odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 16th July 2026, ১৬th July ২০২৬
রাষ্ট্র যখন পরীক্ষা দেয়: এইচএসসি ১৯৯৪ ও ২০২৬, বিশ্বকাপ আবেগ থেকে জলবায়ু বাস্তবতা — বাংলাদেশের শিক্ষা-প্রশাসন, নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অদৃশ্য সংকট এবং শিক্ষা সংস্কারের নতুন পাঠ

একটি পরীক্ষার আড়ালে রাষ্ট্রের আয়নায় শিক্ষা-ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ও দায়িত্বের নতুন প্রশ্ন: ১৯৯৪-এর বিশ্বকাপ থেকে ২০২৬-এর জলবায়ু সংকট—এইচএসসি, শিক্ষা-শাসন, নেতৃত্ব ও এক প্রজন্মের দীর্ঘযাত্রা

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১৬ July ২০২৬ ১৭:২৮

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১৬ July ২০২৬ ১৭:২৮

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক। এবারের এইচএসসি পরীক্ষা শিক্ষা নেতৃত্বের কাছে প্রত্যাশা

বিশ্বকাপের উন্মাদনায় ১৯৯৪ সালে একবার ুশিকত্ষার্থীদের দাবীর মুখে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তির নির্দেশখনায় এইচএসসি পরীক্ষা এক মাস পিছিয়েছিল; আজ জলবায়ুজনিত দুর্যোগে পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—শিক্ষাব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত নেবে ব্যক্তি, নাকি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান?
এই দৃষ্টিকোন থেকে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা কেবল একটি পাবলিক পরীক্ষার গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা-শাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং এক প্রজন্মের মানসিক যাত্রার প্রতিচ্ছবি। ১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে এইচএসসি পরীক্ষা এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং ২০২৬ সালে প্রবল বর্ষণ, জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার কারণে পরীক্ষা স্থগিতের দাবির মধ্যে রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। একটি ছিল আবেগের প্রশ্ন, অন্যটি নিরাপত্তা, সমতা ও শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের প্রশ্ন। এই বিশ্লেষণধর্মী ফিচারে আলোচিত হয়েছে ২০১৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ২০২৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া একটি প্রজন্মের দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের সংকট, কোভিড-১৯-পরবর্তী শিক্ষাহানি, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা-শাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, শিক্ষা বোর্ডের প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা, জলবায়ু-সংবেদনশীল পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যতের শিক্ষা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—একই ঘটনা কখনোই একই অর্থ বহন করে না। ১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে এইচএসসি পরীক্ষা পিছিয়েছিল; ২০২৬ সালে শিক্ষার্থীরা বিশ্বকাপ চলাকালেই পরীক্ষা দিতে রাজি হয়েছে, কিন্তু আকস্মিক বন্যা, জলাবদ্ধতা ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে নিরাপদে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা চেয়েছে। এই দুই ঘটনার পার্থক্য বুঝতে না পারলে আমরা কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, রাষ্ট্রের শিক্ষা-শাসনকেও ভুলভাবে মূল্যায়ন করব। প্রশ্নটি তাই পরীক্ষা স্থগিত হবে কি হবে না—সেটুকু নয়; বরং প্রশ্ন হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, কতটা মানবিক এবং কতটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সক্ষম।

ইতিহাসের আয়নায় দুই প্রজন্ম: বিশ্বকাপের আবেগ থেকে জলবায়ু বাস্তবতার দিকে

ইতিহাস কখনো সরলরেখায় চলে না। সে কখনো নদীর মতো বয়ে যায়, কখনো বটগাছের শিকড়ের মতো মাটির গভীরে প্রবেশ করে, আবার কখনো একই প্রশ্নকে ভিন্ন সময়ে নতুন অর্থে ফিরিয়ে আনে। বাংলাদেশের এইচএসসি পরীক্ষার ইতিহাসেও এমন দুটি মুহূর্ত রয়েছে, যেগুলো প্রথম দৃষ্টিতে এক রকম মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তাদের দর্শন, প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক তাৎপর্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।

১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় আন্দোলিত। স্যাটেলাইট টেলিভিশন তখনও সবার ঘরে পৌঁছায়নি; কিন্তু ফুটবল ছিল আবেগের ভাষা। ঢাকা কলেজের ছাত্রাবাস থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন অল্প সময়েই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। পরীক্ষার্থীরা যুক্তি দিয়েছিল—বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক ক্রীড়া আয়োজন জীবনে বারবার আসে না; পরীক্ষার সময়সূচি সামান্য সমন্বয় করলে শিক্ষাজীবনের বড় ক্ষতি হবে না। শেষ পর্যন্ত সরকার পরীক্ষা এক মাস পিছিয়ে দেয়। শুধু পরীক্ষা নয়, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং একাডেমিক ক্যালেন্ডারও নতুনভাবে সমন্বিত হয়। রাষ্ট্র তখন একটি সমন্বিত প্রশাসনিক সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছিল।

প্রায় বত্রিশ বছর পর, ২০২৬ সালে, দৃশ্যপট আবারও যেন ফিরে এল। কিন্তু এইবার ইতিহাস একই পোশাক পরে এলেও তার অন্তর্গত চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বকাপ আবারও চলছিল, কিন্তু শিক্ষার্থীরা বিশ্বকাপের কারণে পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার দাবি তোলেনি। বরং তারা ব্যক্তিগত বিনোদনকে পাশে রেখে পরীক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তাদের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল প্রবল বর্ষণ, জলাবদ্ধতা, আকস্মিক বন্যা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং নিরাপদে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর অনিশ্চয়তা। অর্থাৎ আবেগের জায়গায় এসেছে অস্তিত্বের প্রশ্ন; উৎসবের জায়গায় এসেছে নিরাপত্তার প্রশ্ন; আর ব্যক্তিগত আনন্দের জায়গায় এসেছে নাগরিক অধিকার ও সমঅধিকারের প্রশ্ন।

এই পার্থক্য অনুধাবন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো সমাজ যখন নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করে, তখন পুরোনো মানদণ্ড দিয়ে নতুন প্রজন্মকে বিচার করলে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি থাকে। ২০২৬ সালের শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল না আনন্দের জন্য সময় চাওয়া; তাদের দাবি ছিল নিরাপদ ও ন্যায্য পরিবেশে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা। এই দাবি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক নীতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আর এখানেই জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা আমাদের সামনে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা এবং চরম আবহাওয়া এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং শিক্ষা পরিকল্পনার স্থায়ী উপাদান। অতএব, প্রশ্নটি আর কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র-পরিকল্পনারও প্রশ্ন।

এই বাস্তবতায় একটি রাষ্ট্রের শক্তি নির্ধারিত হয় শুধু কত দ্রুত পরীক্ষা নেওয়া গেল, তা দিয়ে নয়; বরং কত মানবিকভাবে, কত বৈজ্ঞানিকভাবে এবং কত প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতায় সংকট মোকাবিলা করা গেল, তা দিয়ে। কারণ শিক্ষা কেবল সিলেবাস শেষ করার বিষয় নয়; শিক্ষা হলো মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।

অতএব, ১৯৯৪ এবং ২০২৬—দুটি বছরকে পাশাপাশি দাঁড় করালে আমরা দেখি, পরিবর্তিত হয়েছে শুধু সময় নয়; পরিবর্তিত হয়েছে রাষ্ট্র, সমাজ, জলবায়ু এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা। সেই পরিবর্তনের ভাষা বুঝতে পারাই ভবিষ্যৎ শিক্ষা সংস্কারের প্রথম শর্ত।

একটি কোহর্টের দীর্ঘযাত্রা (২০১৪২০২৬): কোভিড, আন্দোলন, দুর্যোগ এক প্রজন্মের মানসিক ইতিহাস

কোনো পরীক্ষার্থীর ফলাফল কেবল তার দুই ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষায় নির্ধারিত হয় না; তার পেছনে থাকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা শিক্ষা-অভিজ্ঞতা, পারিবারিক বাস্তবতা, সামাজিক পরিবেশ, রাষ্ট্রের নীতি এবং ইতিহাসের অনিবার্য অভিঘাত। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ তারা এমন একটি প্রজন্ম, যাদের পুরো শিক্ষাজীবন যেন একের পর এক জাতীয় ও বৈশ্বিক সংকটের ভেতর দিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে।

২০১৪ সালে যারা প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল, তারাই ২০২৬ সালে এসে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। সাধারণভাবে একটি শিশুর জন্য এই সময়টি হওয়ার কথা ছিল শৈশবের আনন্দ, কৈশোরের বিকাশ এবং আত্মবিশ্বাস অর্জনের সময়। কিন্তু এই প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা কখনো দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার অভিঘাত দেখেছে, কখনো বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হতে দেখেছে, আবার সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে কোভিড-১৯ মহামারির মাধ্যমে। তাদের অনেকেই জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষার্থী ছিল; কিন্তু সেই পরীক্ষাই আর অনুষ্ঠিত হয়নি। শ্রেণিকক্ষের নিয়মিত শিক্ষার পরিবর্তে তারা অনলাইন ক্লাস, বিচ্ছিন্নতা, অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘ শিক্ষাহানির মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতাকে কেবল learning loss বা শিক্ষাহানির পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। আন্তর্জাতিক গবেষণায় ধারাবাহিকভাবে দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাবিরতি ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ, হতাশা এবং আত্মবিশ্বাসের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই প্রজন্মের জন্য সমন্বিত মনোসামাজিক সহায়তা (psychosocial support) কাঠামো পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে তারা যখন ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার মতো জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে পৌঁছায়, তখন সামান্য অনিশ্চয়তাও তাদের কাছে অনেক বড় মানসিক চাপ হিসেবে অনুভূত হওয়া স্বাভাবিক।

এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এই প্রজন্মের বেড়ে ওঠা হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন নাগরিক অংশগ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সম্মিলিত দাবি উত্থাপন তাদের সামাজিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠেছে। তারা দেখেছে, বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে মানুষ সংগঠিত হয়, মত প্রকাশ করে এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করে। ফলে কোনো সংকট দেখা দিলে তাদের মধ্যে সম্মিলিতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ বা দাবি তোলার প্রবণতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এটিকে কেবল ‘আন্দোলনপ্রিয়তা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে তরুণ সমাজের মনস্তত্ত্বকে সরলীকরণ করা হয়। বরং এটি একটি collective agency—অর্থাৎ সম্মিলিতভাবে নিজেদের উদ্বেগ প্রকাশের সামাজিক সক্ষমতারও বহিঃপ্রকাশ।

এই বিষয়টি বোঝার জন্য ১৯৯৪ সালের সঙ্গে ২০২৬ সালের একটি তুলনা আবারও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৪ সালে পরীক্ষার্থীরা বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ চেয়েছিল। ২০২৬ সালের শিক্ষার্থীরা বিশ্বকাপকে প্রাধান্য দেয়নি; বরং দুর্যোগের মধ্যেও পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু যখন বাস্তব পরিস্থিতি এমন হলো যে অনেক অঞ্চলে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোই অনিশ্চিত হয়ে পড়ল, তখন তারা নিরাপদ পরিবেশের দাবি জানাল। এই দুই অবস্থানকে একই মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। প্রথমটি ছিল বিনোদনের সঙ্গে সময় ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন; দ্বিতীয়টি ছিল জীবন, নিরাপত্তা এবং ন্যায্যতার প্রশ্ন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো procedural justice—অর্থাৎ মানুষ সবসময় নিজের পক্ষে সিদ্ধান্ত চায় না; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি ন্যায্য, স্বচ্ছ এবং যুক্তিসংগত হোক, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। অনেক সময় কোনো সিদ্ধান্তের ফল নয়, বরং সেই সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো, কারা ব্যাখ্যা দিল, সংশ্লিষ্টদের কথা কতটা শোনা হলো—এসব বিষয়ই মানুষের আস্থা নির্ধারণ করে। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরিস্থিতিও অনেকাংশে সেই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

যদি শিক্ষার্থীরা অনুভব করে যে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, ভৌগোলিক বৈষম্য এবং দুর্যোগজনিত ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাহলে তারা কঠিন সিদ্ধান্তও সহজে মেনে নিতে পারে। কিন্তু যদি মনে হয় তাদের অভিজ্ঞতা উপেক্ষিত হয়েছে, তাহলে আস্থার সংকট তৈরি হয়। আধুনিক শিক্ষা-শাসনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই—শুধু সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়; বরং এমনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া, যাতে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী সেটিকে ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত বলে বিশ্বাস করতে পারে।

এই প্রজন্মকে তাই কেবল পরীক্ষার্থী হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তারা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। তাদের শৈশব কোভিডে থেমেছে, কৈশোর সামাজিক অস্থিরতায় কেটেছে, আর উচ্চমাধ্যমিকের দ্বারপ্রান্তে এসে তারা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে তাদের মানসিক বাস্তবতা বোঝা ছাড়া তাদের আচরণ বোঝা সম্ভব নয়।

একটি জাতির শিক্ষানীতি তখনই পরিণত হয়, যখন সেটি কেবল পাঠ্যসূচি বা পরীক্ষার সময়সূচি নয়, শিক্ষার্থীদের মানবিক অভিজ্ঞতাকেও নীতিনির্ধারণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। ২০২৬ সালের এইচএসসি আমাদের সেই শিক্ষা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

শিক্ষা-শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও জলবায়ু-সংবেদনশীল পরীক্ষাব্যবস্থা: ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান কেন গুরুত্বপূর্ণ

একটি রাষ্ট্রকে চেনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় তার সংকট মোকাবিলার ধরন। শান্ত সময়ে প্রায় সব প্রশাসনিক কাঠামোই কার্যকর বলে মনে হয়; কিন্তু দুর্যোগ, মহামারি বা জাতীয় সংকটের মুহূর্তে বোঝা যায়—রাষ্ট্রটি ব্যক্তি-নির্ভর, নাকি প্রতিষ্ঠান-নির্ভর। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষাকে ঘিরে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তাই কেবল একটি পরীক্ষার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি আমাদের শিক্ষা-শাসনের (Educational Governance) প্রকৃতি সম্পর্কে একটি গভীর প্রশ্নও উত্থাপন করেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক নীতি হলো—যে প্রতিষ্ঠানের যে আইনগত দায়িত্ব, সেই প্রতিষ্ঠানকেই সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ব্যাখ্যা প্রদান এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা (institutional role) এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা এক নয়। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নীতিনির্ধারণ, বাস্তবায়ন, কারিগরি মূল্যায়ন এবং জন-যোগাযোগ—এই চারটি স্তর পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হলেও তারা অভিন্ন নয়। এই বিভাজনই প্রশাসনের দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি।

বাংলাদেশে এইচএসসি পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা বোর্ডগুলোর। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সময়সূচি নির্ধারণ, পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং ফলাফল প্রকাশ—সবই তাদের প্রাতিষ্ঠানিক এখতিয়ারের অংশ। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এই প্রক্রিয়াকে সমন্বয় করে, আর প্রশাসনিকভাবে মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সহযোগিতা করে। ফলে দুর্যোগ, পরীক্ষা স্থগিত, বিকল্প সময়সূচি কিংবা পরীক্ষা পরিচালনার মতো কারিগরি বিষয়ে জনসমক্ষে ব্যাখ্যা যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকেই আসে, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিকভাবে নয়, গণতান্ত্রিকভাবেও অধিক গ্রহণযোগ্য হয়।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন। এটি কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট পদধারীর সমালোচনার প্রশ্ন নয়। বরং এটি একটি প্রশাসনিক নীতির প্রশ্ন। কারণ ব্যক্তি বদলায়, সরকার বদলায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে। রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা ব্যক্তির জনপ্রিয়তার ওপর নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা, আস্থা এবং জবাবদিহির ওপর নির্ভর করে। যদি প্রতিটি সংকটে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়কেই প্রতিটি কারিগরি বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হয়, তাহলে ধীরে ধীরে মধ্যবর্তী প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। প্রশাসনের ভাষায় একে বলা যায় institutional erosion—প্রতিষ্ঠানের ধীরে ধীরে কার্যকর ভূমিকা হারিয়ে ফেলা।

এই প্রবণতা কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশে অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ (Centralization) প্রশাসনের একটি দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ। সিদ্ধান্ত যত উপরের স্তরে কেন্দ্রীভূত হয়, তত নিচের স্তরের প্রতিষ্ঠানগুলো অপেক্ষমাণ, নিষ্ক্রিয় এবং ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে। ফলে সংকটকালে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ক্ষমতাও কমে যায়। অথচ আধুনিক প্রশাসন ঠিক বিপরীত দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—সিদ্ধান্ত হবে তথ্যভিত্তিক, দায়িত্ব হবে বিকেন্দ্রীভূত এবং জবাবদিহি হবে স্পষ্ট।

শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। শিক্ষা বোর্ড, মূল্যায়ন কর্তৃপক্ষ, BANBEIS, পাঠ্যক্রম বিশেষজ্ঞ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত তথ্যপ্রবাহ না থাকলে কোনো সিদ্ধান্তই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। ২০২৬ সালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে পরীক্ষা শুধু একটি একাডেমিক কার্যক্রম নয়; এটি পরিবহন, আবহাওয়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, জনস্বাস্থ্য এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া।

জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পরীক্ষাব্যবস্থা: নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে শিক্ষানীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হবে জলবায়ু-সংবেদনশীল (climate-responsive) পরিকল্পনা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পরীক্ষা ক্যালেন্ডার মূলত একটি স্থির ঋতুচক্র ধরে পরিকল্পিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। বর্ষাকালের সময়কাল, বৃষ্টিপাতের তীব্রতা, আকস্মিক বন্যা এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো এখন আর ব্যতিক্রম নয়; এগুলো ক্রমেই নিয়মিত ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।

ফলে ভবিষ্যতের পরীক্ষা পরিকল্পনায় শুধুমাত্র একাডেমিক ক্যালেন্ডার নয়, ঝুঁকি বিশ্লেষণ (risk assessment) এবং দুর্যোগ পূর্বাভাস (forecast-based planning)-কেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় পরীক্ষা কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য দুর্যোগের জন্য বিকল্প সময়সূচি, বিকল্প কেন্দ্র, ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা এবং পূর্বনির্ধারিত জরুরি প্রোটোকল প্রস্তুত রাখে। এতে কোনো সিদ্ধান্তকে তাৎক্ষণিক বা আকস্মিক বলে মনে হয় না; বরং জনগণ জানে—সংকট দেখা দিলে কোন নীতি অনুসরণ করা হবে।

বাংলাদেশেও একই ধরনের National Examination Risk Management Framework প্রণয়নের সময় এসেছে। এই কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে—

  • আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগাম পূর্বাভাসের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ জেলার তালিকা;
  • বিকল্প পরীক্ষাকেন্দ্রের পূর্বপ্রস্তুতি;
  • যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অঞ্চলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা;
  • পরীক্ষা স্থগিত বা পুনঃনির্ধারণের সুস্পষ্ট মানদণ্ড;
  • শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য একক তথ্যপ্রদান ব্যবস্থা;
  • এবং শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে নিয়মিত ঝুঁকি-সংক্রান্ত ব্রিফিং।

এতে সিদ্ধান্ত ব্যক্তি-নির্ভর থাকবে না; বরং পূর্বঘোষিত নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।

আস্থা গড়ে ওঠে কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যমে

সংকটকালে রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো জনগণের আস্থা। সেই আস্থা তৈরি হয় কেবল সিদ্ধান্ত দিয়ে নয়; বরং সিদ্ধান্তের ভাষা, সময় এবং ব্যাখ্যার মাধ্যমে। একজন পরীক্ষার্থী যখন দেখে যে তার উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, তার বাস্তব পরিস্থিতিকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিয়মিত তথ্য জানাচ্ছে, তখন অনিশ্চয়তার মধ্যেও সে স্থির থাকতে পারে।

অন্যদিকে তথ্যের ঘাটতি, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য অথবা দেরিতে সিদ্ধান্ত—এসবই গুজব, বিভ্রান্তি এবং সামাজিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে। আধুনিক শিক্ষা-শাসনে তাই risk communication বা ঝুঁকি-যোগাযোগকে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০২৬ সালের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি মৌলিক সত্য আবারও স্পষ্ট করেছে—শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্পষ্ট দায়িত্ববণ্টন এবং মানবিক নীতিনির্ধারণের ভিত্তিতে। ব্যক্তি যত দক্ষই হোন না কেন, একটি দেশের ভবিষ্যৎকে টিকিয়ে রাখতে পারে কেবল এমন প্রতিষ্ঠান, যা সংকটের মধ্যেও পূর্বনির্ধারিত নীতি, পেশাগত সক্ষমতা এবং জনআস্থার ওপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের আগামী অধ্যায় তাই কেবল নতুন পাঠ্যপুস্তক, নতুন পরীক্ষা বা নতুন প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়; বরং এটি এমন একটি শিক্ষা-শাসন নির্মাণের প্রশ্ন, যেখানে প্রতিষ্ঠানই হবে আস্থার কেন্দ্র, ব্যক্তি নয়।

শিক্ষা সংস্কারের নতুন দিগন্ত: আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের করণীয় এবং ভবিষ্যতের পথরেখা

একটি জাতির ইতিহাসে কিছু ঘটনা থাকে, যেগুলো কেবল একটি দিনের সংবাদ নয়; সেগুলো ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা তেমনই একটি ঘটনা। আজ থেকে দশ কিংবা বিশ বছর পরে হয়তো মানুষ মনে রাখবে না কোন দিনে কোন পরীক্ষা স্থগিত হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস মনে রাখবে—বাংলাদেশ কি এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছিল, নাকি এটিকেও অন্য বহু ঘটনার মতো সাময়িক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রেখেছিল।

প্রকৃতপক্ষে, আধুনিক রাষ্ট্রে সংকটকে সফলভাবে মোকাবিলা করার মানে কেবল ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা নয়; বরং সেই সংকটকে ভবিষ্যৎ সংস্কারের উপাদানে রূপান্তর করা। জাপানে ভূমিকম্প, নিউজিল্যান্ডে আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্প, যুক্তরাষ্ট্রে ঘূর্ণিঝড়, অস্ট্রেলিয়ায় দাবানল কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বন্যা—এসব অভিজ্ঞতা শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিবর্তিত করেছে। বহু দেশ এখন Continuity of Education Planning, Disaster-Responsive School Systems এবং Risk-Informed Educational Governance-এর মতো কাঠামো অনুসরণ করছে। এর মূল দর্শন একটাই—শিক্ষা কখনো থেমে থাকবে না; তবে শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার বিনিময়ে শিক্ষা চলতে পারে না।

বাংলাদেশও একই বাস্তবতার মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আগামী কয়েক দশকে আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হবে—এটি এখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। ফলে শিক্ষা পরিকল্পনা আর কেবল একাডেমিক ক্যালেন্ডার নির্ভর থাকতে পারে না; সেটিকে জলবায়ু-সংবেদনশীল, তথ্যনির্ভর এবং পূর্বপ্রস্তুতিমূলক হতে হবে।

শিক্ষা সংস্কারের নতুন দর্শন: দুর্যোগকে ব্যতিক্রম নয়, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা

বাংলাদেশের শিক্ষা পরিকল্পনায় এখনও একটি নীরব অনুমান কাজ করে—স্বাভাবিক পরিস্থিতিই হবে স্থায়ী বাস্তবতা, আর দুর্যোগ হবে ব্যতিক্রম। কিন্তু বাস্তবতা তার উল্টো কথা বলছে। এখন বন্যা, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, নদীভাঙন কিংবা ঘূর্ণিঝড় আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো আমাদের পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুতরাং ভবিষ্যতের শিক্ষা সংস্কারে অন্তত পাঁচটি মৌলিক পরিবর্তন অপরিহার্য বলে মনে হয়:

  • প্রথমত, জাতীয় দুর্যোগ-সংবেদনশীল পরীক্ষা নীতিমালা (National Climate-Responsive Examination Policy) প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এতে আগাম ঝুঁকি বিশ্লেষণ, বিকল্প সময়সূচি, বিকল্প পরীক্ষাকেন্দ্র এবং যোগাযোগ কৌশল পূর্বনির্ধারিত থাকবে।
  • দ্বিতীয়ত, শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। তারা যেন স্বাধীনভাবে তথ্য বিশ্লেষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জনসাধারণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে পারে। শক্তিশালী শিক্ষা বোর্ড মানে শক্তিশালী শিক্ষা-শাসন।
  • তৃতীয়ত, জাতীয় শিক্ষা ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (National Education Risk Observatory) প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা যেতে পারে। আবহাওয়া, দুর্যোগ, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও শিক্ষা-সংক্রান্ত তথ্যকে সমন্বিত করে এটি আগাম সতর্কতা ও নীতিগত সহায়তা দিতে পারে।
  • চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে শিক্ষা নীতির মূলধারায় আনতে হবে। কোভিড-পরবর্তী পৃথিবী আমাদের শিখিয়েছে, মানসিক সুস্থতা বিলাসিতা নয়; এটি শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের জন্য বিদ্যালয় ও কলেজভিত্তিক মনোসামাজিক সহায়তা ব্যবস্থার বিকল্প নেই।
  • পঞ্চমত, ঝুঁকি-যোগাযোগ (Risk Communication)-কে প্রশাসনিক দক্ষতার অংশ করতে হবে। গুজবের যুগে তথ্যই সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা। তাই একটি নির্ভরযোগ্য, একক এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

শিক্ষা কেবল পরীক্ষা নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক চুক্তি

অনেক সময় আমরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেবল পাঠ্যবই, শ্রেণিকক্ষ কিংবা পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। অথচ শিক্ষা তার চেয়েও অনেক বড় একটি সামাজিক চুক্তি। রাষ্ট্র যখন একটি শিশুকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসে, তখন নীরবে একটি প্রতিশ্রুতিও দেয়—"তোমার শেখার অধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা রক্ষা করা হবে।"

এই কারণেই পাবলিক পরীক্ষা কেবল মূল্যায়নের একটি পদ্ধতি নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থারও পরীক্ষা।

যদি কোনো শিক্ষার্থী দুর্যোগের কারণে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারে, তবে প্রশ্নটি কেবল তার ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যের নয়; এটি রাষ্ট্রের সমঅধিকার নিশ্চিত করার সক্ষমতারও প্রশ্ন। যদি কোনো অঞ্চলের শিক্ষার্থী অন্য অঞ্চলের তুলনায় বাস্তবিক অসুবিধার মুখোমুখি হয়, তবে সমতা (Equality) নিশ্চিত করলেই ন্যায়বিচার (Equity) নিশ্চিত হয় না। আধুনিক শিক্ষা-দর্শন আমাদের শেখায়—একই নিয়ম প্রয়োগ করাই সব সময় ন্যায্যতা নয়; বরং ভিন্ন বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীল হওয়াই প্রকৃত ন্যায়।

শিক্ষা নেতৃত্ব বনাম রাজনৈতিক নেতৃত্ব: শিক্ষা-শাসনের সফট পাওয়ার ও হার্ড পাওয়ারের ভারসাম্য

শিক্ষা পরিচালনা এবং রাজনীতি পরিচালনা—দুটি একই রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ হলেও তাদের দর্শন, ভাষা এবং নেতৃত্বের প্রকৃতি এক নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রধান কাজ হলো জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করা, নীতি নির্ধারণ করা, সম্পদ বরাদ্দ করা এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা প্রদান। অন্যদিকে শিক্ষা নেতৃত্বের কাজ অনেক বেশি জ্ঞাননির্ভর, প্রক্রিয়াভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদি। শিক্ষা কোনো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সাফল্যের প্রকল্প নয়; এটি একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার ধীর, ধারাবাহিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। ফলে শিক্ষা-শাসনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা যেমন অপরিহার্য, তেমনি শিক্ষা নেতৃত্বের পেশাগত স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও শিক্ষা প্রশাসনের আলোচনায় প্রায়ই Hard Leadership এবং Soft Leadership-এর মধ্যে পার্থক্য টানা হয়। হার্ড নেতৃত্ব মূলত কর্তৃত্ব, প্রশাসনিক ক্ষমতা, আইন, নির্দেশনা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল। সংকটকালে এটি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক। বিপরীতে সফট নেতৃত্ব নির্ভর করে বিশ্বাস, পেশাগত দক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ, বিশেষজ্ঞ মতামত, অংশীদারিত্ব এবং নৈতিক প্রভাবের ওপর। শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে সফট নেতৃত্বই অধিক কার্যকর। কারণ শিক্ষা মানুষের আচরণ, মূল্যবোধ, চিন্তা এবং সামাজিক আস্থা নির্মাণ করে; এগুলো কেবল নির্দেশ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় না, বরং পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।

এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—শিক্ষা-সংক্রান্ত প্রতিটি কারিগরি বিষয় কি সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই ব্যাখ্যা করতে হবে, নাকি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের আইনগত দায়িত্ব অনুযায়ী কথা বলার এবং সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করার সুযোগ দিতে হবে? একটি পরিণত শিক্ষা-শাসনের উত্তর হবে দ্বিতীয়টি। কারণ আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা বোর্ড, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কিংবা অন্যান্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যেকটিরই নির্দিষ্ট আইনগত দায়িত্ব ও পেশাগত এখতিয়ার রয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানের যে কাজ, সেই প্রতিষ্ঠানকেই সেই কাজ করার সুযোগ দেওয়াই সুস্থ প্রশাসনের লক্ষণ। এতে যেমন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তেমনি জবাবদিহিও স্পষ্ট হয়। কোনো সিদ্ধান্তে ভুল হলে তখন দায়িত্বও নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়; আবার সঠিক সিদ্ধান্তের কৃতিত্বও প্রতিষ্ঠান পায়, ব্যক্তি নয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত জাতীয় শিক্ষা-দর্শন নির্মাণ, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের রূপরেখা নির্ধারণ, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, সম্পদ বরাদ্দ এবং শিক্ষা খাতের সামগ্রিক নীতিগত নেতৃত্ব প্রদান। অন্যদিকে শিক্ষা বোর্ড, অধিদপ্তর, মূল্যায়ন কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য বিশেষায়িত সংস্থার কাজ হওয়া উচিত তাদের নিজ নিজ পেশাগত ও কারিগরি দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালন করা। এই ভারসাম্যই আধুনিক Educational Governance-এর অন্যতম মৌলিক ভিত্তি।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বক্তব্যের জন্য অপেক্ষা করা হয়। এর ফলে ধীরে ধীরে মধ্যবর্তী প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাগত আত্মবিশ্বাস, উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে। এটি ব্যক্তি-নির্ভর প্রশাসনকে শক্তিশালী করলেও প্রতিষ্ঠান-নির্ভর রাষ্ট্র গঠনের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে। অথচ একটি পরিণত রাষ্ট্রে শক্তিশালী নেতৃত্বের অর্থ এই নয় যে একজন ব্যক্তি সব বিষয়ে কথা বলবেন; বরং তিনি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন, যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারবে এবং একই সঙ্গে জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে।

বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের ভবিষ্যৎ তাই নতুন পাঠ্যক্রম বা নতুন পরীক্ষা পদ্ধতির ওপর যতটা নির্ভর করছে, তার চেয়ে কম নয় একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি (Institutional Culture) গড়ে তোলার ওপর। আমাদের এমন একটি প্রশাসনিক ও সামাজিক সংস্কৃতি নির্মাণ করতে হবে, যেখানে শিক্ষা নেতৃত্ব হবে জ্ঞানভিত্তিক, প্রতিষ্ঠান হবে সিদ্ধান্তের কেন্দ্র, আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব হবে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রধান পৃষ্ঠপোষক। কারণ ব্যক্তি-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা সাময়িক সাফল্য আনতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই সাংস্কৃতিক রূপান্তর না ঘটলে নীতির পরিবর্তন ঘটতে পারে, কিন্তু শিক্ষা-শাসনের প্রকৃত পরিবর্তন ঘটবে না।

অতি-কথন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের সংস্কৃতি

ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাষ্ট্র ও নাগরিকের যোগাযোগকে অভূতপূর্বভাবে সহজ করেছে। কিন্তু এই সহজলভ্যতার সঙ্গে একটি নতুন চ্যালেঞ্জও যুক্ত হয়েছে—অতি-কথন (overcommunication) এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারের সংস্কৃতি বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বক্তব্যই জনআলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। কাজের চেয়ে ব্যক্তিগত দৃশ্যমানতা (visibility) বা প্রচার (publicity) কখনো কখনো বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এর ফলে যে বিষয়টি মূলত একটি প্রশাসনিক বা কারিগরি প্রশ্ন, সেটিও দ্রুত রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ব্যক্তিগত বিতর্কে রূপ নিতে পারে।

শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিটি শব্দের প্রভাব লক্ষাধিক শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকের ওপর পড়ে। তাই পরীক্ষা, ফলাফল, মূল্যায়ন বা সময়সূচির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে জনসমক্ষে দেওয়া প্রতিটি বক্তব্য অত্যন্ত পরিমিত, তথ্যনির্ভর এবং প্রাতিষ্ঠানিক হওয়া প্রয়োজন। কারণ কোনো অস্পষ্ট মন্তব্য, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা আবেগপ্রসূত ভাষ্য অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে, যা মূল সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে নতুন বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যেই প্রেক্ষাপট হারিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার জন্ম দিতে পারে।

এ কারণেই একটি পরিণত শিক্ষা-শাসন ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ (institutional communication) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষা-সংক্রান্ত কারিগরি সিদ্ধান্ত, সময়সূচি, স্থগিতাদেশ, মূল্যায়ন বা অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড বা আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির আনুষ্ঠানিক বক্তব্যই হওয়া উচিত তথ্যের প্রধান ও সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস। এতে একদিকে যেমন তথ্যের সামঞ্জস্য বজায় থাকে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক, বিভ্রান্তি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যাখ্যার সুযোগও কমে আসে। একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার মূল দায়িত্ব—নীতি নির্ধারণ, সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা সংস্কারের নেতৃত্ব—নিয়ে কাজ করার সুযোগ পায়।

গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রের শক্তি এটাই যে, সেখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানের কণ্ঠস্বরই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও যদি আমরা এমন একটি যোগাযোগ-সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারি, যেখানে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান তার আইনগত দায়িত্ব অনুযায়ী কথা বলবে এবং জনসাধারণ সেই প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্যকেই সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করবে, তবে শিক্ষা-শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। সেই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বিতর্ক কমবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং শিক্ষা প্রশাসনও আরও পরিণত, স্থিতিশীল ও কার্যকর হয়ে উঠবে।

শিক্ষা প্রশাসনে অহং নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা: নীতিনির্ধারণে মানবিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব

শিক্ষা প্রশাসনকে অন্যান্য অনেক প্রশাসনিক খাত থেকে আলাদা করে যে বিষয়টি, সেটি হলো—এখানে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে মানুষ, বিশেষ করে শিশুকিশোর ও তরুণ প্রজন্ম। ফলে শিক্ষা নেতৃত্ব কেবল আইন, বিধি বা প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি সহমর্মিতা, দূরদর্শিতা এবং সামাজিক মনোবিজ্ঞানেরও বিষয়। একজন শিক্ষা প্রশাসকের ব্যক্তিগত অহং (ego) বা অবস্থান রক্ষার প্রবণতা কখনোই নীতিনির্ধারণের প্রধান বিবেচ্য হতে পারে না। বরং বাস্তবতা, তথ্য-উপাত্ত, অংশীজনদের (stakeholders) অভিজ্ঞতা, শিক্ষার্থীদের আবেগ, অভিভাবকদের উদ্বেগ এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্য—এসবকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে রাখতে হয়।

২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের একটি কোহর্ট (cohort) হিসেবে বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ২০১৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া এই শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় নানা ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে কাটিয়েছে। কখনও রাজনৈতিক অস্থিরতা, কখনও সামাজিক আন্দোলন, কখনও দীর্ঘ কোভিড-১৯ মহামারি, কখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, আবার কখনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ—এসবের ফলে তাদের নিয়মিত শ্রেণিশিক্ষা, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি এবং স্বাভাবিক শেখার পরিবেশ বারবার ব্যাহত হয়েছে। অর্থাৎ, তারা একটি ধারাবাহিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম। এই প্রেক্ষাপটে আকস্মিক জলবায়ুজনিত দুর্যোগের সময় যদি নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তির স্বার্থে পরীক্ষা দশ দিন পিছিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন উঠত, তবে সেটিকে কেবল একটি প্রশাসনিক বিলম্ব হিসেবে নয়, একটি মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত হিসেবেও মূল্যায়ন করা যেত।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন উঠে আসে। সেই অতিরিক্ত দশ দিন কি সত্যিই জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতো? নাকি প্রকৃত সমস্যা অন্য কোথাও? বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে এইইচএসসি পরীক্ষার পরে উচ্চশিক্ষায় গমন বা উত্তরণ (transition) প্রক্রিয়াতেই দীর্ঘদিন ধরে উল্লেখযোগ্য সিস্টেম লস (system loss) বিদ্যমান। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফল প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পৃথক ভর্তি বিজ্ঞপ্তি, একাধিক ভর্তি পরীক্ষা, ফলাফল প্রকাশ, মেধাতালিকা, অপেক্ষমাণ তালিকা, বিষয় বণ্টন এবং ভর্তি সম্পন্ন হতে অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস থেকে প্রায় এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ফলে যদি সামগ্রিক একাডেমিক ক্যালেন্ডারকে দক্ষতার সঙ্গে পুনর্বিন্যাস করা যেত—যেমন উত্তরপত্র মূল্যায়নের গতি বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি প্রক্রিয়ায় অধিক সমন্বয়, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ এবং সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা—তাহলে দুর্যোগজনিত দশ দিনের সমন্বয় করা মোটেও অসম্ভব ছিল না। প্রশ্নটি তাই কেবল দশ দিনের নয়; প্রশ্নটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার দক্ষতা ও পরিকল্পনা সক্ষমতার।

একটি পরিণত শিক্ষা প্রশাসন সংকটকে কেবল সময়সূচির সমস্যা হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে একটি whole-of-system planning-এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। যদি একটি মানবিক সিদ্ধান্ত লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ কমাতে পারে এবং একই সঙ্গে দক্ষ প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সেই সময় পরবর্তীকালে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়, তাহলে সেটি দুর্বলতার নয়; বরং শক্তিশালী শিক্ষা-শাসনেরই পরিচয়। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা প্রমাণিত হয় সংকটের সময় কঠোর হওয়ার মাধ্যমে নয়, বরং কখন দৃঢ় হতে হবে এবং কখন মানবিক হতে হবে—এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করার মধ্য দিয়ে।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনকে স্পর্শ করে। তাই এখানে অহংকারের নয়, প্রজ্ঞার; অবস্থান রক্ষার নয়, আস্থা নির্মাণের; এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার নয়, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করাই হওয়া উচিত আমাদের শিক্ষা নেতৃত্বের সর্বোচ্চ অঙ্গীকার।

উপসংহারের আগে: রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শিক্ষা নেতৃত্বের আদর্শ চরিত্র—একজন অভিভাবক, স্থপতি ও প্রতিষ্ঠান-নির্মাতার রূপরেখা

একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শিক্ষা নেতৃত্বের মূল্যায়ন তিনি কতবার সংবাদমাধ্যমে কথা বলেছেন, কতটি সভা করেছেন কিংবা কতটি নতুন প্রকল্প ঘোষণা করেছেন—এসব দিয়ে হয় না। একজন প্রকৃত শিক্ষা নেতার সাফল্য পরিমাপ করা হয় বহু বছর পরে, যখন দেখা যায় তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে, নীতিগুলো এখনো কার্যকর আছে এবং জনগণ এখনো সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখে। একজন রাজনৈতিক নেতা একটি সরকারের সময়কালকে নেতৃত্ব দিতে পারেন; কিন্তু একজন প্রকৃত শিক্ষা নেতা একটি প্রজন্মকে নেতৃত্ব দেন। তাই শিক্ষা নেতৃত্ব মূলত ব্যক্তি-কেন্দ্রিক নয়, উত্তরাধিকার-কেন্দ্রিক (legacy-oriented) নেতৃত্ব।

  • রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শিক্ষা নেতৃত্বের প্রথম ও প্রধান গুণ হওয়া উচিত বিনয় (Humility) কারণ শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে কোনো ব্যক্তি সর্বজ্ঞ নন। একজন শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা সচিব কিংবা অন্য কোনো সর্বোচ্চ শিক্ষা নেতৃত্বকে প্রতিদিনই শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, মনোবিজ্ঞানী, শিক্ষা প্রশাসক, গবেষক, শিক্ষা বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যালয়, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের কাছ থেকে শেখার মানসিকতা রাখতে হয়। অহংকার শিক্ষা প্রশাসনের সবচেয়ে বড় শত্রু; কারণ অহংকার প্রশ্নকে নিরুৎসাহিত করে, সমালোচনাকে ভয় পায় এবং বিকল্প মতকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে। অথচ শিক্ষা বিকশিত হয় প্রশ্ন, সংলাপ এবং নতুন জ্ঞান গ্রহণের মধ্য দিয়ে।
  • দ্বিতীয়ত, একজন শিক্ষা নেতাকে হতে হবে প্রতিষ্ঠান-নির্মাতা (Institution Builder), ব্যক্তি-নির্ভর প্রশাসনের প্রবক্তা নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে এমন একটি প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষা বোর্ড, অধিদপ্তর, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ আইনগত দায়িত্ব স্বাধীনভাবে, দক্ষতার সঙ্গে এবং জবাবদিহিমূলকভাবে পালন করতে পারে। তিনি প্রতিটি বিষয়ে নিজে মুখপাত্র হয়ে উঠবেন না; বরং নিশ্চিত করবেন যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব কণ্ঠস্বর, দক্ষতা ও মর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ শক্তিশালী নেতা সেই নন, যিনি সব কাজ নিজে করেন; শক্তিশালী নেতা তিনি, যিনি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শক্তিশালী করে যান।
  • তৃতীয়ত, একজন শিক্ষা নেতার দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে প্রমাণভিত্তিক (evidence-informed) নীতি আবেগ, তাৎক্ষণিক জনমত বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ দেখে নির্ধারিত হতে পারে না। প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের আগে প্রয়োজন গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত, পাইলট কার্যক্রম, অংশীজনদের মতামত এবং সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ। শিক্ষা একটি পরীক্ষাগার নয়, যেখানে একটি প্রজন্মের ওপর অপরীক্ষিত ধারণা প্রয়োগ করা যায়। একজন দূরদর্শী শিক্ষা নেতা জানবেন—আজকের একটি ভুল নীতির মূল্য হয়তো একটি পুরো প্রজন্মকে দিতে হতে পারে।
  • চতুর্থত, তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে থাকতে হবে সমানুভূতি (Empathy) একটি পাবলিক পরীক্ষার সময় তিনি শুধু প্রশ্নপত্র বা সময়সূচি দেখবেন না; তিনি দেখবেন সেই শিক্ষার্থীর মুখ, যে ভোর থেকে নৌকায় চড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাচ্ছে; সেই অভিভাবকের উৎকণ্ঠা, যিনি বন্যার পানির মধ্যে সন্তানকে নিয়ে পথে নেমেছেন; সেই শিক্ষকের দায়িত্ববোধ, যিনি দুর্যোগের মধ্যেও পরীক্ষা পরিচালনার চেষ্টা করছেন। পরিসংখ্যান তাঁকে তথ্য দেবে, কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা তাঁকে সিদ্ধান্তের মানবিক ভিত্তি দেবে। একজন প্রকৃত শিক্ষা নেতা কখনো সংখ্যার ভেতরে মানুষকে হারিয়ে ফেলেন না।
  • পঞ্চমত, একজন শিক্ষা নেতার সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত নীরব দক্ষতা (Quiet Competence) তিনি প্রতিদিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে চান না; বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে, সমস্যার সমাধান হয় এবং জনগণ আস্থা পায়। নেতৃত্বের লক্ষ্য ব্যক্তিগত দৃশ্যমানতা নয়; নেতৃত্বের লক্ষ্য হলো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। ইতিহাসে অনেক মহান শিক্ষা সংস্কারকের নাম সাধারণ মানুষ জানে না, কিন্তু তাঁদের গড়ে দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো আজও সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
  • সবশেষে, একজন সর্বোচ্চ শিক্ষা নেতার নিজেকে একটি মালীর (gardener) সঙ্গে তুলনা করা উচিত, স্থপতির সঙ্গে নয়। স্থপতি একটি ভবন নির্মাণ করেন; কিন্তু মালী জানেন, গাছকে বড় হতে সময় লাগে। তিনি প্রতিটি পাতাকে টেনে বড় করেন না; বরং মাটি প্রস্তুত করেন, পানি দেন, আগাছা পরিষ্কার করেন, আলো-বাতাস নিশ্চিত করেন। শিক্ষা নেতৃত্বও ঠিক তেমন। একজন শিক্ষা নেতা প্রতিটি শিক্ষার্থীকে নিজে তৈরি করেন না; তিনি এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেন, যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবেই বিকশিত হতে পারে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই নতুন পাঠ্যক্রম, নতুন পরীক্ষা কিংবা নতুন প্রযুক্তি নয়; বরং এমন এক নেতৃত্বের সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড়, প্রচারের চেয়ে কর্ম বড়, ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্ব বড় এবং তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার চেয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ বড় হয়ে ওঠে। সেদিনই আমাদের শিক্ষা-শাসন প্রকৃত অর্থে পরিণত হবে, এবং শিক্ষা হবে কেবল একটি প্রশাসনিক খাত নয়—একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি সভ্যতা নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।

১৯৯৪ থেকে ২০২৬: ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা

এই নিবন্ধের শুরুতে আমরা দুটি সময়কে পাশাপাশি রেখেছিলাম—১৯৯৪ এবং ২০২৬। প্রথমটি ছিল বিশ্বকাপের আবেগের সময়। আর দ্বিতীয়টি জলবায়ু সংকটের সময়। অপরদিকে প্রথমটিতে তরুণেরা সময় চেয়েছিল উৎসবের জন্য, মানসিক বিনোদন। আর এবার দ্বিতীয়টিতে তরুণেরা নিরাপত্তা চেয়েছে ভবিষ্যতের জন্য। —এই দুই ঘটনার পার্থক্য বোঝার মধ্যেই বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের একটি বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে।

আজকের তরুণদের বিচার করার আগে তাদের সময়কে বুঝতে হবে। কারণ তারা এমন এক পৃথিবীতে বেড়ে উঠেছে, যেখানে মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক অস্থিরতা এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তর একসঙ্গে তাদের বাস্তবতাকে নির্মাণ করেছে। তাদের উদ্বেগকে কেবল আবেগ বলে উড়িয়ে দিলে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেব।

শেষকথা: ভবিষ্যতের শিক্ষা কি অতীতের ক্যালেন্ডারে চলতে পারে?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—"সে ছেলে হবে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?"

—রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি একইভাবে প্রযোজ্য। আমরা কি এমন একটি শিক্ষা-ব্যবস্থা নির্মাণ করতে পারব, যেখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান হবে সিদ্ধান্তের কেন্দ্র? যেখানে দুর্যোগ এলে তাৎক্ষণিক বিভ্রান্তির পরিবর্তে পূর্বপ্রস্তুত নীতিমালা কার্যকর হবে? যেখানে শিক্ষা বোর্ড, আবহাওয়া বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করবে? যেখানে শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য, ভৌগোলিক বৈষম্য এবং জলবায়ু বাস্তবতা শিক্ষা পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে?

২০২৬ সালের এইচএসসি আমাদের সামনে কেবল একটি প্রশাসনিক বিতর্ক এনে দেয়নি; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের নতুন ভাষা নির্মাণের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে।

নদীর দেশ বাংলাদেশে শিক্ষা কখনোই নদীর বাস্তবতাকে অস্বীকার করে টিকে থাকতে পারবে না। বর্ষার দেশে শিক্ষাবর্ষকে বর্ষার সঙ্গে কথা বলতে শিখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পরীক্ষাব্যবস্থাকে প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়, বরং অভিযোজনের ভাষা শিখতে হবে। আর শিক্ষা-শাসনকে ব্যক্তি-নির্ভরতা থেকে প্রতিষ্ঠান-নির্ভরতার পথে যাত্রা শুরু করতেই হবে। কারণ শক্তিশালী জাতি গড়ে ওঠে শুধু মেধাবী শিক্ষার্থী দিয়ে নয়; শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক এবং মানক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড়িয়ে।

লেখকের স্পষ্টীকরণ: পাঠকের প্রতি প্রারম্ভিক কথা (Disclaimer)

বাংলাদেশের শিক্ষা ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে এখনো এমন কিছু উপনিবেশিক উত্তরাধিকার সক্রিয়, যেখানে গঠনমূলক সমালোচনা, ভিন্নমত কিংবা নীতিগত প্রশ্নকে অনেক সময় ব্যক্তিগত বিরোধ বা রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। সেই বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন থেকেও একজন শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নীরব থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সেই পেশাগত ও নৈতিক দায়বোধ থেকেই এই নিবন্ধ রচিত হয়েছে। লেখাটির কোনো বিশ্লেষণ, প্রশ্ন বা প্রস্তাব যদি বাংলাদেশের শিক্ষা-শাসন, পরীক্ষাব্যবস্থা কিংবা শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক নীতি-পরিকল্পনায় সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তনেরও অনুঘটক হয়, তবেই এর শ্রম সার্থক বলে বিবেচিত হবে।

এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি, পদধারী, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক পক্ষকে ব্যক্তিগতভাবে সমালোচনা, হেয় বা অভিযুক্ত করা নয়। এটি কোনো দলীয় রাজনৈতিক প্রচারণাও নয়; বরং শিক্ষা নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, দুর্যোগ-সংবেদনশীল পরিকল্পনা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক ও মানবিক বাস্তবতা নিয়ে একটি নীতিভিত্তিক সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ। এখানে উত্থাপিত মতামতগুলো শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, প্রতিষ্ঠানসমূহের ক্ষমতায়ন এবং অংশীজনদের প্রতি অধিক সংবেদনশীল প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রত্যাশা থেকে প্রকাশিত।

১৯৯৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তনের ঘটনাটি ঢাকা কলেজে অধ্যয়নের সময় লেখকের প্রত্যক্ষ ছাত্রজীবনের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার অংশ। সে সময় পরীক্ষার সূচি পুনর্নির্ধারণের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে লেখকসহ বহু শিক্ষার্থী সম্পৃক্ত ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসা বর্তমান সংসদে একজন এমপি সেই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এই ঐতিহাসিক প্রসঙ্গটি উল্লেখ করার উদ্দেশ্য বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে যান্ত্রিক তুলনা টানা নয়; বরং দেখানো যে বৃহৎ পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি বাস্তবতার আলোকে সমন্বয় করা বাংলাদেশে নজিরবিহীন বা প্রশাসনিকভাবে অসম্ভব কোনো বিষয় নয়।

শিক্ষার্থীদের কেবল নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নাগরিক, অংশীজন এবং সংলাপের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। শিক্ষা নেতৃত্বের ভাষা তাই চাপ, বিরোধ বা দূরত্বের নয়; হওয়া উচিত আস্থা, সহমর্মিতা ও বন্ধুত্বের। দুর্যোগপূর্ণ বাস্তবতায় পরীক্ষা দশ দিন পিছিয়ে দিলে রাষ্ট্র বা শিক্ষাব্যবস্থার কোনো অপূরণীয় ক্ষতি হতো—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে পুরো ব্যবস্থার অব্যবহৃত সময়, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফল প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি এবং একাডেমিক রূপান্তরের দীর্ঘসূত্রতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। মানবিক সিদ্ধান্তকে পরবর্তী প্রশাসনিক দক্ষতার মাধ্যমে সমন্বয় করাই একটি সক্ষম শিক্ষা ব্যবস্থার পরিচয়। সুতরাং এই নিবন্ধের মূল আহ্বান বিরোধ সৃষ্টি নয়; বরং শিক্ষা প্রশাসনে অহংকারের পরিবর্তে প্রজ্ঞা, অতি-কথনের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে তাদের পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

লেখক গবেষক:  অধ্যাপক . মাহবুব লিটুশিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#এইচএসসি২০২৬ #HSC2026 # #শিক্ষাসংস্কার #HSC1994 #EducationReform #EducationalGovernance #ClimateEducation #ClimateResilience #MentalHealth #BangladeshEducation #Odhikarpatra #এইচএসসি_পরীক্ষা #শিক্ষাপ্রশাসন #শিক্ষানেতৃত্ব #শিক্ষাশাসন #জলবায়ু__শিক্ষা #দুর্যোগ_ব্যবস্থাপনা #শিক্ষার্থী #মানসিকস্বাস্থ্য #বাংলাদেশের_শিক্ষা #শিক্ষানীতি #পরীক্ষাব্যবস্থা #প্রাতিষ্ঠানিক_জবাবদিহি #শিক্ষাবোর্ড #ClimateAndEducation #ClimateResilientEducation #DisasterManagement #InstitutionalLeadership #EvidenceBasedPolicy #StudentWellbeing #PublicExaminations #EducationAdministration #GoodGovernance

Keywords :
এইচএসসি ২০২৬, HSC 2026 Bangladesh, এইচএসসি ‘১৯৯৪, শিক্ষা সংস্কার, Educational Governance, Educational Leadership, শিক্ষা প্রশাসন, বাংলাদেশ শিক্ষা বোর্ড, পাবলিক পরীক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন ও শিক্ষা, Climate-Responsive Education, দুর্যোগে পরীক্ষা, পরীক্ষা স্থগিত, শিক্ষা নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, শিক্ষা নেতৃত্ব, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা, Mental Health of Students, Cohort Analysis, Education Policy Bangladesh, Higher Secondary Examination Bangladesh.



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: