করলেই যথেষ্ট নয়; বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি, গ্রাম-শহরের বাস্তবতা এবং ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার উপযোগিতা যাচাই করতে হবে।
  • অষ্টমত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণের মধ্যে সমন্বিত রেফারেল ও তথ্যবিনিময়ব্যবস্থা গড়তে হবে, অবশ্যই ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা বজায় রেখে। একটি পরিবার যেন একই ইতিহাস বারবার বলতে বাধ্য না হয়, আবার তার সম্মতি ছাড়া তথ্যও যেন ছড়িয়ে না পড়ে—এই দুই প্রয়োজনের ভারসাম্য জরুরি।
  • নবমত, ঢাকাকেন্দ্রিক সুবিধা ভেঙে বিভাগীয় বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আঞ্চলিক অংশীদারত্ব গড়া প্রয়োজন। অনলাইন ও মিশ্র প্রশিক্ষণ সহায়ক হতে পারে, কিন্তু মাঠভিত্তিক পরামর্শের বিকল্প নয়। আঞ্চলিক প্রশিক্ষক দল, বাংলা উন্মুক্ত শিক্ষাসামগ্রী এবং স্থানীয় গবেষণা নেটওয়ার্ক তৈরি হলে জ্ঞান রাজধানীর দেয়ালে আটকে থাকবে না।

বিশেষ শিক্ষা বিভাগের সংস্কার: বিশ্ববিদ্যালয়–সমাজ সংযোগে সমন্বিত আউটডোর সেবা

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী বা বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন সন্তানের জন্মের পর অধিকাংশ পরিবারকে সীমাহীন অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ, সামাজিক কুসংস্কার এবং খণ্ডিত সেবাব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। সন্তানের অবস্থা বোঝা, নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন করানো কিংবা কোথায় কোন সেবা পাওয়া যাবে—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই মা-বাবাকে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বিদ্যালয় ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। পরস্পরবিরোধী পরামর্শ, অতিরিক্ত ব্যয় এবং ভুল প্রত্যাশা তাঁদের হতাশা আরও বাড়ায়। এই বাস্তবতায় উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুসরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ শিক্ষা বিভাগের অধীনে একটি বহুবিষয়ক ও জনসেবামুখী “Special Education Assessment, Counselling and Support Outpatient Centre” প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এখানে প্রশিক্ষিত পেশাজীবীদের মাধ্যমে শিশুর বিকাশগত ও শিক্ষাগত চাহিদা নিরূপণ, শ্রবণ ও দৃষ্টি পরীক্ষা, মনোবৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যায়ন, যোগাযোগ ও আচরণগত মূল্যায়ন, অভিভাবক কাউন্সেলিং এবং প্রয়োজনভিত্তিক রেফারেল সেবা দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি পেশাগত যোগ্যতা ও নৈতিক সীমারেখা অনুসরণ করে অডিটরি-ভার্বাল সহায়তা, ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি এবং প্রারম্ভিক হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। কেন্দ্রটি বিশেষ শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, চিকিৎসক, অডিওলজিস্ট ও বিভিন্ন থেরাপি-পেশাজীবীর সমন্বিত দল পরিচালনা করবে; কোনো একটি পরীক্ষা বা পেশাজীবীর মতামতকে চূড়ান্ত ‘লেবেল’ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে স্বল্পমূল্য ও মানসম্মত এই আউটডোর সেবা একই সঙ্গে পরিবারকে সহায়তা, শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধানে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং দেশের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণাতথ্য তৈরির ক্ষেত্র হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়–সমাজ সংযোগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বাস্তব রূপ হিসেবে এমন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এখন বিশেষ শিক্ষা বিভাগের সংস্কারের অন্যতম জরুরি অগ্রাধিকার।

বিশেষায়িত জনবল, পেশাগত স্বীকৃতি ও সহায়ক প্রযুক্তিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা

বিশেষ শিক্ষা বিভাগে বিভিন্ন প্রতিবন্ধিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ শিক্ষক থাকলেও মূল্যায়নকেন্দ্র, গবেষণাগার ও আউটডোর সেবা কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান এবং সংশ্লিষ্ট রিহ্যাবিলিটেশন পেশাজীবী নিয়োগ করা জরুরি। শ্রবণ ও দৃষ্টি পরীক্ষা, মনোবৈজ্ঞানিক ও শিক্ষাগত মূল্যায়ন, সহায়ক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুধু শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে রাখা উচিত নয়। একই সঙ্গে বিভাগের পাঠক্রম, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত যোগ্যতা এমনভাবে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন, যাতে যোগ্য স্নাতকেরা তাঁদের অর্জিত বিশেষায়ন অনুযায়ী বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলের স্বীকৃতি, নিবন্ধন বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লাইসেন্স গ্রহণের সুযোগ পান। তবে সব শিক্ষার্থীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই নিবন্ধন দেওয়ার পরিবর্তে নির্ধারিত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণঘণ্টা, তত্ত্বাবধানে ব্যবহারিক অনুশীলন এবং সংশ্লিষ্ট পেশার কর্মপরিধির ভিত্তিতে এই স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৮-এর ১৫ ধারায় রিহ্যাবিলিটেশন পেশাজীবীর নিবন্ধন এবং প্রাকটিশনারের লাইসেন্স গ্রহণের বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৮

বিভাগের অধীনে একটি Assistive Technology Research, Design and Production Centre প্রতিষ্ঠাও সময়ের দাবি। এখানে প্রতিবন্ধী শিশু, শিক্ষার্থী ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের শিক্ষা, যোগাযোগ, চলাচল, কর্মসংস্থান এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় স্বল্পমূল্যের সহায়ক উপকরণ গবেষণা, নকশা, পরীক্ষণ, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন, অভিযোজন ও মেরামত করা যেতে পারে। ব্রেইল ও স্পর্শনির্ভর শিক্ষাসামগ্রী, বড় হরফের উপকরণ, যোগাযোগ বোর্ড, শ্রবণ ও দৃষ্টিসহায়ক সরঞ্জাম, অভিযোজিত শিক্ষা উপকরণ এবং বাংলা ভাষাভিত্তিক ডিজিটাল প্রযুক্তি উদ্ভাবনে প্রকৌশল, কম্পিউটারবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা প্রয়োজন। ব্যবহারকারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নকশা ও পরীক্ষণপ্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত করতে হবে, যাতে উৎপাদিত প্রযুক্তি বাস্তব চাহিদাসম্মত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হয়।

একই সঙ্গে একটি সম্পূর্ণ প্রবেশগম্য Specialised ICT, Digital Skills and Outsourcing Lab স্থাপন করা প্রয়োজন। স্ক্রিন রিডার, রিফ্রেশেবল ব্রেইল ডিসপ্লে, স্পিচ-টু-টেক্সট, ম্যাগনিফিকেশন সফটওয়্যার, বিকল্প ইনপুট ডিভাইস, ক্যাপশনিং এবং প্রয়োজনমাফিক অভিযোজিত কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে এখানে প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণদের ডিজিটাল সাক্ষরতা, গ্রাফিক ডিজাইন, কনটেন্ট তৈরি, প্রোগ্রামিং, অনলাইন কাজ, ফ্রিল্যান্সিং এবং আউটসোর্সিংয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং প্রতিবন্ধিতা-সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতায় এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা উচিত। এর মাধ্যমে বিশেষ শিক্ষা বিভাগ শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং গবেষণা, উদ্ভাবন, পেশাগত মানোন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং বিশ্ববিদ্যালয়–সমাজ সংযোগের একটি জাতীয় কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হতে পারবে।

শেষ কথা: একটি বিভাগ নয়, অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশের নির্মাণশালা

১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ শিক্ষা বিভাগ বাংলাদেশের শিক্ষা-ইতিহাসে একটি মৌলিক সত্য প্রতিষ্ঠা করেছে—প্রতিবন্ধী শিশুর শেখার অধিকার বাস্তবায়নে সদিচ্ছার পাশাপাশি বিশেষায়িত জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পেশাগত দক্ষতা প্রয়োজন। শিক্ষক প্রস্তুতি থেকে পরিবার-সহায়তা, মূল্যায়ন থেকে গবেষণা, বিদ্যালয় অনুশীলন থেকে নীতিপরামর্শ—বিভাগটির কাজ বহু দিকে বিস্তৃত। এর স্নাতকেরা এমন জায়গায় কাজ করেন, যেখানে একটি সঠিক শিক্ষণ-কৌশল, একটি প্রবেশগম্য উপকরণ কিংবা একটি সম্মানজনক পরামর্শ কোনো শিশুর জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

এই বিভাগের সবচেয়ে গভীর অবদান হয়তো সংখ্যায় ধরা কঠিন। যে শিক্ষক প্রথমবার বুঝলেন, শিশুটি অবাধ্য নয়—যোগাযোগ করতে পারছে না; যে মা সন্তানের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি শক্তিও দেখতে শিখলেন; যে তরুণ ব্রেইল, ইশারা ভাষা বা সহায়ক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজের শিক্ষার দরজা খুললেন; যে নীতিনির্ধারক প্রতিবন্ধিতাকে কল্যাণ নয়, অধিকার ও উন্নয়নের প্রশ্ন হিসেবে দেখলেন—প্রতিটি পরিবর্তনের ভেতরে বিশেষ শিক্ষার নীরব প্রভাব রয়েছে।

তবু এক বিভাগের শ্রম দিয়ে সমগ্র দেশের বঞ্চনা দূর হবে না। প্রতিবন্ধী শিশুদের বড় অংশ যখন শিক্ষার বাইরে, বহু সেবা খণ্ডিত এবং সাধারণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রয়োজনীয় সহায়তা পান না, তখন রাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের বদলে সুসংহত জনশক্তি ও প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশেষ শিক্ষা বিভাগকে সেই পরিকল্পনার শক্তিশালী গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও উদ্ভাবনকেন্দ্র করা যায়। তার জন্য অর্থায়ন, আধুনিক গবেষণাগার, মানসম্মত কর্মপদ, প্রকাশ্য জবাবদিহি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

একটি সমাজ কতটা উন্নত, তা শুধু মেধাবী শিশুকে কত দূর নিয়ে যায় দিয়ে মাপা যায় না। যে শিশুকে পথটি শুরুতেই বাদ দিতে চেয়েছিল, তার জন্য সমাজ কতটা পথ তৈরি করে—উন্নয়নের আসল পরীক্ষা সেখানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ শিক্ষা বিভাগের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাই ‘ব্যতিক্রমী একটি বিভাগ’ হওয়া নয়; এমন একটি বাংলাদেশের নির্মাণশালা হয়ে ওঠা, যেখানে একদিন কোনো শিক্ষার্থীকে ব্যতিক্রম বলে শিক্ষার বাইরে রাখা হবে না। নীরব বিপ্লবের সার্থকতা তখনই, যখন প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ বলবে—তুমি যেমন, তোমার জন্যও এখানে শেখার জায়গা আছে।

লেখক: অধ্যাপক . মাহবুবুর রহমান লিটু, সাবেক চেয়ারম্যান, বিশেষ শিক্ষা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়;&  প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল এলায়েন্স অফ ডিসএ্যাবিলিটি প্রফেশনালস (বিএনএডিপি); & সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ডেফ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন; এবং উপদেষ্টা  সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#বিশেষশিক্ষা #অন্তর্ভুক্তিমূলকশিক্ষা #প্রতিবন্ধিতাঅধিকার #ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় #শিক্ষাসংস্কার #SpecialEducation #InclusiveEducation #DisabilityRights #UniversityOfDhaka #EducationReform



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: