অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক │ বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম
ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল, ট্যাব ও টেলিভিশনের পর্দায় ডুবে থেকে হারাচ্ছে শৈশবের স্বাভাবিকতা। গবেষণা বলছে—অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম শুধু চোখের ক্ষতি নয়; এটি শিশুদের ঘুম, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক আচরণ, শিক্ষাগত দক্ষতা, সহমর্মিতা ও ভবিষ্যৎ নাগরিকত্বকে গভীর সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। এই বিশ্লেষণধর্মী বিশেষ সম্পাদকীয় ফিচারে উঠে এসেছে ডিজিটাল আসক্তির ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি, পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা, কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক, এবং শিশুদের মানবিক শৈশব ফিরিয়ে আনতে জরুরি শিক্ষা সংস্কার, পিতামাতার সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা।
প্রারম্ভিক স্তবক: আলোর ফাঁদে বন্দি শৈশব
রাত সাড়ে বারোটা। শহরের এক ফ্ল্যাটবাড়ির শিশুটির ঘুমানোর কথা ছিল অনেক আগেই। অথচ সে তখনও ট্যাবের পর্দায় যুদ্ধের গেম খেলছে। মা-বাবা ব্যস্ত নিজেদের মোবাইলে। পরিবার একই ঘরে, কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে নেই। কথোপকথনের জায়গা দখল করেছে নীল আলো। ছোট্ট হাতের মুঠোয় ধরা থাকে এক পুরো দুনিয়া—স্মার্টফোনের মায়াবী আলোয় মুগ্ধ হয়ে ঝুলে থাকে চোখের মণি, শুধু চোখ নয়; বুঁদ হয়ে যায় মন, থমকে যায় কল্পনার ডানা। এ যেন এক নতুন নীরবতা—যেখানে শিশুরা ধীরে ধীরে বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রবেশ করছে ডিজিটাল পর্দার এক অদৃশ্য কারাগারে।
প্রাত্যহিক জীবন জুড়ে এখন এমন দৃশ্য অভ্যাসের মতো। খাওয়ার টেবিলে, আঙিনার দোলনায়, এমনকি ঘুমের বিছানায়—সবখানেই ডিজিটাল পর্দার দাসত্ব। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর এক গবেষণা সেই নীরব সংকটকে স্পষ্ট করে সামনে এনেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ৮৩ শতাংশ স্কুলগামী শিশু আন্তর্জাতিকভাবে সুপারিশকৃত সীমার চেয়ে অনেক বেশি সময় স্ক্রিনে কাটাচ্ছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪.৬ ঘণ্টা তারা মোবাইল, টেলিভিশন, কম্পিউটার, ট্যাব বা গেমিং ডিভাইসে ব্যয় করছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত দিনে মাত্র এক ঘণ্টা। কখনো কি ভেবেছেন, এই স্মার্টফোনের আলো যে শিশুর মনের গহীনে এক অন্ধকারের জন্ম দিচ্ছে? দেশী ও বিদেশী নানা গবেষণা তেড়ে আসা এক সত্যের সামনে দাঁড় করাচ্ছে।
প্রথম স্তবক: স্বাস্থ্যের নীরব বিপর্যয়
পায়ের শব্দ হয় না, চোখ মেলে না, মন নেই—আজকের শিশুরা যেন পর্দার ভিতর বন্দি। গবেষণার তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স সতর্ক করে দিয়েছে, দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিনের সামনে কাটালে শিশুর ঘুমের চক্র অকেজো হয়ে যায়। স্মার্টফোনের নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনকে নষ্ট করে, ফলে ঘুম আসে দেরিতে, সেই ঘুমও অগভীর। আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে মাথাব্যথা, চোখের সমস্যা, ঘুমের ঘাটতি এবং স্থূলতার প্রবণতা বাড়ছে। অনেক শিশুর ঘুম কমে নেমে এসেছে দৈনিক ৭.৩ ঘণ্টায়, যেখানে তাদের প্রয়োজন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে, ঢাকায় প্রতি তিনজনের মধ্যে এক শিশু স্ক্রিনের অতিরিক্ত সংস্পর্শে চোখের শুষ্কতা ও মাথাব্যথার শিকার। সেই সঙ্গে বেড়েছে মেদহীন এক স্থূলতা—পর্দার সামনে বসে থাকা শরীর আর খেলায় না ছুটতে চায়, হজমের সমস্যায় কাঁদে।
আহা, দৃষ্টিভ্রমে ডুবে থাকা এক প্রজন্ম, যাদের হাঁটু দুর্বল, চোখ লাল, আর কাঁধে নামহীন এক অবসাদ। পাশ্চাত্যের জার্নাল ‘ল্যানসেট চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট হেলথ’ নামিয়ে দিয়েছে ভয়াবহ এক তথ্য: পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু যারা দিনে ছয় ঘণ্টা স্ক্রিন দেখে, তাদের দেহকোষে দেখা দিচ্ছে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের পূর্বাভাস। এ যেন ছোট্ট বয়সেই বয়সের ভার।
দ্বিতীয় স্তবক: মানসিকতার গলিতে নেমে আসা সাপ
শিশু মানেই কোলাহল, দৌড়ঝাঁপ, আর বিচিত্র প্রশ্ন। কিন্তু ডিজিটাল সন্তানরা নীরব। মনোবিদরা বলছেন, স্মার্টফোন শিশুকে দেয় তাৎক্ষণিক আনন্দ, আর কেড়ে নেয় সহনশীলতার পাঠ। আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা ধীরে ধীরে একাকী হয়ে পড়ছে। তাদের মনোযোগ কমছে, আচরণে বিরক্তি বাড়ছে, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া কমে যাচ্ছে। বাস্তব খেলাধুলা, গল্প বলা, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে দৌড়ানো—এসব হারিয়ে গিয়ে শিশুর জগৎ সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে স্ক্রিনের ভেতরে। ভারতীয় গবেষক দিলীপ কুমারের নেতৃত্বে ‘এশিয়ান জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি’তে প্রকাশিত গবেষণায় দেখানো হয়েছে, যে শিশু প্রতিদিন তিন ঘণ্টার বেশি অনলাইন গেম বা রিলস দেখে, তার মনোযোগের গড় স্থায়িত্ব মাত্র আট সেকেন্ড। অথচ ক্লাসরুমে শিক্ষকের কথা শুনতে লাগে অন্তত পনেরো মিনিটের ধৈর্য।
শুধু মনোযোগ নয়, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার বিষ বাতাসে মেশে। কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির গবেষণা বলছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘লাইক’ আর ‘কমেন্ট’-এর খামখেয়ালিপনা শিশুদের আত্মসম্মানকে করে ফেলেছে ভঙ্গুর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের এক সমীক্ষা চাঞ্চল্যকর: স্কুলগামী কিশোরদের প্রায় ৪০ শতাংশই স্বীকার করেছে, ফোন না থাকলে অথবা চার্জ না থাকলে তাদের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বেড়ে যায়, হাত কাঁপে—এ আসক্তির নামই ‘নোমোফোবিয়া’। একসময় গ্রামের উঠোনে, মহল্লার মাঠে কিংবা স্কুলের বিরতিতে শিশুরা খেলত গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা কিংবা ফুটবল। এখন সেই মাঠের জায়গা নিয়েছে ভার্চুয়াল যুদ্ধের গেম। শিশুর কল্পনাশক্তি, সামাজিকতা ও সৃজনশীলতা ধীরে ধীরে যান্ত্রিক প্রতিক্রিয়ায় রূপ নিচ্ছে। বাস্তবের মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে যদি ফোনের বন্ধুটি মেসেজ দেয়, তবে মন অকারণে উদাস হয়ে যায়। এই যে মানসিক দ্বিধাবিভক্ত, এটাই আজকের শিশুর রোজকার অভিশাপ।
তৃতীয় স্তবক: শিক্ষা কি হয়ে উঠছে ‘স্ক্রিন নির্ভর মুখস্থ কারখানা’?
এককালে বইয়ের ঘ্রাণ ছিল জ্ঞানের প্রথম পাঠশালা। এখন অক্ষর আর বাক্য মুখস্থ করতে ডিজিটাল ডিভাইস নির্ভরতা তৈরি করেছে এক পঙ্গু শিক্ষাব্যবস্থা। করোনা মহামারির সময় অনলাইন শিক্ষা ছিল জরুরি বাস্তবতা। কিন্তু সেই প্রয়োজনীয়তা এখন অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরতায় পরিণত হয়েছে। স্কুলের পড়া, কোচিং, বিনোদন, এমনকি বন্ধুত্ব—সবকিছুই পর্দাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। ফলে শিশুরা জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে দ্রুত উত্তেজনা ও তাৎক্ষণিক আনন্দে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।
পর্দায় আলোড়ন, অ্যানিমেশন, দ্রুত পাল্টানো ছবি—এসব মিলিয়ে তৈরি হয় ‘ভিজুয়াল স্টিমুলাস’, যা কিনা বাচ্চাকে বাঁধে সেখানে; কিন্তু ‘গভীর পাঠ’ ও ‘বিশ্লেষণী চিন্তা’র পথটি করে তোলে অবরুদ্ধ। ইউনেস্কোর বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহামারি-পরবর্তী সময়ে স্ক্রিননির্ভর শিক্ষায় যেসব শিশু অভ্যস্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে ‘রিডিং কম্প্রিহেনশন’ (পাঠ-বোধ) ১৫ শতাংশ কমে গেছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে , যেসব শিক্ষার্থী গণিত অথবা বিজ্ঞানের সমস্যা সমাধানে ভিডিও দেখেই উত্তর বের করতে অভ্যস্ত, তারা কেন ব্যাখ্যা করতে অক্ষম। অর্থাৎ মুখস্থ দক্ষতা আছে, কিন্তু যুক্তির দোলায় দোল খাওয়ার জ্ঞান নেই। শিক্ষকরা অভিযোগ করছেন, অনেক শিক্ষার্থী এখন ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না; তারা দ্রুত বিরক্ত হয়ে পড়ে এবং বাস্তব শিক্ষার চেয়ে ডিজিটাল বিনোদনে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। দেশের কোনও কোনও অভিজাত স্কুলে ‘ডিজিটাল ক্লাসরুম’-এর নামে ট্যাব দেওয়া হয় শিশুহাতে, কিন্তু শিক্ষক অভিযোগ করেন—অনেক শিশু খেয়াল করে না পাঠ কবে শেষ হলো, বরং গোপনে গেম খেলে। এই যে ‘মাল্টিটাস্কিং’-এর ধ্বংসাত্মক ফাঁদ, এ যেন চরকির মিথ্যে ঘোর, যা আসলে কোনো কাজই ভালোভাবে করায় না। গবেষকেরা বলছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের সঙ্গে শিক্ষাগত দুর্বলতা, উদ্বেগ, হতাশা ও এডিএইচডি-র সম্পর্কও রয়েছে।
চতুর্থ স্তবক: পরিবার হারাচ্ছে ‘মানবিক সংলাপের সংস্কৃতি’, মাঠহীন শহর ও বন্দী শৈশব
শিশুর প্রথম বিদ্যালয় পরিবার। কিন্তু যখন পরিবার নিজেই ডিজিটাল নির্ভর হয়ে পড়ে, তখন শিশুরাও সেই অভ্যাস গ্রহণ করে। এখন অনেক পরিবারে খাওয়ার টেবিলে গল্প হয় না; সবাই ব্যস্ত নিজস্ব পর্দায়। শিশুর কান্না থামাতে হাতে তুলে দেওয়া হয় মোবাইল ফোন। ধীরে ধীরে মোবাইল হয়ে ওঠে শিশুর “ডিজিটাল অভিভাবক”। এটি শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এটি সামাজিক সম্পর্কের কাঠামোগত পরিবর্তন। শিশুরা এখন বাস্তব মানুষের চেয়ে ভার্চুয়াল চরিত্রের সঙ্গে বেশি সময় কাটাচ্ছে। ফলে সহমর্মিতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য ও মানবিক সম্পর্ক গঠনের দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ক্রিন আসক্তির পেছনে বড় কারণগুলোর একটি হলো নিরাপদ খেলার মাঠের অভাব। ঢাকার অধিকাংশ শিশু এখন উন্মুক্ত মাঠ থেকে বঞ্চিত। ফলে তাদের অবসর কাটে স্ক্রিনের সামনে। একটি শিশু প্রকৃতিগতভাবে দৌড়াতে চায়, মাটিতে খেলতে চায়, প্রকৃতিকে ছুঁতে চায়। কিন্তু কংক্রিটের শহর তাকে বন্দী করে রেখেছে ছোট্ট একটি ঘরে, যেখানে তার একমাত্র জানালা হয়ে উঠেছে মোবাইলের স্ক্রিন।
পঞ্চম স্তবক: কারণ—পিতামাতার দায় ও অসচেতনতার জটিল জাল
সংকটের গভীরে গেলে একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরে আসে: কে এত সহজে শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেয়? উত্তর দুঃখজনক—আমরাই, পিতামাতারা। শিশুর কান্না থামাতে, খাওয়াতে, ব্যস্ততার নামে অথবা ‘স্মার্ট’ শিশু গড়ার প্রতিযোগিতায় মোবাইল বর্তমানে সবচেয়ে সহজলভ্য ‘ডিজিটাল প্যাসিফায়ার’। বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা একবাক্যে বলছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইমের পেছনে পিতামাতার ভূমিকা সবচেয়ে বড় অনুঘটক।
- অবহেলা নয়, ব্যস্ততার নামে অজ্ঞতা: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অভিভাবকদের একটি বড় অংশ দীর্ঘ কাজের সময়, নগর জীবনের চাপ, এবং সংসারের নানা দায়দায়িত্বে জর্জরিত। অবসরে যখন সামান্য সময় পান, তখন নিজেরাও ডুব দেন মোবাইলে। এই চিত্রটি সামাজিক গবেষণায় উঠে এসেছে—যে ঘরে মা-বাবা নিজেরা দিনে ৫-৬ ঘণ্টা পর্দায় সময় কাটান, সেখানে শিশুর স্ক্রিনটাইম হওয়ার সম্ভাবনা তিনগুণ বেড়ে যায়। শিশু দেখে, শেখে, অনুকরণ করে। পিতামাতার হাতে ফোন দেখে তার কৌতূহল জাগে, আর সেই কৌতূহলকে নিয়ন্ত্রণ না করলে ধীরে ধীরে তা নেশায় পরিণত হয়।
- ‘অভিভাবকের অজুহাত’ বনাম ‘মনোযোগের অভাব’: অনেক অভিভাবক বলেন, “আমার সন্তান ফোনে পড়ে, গান শেখে, ইংরেজি জানে।” এ এক বিপজ্জনক ভ্রান্ত ধারণা। আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণায় দেখা গেছে, অভিভাবকদের একটি বড় অংশ মনে করেন ডিজিটাল ডিভাইস শিশুর শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু বাস্তবে বেশিরভাগ শিশু সেই সময় শিক্ষামূলক কনটেন্টের বদলে বিনোদনমূলক ও গেমিং কনটেন্ট দেখে। মাত্র ৩০ শতাংশ অভিভাবক সন্তানের স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়টি নিয়মিত মনিটর করেন।
- আরও গভীর কারণ হলো—অনেক অভিভাবকই শিশুর সঙ্গে গল্প করা, সময় কাটানো, খেলাধুলা করা বা প্রকৃতিতে নিয়ে যাওয়ার মতো ‘মানবিক মিথস্ক্রিয়াকে’ অবহেলা করেন। অথচ মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সন্তানের সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ মিনিটের ‘অবিভক্ত পিতামাতার সময়’ দরকার। ফোনের পর্দা সেই জায়গাটি দখল করে নেয়। শিশু যখন বারবার ফোন দেয়, নীরব থাকে, একা থাকতে চায়—সেই প্রথম সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়।
- সামাজিক চাপ ও প্রতিযোগিতার বিষ: শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারে একটি প্রতিযোগিতা দেখা যায়—“আমার ছেলে আইপ্যাড চালায়”, “আমার মেয়ে গুগল থেকে ঘরের কাজ জোগাড় করে”। অর্থাৎ প্রযুক্তি ব্যবহারকে সন্তানের ‘মেধার পরিচায়ক’ ভাবার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষাবিদদের মতে, এটি পশ্চিমা কিছু অভিভাবকশৈলীর অন্ধ অনুকরণ মাত্র। অথচ পশ্চিমের উদারপ্রাণ গবেষকরাও এখন বলছেন, ছয় বছরের নিচে কোনো স্ক্রিন নয়। কিন্তু আমাদের এখানে মোবাইলকে ‘স্মার্ট ন্যানি’ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। অভিভাবকদের জন্য করণীয় হলো প্রথমেই নিজের উদাহরণ তৈরি করা, সন্তানের সঙ্গে প্রতিদিন ‘ডিভাইস-ফ্রি’ সময় কাটানো এবং মোবাইলকে পুরস্কার বা শাস্তির হাতিয়ার না করা।
ষষ্ঠ স্তবক: কারণ—শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা
পিতামাতার দায় যেমন স্পষ্ট, তেমনি দায় এড়াতে পারে না শিক্ষাব্যবস্থা। কারণ, যে স্কুলে শিশু দিনের এক-তৃতীয়াংশ সময় কাটায়, সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি পর্দার প্রতি আসক্তিকে উৎসাহিত করে অথবা চোখ বুঁজে থাকে, তাহলে সংকট আরও গভীর হয়।
- ডিজিটাল বাংলাদেশের নামে ‘অন্ধ ডিজিটালাইজেশন’: সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের অনেক স্কুলেই এখন ‘ডিজিটাল ক্লাসরুম’, ‘মাল্টিমিডিয়া ক্লাস’ বা ‘ট্যাব-ভিত্তিক শিক্ষা’ চালু করা হয়েছে। কিন্তু এর অধিকাংশই সুপরিকল্পিত নয়। স্কুলগুলো প্রায়ই পাহাড়ি মূল্যের ডিভাইস কিনে বসে থাকে, অথচ নেই কোনো ব্যবহারের নীতিমালা—প্রতি ক্লাসে কত মিনিট স্ক্রিন দেখবে, কী কন্টেন্ট দেখাবে, কীভাবে তা পর্যবেক্ষণ করবে, তার কোনো স্পষ্ট গাইডলাইন নেই। শিক্ষকদেরও দেওয়া হয় না প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ। ফলে শিশুটি একাধিক ঘণ্টা প্রজেক্টর বা ট্যাবের পর্দায় অ্যানিমেশন দেখে, যা কিনা দীর্ঘমেয়াদে তার মনোযোগের পরিধি সংকুচিত করে। গবেষণা বলছে, স্কুলে বিনা নিয়মে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার ক্লাসের গতিশীলতা নষ্ট করে এবং শিক্ষার্থীদের প্যাসিভ দর্শকে পরিণত করে। অথচ শিক্ষাব্যবস্থা এখনও এ ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়নি।
- পাঠ্যবই ও মূল্যায়নের রুটিন শিক্ষা: আমাদের পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষাপদ্ধতি মুখস্থ ও নম্বরভিত্তিক। শিশুকে কোনও গভীর জিজ্ঞাসা বা সৃজনশীল চিন্তায় উৎসাহিত করে না। ফলে শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই বাইরের জগতে অল্প পরিশ্রমে বিনোদন খোঁজে, আর ফোনের গেম কিংবা ভিডিও তাকে দেয় সেটা। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যখন বিদ্যালয় শিশুর কৌতূহল মেটাতে ব্যর্থ হয়, তখন ডিজিটাল ডিভাইস ‘পলায়নের পথ’ হয়ে ওঠে। অথচ কয়েকটি বেসরকারি স্কুল ‘প্রজেক্ট ভিত্তিক শিক্ষা’ চালু করলেও তা ব্যাপক নয়।
- স্কুলে ডিজিটাল স্বাস্থ্য শিক্ষার অভাব: শিশুকে কীভাবে সুস্থভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়—এই পাঠ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নেই। ‘ডিজিটাল সাক্ষরতা’ বলতে আমরা বুঝি কম্পিউটার চালানো বা কোডিং শেখানো, কিন্তু কখনো পড়াই না ‘ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং’, অর্থাৎ কখন স্ক্রিন বন্ধ করতে হবে, কীভাবে আসক্তি চিনতে হয়, কীভাবে ভার্চুয়াল জগতের বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচাতে হয়। বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে এই বিষয়ে কোনো পদ্ধতিগত শিক্ষা নেই। শিক্ষকদের নিজেদেরও সেভাবে তৈরি করা হয়নি। একটি জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ শিক্ষক চিরাচরিত পদ্ধতিতে পড়ান, তবে ডিজিটাল স্বাস্থ্য সচেতনতায় তারা প্রায় অপ্রশিক্ষিত।
- বিরক্তিকর ক্লাস বনাম আকর্ষণীয় পর্দা: যেসব শিক্ষক এখনও শুধু ‘ব্ল্যাকবোর্ড-চক’ পদ্ধতিতে পড়ান, তাদের ক্লাস শিশুর কাছে একঘেয়ে ও ক্লান্তিকর মনে হয়। অন্যদিকে ফোনের পর্দায় প্রতি সেকেন্ডে বদলায় রং, শব্দ, ইফেক্ট—এটি শিশুর মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ করে, উৎসাহিত করে ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’কে। শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থা যদি ক্লাসের অভিজ্ঞতাকে আরও ইন্টারঅ্যাকটিভ ও জীবনঘনিষ্ঠ করতে না পারে, তবে পর্দার টান কাটানো মুশকিল। পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার এই ফাঁকা জায়গা পূরণ করছে মোবাইল।
করণীয় শিক্ষাব্যবস্থার জন্য:
- প্রথমত, জাতীয় শিক্ষাক্রমে ‘ডিজিটাল স্বাস্থ্য ও আসক্তি প্রতিরোধ’ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- দ্বিতীয়ত, স্কুলে স্ক্রিন ব্যবহারের বয়সভিত্তিক সময়সীমা ও কন্টেন্টের মান নির্ধারণ করতে হবে।
- তৃতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণে কেবল আইটি দক্ষতা নয়, বরং ডিজিটাল আসক্তি চিহ্নিতকরণ ও কাউন্সেলিং কৌশল শেখানো জরুরি।
- চতুর্থত, বইপড়া ও খেলাধুলাকে যতটা জোর দেওয়া হয়, তার চেয়ে বেশি জোর দিতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে।
- পঞ্চমত, বিদ্যালয়গুলো অভিভাবকদের নিয়ে সচেতনতা সেশন পরিচালনা করতে পারে, যাতে ঘর ও স্কুলে একসূত্রে শিশুকে স্ক্রিনের দাসত্ব থেকে বাঁচানো যায়। শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতায় শিশু প্রতিদিন পর্দার গহ্বরে আরও এক ইঞ্চি তলিয়ে যায়। এই পরিস্থিতি আর টেকসই নয়।
সপ্তম স্তবক: এ অবস্থা চলমান থাকলে জাতির ভবিষ্যৎ কি হবে?
চলতি সংকট যদি এখনই না থামে, তবে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। শিশুরা একদিন বড় হবে, দেশ চালাবে, সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু পর্দার আসক্তিতে পুষ্ট এই প্রজন্ম কি দেশ চালানোর উপযুক্ত থাকবে? গবেষণার বরাত দিয়ে বলতে হচ্ছে, উত্তরটি ভীতিকর।
- শারীরিকভাবে দুর্বল একটি জাতি: অস্ট্রেলিয়ার ‘জার্নাল অব ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি অ্যান্ড হেলথ’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, যেসব শিশু দিনে ৫ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন দেখে, তাদের পেশির শক্তি ও কার্ডিওভাসকুলার ধারণক্ষমতা স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই দুর্বলতা ঘাড়, কোমর ও চোখের জটিলতায় রূপ নেয়। বাংলাদেশ যদি একুশ শতকের মাঝামাঝিতে একটি অসুস্থ, ক্লান্ত ও শারীরিকভাবে অক্ষম যুবশক্তি লাভ করে, তাহলে উৎপাদনশীলতা কোথায় থাকবে? ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও স্থূলতা যাদের শৈশবেই বয়ে বেড়াতে শিখিয়েছে, তারা কখনো স্বাস্থ্যবান নাগরিক হবে না।
- মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ও সামাজিক পতন: সামাজিক সম্পর্কের ভিত গলে যাচ্ছে। শিশুরা বড় হয়ে মানুষকে ‘পর্দার চরিত্র’-এর মতো দেখতে শেখে। সহমর্মিতা লোপ পায়, আবেগ বোঝার ক্ষমতা লোপ পায়। যুক্তরাজ্যের ‘অফকম’ রিপোর্ট অনুযায়ী, অতিরিক্ত স্ক্রিন আসক্ত শিশুরা যখন কৈশোরে পৌঁছায়, তখন তাদের মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণ, সহিংসতা স্বাভাবিক করে ফেলা এবং এমনকী পর্নোগ্রাফির নেশা তৈরি হওয়ার প্রবণতা অস্বাভাবিক হারে বাড়ে। ফলাফল এক সমাজ যে নিজের সদস্যদের ব্যথা অনুভব করতে পারে না, যে একা থেকেও অভ্যস্ত কিন্তু জনতার ভিড়ে অদ্ভুত উদ্বিগ্ন। যে সমাজে কেউ কারও চোখের দিকে তাকাতে চায় না—সেটাই ধীরে ধীরে নির্মম, ঠান্ডা ও বিভক্ত সমাজে পরিণত হয়।
- শিক্ষা ও চাকরির বাজারে ভয়াবহ অযোগ্যতা: গভীরভাবে কিছু বোঝার ক্ষমতা যখন ধ্বংস হয়, তখন সেই প্রজন্ম জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারে না। ‘হার্ভার্ড এডুকেশনাল রিভিউ’-এর এক নিবন্ধ নিদারুণভাবে দেখিয়েছে, ডিজিটাল আসক্তদের ক্রিটিকাল থিংকিং, সমস্যা বিশ্লেষণ ও টিমওয়ার্কের গুণমান ক্রমাগত নিম্নমুখী। তারা ধৈর্য ধরে কোনো বই পড়তে পারে না, লম্বা রিপোর্ট লিখতে পারে না, একটি প্রকল্পের গভীরে যেতে চায় না। ভবিষ্যতের চাকরির বাজার শুধু প্রযুক্তি জানে না, তার দরকার সৃজনশীলতা ও গভীর চিন্তা—যা থাকছে না। তাহলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ কোটি কোটি যুবককে রেখে কী করবে? হতাশা ও বেকারত্বের একটি প্রজন্ম তৈরি হবে, যারা ভার্চুয়াল জগতে পলায়ন ছাড়া অন্য কিছু জানে না।
- নৈতিক ও আবেগিক বধিরতার যুগ: হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, পর্দাভিত্তিক যেকোনো আসক্তির অন্যতম অভিশাপ হলো ‘এমপ্যাথি ডেফিসিট’- সহমর্মিতার অভাব। যারা বাস্তবে ‘লাইক’ আর ‘সাবস্ক্রাইব’-এর ফাঁদে পড়ে, তারা আর বাস্তব কান্না দেখে কাঁদে না। শিশুরা এখন ছোটবেলায় সিরিয়াল কিলারের গেম খেলে বড় হয়, যেখানে রক্ত-হিংসা একটি ‘কৌতুক’। ভবিষ্যতে এই শিশুরা অভিভাবক হবে—তারা নিজেরাই তখন সন্তানকে আবার পর্দার দাস বানাবে, চক্রটি চলতেই থাকবে। সৌমিত্র, পাঁচ বছরের শিশু যাকে আমরা প্রতিবেদনের শুরুতে দেখেছিলাম, একদিন সে বড় হয়ে কেমন পিতা হবে? যদি আজই ফিরে না দাঁড়াই, তাহলে সে পুত্রই পিতার অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে।
অষ্টম স্তবক: শিক্ষা সংস্কারের করণীয়—এখনই সময় নতুন ভাবনার
এই সংকট শুধু পারিবারিক নয়; এটি জাতীয় শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের সংকট। তাই প্রয়োজন সমন্বিত শিক্ষা সংস্কার। গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ অবিলম্বে নেওয়া জরুরি—
- ১. স্কুলে ‘ডিজিটাল সাক্ষরতা’ ও ‘ডিজিটাল শৃঙ্খলা’ শিক্ষা – শিশুদের শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার শেখালে হবে না; প্রযুক্তির সীমা ও ঝুঁকিও শেখাতে হবে। পাঠ্যক্রমে “ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং” অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
- ২. খেলাধুলা ও শিল্প-সংস্কৃতি বাধ্যতামূলক করা – শুধু পরীক্ষামুখী শিক্ষা শিশুকে যন্ত্রে পরিণত করে। খেলাধুলা, সংগীত, নাটক, বিতর্ক, বইপড়া ও প্রকৃতিনির্ভর কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করতে হবে।
- ৩. পরিবারভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি – অভিভাবকদের বুঝতে হবে—মোবাইল কোনো শিশুপালন পদ্ধতি নয়। পরিবারে “ডিভাইস-ফ্রি টাইম” চালু করা যেতে পারে।
- ৪. স্কুলে স্ক্রিন ব্যবহারের নীতিমালা – ডিজিটাল শিক্ষা প্রয়োজনীয় হলেও সীমাহীন নয়। বিদ্যালয়ে বয়সভিত্তিক স্ক্রিন ব্যবহারের নীতিমালা থাকতে হবে।
- ৫. নগর পরিকল্পনায় শিশু-বান্ধব মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান – শিশুরা যদি মাঠ না পায়, তারা পর্দাতেই আশ্রয় নেবে। তাই প্রতিটি নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিশুদের খেলার জায়গা নিশ্চিত করতে হবে।
- ৬. শিক্ষক প্রশিক্ষণে মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি সচেতনতা – শিক্ষকদের এখন শুধু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নয়, বরং ডিজিটাল যুগের শিশুমন বোঝার সক্ষমতাও অর্জন করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশনা দিয়েছে, দুই বছরের কম বয়সী কোনো স্ক্রিন নয়; পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত দিনে এক ঘণ্টা; তারপর প্রয়োজন ভাগ করে দেওয়া। ‘স্ক্রিন ফ্রি’ আওর নির্ধারণ করা—খাবারের সময়, ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে, আর রবিবারের দুপুরে—সন্তানের হাতে ফের দেওয়া যাক রংতুলি, ছড়ার বই, কিংবা ছাদবাগানের মাটি।
নবম স্তবক: পর্দার হিংসা যখন রক্তাক্ত বাস্তব—ডিজিটাল আসক্তি কি তৈরি করছে কিশোর গ্যাং?
শিশুর হাতের স্মার্টফোনটি যেন এক নীরব বিষধর সাপ। এটি ধীরে ধীরে নাড়া দেয় শিশুর কল্পনার জগৎকে, বিনোদনের নামে ঢোকায় হিংস্র সব ছবি, গেমের নামে শেখায় খুন–খারাবির রোমাঞ্চ। গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে এলেও এখন বাংলাদেশের মাটিতেও তার প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। প্রশ্ন হলো—‘পাবজি’ বা ‘ফ্রি ফায়ার’-এর ভার্চুয়াল যুদ্ধ শেষে কখনো কি সেই হিংসা বাস্তব অস্ত্রের মূর্তি ধারণ করে? ডিজিটাল আসক্তি কি কিশোরদের ঠেলে দিচ্ছে গ্যাং সংস্কৃতির অন্ধকার গলিতে?
গেমের গুলি বাস্তবের রক্ত
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কিশোর সপ্তাহে ১৫ ঘণ্টার বেশি হিংসাত্মক ভিডিও গেম খেলে, তাদের মধ্যে বাস্তব জীবনে আগ্রাসী আচরণ প্রদর্শনের প্রবণতা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। শুধু গেম নয়; সোশ্যাল মিডিয়ায় একের পর এক ‘চ্যালেঞ্জ’, ‘প্র্যাঙ্ক’, ছুরি-রামদা নিয়ে ভিডিও—এসব শিশুর মনে তৈরি করে ‘হিংসা স্বাভাবিক’ এই বোধ। মার্কিন মনোবৈজ্ঞানিক ড. ক্রেগ অ্যান্ডারসনের গবেষণা দাবি করে, দীর্ঘমেয়াদী হিংসাত্মক গেম খেলা মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল করটেক্সকে সংকুচিত করে, যে অংশ আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও যুক্তির কাজ করে। ফলে শিশু সামান্য উত্তেজনায় ছুরি তোলা, লাথি মারা, এমনকি দলবদ্ধ মারামারিকে ‘মজা’ ভাবতে শেখে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকটি কিশোর গ্যাংয়ের নাম ওঠেছে সংবাদ শিরোনামে—যাদের অনেক সদস্য স্বীকার করেছে, প্রথমে তারা অনলাইন গেমে ‘ক্ল্যান’ বানিয়ে খেলত, পরে সেই বন্ধন বাস্তবে গ্যাংয়ে রূপ নেয়। প্রতিপক্ষের ‘ভার্চুয়াল কিংডম’ দখলের খেলা শেষে দেখা যায়, প্রতিপক্ষের এলাকায় ইট-পাটকেল ছোড়া, চাঁদা আদায়, এমনকি ছুরিকাঘাতের মতো ঘটনা।
‘লাইক’-এর নেশা থেকে ‘পাওয়ার’-এর নেশা
কৈশোর মানেই নিজেকে প্রমাণ করার এক অস্থির সময়। যেসব শিশু বাস্তবজীবনে সামান্য স্বীকৃতি পায় না—পরীক্ষায় ভালো ফল নেই, খেলায় দক্ষতা নেই, পরিবারের প্রশংসা নেই—তারাই সবচেয়ে বেশি আশ্রয় নেয় ভার্চুয়াল জগতে। সেখানে গেমে ‘লেভেল আপ’ করলে, গ্যাংয়ে ‘লিডার’ হলে মেলে তাৎক্ষণিক মর্যাদা। অস্ট্রেলিয়ার ‘ইয়ুথ স্টাডিজ জার্নাল’-এ প্রকাশিত গবেষণা বলছে, গেম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সহিংস কনটেন্টের নিয়মিত সংস্পর্শে যেসব কিশোর-কিশোরী আসক্ত হয়, তাদের বাস্তব সমাজে অপরাধী চরিত্রের প্রতি আকর্ষণ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ‘শত্রুকে শেষ করা’ যখন অভ্যাস হয়ে যায়, তখন রাস্তার প্রতিপক্ষকেও ‘সেই চরিত্র’ ভেবে আক্রমণ করতে সময় লাগে না।
বাংলাদেশে গবেষণা কী বলে?
সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে, রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ১৫-১৯ বছর বয়সী গ্রেফতারকৃত যুবকদের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশই ঘন্টার পর ঘন্টা হিংসাত্মক গেম কিংবা ইউটিউবের ‘গ্যাংস্টার’ কন্টেন্ট দেখত। অনেকে স্বীকার করে, গেমের মিশন শেষ করতে গিয়ে যেমন অ্যাড্রেনালিন বেড়ে যায়, তেমনই বাস্তবেও ‘মিশন’ পছন্দ করে। শিক্ষাবিদ ও মনোবিদ ড. মেহেরুন্নেসা তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, টানা পাঁচ ঘণ্টা হিংসাত্মক গেম খেললে শিশুর চিন্তন প্রক্রিয়ায় ‘ডিসেনসিটাইজেশন’ (সংবেদনশীলতা হ্রাস) তৈরি হয়—অর্থাৎ বাস্তব রক্ত দেখলে সে আর শিউরে ওঠে না, বরং সেই দৃশ্য ‘গেমের মতো’ লাগে।
কিশোর গ্যাং: অনলাইন ক্ল্যান থেকে সড়ক সন্ত্রাস
খুব সহজেই সম্পর্কটি বোঝা যায়: গেমের ‘ক্রু’ বা ‘ক্ল্যান’ যেভাবে ভিডিও কলে পরিকল্পনা করে, সেভাবেই মেসেঞ্জার বা ডিসকর্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ‘অপারেশন’ ডাকে। ‘টেরিটরি কন্ট্রোল’, ‘বস হত্যা’, ‘সাপ্লাই লুট’—এই শব্দগুলো গেমের ভাষা হলেও ধীরে ধীরে তা বাস্তবের চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারে রূপ নেয়। ভারতের পুণে ও দিল্লিতে ‘পাবজি গ্যাং’ নামে একাধিক কিশোর চক্র ধরা পড়েছে, যাদের অনুপ্রেরণা ছিল সম্পূর্ণ ডিজিটাল। বাংলাদেশও যে সেই পথে হাঁটছে, তার প্রমাণ মিলেছে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রতিক কিশোর সংঘর্ষের ঘটনায়—যেখানে মারামারির আগে টিকটক ও ফেসবুকে ‘গ্যাং ওয়ার’ ঘোষণা করা হয়েছিল।
এ বিপথগামিতা থামাতে কী করা যায়?
- প্রথমত, পিতামাতা ও শিক্ষকদের চোখ এখন কেবল পড়ার টেবিলে নয়—সন্তান কোন গেম খেলছে, কোন ইউটিউব চ্যানেল দেখছে, সেদিকেও সমান সতর্কতা দরকার।
- দ্বিতীয়ত, স্কুলে ‘ডিজিটাল নীতিবোধ’ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা: শিশুকে বোঝাতে হবে পর্দার হিংসা আর রাস্তার হিংসার মধ্যে পার্থক্য।
- তৃতীয়ত, গেম ও অ্যাপে বয়স ভিত্তিক রেটিং কঠোরভাবে মানা এবং অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করা।
- চতুর্থত, যেসব শিশু ইতিমধ্যে আক্রমনাত্মক আচরণ দেখাচ্ছে, তাদের দরকার দরদী কাউন্সেলিং, অবজ্ঞা নয়।
- পঞ্চমত, আইনশৃঙ্খলা সংস্থাকে কিশোর গ্যাংয়ের অনলাইন নেটওয়ার্ক নজরদারি করতে হবে।
কথা সহজ, বাস্তব কঠিন। কিন্তু যদি আজই আমরা শিশুর মোবাইল থেকে ‘হিংসাত্মক গেম’ মুছে না দিই, তাহলে কাল রাস্তায় হয়তো সেই শিশুই অন্য শিশুর রক্ত দিয়ে নাম লেখাবে। গবেষণা বলছে, পর্দার সেই ‘মিশন কমপ্লিট’-এর লাল বোতামটি একসময় বাস্তবের ট্রিগার হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যাতে ‘গেম ওভার’ হয়ে না যায়, সেজন্য এখনই সময় ব্যবস্থা নেওয়ার।
দশম স্তবক: পর্দার নেশা যখন সমাজবিরোধী আচরণে (Antisocial Behavious) রূপ নেয়—গবেষণা ও প্রমাণ কী বলে?
শুধু গ্যাং বা হিংসাত্মক অপরাধ নয়; ডিজিটাল আসক্তির ছোবল অনেক গভীর পর্যন্ত যায়। শিশু ধীরে ধীরে হারায় ‘আমি আর অন্যরা’–এর মধ্যে পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা। সামাজিক আচরণের মৌলিক শিক্ষাটাই যেন মুছে ফেলছে স্মার্টফোন। গবেষকেরা বলছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম শিশুর ‘প্রোসোশ্যাল বিহেভিয়ার’ (যেমন সাহায্য করা, ভাগ করে নেওয়া, সহানুভূতি দেখানো) কমিয়ে দেয় এবং ‘অ্যান্টিসোশ্যাল বিহেভিয়ার’ (মিথ্যা বলা, চুরি করা, বুলিং করা, নিয়ম ভাঙা) বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বের নানা গবেষণা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রমাণ আজ স্পষ্ট সাক্ষ্য দিচ্ছে।
সহমর্মিতা হারানোর নীরব মহামারী
যুক্তরাষ্ট্রের ‘জার্নাল অব পেরেন্টিং’–এ প্রকাশিত এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, ৪ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুরা যারা দিনে তিন ঘণ্টার বেশি স্ক্রিনে সময় কাটায়, তাদের মধ্যে ‘এম্প্যাথি’ বা পরের দুঃখে কষ্ট পাওয়ার ক্ষমতা স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম থাকে। কারণটি সহজ—পর্দা শিশুকে বাস্তব মানুষের মুখোমুখি আবেগ পড়ার সুযোগ দেয় না। কারও কান্না, কারও হাসি, কারও শরীরী ভাষা—এসব স্ক্রিনের দ্বিমাত্রিক জগতে থাকে না। ফলে শিশু শেখে না কিভাবে কারো কষ্টে সাড়া দিতে হয়। বিপরীতে, গেমে ‘শত্রু’কে কিল করলে যে ‘পয়েন্ট’ মেলে, তাতে আনন্দ পায়। ধীরে ধীরে এই ‘উদাসীনতা’ বাস্তবেও কাউকে আঘাত করলে অপরাধবোধ না জাগার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬০ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, গত পাঁচ বছরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘অকারণে দুর্বল সহপাঠীকে উত্যক্ত করা’, ‘কাউকে ক্লাস থেকে আলাদা করে রাখা’ (সাইবার বুলিং–সহ), এবং ‘পরের জিনিস নষ্ট করে আনন্দ পাওয়া’—এসব আচরণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। শিক্ষকদের মতে, দিনে চার ঘণ্টার বেশি ইউটিউব বা গেম দেখে যেসব শিশু, তাদের মধ্যে ক্লাসে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
মিথ্যা ও প্রতারণা: ভার্চুয়াল অভ্যাস বাস্তবের চরিত্রে পরিণত হয়
অনলাইন জগতে শিশুরা প্রায়ই ‘ছদ্মনাম’ বা ‘এভাটার’ ব্যবহার করে। সেখানে তারা অন্য কারও ছবি লাগায়, ভিন্ন বয়স জানায়, মিথ্যা পরিচয় তৈরি করে—সবই ‘মজা’ হিসেবে। কিন্তু গবেষণা বলছে, দীর্ঘদিন এই ‘ডিজিটাল মিথ্যা’ বলা অভ্যাসটি বাস্তব জীবনেও মিথ্যা বলার স্বাভাবিকতা তৈরি করে। ‘ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি’র এক গবেষণায় দেখা যায়, দিনে চার ঘণ্টার বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী কিশোর-কিশোরীরা বাস্তবে বাবা-মা ও শিক্ষকদের কাছে মিথ্যা বলার সম্ভাবনা দ্বিগুণ। কারণ ভার্চুয়াল জগতে কেউ ধরে না, ফলে ‘মিথ্যার কোনও দাম নেই’—এই বোধ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অভিভাবকদের একটি সাধারণ অভিযোগ হলো সন্তান মোবাইলে ঠিক কী দেখছে তা লুকোচ্ছে, মিথ্যা বলছে ‘পড়ছি’ বলে, কিংবা ফোন ভাঙিয়ে দেওয়ার পরে ‘হারিয়ে গেছে’ বলে মিথ্যা কথা বলে। চট্টগ্রামের একটি কাউন্সেলিং সেন্টারের তথ্যমতে, তাদের কাছে অভিভাবকদের আসা প্রায় ৩৫ শতাংশ কিশোরের ক্ষেত্রেই ‘প্যাথলজিক্যাল লাইং’–এর প্রবণতা ধরা পড়েছে, যাদের প্রায় প্রত্যেকেরই মোবাইল আসক্তি ছিল।
চুরি, প্রতারণা ও ‘ডিজিটাল আত্মকেন্দ্রিকতা’
পর্দার আসক্ত শিশুরা প্রায়ই ‘চুরি’ করতে দ্বিধা বোধ করে না—যদি তা ফোন চার্জ, ডেটা প্যাক, কিংবা অভিভাবকের ক্রেডিট কার্ড থেকে গেমের জন্য টাকা নেওয়া হয়। ‘জার্নাল অফ চাইল্ড সাইকোলজি অ্যান্ড সাইকিয়াট্রি’–তে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন আসক্ত শিশুদের মধ্যে ‘বস্তুগত মূল্যবোধ’ মোটা দাগে তৈরি হয়: তারা জানে না টাকা উপার্জনের কষ্ট কী, কিন্তু জানে কীভাবে ‘ফ্রি ফায়ার’-এ ‘ডায়মন্ড’ কিনতে হয়। পরিবারকে প্রতারণা করে, ভাইবোনের পিগি ব্যাংক ভাঙচুর করে, কিংবা অভিভাবকের ওটিপি চুরি করে অনলাইন কেনাকাটা করার উদাহরণ এখন আর বিরল নয়। রাজধানীর একটি থানায় নথিভুক্ত ১৫ বছরের এক কিশোরের ঘটনা: সে তার মায়ের মোবাইল থেকে ব্যাংকের লগইন তথ্য চুরি করে গেমের ‘স্কিন’ কিনেছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা। যখন ধরা পড়ে, তখন তার কোনো অনুশোচনা ছিল না—বরং ক্ষোভ ছিল ‘কেন বাবা-মা আরও টাকা দেয় না’।
নিঃসঙ্গতা, বিদ্রোহ ও আইন অমান্য করার মানসিকতা
কানাডার ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির গবেষক দল তিন বছর ধরে ১৫০০ কিশোরের ওপর গবেষণা করে দেখেন, দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহারকারীদের মধ্যে ‘অথরিটি চ্যালেঞ্জ’ (কর্তৃত্বকে অস্বীকার) ও ‘রুল ব্রেকিং বিহেভিয়ার’ (নিয়ম ভাঙার আচরণ) অন্যদের তুলনায় তিনগুণ বেশি। কারণ ভার্চুয়াল জগতে আইন বলতে কিছু নেই—সব কিছু ‘হ্যাক’ করা যায়, ‘চিট কোড’ ব্যবহার করে বাঁচা যায়। ফলে বাস্তব জীবনের ট্রাফিক সিগন্যাল, ক্লাসের নিয়ম, কিংবা বয়সভিত্তিক আইন—সব যেন তাদের কাছে ‘ফাঁকি দেওয়ার মতো’ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্কুলের শিক্ষক ও মনোবিদরা একমত—যেসব শিশু ‘পাবজি’ বা ‘ফ্রি ফায়ার’-এ অভ্যস্ত, তারা ক্লাসের ‘ড্রেস কোড’ বা ‘মোবাইল নিষিদ্ধ’ নীতি মানতে চায় না। তারা বলে, “ওগুলো বোকামি।” এই বিদ্রোহী মনোভাব ধীরে ধীরে তাদের পরিবারের সঙ্গেও আনা-আদায়ে দেখায়। বাবা-মা’র কথা শোনার বদলে ‘ইগনোর’ করে পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে।
কী করে বোঝাবেন সন্তান বিপদে আছে?
কিছু সতর্কসংকেত রয়েছে: যদি শিশু সারা দিন ফোন ছাড়া থাকতে না পারে, ফোন চার্জ না থাকলে অস্থির হয়ে পড়ে, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে বাস্তব মেলামেশা এড়িয়ে চলে, রাতে ঘুমাতে না চেয়ে পর্দায় ডুবে থাকে, কারও অনুভূতির প্রতি উদাসীন হয়, মিথ্যা বলার ফাঁদ বাঁধে, কিংবা ছোটখাটো চুরি করে—তাহলে বুঝতে হবে এটি শুধু ‘খারাপ অভ্যাস’ নয়, এটি এক ধরনের মানসিক নির্ভরতা ও আচরণগত বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হওয়ার ইঙ্গিত। ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন’ ২০১৮ সালে ‘গেমিং ডিজঅর্ডার’-কে মানসিক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তখনই প্রয়োজন পেশাদার কাউন্সেলরের সাহায্য।
গবেষণার উপাত্ত বলছে, এই আচরণগুলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজে থেমে যায় না—বরং আরও জটিল, আরও কঠিন রূপ ধারণ করে। একবার ‘চুরি’ অভ্যাস হয়ে গেলে তা কৈশোর ও যৌবনে সম্পত্তি অপরাধের পথ তৈরি করে। একবার ‘মিথ্যা’ স্বাভাবিক হয়ে গেলে সারা জীবন সেই মানসিকতা বহন করে। একবার ‘সহমর্মিতাহীনতা’ মাথায় ঢুকে গেলে মানুষ সহজেই অপরাধী হয়ে উঠতে পারে।
সুতরাং এখনই সময় চোখ খোলার। পর্দার পেছনে লুকিয়ে থাকা শিশুটি একদিন সমাজের পেছনে ছুরি নিতে পারে—এমন দুর্দিন ডেকে আনার আগে প্রয়োজন সচেতন পিতামাতা, সজাগ শিক্ষক, ও একটি দায়বদ্ধ রাষ্ট্র। গবেষণা যা স্পষ্ট বলেছে, তা আর উপেক্ষা করার মতো নয়।
উপসংহার: শৈশবকে ফিরিয়ে আনার লড়াই
প্রযুক্তি শত্রু নয়। কিন্তু প্রযুক্তির অসুস্থ ব্যবহার শিশুর শৈশবকে গ্রাস করছে। যে শিশু একসময় গল্প শুনে ঘুমাত, সে এখন স্ক্রিনের আলোয় ঘুমায়। যে শিশু মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়াত, সে এখন ভার্চুয়াল চরিত্রের সঙ্গে যুদ্ধ করে। আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো প্রযুক্তিতে দক্ষ হবে, কিন্তু মানবিকতায় দুর্বল হয়ে পড়বে। শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু “ডিজিটাল বাংলাদেশ” গড়া নয়; বরং “মানবিক বাংলাদেশ” গড়া—যেখানে প্রযুক্তি থাকবে মানুষের নিয়ন্ত্রণে, মানুষ প্রযুক্তির বন্দী হবে না।
গবেষণার এই সতর্কবার্তা তাই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার জন্য সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রের প্রতি এক গভীর আহ্বান। মনে রাখবেন, পর্দার আলো জ্বলে ক্ষণিক, কিন্তু শিশুর হারিয়ে যাওয়া বাল্যকাল ফেরে না আর কখনো।
শেষকথা: ফিরে দেখা, সামনে তাকানো—শৈশব ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার
একটুকু শৈশব আজ পর্দার আলোয় বন্দি। আমরা প্রতিদিন দেখছি সেই বন্দিত্বের চিত্র—চোখের মণিতে ক্লান্তি, মনের গহীনে বিষণ্নতা, আর আচরণে এক অনভ্যস্ত রূঢ়তা। গবেষণা কেবল সংখ্যা আর পরিসংখ্যান দেয়নি; এটি এও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে অতিরিক্ত ডিজিটাল স্ক্রিন শিশুর স্বাস্থ্য, মনন, শিক্ষা, সামাজিকতা ও মূল্যবোধের ভিত গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। আর সেই ভিত যখন দুর্বল হয়, তখন গড়ে ওঠে হিংস্র, অসহমর্মী, আইনহীন এক প্রজন্ম—যারা হয়তো প্রযুক্তিতে দক্ষ, কিন্তু মানবিকতায় পঙ্গু।
অস্বস্তিকর সত্য: কেউ নেই দায়ী নয়
এই প্রতিবেদন জুড়ে বারবার একটি সত্য ফিরে এসেছে: দোষ শুধু শিশুর নয়। পর্দার আসক্তি একটি ‘সিস্টেম ফেলিওর’—যেখানে ব্যর্থ পিতামাতা, ব্যর্থ শিক্ষাব্যবস্থা, ব্যর্থ নগর পরিকল্পনা, এবং ব্যর্থ সামাজিক কাঠামো যৌথভাবে এই সংকট তৈরি করেছে। বাবা-মা যদি সন্তানের হাতে ফোন তুলে দেন নিজের শান্তির জন্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহারে কোনো নীতিমালা না দেয়, শহর যদি শিশুকে খেলার মাঠ না দেয়, সমাজ যদি প্রযুক্তিকে ‘মর্যাদার প্রতীক’ হিসেবেই দেখে—তাহলে শিশুটি কোথায় যাবে? পর্দাই তার শেষ আশ্রয়।
কিন্তু সেই আশ্রয় আজ অভিশাপে পরিণত হয়েছে। গবেষণার প্রতিটি পাতায় লেখা আছে—‘নির্বিকার থেকো না।’ কারণ আজকের ছোট্ট স্ক্রিনাসক্ত শিশুটিই আগামীকালের নিঃসঙ্গ, উদ্বিগ্ন, অসহিষ্ণু যুবক হয়ে উঠতে পারে। আজ সে গেমের চরিত্রকে ‘কিল’ করে আনন্দ পায়; কাল সে রাস্তার প্রতিপক্ষকে ‘মিশন’ ভেবে আঘাত করবে। আজ সে মিথ্যা বলে ফোনের সময় বাড়ায়; কাল সে প্রতারণাকে জীবিকার পথ মনে করবে। আজ সে বন্ধুহীন; কাল সে গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ‘পরিচয়’ খুঁজবে।
ফেরার পথ এখনো শেষ হয়নি তবে হতাশার কারণ নেই। প্রযুক্তি নিজে কোনো দানব নয়, তার অপব্যবহার দানব সৃষ্টি করে। সচেতনতা, ভালোবাসা ও দৃঢ় পদক্ষেপ দিয়ে এই দানবকে ফের খাঁচায় পুরে ফেলা সম্ভব।
- পরিবারপারে ‘ডিভাইস-ফ্রি’ ঘণ্টা চালু করে, সন্তানের সঙ্গে গল্পের আসর বসিয়ে, মাঠে কিংবা প্রকৃতিতে সময় কাটিয়ে। পিতা-মাতা যদি নিজেরা মোবাইল নামিয়ে সন্তানের চোখের দিকে তাকান, তাহলে শিশু বুঝবে—প্রযুক্তির চেয়ে বড় মূল্যবান হলো মানুষের স্পর্শ। ‘কান্না থামানোর যন্ত্র’ নয়, মোবাইল যেন কখনো ‘অভিভাবকের বিকল্প’ না হয়।
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপারে পাঠ্যক্রমে ‘ডিজিটাল সুস্থতা’ অন্তর্ভুক্ত করে, শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে, স্কুলে কঠোর স্ক্রিনটাইম নীতিমালা তৈরি করে। যে বিদ্যালয় শিশুকে বই, খেলাধুলা, কল্পনা ও সৃজনশীলতার স্বাদ দেয়, সেখানকার শিক্ষার্থীরা পর্দার দাসত্বে পড়ে না।
- রাষ্ট্র ও নগর পরিকল্পনাকারীরাপারে শিশুবান্ধব খোলা মাঠ ও সুরক্ষিত উদ্যান তৈরি করে। যেখানে শিশু দৌড়াবে, গোল্লাছুট খেলবে, গল্প বলবে—সেখানে মোবাইলের দরকার পড়বে না। সরকার চাইলে গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে পারে, স্কুলে ডিজিটাল স্বাস্থ্যবিধি বাধ্যতামূলক করতে পারে, এমনকি গেম ও অ্যাপের বয়সভিত্তিক রেটিং কার্যকর করতে পারে।
- প্রতিটি নাগরিকপারে প্রতিবেশীর সন্তানকে বাইরে খেলতে আহ্বান জানিয়ে, নিজের সন্তানকে সময় দিয়ে, আর সামাজিক মাধ্যমের ভুয়া ‘মেধার প্রতিযোগিতা’ বর্জন করে।
চূড়ান্ত প্রতিফলন: অন্ধকার কাটিয়ে আলোয় ফেরা
এই ফিচার প্রতিবেদন কোনো গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের আয়না। পর্দার আলো যতই মোহময় হোক, শৈশব আসলে প্রকৃতির আলোয় ফোটে—মাঠের ঘাসে, ছড়ার বইয়ের পাতায়, বন্ধুর অনর্গল হাসিতে। গবেষণা বারবার বলছে আমরা একটা ক্রিটিক্যাল পয়েন্টে দাঁড়িয়ে। এখন সময় ফিরে দাঁড়ানোর। নইলে হারাবে বর্তমান প্রজন্ম, তারাও হারাবে ভবিষ্যৎ।
মনে রাখবেন, একদিন শিশু জিজ্ঞাসা করবে, “মা, ছোটবেলায় তুমি আমার সঙ্গে খেলতে না কেন?” আজকের উত্তরটা যেন অজুহাতের গোনায় না লেখা হয়। আর দেশ যদি চায় সত্যিকারের ‘সোনার বাংলা’—যেখানে আছে সৃজনশীল, সহমর্মী, সুস্থ, দায়িত্ববান নাগরিক—তাহলে এখনই অঙ্গীকার করতে হবে: ‘পর্দার দাসত্ব নয়, শিশুর মুক্তি চাই।’
পরিশেষে, একটি শিশুর মুখে ফিরিয়ে দিই কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের অমর লাইন—যে শিশু ভুলে গেছে দৌড়াতে, সে হয়তো আজ পর্দার বন্দি; কিন্তু তাকে বলতে চাই, “ওরে ভাই, তোর ভাঙা পথের ক্লান্তি ঘুচে যাক। চলে আয়, চলে আয়।” চলে আসুক শিশুরা পর্দার জেল থেকে খোলা আকাশের নিচে। সেটুকুই আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের দায়, আমাদের শেষ প্রতিফলন।
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#ডিজিটাল_আসক্তি #শিশু_স্বাস্থ্য #স্ক্রিনটাইম #শিক্ষা_সংকট #মানসিক_স্বাস্থ্য #শিশুর_শৈশব #ডিজিটাল_বাংলাদেশ #অভিভাবক_সচেতনতা #ডিজিটাল_ওয়েলবিয়িং #মানবিক_বাংলাদেশ #কিশোর_গ্যাং #সাইবার_আসক্তি #শিশু_মনোবিজ্ঞান #অন্তর্ভুক্তিমূলক_শিক্ষা #অধিকারপত্র #ScreenAddiction #ChildMentalHealth #DigitalWellbeing #EducationCrisis #HealthyChildhood #Parenting #DigitalDiscipline #YouthMentalHealth #SaveChildhood #HumanityFirst
Keywords: ডিজিটাল আসক্তি ও শিশু স্বাস্থ্য, স্ক্রিনটাইম ও মানসিক বিকাশ, শিশুদের শিক্ষা সংকট, কিশোর গ্যাং ও ডিজিটাল হিংসা, ডিজিটাল যুগে পরিবার ও শৈশব
ডিজিটাল আসক্তি ও শিশু স্বাস্থ্য স্ক্রিনটাইম ও মানসিক বিকাশ শিশুদের শিক্ষা সংকট কিশোর গ্যাং ও ডিজিটাল হিংসা ডিজিটাল যুগে পরিবার ও শৈশব অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: