অধিকারপত্র ডটকম
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের মেনিয়ালস কোয়ার্টার বা সুইপার কলোনিতে বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায় ও কর্মচারীদের পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ এবং পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নের সিদ্ধান্ত স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন ১০৮ জন নাগরিক।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রতিবাদলিপিতে তারা এ দাবি জানান।
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে মিটফোর্ড হাসপাতালের মেনিয়ালস কোয়ার্টারে বসবাস করছেন প্রায় ৬০টি পরিবার। এসব পরিবারের জন্য বিকল্প আবাসন বা পুনর্বাসনের কোনো পরিকল্পনা না করেই উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্বাক্ষরকারীরা।
তাদের দাবি, অবিলম্বে উচ্ছেদের নোটিশ কার্যকর স্থগিত করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী ও উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত উচ্ছেদ এবং ভবন অপসারণের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে।
৬০ পরিবারের ৪২ শিক্ষার্থী
প্রতিবাদলিপিতে উল্লেখ করা হয়, ১৮৫৮ সালে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই হরিজন সম্প্রদায়ের সদস্য ও তাদের পরিবারগুলো ওই মেনিয়ালস কোয়ার্টারে বসবাস করে আসছেন।
বর্তমানে সেখানে ৬০টি পরিবার বসবাস করছে। এর মধ্যে চারটি পরিবার মুসলিম। এসব পরিবারের ৪২ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করছে।
এ ছাড়া কলোনির বাসিন্দাদের মধ্যে ৩১ জন সরকারি স্থায়ী চাকরিজীবী, ২৮ জন সরকারি অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী এবং ১৯ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী রয়েছেন বলে প্রতিবাদলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
উচ্ছেদের নোটিশ নিয়ে অভিযোগ
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, গত ৩০ জুলাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি প্রশাসনিক নোটিশ জারি করে ৩০ আগস্টের মধ্যে কলোনির সব বাসিন্দাকে কোয়ার্টার খালি করার চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়।
নোটিশে ৩১ আগস্ট থেকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানিসহ মৌলিক ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ভবন অপসারণের কথা জানানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ—এমন কারণ দেখানো হলেও সেখানে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য কোনো পুনর্বাসন পরিকল্পনা দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন প্রতিবাদলিপির স্বাক্ষরকারীরা।
তারা আরও অভিযোগ করেন, নোটিশ পাওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে বাসিন্দাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে।
‘করোনার সময়ও ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন’
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, হরিজন সম্প্রদায়ের সদস্য ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা সেবার সঙ্গে যুক্ত। করোনা মহামারিসহ বিভিন্ন সংকটের সময় জীবন ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে তারা দায়িত্ব পালন করেছেন।
তবে বর্তমানে বিকল্প আবাসন ও স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই তাদের উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
স্বাক্ষরকারীরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী এসব মানুষকে সাধারণ অবৈধ দখলদার হিসেবে বিবেচনা না করে তাদের দীর্ঘদিনের সেবা, সামাজিক অবস্থান, বিকল্প আবাসনের অনুপস্থিতি এবং মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সংবিধান ও মানবাধিকার নীতির প্রসঙ্গ
প্রতিবাদলিপিতে দাবি করা হয়, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদের উদ্যোগ বাংলাদেশের সংবিধান, সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন নজির এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী।
দীর্ঘদিনের অনুমোদিত বসবাস, হাসপাতালের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেবা প্রদান এবং কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতির কারণে বাসিন্দাদের একটি ন্যায়সংগত প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
যে দাবিগুলো জানানো হয়েছে
প্রতিবাদলিপিতে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের উচ্ছেদ নোটিশ অবিলম্বে স্থগিত করার দাবি জানানো হয়।
একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী ও উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত উচ্ছেদ ও ভবন অপসারণ কার্যক্রম বন্ধ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায়ের সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও আবাসনের অধিকার নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সেই পরিকল্পনায় স্থানীয় হরিজন প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
প্রতিবাদলিপিতে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা নিত্রা, গবেষক মেঘনা গুহঠাকুরতা, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, খুশী কবীর, শিরীন পারভিন হক, মুক্তাশ্রী চাকমা, পাভেল পার্থ, সায়দিয়া গুলরুখ, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, জাকির হোসেন, ড. স্বপন আদনান ও সুরেশ বাসফোরসহ বিভিন্ন পেশা ও সংগঠনের ১০৮ জন নাগরিক স্বাক্ষর করেছেন।
পুনর্বাসন ছাড়া মিটফোর্ডের সুইপার কলোনি উচ্ছেদ বন্ধের দাবি, ১০৮ নাগরিকের প্রতিবাদ
#মিটফোর্ডহাসপাতাল #হরিজনসম্প্রদায় #সুইপারকলোনি #পুনর্বাসন #মিটফোর্ড #উচ্ছেদ #হরিজনকলোনি #মানবাধিকার #অধিকারপত্র
