অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক | বিশেষ সম্পাদকীয় ফিচার
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের জীবনে কীভাবে ভয়, সামাজিক বয়কট, সাইবার হয়রানি, অস্পষ্ট বা ‘ভৌতিক অভিযোগ’, দীর্ঘস্থায়ী প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা এবং গবেষণা ও পাঠদান থেকে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে পারে—এই দীর্ঘ অনুসন্ধানী ফিচারে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর উচ্চশিক্ষা সংকটের সঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। Natural Justice, Due Process, Academic Freedom, Chilling Effect, Guilt by Association, Rule of Law বনাম Rule by Mob, Institutional Capture, Transitional Justice, ILO Convention No. 111, ICCPR, ICESCR এবং UNESCO 1997 Recommendation-এর আলোকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—রাজনৈতিক পরিচয় কি কখনো পেশাগত অপরাধের বিকল্প প্রমাণ হতে পারে? একজন শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা, তত্ত্বাবধান ও একাডেমিক পরিসর থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন রাখার ক্ষতি কি শুধু ব্যক্তির, নাকি শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক পুঁজিরও? ফিচারটি প্রতিশোধ নয়, ব্যক্তি-নির্দিষ্ট প্রমাণ, ন্যায্য তদন্ত, জবাবদিহি, সহাবস্থান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্র রক্ষার পক্ষে একটি গভীর মানবাধিকার ও নীতিগত পাঠ হাজির করে।
রাষ্ট্রে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে। সরকার বদলে যায়। ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তিত হয়। পুরোনো রাজনৈতিক ভাষার জায়গায় আসে নতুন ভাষা, নতুন নেতৃত্ব, নতুন প্রত্যাশা এবং নতুন জবাবদিহির দাবি। ইতিহাসে রাজনৈতিক রূপান্তর অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি একটু আলাদা।
প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে কি বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষক ও গবেষকদের রাজনৈতিক পরিচয় নতুন করে যাচাই করবে? নাকি রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব স্থায়ী নৈতিক ভিত্তি—যুক্তি, প্রমাণ, স্বাধীন চিন্তা, ন্যায়বিচার, সহনশীলতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বহুত্ববাদ—অক্ষুণ্ণ রাখবে?
একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের স্বীয় জীবনের গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নটিকে আর কেবল তাত্ত্বিক থাকতে দেয়নি। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন পাঠদান করেছেন, গবেষণা করেছেন, গবেষণা-শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধান করেছেন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য হিসেবে দায়িত্বেও ছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যাওয়ার পর সেই শিক্ষককের পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনটিও যেন দ্রুত অপরিচিত হয়ে উঠতে শুরু করে।
একসময় যে ক্যাম্পাস ছিল তার সারাদিনের কর্মস্থল, সেখানে ফিরে যাওয়া নিরাপদ কি না—সেই প্রশ্ন সেই শিক্ষককে এখন বার বার ভাবতে হয়। যে শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পড়িয়েছেন, সেখানে আবার প্রবেশ করতে পারবেন কি না, তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যে চেম্বারে বসে গবেষণা করেছেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, গবেষণাপত্র সম্পাদনা করেছেন—সেই কক্ষ দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ থেকেছে। সেই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে থাকা গবেষণা-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্বাভাবিক একাডেমিক সম্পর্কও ব্যাহত হয়েছে। অপরদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপপ্রচার, বিদ্রূপ এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত হুমকির অভিযোগের মধ্যে একসময় একটি কঠিন সত্য উপলব্ধি করেছি—একজন মানুষকে তাঁর কর্মক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সব সময় চাকরিচ্যুতির চিঠির প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো ভয়ই হয়ে ওঠে অদৃশ্য বরখাস্তপত্র।
সেই ‘দশ দিন’, যার শেষ আর হলো না
২০২৪ সালের আগস্টে সেই শিক্ষককে জানানো হয়েছিল, সাময়িকভাবে দশ দিনের জন্য একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে হবে। দশ দিন। শুনতে খুব দীর্ঘ সময় নয়। তখন সেই শিক্ষককের মনে হয়েছিল, রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রশমিত হবে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তারপর আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরবেন। গবেষণা করবেন শিক্ষার্থীদের থিসিস দেখবেন। সহকর্মীদের সঙ্গে বসবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবেন। কিন্তু ক্যালেন্ডারের সেই দশ দিন যেন আর শেষ হলো না। মাস পেরোল। বছর পেরোল। সাময়িক ব্যবস্থা তার বাস্তব প্রভাবে ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠল। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর একপর্যায়ে সেই শিক্ষককে জানানো হলো—চাকরি আর থাকছে না, বরখাস্তের সিদ্ধান্ত আসছে।
তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—অপরাধ কী?
একজন মানুষের জন্য এর চেয়ে মৌলিক প্রশ্ন আর কী হতে পারে?
সেই শিক্ষকের কাছে এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে আছে নিজের চেম্বারের বন্ধ দরজা। অন্যের কাছে একটি তালাবদ্ধ কক্ষ হয়তো খুব সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু একজন শিক্ষকের কাছে তাঁর চেম্বার কেবল চারটি দেয়াল নয়। সেখানে বই থাকে, গবেষণার খসড়া থাকে, শিক্ষার্থীদের থিসিস থাকে, অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি থাকে, স্মৃতি থাকে এবং বহু বছরের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম জমা থাকে। একটি তালা তাই কখনো কখনো শুধু দরজায় ঝোলে না।-তা ঝুলে যায় একটি পেশাগত জীবনের ওপরেও।
সেই শিক্ষক জানান, তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকা তিনজন এমফিল ও একজন পিএইচডি গবেষকের গবেষণার ধারাবাহিকতাও ব্যাহত হয়েছে। গবেষণা-সুপারভাইজার ও গবেষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক প্রশাসনিক কাগজে লেখা একটি নামমাত্র সম্পর্ক নয়। বহু বছরের একাডেমিক বোঝাপড়া, গবেষণার ভাষা, methodological orientation, আস্থা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিয়োগের ওপর সেই সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কখনো শুধু একজন শিক্ষককে প্রভাবিত করে না। তার ঢেউ পৌঁছে যায় গবেষণা-শিক্ষার্থীর কাছে, গবেষণা প্রকল্পে, প্রকাশনায়, ভবিষ্যৎ গবেষণায়—কখনো একটি সম্পূর্ণ academic lineage-এর মধ্যেও।
রাজনৈতিক পরিচয় কি পেশাগত অপরাধ?
এখানেই এক শিক্ষকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা একটি বৃহত্তর নীতিগত প্রশ্নে রূপ নেয়। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কোনো রাজনৈতিক দর্শন ধারণ করতে পারেন। তিনি কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা, রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠাতা নেতা, রাজনৈতিক আন্দোলন, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, উদারতাবাদ, ধর্মীয় চিন্তা, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা রাষ্ট্রগঠন নিয়ে গবেষণা করতে পারেন। আবার অন্য একজন গবেষক তাঁর সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যাখ্যা দিতে পারেন। —এটাই বিশ্ববিদ্যালয়।
জ্ঞানচর্চার অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো—একটি প্রশ্নের সব সময় একটি মাত্র অনুমোদিত উত্তর থাকে না। তাই রাজনৈতিক মতামত এবং পেশাগত অসদাচরণ এক বিষয় নয়। কোনো শিক্ষক সহিংসতায় যুক্ত ছিলেন কি না, দুর্নীতি করেছেন কি না, গবেষণায় জালিয়াতি করেছেন কি না, যৌন হয়রানি করেছেন কি না, পরীক্ষায় অনিয়ম করেছেন কি না, শিক্ষার্থীর প্রতি বৈষম্য করেছেন কি না কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন কি না—এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অবশ্যই তদন্তযোগ্য। বরং বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকলে তদন্ত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব।
Academic freedom কখনো impunity বা দায়মুক্তি নয়। কিন্তু বিপদ শুরু হয় যখন প্রশ্নের ভাষা বদলে যায়। প্রশ্ন যদি হয়—“এই শিক্ষক কী করেছেন?” —তাহলে সেটি accountability বা জবাবদিহির প্রশ্ন।
কিন্তু প্রশ্ন যদি হয়ে যায়—“এই শিক্ষক কোন রাজনৈতিক পক্ষের?” —তাহলে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি নৈতিক ও আইনি ভূখণ্ডে প্রবেশ করি।
মানবাধিকারভিত্তিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রহণযোগ্য সূত্র হওয়া উচিত—
ব্যক্তিগত কার্য + ব্যক্তি-নির্দিষ্ট প্রমাণ + প্রযোজ্য আইন বা বিধি + আইনসম্মত প্রক্রিয়া।
কোনো সংগঠন, মতাদর্শ বা পূর্ববর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বলেই কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দোষী ধরে নেওয়া যায় না। কারণ association evidence এবং misconduct evidence এক জিনিস নয়।
‘ভৌতিক অভিযোগ’: অভিযোগ আছে, কিন্তু অভিযোগটা কী?
এই দীর্ঘ অস্থিরতার সবচেয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল এমন অভিযোগের মুখোমুখি হওয়া, যার প্রকৃতি সেই শিক্ষককের কাছে কখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। অভিযোগ আছে—কিন্তু কী অভিযোগ? কে অভিযোগ করেছেন? কোন ঘটনার ভিত্তিতে? কোন সাক্ষ্য আছে? কোন নথি আছে? কোন নির্দিষ্ট আচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বিধি লঙ্ঘন করেছে? —এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না থাকলে একজন অভিযুক্ত মানুষ কীভাবে অর্থবহভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন?
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ অবশ্যই উঠতে পারে। অভিযোগকারীকে নিরাপত্তা দিতে হবে, তাঁর বক্তব্য শুনতে হবে এবং অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে ন্যায়বিচারের স্বার্থে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেও অভিযোগের প্রকৃতি জানতে, সংশ্লিষ্ট প্রমাণ দেখতে, নিজের বক্তব্য দিতে এবং প্রযোজ্য প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য বা অভিযোগের মোকাবিলা করার বাস্তব সুযোগ দিতে হবে।
এই মৌলিক সুযোগগুলো অনুপস্থিত থাকলে অভিযোগের সঙ্গে লড়াই করা কঠিন নয় শুধু—কখনো কখনো অসম্ভব হয়ে ওঠে। —রূপক অর্থে সেই শিক্ষক যাকে বলেন ‘ভৌতিক অভিযোগ’। —ভূতকে সবাই ভয় পায়, কিন্তু কেউ দেখাতে পারে না সেটি কোথায়। এ ধরনের অভিযোগেরও নির্দিষ্ট অবয়ব দৃশ্যমান নয়, অথচ তার সামাজিক ও পেশাগত প্রভাব অত্যন্ত বাস্তব।
একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, অজ্ঞাত অভিযোগ, বন্ধ গ্রুপের মন্তব্য, কোনো রাজনৈতিক interpretation কিংবা কারও মৌখিক দাবি—এসব ধীরে ধীরে এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই মানুষটি সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়ে যান।
তখন একটি বিপজ্জনক inversion ঘটে।
প্রতিষ্ঠানকে আর অভিযোগ প্রমাণ করতে হয় না; অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই যেন প্রমাণ করতে হয়—তিনি নির্দোষ। কিন্তু কোনো অভি যোগের অস্তিত্ব নিজে প্রমাণ নয়। অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে। প্রমাণ সংগ্রহ হবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য শোনা হবে। তারপর সিদ্ধান্ত হবে। ন্যায়বিচারের প্রকৃত শক্তি অভিযোগের সংখ্যায় নয়; সত্য অনুসন্ধানের সততা ও নিরপেক্ষতায়।
অভিযোগ, ন্যায়বিচার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মা: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আমাদের কী শেখায়?
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি কর্মক্ষেত্র নয়; এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে জ্ঞানের অনুসন্ধান, মতবিনিময় এবং সমালোচনামূলক চিন্তার স্বাধীনতা সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করে। ফলে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু সেই গুরুত্ব কখনোই ন্যায়সংগত প্রক্রিয়াকে অতিক্রম করতে পারে না। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হতে পারে; কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে আগাম সামাজিক বা প্রশাসনিক শাস্তি—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দর্শনে দীর্ঘদিন ধরেই একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—প্রত্যেক ব্যক্তি ন্যায্য ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার অধিকারী। এই নীতির আলোকে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের প্রকৃতি স্পষ্ট হওয়া, অভিযোগের তথ্য ও প্রমাণ জানার সুযোগ থাকা, নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ পাওয়া এবং একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি বিবেচিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক না কেন, প্রক্রিয়াগত ন্যায়বিচার উপেক্ষিত হলে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয় হতে শুরু করে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক বা গবেষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য সাধারণত লিখিত অভিযোগ, প্রাথমিক যাচাই, প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং লিখিত সিদ্ধান্তের মতো একাধিক ধাপ অনুসরণ করা হয়। এসব প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য অভিযুক্তকে রক্ষা করা নয়; বরং সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা। কারণ ন্যায্য তদন্ত অভিযুক্ত ও অভিযোগকারী—উভয় পক্ষের অধিকারই সুরক্ষিত করে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনায় একটি বিষয় বারবার উঠে আসে—একাডেমিক স্বাধীনতা শুধু ব্যক্তিগত অধিকার নয়; এটি জনস্বার্থের বিষয়। শিক্ষক যদি রাজনৈতিক মত, গবেষণার বিষয়, কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানের কারণে ভয়, হয়রানি বা আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য হন, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গবেষণার মান, শ্রেণিকক্ষের উন্মুক্ত আলোচনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ভূমিকা। একটি সমাজের জ্ঞানচর্চা তখন ধীরে ধীরে প্রশ্নহীন আনুগত্যের দিকে ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
শিক্ষকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে কঠিন বিষয় ছিল অনিশ্চয়তা। অভিযোগের প্রকৃতি পরিষ্কার নয়, কিন্তু অভিযোগ আছে; তদন্তের কথা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু অভিযোগের নির্দিষ্ট ভিত্তি জানা যাচ্ছে না; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রচার চলছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই স্পষ্ট নয়। এমন পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষক নিজেকে কীভাবে রক্ষা করবেন? কীসের জবাব দেবেন? কোন অভিযোগের উত্তর দেবেন? এই অনিশ্চয়তাই ধীরে ধীরে মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পেশাগত অচলাবস্থার জন্ম দেয়।
এই অভিজ্ঞতা ঐ শিক্ষককে একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কি এমন একটি জায়গা থাকবে, যেখানে মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষ যুক্তি দিয়ে বিতর্ক করবে? নাকি এমন একটি পরিবেশ তৈরি হবে, যেখানে অভিযোগের আগে গুজব, তদন্তের আগে সামাজিক রায় এবং প্রমাণের আগে রাজনৈতিক পরিচয়ই মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে?
একটি সভ্য সমাজে কোনো অভিযোগকে উপেক্ষা করা যেমন উচিত নয়, তেমনি কোনো অভিযোগকে প্রমাণের বিকল্প হিসেবেও দেখা উচিত নয়। কারণ ন্যায়বিচারের শক্তি শাস্তি প্রদানের ক্ষমতায় নয়; বরং সত্য অনুসন্ধানের সততা, প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার মধ্যেই নিহিত। বিশ্ববিদ্যালয় যদি এই নীতিগুলো ধরে রাখতে পারে, তবে রাজনৈতিক পরিবর্তন যাই হোক না কেন, জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে। আর যদি তা না পারে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শুধু কয়েকজন শিক্ষক নন; ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ভবিষ্যৎ।
Natural Justice: বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচারের প্রথম পাঠ
আইনশাস্ত্রে Natural Justice বা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের দুটি সুপরিচিত নীতি রয়েছে।
- প্রথমটি, Audi Alteram Partem—অন্য পক্ষকেও শুনতে হবে। অর্থাৎ কাউকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁকে জানতে হবে অভিযোগ কী, প্রমাণ কী এবং তাঁকে অর্থবহভাবে জবাব দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
- দ্বিতীয়টি, Nemo Judex in Causa Sua—কেউ নিজের মামলার বিচারক হতে পারেন না। অর্থাৎ তদন্তকারী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষকে নিরপেক্ষ হতে হবে।
- এর সঙ্গে যুক্ত হয় Due Process বা যথাযথ প্রক্রিয়ার প্রশ্ন। অভিযোগের প্রকৃতি স্পষ্ট করা, প্রাসঙ্গিক প্রমাণ উপস্থাপন করা, আত্মপক্ষ সমর্থনের বাস্তব সুযোগ দেওয়া, নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা, যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত দেওয়া এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে review বা appeal-এর সুযোগ রাখা—এসব কোনো আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়; ন্যায্য প্রশাসনের ভিত্তি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব নীতির গুরুত্ব আদালতের চেয়ে কম নয়। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক দাবি আরও বেশি হওয়া উচিত। কারণ যে প্রতিষ্ঠান তার শিক্ষার্থীদের critical reasoning, evidence এবং fairness শেখায়, সেই প্রতিষ্ঠান নিজেই যদি গুজব, জনচাপ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তার শিক্ষাদর্শ ও প্রশাসনিক আচরণের মধ্যে গভীর বিরোধ তৈরি হয়।
Rule of Law বনাম Rule by Mob
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর প্রতিবাদ করার অধিকার আছে। শিক্ষকেরও প্রতিবাদ করার অধিকার আছে। অভিযোগকারী ব্যক্তির ন্যায়বিচার চাওয়ার অধিকার আছে। কোনো ভুক্তভোগীর অভিযোগকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। কিন্তু অভিযোগকারী একই সঙ্গে অভিযোগকারী, তদন্তকারী, বিচারক এবং শাস্তি কার্যকরকারী হতে পারেন না। এই জায়গাতেই Rule of Law এবং Rule by Mob-এর মৌলিক পার্থক্য।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন, সিন্ডিকেট, তদন্ত কমিটি, ট্রাইব্যুনাল, চাকরিবিধি—সবই থাকতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্ত যদি বাস্তবে নির্ধারিত হয় স্লোগানে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায়, দলগত চাপ কিংবা সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কায়—তাহলে প্রতিষ্ঠানটি কাগজে আইনভিত্তিক হলেও বাস্তবে জনচাপ-নির্ভর হয়ে পড়তে পারে।
Mob justice-এর সবচেয়ে বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য হলো—সেখানে verdict আগে আসে, investigation পরে। প্রথমে বলা হয়, মানুষটি দোষী। তারপর প্রমাণ খোঁজা হয়। আইনের শাসনে ঠিক উল্টো হওয়ার কথা।
Guilt by Association: পরিচয়ের বিচার
রাজনৈতিক পালাবদলের পর সমাজে একটি প্রবণতা খুব সহজে তৈরি হতে পারে—মানুষের নির্দিষ্ট আচরণের পরিবর্তে তার affiliation বিচার করা। তিনি ‘ওই পক্ষের’। তিনি ‘এই মতের’। তিনি অমুক শিক্ষক সংগঠনে ছিলেন। তিনি অমুক সময়ে প্রশাসনে দায়িত্বে ছিলেন। তিনি অমুক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন। কিন্তু আইন ও ন্যায়বিচারের মৌলিক প্রশ্ন হওয়া উচিত— তিনি নিজে কী করেছেন?
কোনো সংগঠনের একজন সদস্য অপরাধ করলে তার অন্য সদস্যরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধী হয়ে যান না। কোনো সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে কাজ করাও নিজে অপরাধ নয়। একটি নির্দিষ্ট গবেষণা বিষয় নিয়ে কাজ করাও অপরাধ নয়। ‘Political identity’ একটি sociological category হতে পারে। কিন্তু তা proof of misconduct নয়।
গবেষণার বিষয় কি অপরাধ হতে পারে?
সেই শিক্ষক তার নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মনিরপেক্ষতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং সংবিধানের মূল্যবোধের মতো বিষয়ে গবেষণার সঙ্গে সম্পর্কিত। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একসময় মনে হতে শুরু করে, এই গবেষণার বিষয়গুলোও যেন কারও কারও কাছে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রমাণ হয়ে উঠছে। এখানেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খুব গভীর বিপদ।
কারণ গবেষণার বিষয় যদি গবেষকের বিরুদ্ধে evidence হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যৎ গবেষকরা শেখেন— কিছু প্রশ্ন করা নিরাপদ নয়। বরং বিপজ্জনক। তারপর আসে self-censorship। কেউ বঙ্গবন্ধু নিয়ে গবেষণা করবেন না। কেউ ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে করবেন না। কেউ সামরিক শাসন নিয়ে করবেন না। কেউ সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে করবেন না। কেউ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে করবেন না। কেউ ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে করবেন না। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার জায়গা থেকে ধীরে ধীরে ‘safe topics’-এর কারখানায় পরিণত হতে পারে। একটি পরিণত সমাজে ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক থাকবে। ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকবে। গবেষকের সঙ্গে গবেষকের মতভেদ থাকবে। কিন্তু তার সমাধান হবে গবেষণাপত্রে, বইয়ে, সেমিনারে, সম্মেলনে এবং যুক্তিনির্ভর আলোচনায়। গবেষণার উত্তর গবেষণা। ইতিহাসের উত্তর ইতিহাস। যুক্তির উত্তর যুক্তি। গবেষকের রাজনৈতিক শ্রেণিবিন্যাস নয়।
Chilling Effect: ভয়ের সবচেয়ে বড় বিজয়
ভয় সব সময় মানুষকে সরাসরি নীরব করে না। ভয়ের সবচেয়ে সূক্ষ্ম সাফল্য হলো—মানুষকে এমনভাবে বদলে দেওয়া, যাতে সে নিজের কণ্ঠস্বর নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
শিক্ষকের মনে প্রশ্ন ভর করে:
- আমি কী লিখব?
- কোন সেমিনারে যাব?
- ফেসবুকে কী লিখব?
- কোন গবেষণার বিষয় বেছে নেব?
- কোন পুরোনো ছবি ভবিষ্যতে শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে?
এই প্রশ্নগুলো যখন academic judgment-এর সঙ্গে জুড়ে যায়, তখন তৈরি হয় chilling effect—সম্ভাব্য শাস্তি বা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় মানুষ আইনসম্মত ও বৈধ আচরণ থেকেও বিরত হতে শুরু করেন। একজন শিক্ষককে প্রকাশ্যে অপমানিত হতে দেখে যদি আরও দশজন শিক্ষক বিতর্কিত বিষয়ে কথা বলা বন্ধ করেন, তাহলে তাঁদের প্রত্যেককে আলাদাভাবে সেন্সর করার প্রয়োজন হয় না।
প্রথম ঘটনাটিই বাকিদের শিক্ষা দেয়। এই নীরবতা শিক্ষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। শিক্ষার্থীরাও দেখে। তারা শিখতে শুরু করে—সব প্রশ্ন করা সুবিধাজনক নয়, সব মত প্রকাশ নিরাপদ নয়, সব গবেষণার বিষয় সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এই শিক্ষা কোনো syllabus-এ লেখা থাকে না।
কিন্তু অনেক সময় এটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী hidden curriculum হয়ে ওঠে।
সাইবার হয়রানি: দ্বিতীয় কারাগার
শারীরিক কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে আসা যায়। ডিজিটাল জগত থেকে বেরিয়ে আসা অনেক কঠিন। একটি পোস্ট, একটি ছবি, edited screenshot, অসম্পূর্ণ উদ্ধৃতি, অপমানজনক মন্তব্য কিংবা হুমকি—কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। Digital mob-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে অভিযোগের আয়ু অনেক দীর্ঘ। পোস্ট মুছে গেলেও screenshot থাকে। অপপ্রচার খণ্ডন করা হলেও search result থেকে যেতে পারে। মানুষ ভুলে গেলেও algorithm অনেক দিন মনে রাখে। ফলে reputational punishment কখনো formal punishment-এর চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে।
এই শিক্ষকের নিজের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণ, অপমানজনক প্রচারণা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত হুমকির অভিযোগ সেই শিক্ষককে ও তার পরিবারকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। প্রতিটি বার্তার সত্যতা সব সময় যাচাই করা সম্ভব নয়। কিন্তু নিরাপত্তা-ঝুঁকির নিষ্ঠুর বৈশিষ্ট্য হলো—হুমকি সত্য কি না নিশ্চিতভাবে না জানাটাই অনেক সময় সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ।
ডিজিটাল হয়রানির আরেকটি সমস্যা হলো, তা অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অনলাইনের অভিযোগ অফলাইনের সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। সহকর্মীরা দূরত্ব বজায় রাখতে পারেন, শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হতে পারেন, পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারে। ডিজিটাল আক্রমণ তখন ধীরে ধীরে সামাজিক বাস্তবতায় রূপ নেয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে লক্ষ্যভিত্তিক হয়রানি, মানহানি, সহিংসতার উসকানি এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগকেও গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে। কারণ স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং কাউকে ভীত করে তোলার স্বাধীনতা এক বিষয় নয়।
ঘরছাড়া শিক্ষক, অনিশ্চয়তায় পরিবার
একজন অধ্যাপক কেবল অধ্যাপক নন। তিনি কারও বাবা, কারও স্বামী, কারও সন্তান, কারও সহকর্মী, কারও গবেষণা-সুপারভাইজার। রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সংঘাতের অভিঘাত তাই office memo-তে আটকে থাকে না। তা পরিবারে পৌঁছায়, বাসস্থানে পৌঁছায়, সন্তানের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছায়, মানসিক শান্তিতে পৌঁছায়। নিরাপত্তার কারণে একজন শিক্ষক যদি মনে করেন যে তাঁকে পরিবারসহ নিজের পরিচিত বাসস্থান থেকে দূরে থাকতে হবে, তাহলে ‘employment dispute’ শব্দটি সেই মানবিক অভিজ্ঞতার পূর্ণতা ধারণ করে না। —এটি তখন professional insecurity থেকে existential insecurity-তে প্রবেশ করে।
‘বাবার অপরাধ কী?’—একটি শিশুর নীরব প্রশ্ন
২০২৪ সালের আগস্টে সেই শিক্ষকের ছোট ছেলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। রাজনীতি কী, রাষ্ট্র কী, মতাদর্শ কী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী—এসব সে জানত না। সে শুধু জানত, প্রতিদিন সকালে বাবা অফিসে যায়। ক্লাস নেয়। শিক্ষার্থীদের পড়ায়। বই লেখে। গবেষণা করে। সন্ধ্যায় ফিরে তার পড়া দেখে, গল্প করে। হঠাৎ একদিন সেই নিয়ম বদলে গেল। বাবা আর অফিসে যায় না। প্রথমে সে ভেবেছিল, বাবা হয়তো ছুটিতে আছে। কয়েক দিন পর প্রশ্ন করল—“বাবা, তুমি অফিসে যাও না কেন?”
শিক্ষক তার সন্তানকে কী উত্তর দিবেন তা খুঁজে পান না। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শিক্ষাতত্ত্ব কিংবা গবেষণা-পদ্ধতি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা দিতে পারেন; কিন্তু কখনো কখনো নিজের সন্তানকে বোঝাতে পারেন না—কেন তিনি নিজের কর্মস্থলে যেতে পারছেন না।
আজ সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেছে। সময় তাকে বড় করেছে, কিন্তু প্রশ্নটির উত্তর সহজ করেনি। মাঝেমধ্যে তার দৃষ্টিতে যেন আরেকটি প্রশ্ন পড়তে পাই—“বাবা, তুমি কি সত্যিই কোনো অপরাধ করেছ?”
—এটি কোনো আদালতের প্রশ্ন নয়। এটি একটি সন্তানের প্রশ্ন। সেই শিক্ষকের বড় ছেলের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। সে পরিস্থিতি কিছুটা বুঝতে পারত। সংবাদ দেখত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা দেখত, মানুষের মন্তব্য শুনত। কিন্তু জানা মানেই শান্তি নয়। ফোন বেজে উঠলে উদ্বেগ, দরজায় শব্দ হলে উৎকণ্ঠা—একটি কিশোরের বেড়ে ওঠার সময়ে যে নিরাপত্তাবোধ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তার ওপর অনিশ্চয়তার ছায়া পড়েছিল।
সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছেন সেই শিক্ষকের স্ত্রী। বাইরে মানুষ একজন শিক্ষককে দেখেছে; ঘরের ভেতরে একজন স্ত্রী দেখেছেন এমন একজন মানুষকে, যিনি প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করেছেন—কবে আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারব? কবে চেম্বারের দরজা খুলব? কবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে গবেষণা নিয়ে কথা বলব?
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার হতে পারে। কিন্তু সেই অভিযোগের ছায়া যখন সন্তানের শৈশব, স্ত্রীর মানসিক শান্তি এবং পরিবারের স্বাভাবিক জীবনকে গ্রাস করে, তখন তার অভিঘাত আর ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা ভবিষ্যতের স্মৃতিকেও স্পর্শ করে।
অপরাধ নয়, আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন
এই অভিজ্ঞতার আরেকটি গভীর স্তর ছিল নৈতিক। বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ এসেছে—নতুন প্রশাসনের সঙ্গে দেখা করুন, কথা বলুন, দুঃখ প্রকাশ করুন, কোনোভাবে বিষয়টি মিটিয়ে নিন। পরিবার থেকেও এসেছে। সহকর্মীদের কাছ থেকেও। তাঁদের উদ্দেশ্য আমি বুঝেছি, বললেন সেই শিক্ষক।। তাঁরা সংঘাতের সমাধান চেয়েছেন। পরিবার চেয়েছে নিরাপত্তা। কিন্তু সেই শিক্ষকের ভেতরে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে—”আমি যদি এমন একটি অপরাধের জন্য ক্ষমা চাই, যা আমি করিনি বলে বিশ্বাস করি, তাহলে সেই ক্ষমা কি সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা, নাকি ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ?”
সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে যদি সুনির্দিষ্ট কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকে এবং নিরপেক্ষ তদন্তে তা প্রমাণিত হয়, তাহলে সেই প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া একজন নাগরিক হিসেবে সেই শিক্ষকের দায়িত্ব। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই নিজের রাজনৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয়কে অপরাধ হিসেবে স্বীকার করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।—এই অবস্থান বীরত্ব প্রদর্শনের চেষ্টা নয়। এটি ছিল পরিবার, নিরাপত্তা, পেশাগত ভবিষ্যৎ, ব্যক্তিগত নৈতিকতা এবং আত্মমর্যাদার মধ্যে প্রতিদিনের কঠিন সংঘর্ষ।
রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সংকট তাই কেবল বাহ্যিক ঘটনা নয়। তা মানুষের আত্মপরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক, নৈতিক অবস্থান এবং সময়বোধকেও পুনর্গঠন করে। ক্যালেন্ডারের একটি দিন চব্বিশ ঘণ্টার। কিন্তু অনিশ্চয়তার মধ্যে সেই দিন কখনো সহস্র বছরের মতো দীর্ঘ মনে হতে পারে।
চাকরি আছে—কিন্তু শিক্ষকতা নেই
প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তি সব সময় dismissal letter-এর মাধ্যমে আসে না। একজন শিক্ষকের নাম payroll-এ থাকতে পারে। কিন্তু তিনি যদি ক্লাস নিতে না পারেন, গবেষণা করতে না পারেন, গবেষক তত্ত্বাবধান করতে না পারেন, নিজের চেম্বারে যেতে না পারেন, কমিটিতে কাজ করতে না পারেন এবং সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্বাভাবিক academic interaction করতে না পারেন—তাহলে প্রশ্ন ওঠে: তাঁর পেশাটি বাস্তবে কতটা বহাল আছে?
বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষকের professional existence গড়ে ওঠে—
Teaching + Research + Supervision + Publication + Academic Governance + Collegial Interaction
—এই সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে।
এর অধিকাংশই দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে formal title অক্ষুণ্ণ থাকলেও professional exclusion বাস্তব হয়ে ওঠে।
একজন অধ্যাপককে শ্রেণিকক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন করা অনেকটা নদীর প্রবাহ থামিয়ে দেওয়ার মতো। নদী তখনও থাকে, কিন্তু তার স্বাভাবিক গতি থাকে না। গবেষক তখনও গবেষক, কিন্তু তাঁর গবেষণার স্বাভাবিক পরিবেশ থাকে না। শিক্ষক তখনও শিক্ষক, কিন্তু তাঁর সামনে শ্রেণিকক্ষ থাকে না।—এই বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি শুধু ব্যক্তিগত নয়। ক্ষতিগ্রস্ত হন শিক্ষার্থীরাও।
এমফিল বা পিএইচডি গবেষক গবেষণার মাঝপথে সুপারভাইজারের ধারাবাহিক দিকনির্দেশনা হারাতে পারেন। শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীরা একজন শিক্ষকের অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হন। সম্ভাব্য গবেষণা প্রকল্প শুরু হয় না। নতুন প্রজন্মের গবেষক তৈরির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অভিঘাত তাই অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
একাডেমিক স্বাধীনতা ব্যক্তিগত সুবিধা নয়
Academic freedom-কে কখনো কখনো শিক্ষকের বিশেষ privilege হিসেবে দেখা হয়। আসলে এটি জনস্বার্থের বিষয়। শিক্ষক স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে না পারলে শিক্ষার্থী স্বাধীন জ্ঞান পায় না। গবেষক প্রশ্ন করতে না পারলে সমাজ নতুন জ্ঞান পায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে controversial hypothesis পরীক্ষা করা না গেলে সমাজের ভুল বিশ্বাস সংশোধনের পথও সংকুচিত হয়।
অর্থাৎ—
শিক্ষকের নিরাপত্তা → গবেষণার স্বাধীনতা → শিক্ষার্থীর শেখার মান → জ্ঞান উৎপাদন → সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা।
এই chain-এর প্রথম অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেষ অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের অধিকার কেবল তাঁর নিজের অধিকার নয়।—এটি শিক্ষার্থীরও অধিকার।
একাডেমিক স্বাধীনতা ব্যক্তিগত সুবিধা নয়
অনেক সময় academic freedom-কে শিক্ষকদের একটি বিশেষ privilege হিসেবে ভুল বোঝা হয়। আসলে এটি জনস্বার্থ। কারণ শিক্ষক স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে না পারলে শিক্ষার্থী স্বাধীন জ্ঞান পায় না। গবেষক প্রশ্ন করতে না পারলে সমাজ নতুন জ্ঞান পায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে controversial hypothesis পরীক্ষা করা না গেলে সমাজের ভুল বিশ্বাসও সংশোধিত হয় না। অর্থাৎ—
শিক্ষকের নিরাপত্তা → গবেষণার স্বাধীনতা → শিক্ষার্থীর শেখার মান → জ্ঞান উৎপাদন → সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা।
এই chain-এর প্রথম অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেষ অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের অধিকার শুধু তাঁর নিজের অধিকার নয়।—এটি শিক্ষার্থীরও অধিকার।
UNESCO 1997: উচ্চশিক্ষার শিক্ষককে বিশ্ব কীভাবে দেখে
১৯৯৭ সালের UNESCO Recommendation concerning the Status of Higher-Education Teaching Personnel উচ্চশিক্ষার শিক্ষকদের মর্যাদা, পেশাগত স্বাধীনতা, কর্মপরিবেশ এবং institutional autonomy নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি reference framework। এই কাঠামোর কেন্দ্রীয় দর্শন হলো—বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক শুধু একজন সাধারণ চাকরিজীবী নন।
তিনি জ্ঞান উৎপাদনের অংশীদার। তাঁর research, teaching, publication এবং intellectual engagement-এর স্বাধীনতা উচ্চশিক্ষার মানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এই Recommendation-এর আলোকে কোনো শিক্ষককে রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক চাপের কারণে দীর্ঘকাল একাডেমিক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার অভিযোগ উঠলে তিনটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—
- প্রথমত, অভিযোগ কী?
- দ্বিতীয়ত, সেই অভিযোগের ব্যক্তি-নির্দিষ্ট প্রমাণ কী?
- তৃতীয়ত, প্রক্রিয়াটি কি স্বাধীন, ন্যায্য ও reviewable?
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর ছাড়া punishment এবং accountability-এর মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন।
ILO Convention No. 111: রাজনৈতিক মতামতের কারণে চাকরিগত বৈষম্য
বাংলাদেশ ILO Convention No. 111-এর পক্ষভুক্ত। এই Convention কর্মসংস্থান ও পেশার ক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী আন্তর্জাতিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বিশেষ তাৎপর্য হলো—এখানে political opinion কর্মসংস্থান বৈষম্যের নিষিদ্ধ ভিত্তিগুলোর একটি। অর্থাৎ একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক মতামত থাকা এবং সেই মতামতের কারণে তাঁর প্রতি adverse employment treatment করা—এ দুটি আন্তর্জাতিক শ্রমমানের আলোচনায় এক নয়। অবশ্যই কোনো ব্যক্তির proven misconduct থাকলে আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
Convention No. 111 কোনো অপরাধ বা পেশাগত অসদাচরণের দায়মুক্তি দেয় না। কিন্তু misconduct-এর পরিবর্তে political opinion যদি বাস্তবে adverse treatment-এর ভিত্তি হয়, তখন serious discrimination question তৈরি হয়।
ICCPR, ICESCR এবং বিশ্ববিদ্যালয়
International Covenant on Civil and Political Rights-এর আলোচনায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমতা এবং বৈষম্যহীনতার নীতি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে International Covenant on Economic, Social and Cultural Rights কাজের অধিকার, ন্যায্য কর্মপরিবেশ এবং শিক্ষার অধিকারকে গুরুত্ব দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই অধিকারগুলো আলাদা আলাদা বাক্সে থাকে না। একজন শিক্ষককে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বর্জনের অভিযোগ থাকলে সম্ভাব্য chain হতে পারে—
Political labelling
↓
Discriminatory treatment
↓
Restriction of expression/association
↓
Adverse employment action
↓
Academic exclusion
↓
Reduced research and teaching
↓
Institutional damage
↓
Impact on students’ education
এই কারণেই academic freedom-এর প্রশ্নটি একটি isolated labour dispute-এর চেয়ে অনেক বড়।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন নয়—প্রধানত মানবাধিকার আইনের প্রশ্ন
এখানে ভাষাগত একটি সতর্কতা জরুরি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, মব সহিংসতা কিংবা গুরুতর সামাজিক সংঘাত দেখলেই Geneva Conventions বা International Humanitarian Law প্রয়োগ করা সঠিক নয়। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মূলত armed conflict-এর নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কার্যকর। সাধারণ রাজনৈতিক transition, civil unrest কিংবা campus mob violence নিজে থেকেই armed conflict নয়। এখানে একটি আইনি সতর্কতা জরুরি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, মব সহিংসতা কিংবা গুরুতর সামাজিক সংঘাত ঘটলেই Geneva Conventions বা International Humanitarian Law (IHL) প্রয়োগ করা যায় না। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মূলত armed conflict-এর নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কার্যকর। সাধারণ political transition, civil unrest বা campus mob violence নিজে থেকেই armed conflict নয়। অতএব বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত এ ধরনের ঘটনার প্রধান আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণী কাঠামো হওয়া উচিত—
Human Rights Law + International Labour Standards + Academic Freedom Standards
আইনি বিশ্লেষণে এই distinction অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
Institutional Autonomy: বাইরে স্বাধীন, ভেতরে কি স্বাধীন?
বিশ্ববিদ্যালয়ের autonomous status থাকলেই তার অভ্যন্তরীণ decision-making স্বাধীন হবে—এ নিশ্চয়তা নেই।
Institutional capture অন্তত দুইভাবে ঘটতে পারে:
- একটি external capture—যখন রাষ্ট্র, রাজনৈতিক শক্তি বা বহিরাগত গোষ্ঠী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করে।
- অন্যটি internal capture—যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের প্রভাবশালী প্রশাসনিক, শিক্ষক বা ছাত্রগোষ্ঠী institutional mechanisms-কে ideological retaliation-এর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
তাই বিশ্ববিদ্যালয় আইনে autonomous হয়েও সংস্কৃতিতে authoritarian হয়ে উঠতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের প্রকৃত পরীক্ষা হলো বিশ্ববিদ্যালয় কি তার অপছন্দের মতকেও procedural fairness দিতে পারে? —বন্ধুকে ন্যায্যতা দেওয়া সহজ। একটি প্রতিষ্ঠানের চরিত্র বোঝা যায় প্রতিপক্ষের অধিকার রক্ষার সময়।
Transitional Justice বনাম Political Revenge
বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর accountability-এর দাবি স্বাভাবিক এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরিহার্য। অতীতের সহিংসতা, বৈষম্য, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার তদন্ত হওয়া উচিত। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ শোনা উচিত। অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তিও হওয়া উচিত। কিন্তু transitional justice এবং political revenge-এর মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
- Transitional justice ব্যক্তি-নির্দিষ্ট accountability প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
- Political revenge মানুষকে collective identity দিয়ে বিচার করে।
একটি ন্যায্য transitional accountability process-এ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ চিহ্নিত করা, প্রমাণ সংরক্ষণ, স্বাধীন তদন্ত, অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয়ের নিরাপত্তা, পূর্ণ শুনানির সুযোগ, ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ, আনুপাতিক শাস্তি, আপিলের ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে কার্যকর restoration বা remedy থাকা দরকার।—এই প্রক্রিয়াই প্রতিহিংসা ও ন্যায়বিচারের মধ্যে সীমারেখা তৈরি করে।
Comparator Test: রাজনৈতিক বৈষম্য বোঝার আরেকটি উপায়
রাজনৈতিক বৈষম্যের একটি জটিল দিক হলো—কোনো অফিস আদেশে সাধারণত লেখা থাকে না, “আপনাকে আপনার রাজনৈতিক মতামতের কারণে শাস্তি দেওয়া হলো।” —তাই pattern গুরুত্বপূর্ণ।
- একই ধরনের অভিযোগে এক মতাদর্শের শিক্ষক শাস্তি পেলেন, অন্য মতাদর্শের শিক্ষক পেলেন না কেন?
- কাদের বিরুদ্ধে investigation দ্রুত শুরু হচ্ছে?
- কাদের suspension দীর্ঘায়িত হচ্ছে?
- কাদের social-media allegation প্রশাসনিক action-এ রূপ নিচ্ছে?
- কাদের ক্ষেত্রে due process কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে, আর কাদের ক্ষেত্রে নয়?
এই comparator evidence স্বাধীন গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের ন্যায্যতা শুধু একটি মামলায় বোঝা যায় না। Pattern-এও বোঝা যায়।
জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক পুঁজির ক্ষয়
একজন অধ্যাপক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হলে প্রতিষ্ঠান শুধু একটি salary position হারায় না। তার সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়তে পারে দশকের অভিজ্ঞতা, গবেষণা network, doctoral supervision, institutional memory, professional collaboration, specialised expertise, international academic linkage এবং ভবিষ্যৎ গবেষক তৈরির সক্ষমতা। অর্থনীতির ভাষায় এগুলো intellectual capital।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় বহু বছর ধরে একজন অধ্যাপকের মধ্যে যে জ্ঞান, দক্ষতা, network ও institutional memory তৈরি করে, তা রাতারাতি প্রতিস্থাপন করা যায় না। তাই politically motivated academic exclusion যদি বৃহৎ প্রবণতায় রূপ নেয়, তার ফল individual injustice-এর চেয়েও বড়।—রাষ্ট্র তখন নিজেরই বুদ্ধিবৃত্তিক পুঁজি ক্ষয় করে।
একজন শিক্ষক, একটি মঞ্চ এবং নীরব দর্শক
প্রাচীন ট্র্যাজেডির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল—একজন মানুষের ব্যক্তিগত ভাগ্য বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সেই শিক্ষকের কাছে তার নিজের অভিজ্ঞতাকেও কখনো কখনো তেমন একটি দীর্ঘ নাটকের মতো মনে হয়।
- প্রথম অঙ্কে একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পড়াচ্ছেন, গবেষণা করছেন, শিক্ষার্থীদের থিসিস তত্ত্বাবধান করছেন, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন।
- দ্বিতীয় অঙ্কে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়।
- শিক্ষকের পরিচয়ও যেন বদলে দেওয়া হয়। তিনি আর শুধু শিক্ষক নন; তাঁকে একটি রাজনৈতিক প্রতীকে রূপান্তরিত করা হয়।
- তৃতীয় অঙ্কে আসে অভিযোগ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সাইবার আক্রমণ, কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে সরে যাওয়া এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তা।
কিন্তু এই নাটকের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি কোনো একক নায়ক বা খলনায়ক নয়। প্রশাসন চাপের মধ্যে থাকতে পারে। শিক্ষক ভয়ের মধ্যে থাকেন। শিক্ষার্থীরা বিভক্ত হয়। সহকর্মীরা নীরব হয়ে যান। আর বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে হারাতে শুরু করে তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—পারস্পরিক আস্থা।
অপরাধ না করেও অপরাধীর জীবন
সেই শিক্ষকেরকাছে মনে হতে থাকে, তার নিজের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে নির্মম দিক কোনো একক প্রশাসনিক আদেশ নয়; বরং সেই অনুভূতি যে, নিজের বিবেকের কাছে নির্দোষ মনে করেও আমাকে ধীরে ধীরে একজন অপরাধীর মতো জীবনযাপন করতে হয়েছে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের জন্য সবচেয়ে বড় শাস্তি শুধু চাকরি হারানো নয়। তাঁকে তাঁর শ্রেণিকক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন করা, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া, গবেষণার স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের প্রবাহ সংকুচিত করে দেওয়াও গভীর পেশাগত শাস্তিতে পরিণত হতে পারে।
একজন শিক্ষককে নীরব করা মানে কেবল একটি কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা নয়। অনেক সময় এর অর্থ একটি সম্ভাব্য গবেষণা না হওয়া, একটি বই না লেখা, একটি গবেষক-প্রজন্মের ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়া, একটি শ্রেণিকক্ষের গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক না হওয়া।
সেই শিক্ষক চিন্তা করেন, তাঁর ব্যক্তিগত যন্ত্রণা হয়তো একদিন শেষ হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় যদি তার শিক্ষকদের স্বাধীনভাবে পড়ানো, গবেষণা করা এবং শিক্ষার্থী গড়ে তোলার পরিবেশ হারাতে শুরু করে, সেই ক্ষতি বহু বছর থেকে যেতে পারে।
যখন একজন অধ্যাপকের নীরবতা একটি বিশ্ববিদ্যালয়েরও নীরবতায় পরিণত হয়
সেই শিক্ষকের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে নির্মম দিকটি কোনো প্রশাসনিক আদেশ নয়; বরং সেই অনুভূতি যে, তার নিজের বিবেকের কাছে নির্দোষ মনে করলেও ধীরে ধীরে আমাকে একজন অপরাধীর মতো জীবনযাপন করতে হয়েছে। এই অনুভূতির গভীরতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কারণ একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের জন্য সবচেয়ে বড় শাস্তি কারাগার নয়; সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো তাঁকে তাঁর শ্রেণিকক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন করা, তাঁর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া এবং তাঁর চিন্তার জগৎকে সংকুচিত করে দেওয়া।
একজন অধ্যাপককে প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে না দেওয়া, পাঠদান থেকে বিরত রাখা, পরীক্ষা গ্রহণ বা মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করতে না দেওয়া, গবেষণা পরিচালনা করতে না দেওয়া, গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়া কিংবা গবেষণা-শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধান থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া—এসবকে তিনি কেবল ব্যক্তিগত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখি না। সেই শিক্ষকের অভিজ্ঞতায় এগুলো একজন শিক্ষকের পেশাগত অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দুকেই আঘাত করে। কারণ একজন অধ্যাপকের জীবন তাঁর পদবিতে নয়; তাঁর শ্রেণিকক্ষে, গবেষণাগারে, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিদিনের সংলাপে এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টির নিরন্তর প্রচেষ্টায়।
সেই শিক্ষকের কাছে মনে হয়েছে, একজন অধ্যাপককে তাঁর শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া অনেকটা একটি নদীর প্রবাহ থামিয়ে দেওয়ার মতো। নদী তখনও থাকে, কিন্তু তার স্বাভাবিক গতি থাকে না। একজন গবেষক তখনও গবেষক থাকেন, কিন্তু গবেষণার স্বাভাবিক পরিবেশ হারিয়ে ফেলেন। একজন শিক্ষক তখনও শিক্ষক থাকেন, কিন্তু তাঁর সামনে আর কোনো শ্রেণিকক্ষ থাকে না। এই বিচ্ছিন্নতা কেবল পেশাগত নয়; এটি ধীরে ধীরে মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং অস্তিত্বগত বিচ্ছিন্নতায় রূপ নিতে পারে।
অনেক সময় তিনি অনুভব করেছেন, যেন একজন মানুষকে শারীরিকভাবে নয়, তাঁর চিন্তাশক্তিকেই আটকে দেওয়া হচ্ছে। মুক্তভাবে চিন্তা করা, গবেষণার নতুন প্রশ্ন তৈরি করা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিতর্কে অংশ নেওয়া, নতুন ধারণা পরীক্ষা করা—এসবই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্বাভাবিক অংশ। যখন সেই পরিবেশ আর থাকে না, তখন মনে হয় যেন একজন অধ্যাপকের কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। রূপক অর্থে এটি যেন তাঁর গলা চেপে ধরা—যেখানে তিনি কথা বলতে পারেন, কিন্তু তাঁর কথা পৌঁছানোর স্বাভাবিক একাডেমিক পরিসরটি আর থাকে না।
তবে এই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সেই শিক্ষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে শিক্ষার্থীদের। একজন এমফিল বা পিএইচডি গবেষক তাঁর গবেষণার মাঝপথে সুপারভাইজারের ধারাবাহিক দিকনির্দেশনা হারিয়েছেন। শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীরা একটি নির্ধারিত কোর্সে একজন শিক্ষকের অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সম্ভাব্য গবেষণা প্রকল্প শুরু হয়নি। নতুন প্রজন্মের গবেষক তৈরির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান উৎপাদনের যে অদৃশ্য প্রবাহ প্রতিদিন গড়ে ওঠে, তার একটি অংশ থেমে গেছে।
একজন অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে সেটি কখনোই কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা থাকে না। এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ে তাঁর শিক্ষার্থী, গবেষণা-সহযোগী, গবেষণা প্রকল্প, একাডেমিক নেটওয়ার্ক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান-উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর। ফলে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অভিঘাত বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
এই কারণেই সেই শিক্ষক আজও মনে করেন, বিষয়টি একজন ব্যক্তির নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক দর্শনের প্রশ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হলো মুক্ত অনুসন্ধান, যুক্তিভিত্তিক বিতর্ক এবং গবেষণার স্বাধীনতা। যদি কোনো পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষক দীর্ঘ সময় তাঁর মৌলিক একাডেমিক ভূমিকা পালন করতে না পারেন, তাহলে প্রশ্নটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অধিকার নয়; প্রশ্নটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা, জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মান সম্পর্কেও।
সেই শিক্ষক ভাবেন, তার ব্যক্তিগত যন্ত্রণা হয়তো একদিন শেষ হবে। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি তার শিক্ষকদের স্বাধীনভাবে পড়ানো, গবেষণা করা এবং শিক্ষার্থী গড়ে তোলার পরিবেশ হারাতে শুরু করে, তাহলে সেই ক্ষতি বহু বছর ধরে থেকে যেতে পারে। কারণ একজন অধ্যাপককে নীরব করা মানে কেবল একজন মানুষের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করা নয়; অনেক সময় একটি প্রজন্মের সম্ভাব্য জ্ঞান, চিন্তা এবং ভবিষ্যৎকেও সীমাবদ্ধ করে দেওয়া।
বিশ্ববিদ্যালয় কি প্রতিশোধ শেখাবে, না পুনর্মিলন?
বিশ্ববিদ্যালয় জাতির সবচেয়ে পরিণত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হওয়ার কথা। রাষ্ট্রের অন্য অংশে যখন মেরুকরণ থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয় তখন সংলাপের জায়গা হবে। সমাজে যখন ক্রোধ থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয় তখন প্রমাণ চাইবে। রাজনীতিতে যখন slogan থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয় তখন প্রশ্ন করবে।
জনতা যখন দ্রুত verdict চাইবে, বিশ্ববিদ্যালয় তখন বলবে— প্রথমে শুনি। তারপর বিচার করি। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি তার উঁচু ভবনে নয়। তার র্যাঙ্কিংয়ে নয়। তার gate-এ নয়। তার ceremonial speech-এও নয়। তার শক্তি হলো—অপছন্দের মতামতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার সামর্থ্য।
শেষ প্রশ্ন: নির্বাসিত আসলে কে?
কখনো কখনো নিজের অভিজ্ঞতার দিকে তাকিয়ে সেই শিক্ষকের মনে ভাবনার উদয় হয় এবং তখন তিনি নিজের মতো করে ভাবেন—
নির্বাসিত আসলে কে?
সেই শিক্ষক?
সেই শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষ?
সেই শিক্ষকের গবেষণা-শিক্ষার্থীরা?
নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই পুরোনো আদর্শ—যেখানে মতভিন্নতার জন্য একজন মানুষকে ভয় পাওয়ার কথা নয়?
একজন শিক্ষককে ক্যাম্পাস থেকে দূরে রাখা যায়। একটি চেম্বারে তালা দেওয়া যায়। একটি ক্লাস বন্ধ করা যায়।
একজন supervisor-এর নাম পরিবর্তন করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে হাজার পোস্ট লেখা যায়। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি ইতিহাস শেষ পর্যন্ত অন্য একটি প্রশ্ন করবে—এই মানুষটির বিরুদ্ধে অভিযোগ কী ছিল, তার প্রমাণ কী ছিল, এবং বিচারটি কতটা ন্যায্য ছিল?
রাজনৈতিক সময় বদলে যায়।
স্লোগান বদলে যায়।
ক্ষমতার ভাষা বদলে যায়।
কিন্তু ন্যায়বিচারের মৌলিক প্রশ্নগুলো খুব বেশি বদলায় না।
সেই শিক্ষকের মতে তিনি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষের জন্য আলাদা ন্যায়বিচার চাই না।
যে নীতি আজ সেই শিক্ষকের জন্য প্রযোজ্য হলো, সেটিই আগামীকাল তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্যও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
কোনো শিক্ষক যদি অপরাধ করেন—তদন্ত হোক, প্রমাণ হোক, বিচার হোক, শাস্তি হোক। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় যেন অপরাধের বিকল্প প্রমাণ না হয়।
গুজব যেন charge sheet না হয়।
Facebook post যেন tribunal না হয়।
মব যেন disciplinary authority না হয়।
আর ‘সাময়িক’ ব্যবস্থা যেন অনির্দিষ্ট পেশাগত নির্বাসনে পরিণত না হয়।
শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা কোনো র্যাঙ্কিং নয়।
তার পরীক্ষা হলো—ক্ষমতা বদলের পর সে তার ভিন্নমতের মানুষগুলোর সঙ্গে কেমন আচরণ করে।
বিশ্ববিদ্যালয় যদি প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদলে স্মৃতি মুছে নতুন আনুগত্যের তালিকা তৈরি করে, তাহলে সে আর বিশ্ববিদ্যালয় থাকে না।
সে হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রতিধ্বনি।
আর বিশ্ববিদ্যালয় যদি ক্রোধের সময়েও প্রমাণ চায়, প্রতিশোধের সময়েও due process রক্ষা করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার আবেগের মধ্যেও সংখ্যালঘু মতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে—তখনই সে সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে।
সেই শিক্ষকের মনে এখনো রয়েছে সেই বিশ্বাস, তিনি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই এখনো বিশ্বাস করেন।
যেখানে শিক্ষার ভাষা প্রতিশোধ নয়—সংলাপ।
যেখানে অভিযোগের উত্তর গুজব নয়—প্রমাণ।
যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের উত্তর বয়কট নয়—সহাবস্থান।
যেখানে জনতার রায়ের পরিবর্তে থাকে—ন্যায্য প্রক্রিয়া।
আর যেখানে একজন শিক্ষক নিজের শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক ঋতু পরিবর্তনের অপেক্ষা করেন না।
তিনি ফিরে যান তাঁর অধিকারেই।
কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এটি জ্ঞানের স্থান।
আর জ্ঞানের দরজায় স্থায়ী তালা পড়লে, শেষ পর্যন্ত নির্বাসিত হন শুধু একজন শিক্ষক নন—নির্বাসিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই।
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষক #একাডেমিকস্বাধীনতা #শিক্ষকেরঅধিকার #উচ্চশিক্ষা #বিশ্ববিদ্যালয় #রাজনৈতিকপালাবদল #মবজাস্টিস #মবসন্ত্রাস #ভৌতিকঅভিযোগ #ন্যায্যপ্রক্রিয়া #প্রাকৃতিকন্যায়বিচার #আইনেরশাসন #মতপ্রকাশেরস্বাধীনতা #সাইবারহয়রানি #রাজনৈতিকবৈষম্য #পেশাগতনির্বাসন #গবেষণারস্বাধীনতা #শিক্ষারঅধিকার #মানবাধিকার #শিক্ষাসংস্কার #AcademicFreedom #UniversityTeachers #TeachersRights #HigherEducation #HumanRights #DueProcess #NaturalJustice #RuleOfLaw #MobJustice #ChillingEffect #PoliticalDiscrimination #GuiltByAssociation #InstitutionalAutonomy #InstitutionalCapture #ResearchFreedom #FreedomOfExpression #UNESCO1997 #ILO111 #ICCPR #ICESCR #TransitionalJustice #HigherEducationCrisis #OdhikarPatra #AdhikarPatraShikshaSanskarDharabahi

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: