odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 21st September 2026, ২১st September ২০২৬
দূষণ, পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিক, দখল ও কমে যাওয়া প্রবাহে বুড়িগঙ্গা গভীর সংকটে। অথচ ঢাকার নৌযোগাযোগ, পানি নিষ্কাশন, জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও জলবায়ু সহনশীলতার সঙ্গে এই নদীর ভবিষ্যৎ সরাসরি জড়িত

বুড়িগঙ্গা বাঁচলে ঢাকা বাঁচবে: রাজধানীকে টিকিয়ে রাখতে কটি নদীর নীরব লড়াই

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২০ September ২০২৬ ২৩:৫৮

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২০ September ২০২৬ ২৩:৫৮

অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয় ফিচারদেশ চিন্তা

বুড়িগঙ্গা শুধু ঢাকার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি নদী নয়; এটি রাজধানীর ইতিহাস, নৌযোগাযোগ, প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন, জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য পরিবেশগত নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক গবেষণা সরকারি তথ্য বলছে, শিল্পবর্জ্য, অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিক, দখল, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কম প্রবাহ নদীটির ইকোসিস্টেমকে মারাত্মক চাপে ফেলেছে। কেন বুড়িগঙ্গাকে পুনরুদ্ধার না করলে ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখা আরও কঠিন হবেতার তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ।

সদরঘাটে দাঁড়ালে নদী দেখা যায়, কিন্তু নদীর অসুখ দেখা যায় আরও স্পষ্ট

সদরঘাটে এখনও নৌকা চলে। লঞ্চ ভেড়ে। মানুষ পারাপার হয়। নদীর ওপর দিয়ে পণ্য যায়, মানুষের জীবিকা চলে। দূর থেকে তাকালে মনে হতে পারে—বুড়িগঙ্গা তো আছে। ঢাকা শহরের পাশে তার জলরেখাও আছে। কিন্তু একটু কাছে গেলেই অন্য ছবি।

কোথাও পানির গাঢ় রং, কোথাও ভাসমান প্লাস্টিক, কোথাও ড্রেনের পানি সরাসরি নদীতে পড়ছে। তীরে জমে আছে পলিথিন, বোতল, প্যাকেট ও নানা ধরনের বর্জ্য। বর্ষায় বেশি পানি এসে এসবের কিছু ঢেকে দেয়। শুষ্ক মৌসুমে নদীর অসুস্থতা আবার উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও সমস্যাটির দৃশ্যমানতা এতটাই প্রকট যে ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ইসলামবাগ, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকার বুড়িগঙ্গার তীর থেকে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য ১৫ দিনের মধ্যে সরানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বর সরেজমিন পর্যবেক্ষণে এসব এলাকার বিভিন্ন অংশে তখনও বিপুল বর্জ্য পড়ে থাকার খবর পাওয়া যায়।

এখানেই বুড়িগঙ্গার বর্তমান সংকটের সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিকটি ধরা পড়ে। নদী দূষিত—এটি নতুন খবর নয়। দূষণ রোধে আইন, নির্দেশ, প্রকল্প, অভিযানও নতুন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, দূষণ নদীতে পৌঁছানোর পথ কি সত্যিই বন্ধ হচ্ছে?

বুড়িগঙ্গাকে পরিষ্কার করার অর্থ শুধু নদীর ওপর থেকে ময়লা তুলে নেওয়া নয়। নদীকে বাঁচাতে হলে পুরো শহরের বর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন, শিল্প, খাল, জলাধার, নৌপরিবহন ও ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাকে একসঙ্গে দেখতে হবে। কারণ বুড়িগঙ্গা একটি বিচ্ছিন্ন জলরেখা নয়। এটি একটি ইকোসিস্টেম। আর সেই ইকোসিস্টেম দুর্বল হলে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত ঢাকাকেই দিতে হবে।

বুড়িগঙ্গার জন্ম বিবর্তন: গঙ্গার পুরোনো ধারা থেকে ঢাকার জীবনরেখা

আজ যে বুড়িগঙ্গাকে আমরা ঢাকার দক্ষিণ ও পশ্চিম প্রান্ত ঘেঁষে বয়ে যেতে দেখি, তার ইতিহাস কেবল কয়েক দশক বা কয়েক শতকের নয়। এর জন্ম ও বিবর্তনের গল্প আসলে বাংলাদেশের পুরো বদ্বীপভূমির নদী বদলের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। এই ভূখণ্ডে নদী কোনো স্থির রেখা নয়। পলি জমা, ভাঙন, বন্যা, প্রবাহের শক্তি এবং বৃহত্তর নদীপ্রণালীর পরিবর্তনের কারণে নদী কখনো নতুন পথ তৈরি করেছে, কখনো পুরোনো পথ ছেড়েছে, আবার কখনো এক নদীর শাখা অন্য নদীর প্রধান প্রবাহে পরিণত হয়েছে।—বুড়িগঙ্গাও সেই পরিবর্তনশীল বদ্বীপের সন্তান।

বুড়িগঙ্গানামের ভেতরেই লুকিয়ে আছে তার অতীত

‘বুড়িগঙ্গা’ নামটির সঙ্গে গঙ্গার একটি পুরোনো প্রবাহের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখিত প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রাচীনকালে গঙ্গার একটি প্রবাহ ধলেশ্বরীর মাধ্যমে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে যেত। সময়ের সঙ্গে নদীর গতিপথ বদলে যায় এবং ওই প্রবাহ প্রধান গঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরে সেই পুরোনো গাঙ্গেয় ধারাই ‘বুড়িগঙ্গা’ নামে পরিচিত হয়। অর্থাৎ নামটির অর্থগত ইঙ্গিত অনেকটা পুরোনো গঙ্গাবাবৃদ্ধ গঙ্গাযদিও এটিকে একটি প্রচলিত ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা হিসেবেই দেখা উচিত, নির্দিষ্ট একটি মুহূর্তে নদীটির জন্মের বৈজ্ঞানিক তারিখ হিসেবে নয়।

এখানেই বুড়িগঙ্গার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য ধরা পড়ে। আজ নদীটি সরাসরি গঙ্গার শাখা বলে মনে না হলেও তার পরিচয়ের গভীরে বৃহত্তর গঙ্গা–পদ্মা এবং ধলেশ্বরী নদীপ্রণালীর স্মৃতি রয়েছে।

বাংলাদেশের নদীপ্রবাহের ইতিহাস বুঝতে গেলে মনে রাখতে হয়, এ দেশের বদ্বীপ হাজার বছর ধরে নদীর পথ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। আজ যেখানে নদী নেই, অতীতে সেখানে বড় প্রবাহ থাকতে পারে; আবার বর্তমানের বড় নদী কোনো সময়ে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র জলধারা ছিল। বুড়িগঙ্গার বিবর্তনও এই বৃহত্তর ভূপ্রাকৃতিক গতিশীলতার অংশ।

ধলেশ্বরীর শাখা, তুরাগের পানিতে বর্তমান জীবন

বর্তমান ভৌগোলিক বিবরণে বুড়িগঙ্গার উৎস ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে যুক্ত। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, সাভারের দক্ষিণে—কালাতিয়ার কাছাকাছি—ধলেশ্বরী থেকে বুড়িগঙ্গার প্রবাহের সূচনা। নদীটি ঢাকা শহরের পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আবার ধলেশ্বরীর সঙ্গে মিলেছে। কামরাঙ্গীরচরের কাছে তুরাগ নদী এসে বুড়িগঙ্গায় যুক্ত হয়। বর্তমান সময়ে বুড়িগঙ্গার উল্লেখযোগ্য মূল প্রবাহ তুরাগ থেকেই আসে। অর্থাৎ বুড়িগঙ্গার জীবনচক্র কিছুটা বৃত্তের মতো।

ধলেশ্বরীর সঙ্গে তার জন্মগত সম্পর্ক, মাঝপথে তুরাগের প্রবাহের সংযোগ, এরপর আবার ধলেশ্বরীর সঙ্গে মিলন—এই পুরো ব্যবস্থাটিকে আলাদা আলাদা নদী হিসেবে নয়, একটি সংযুক্ত নদী-নেটওয়ার্ক হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

এই বাস্তবতাই আজকের নদী পুনরুদ্ধারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তুরাগ দূষিত হলে বুড়িগঙ্গা প্রভাবিত হবে। ধলেশ্বরীর প্রবাহ বদলালে বুড়িগঙ্গাও তার প্রভাব অনুভব করবে। সংযোগকারী খাল বা প্রবাহপথ বন্ধ হলে নদীর পানির বিনিময় দুর্বল হবে। তাই শুধু সদরঘাটের পানি পরিষ্কার করে বুড়িগঙ্গাকে সুস্থ করা সম্ভব নয়। নদীর upstream এবং downstream—দুই দিকের জলপ্রবাহকেই বিবেচনায় নিতে হবে।

নদীর মুখ পলি জমে দুর্বল হয়েছে, কিন্তু নিচের ধারা এখনও বেঁচে আছে

বুড়িগঙ্গার বিবর্তনের একটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে তার উজানের সংযোগে। বাংলাপিডিয়ার ভূপ্রাকৃতিক বিবরণ অনুযায়ী, নদীটির বর্তমান উজানের মুখ ছাগলাকান্দি এলাকার কাছে উল্লেখযোগ্যভাবে পলিতে ভরাট হয়েছে এবং প্রধানত বন্যার সময় বেশি সক্রিয় হয়। অন্যদিকে নদীর নিম্নাংশ সারা বছরই খোলা থাকে। ধলেশ্বরীর নিজস্ব গতিপথ পরিবর্তনের কারণে বুড়িগঙ্গার ভাটির সংযোগস্থলও সময়ের সঙ্গে কিছুটা সরে যায়।

এটি বাংলাদেশের বদ্বীপীয় নদীর স্বাভাবিক চরিত্রের একটি উদাহরণ।

নদী শুধু মানুষের দখল বা খননের কারণে পথ বদলায় না; নদীর নিজেরও একটি ভূপ্রাকৃতিক জীবন আছে। পলি পড়ে। চর জাগে। বাঁক তৈরি হয়। কোনো শাখায় প্রবাহ বাড়ে, অন্য শাখায় কমে। কিন্তু প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের তৈরি বাধা যোগ হলে সমস্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রাকৃতিকভাবে পলি জমা একটি বিষয়; সেই প্রবাহপথে দখল, বর্জ্য, অবকাঠামো বা অপরিকল্পিত ভরাট যোগ হওয়া আরেকটি বিষয়।—এই দুই প্রক্রিয়াকে আলাদা করে বোঝা জরুরি।

ঢাকার পাশে এসে নদীটি কেন তুলনামূলক স্থির?

বুড়িগঙ্গার আরেকটি আকর্ষণীয় ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হলো—ঢাকা শহরের পাশের তার প্রবাহপথ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।

এর একটি কারণ মধুপুর গড়ের দক্ষিণ প্রান্তের শক্ত ও পুরোনো মৃত্তিকা। বাংলাপিডিয়ার ব্যাখ্যায়, ঢাকার পাশের বুড়িগঙ্গার গতিপথ এই তুলনামূলক প্রতিরোধী কাদামাটির ভূস্তর দ্বারা অনেকটা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। বৃহত্তরভাবে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী মধুপুর অঞ্চলের প্লাইস্টোসিন উঁচুভূমির দক্ষিণ প্রান্ত নির্দেশ করে।—সহজভাবে বললে, নদীটি যেমন ঢাকাকে গড়ে তুলেছে, তেমনি ঢাকার ভূপ্রকৃতিও নদীটির পথকে আকার দিয়েছে।

এই পারস্পরিক সম্পর্ক কয়েক শত বছর ধরে শহর ও নদীকে পাশাপাশি রেখেছে।

কামরাঙ্গীরচরও বলে নদী যে কখনো স্থির নয়

আজকের কামরাঙ্গীরচরকে আমরা ঘনবসতিপূর্ণ নগরভূমি হিসেবে দেখি। কিন্তু এর ভূপ্রাকৃতিক ইতিহাস বুড়িগঙ্গার প্রবাহ পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত।

ঢাকার ঐতিহাসিক বিবরণে দেখা যায়, উনিশ শতকে বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে ধীরে ধীরে চর জেগে উঠছিল। ১৮৫৯ সালের একটি মানচিত্রে ওই অঞ্চলের অংশ ‘চর বাগচাঁদ’ এবং পশ্চিমাংশ ‘চর কামরাঙ্গী’ নামে চিহ্নিত ছিল। বুড়িগঙ্গার একটি বড় বাঁক ও প্রবাহপথের পরিবর্তনের সঙ্গে এই নতুন ভূমি সৃষ্টির সম্পর্ক ছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ আমরা আজ যে শহুরে ভূখণ্ডকে স্থায়ী মনে করি, তার একটি অংশও নদীর তৈরি।

নদী পলি এনে ভূমি দিয়েছে। মানুষ সেখানে বসতি গড়েছে। এরপর সেই বসতিই কখনো কখনো নদীর জায়গা আরও সংকুচিত করেছে।

বুড়িগঙ্গার ইতিহাসে এই বৈপরীত্যটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

মোগল ঢাকা: নদীই ছিল মহাসড়ক, বন্দর প্রতিরক্ষা

বুড়িগঙ্গার ভূপ্রাকৃতিক বিবর্তনের সঙ্গে ঢাকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবর্তনও জড়িয়ে যায়।ৎ ১৬১০ সালে ইসলাম খান চিশতি যখন ঢাকা—তৎকালীন জাহাঙ্গীরনগর—বাংলার সুবাহর রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন, তখন নদীপথ ছিল যোগাযোগ ও সামরিক নিয়ন্ত্রণের প্রধান মাধ্যম। ঢাকা পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার বৃহত্তর নদীপ্রণালীর সঙ্গে ছোট-বড় নদীর মাধ্যমে যুক্ত ছিল। বুড়িগঙ্গার তীরে চাঁদনীঘাটে রাজকীয় নৌবহরের চলাচল ও সৈন্য অবতরণের ব্যবস্থাও ছিল।

সপ্তদশ শতকের ঢাকাকে ঘিরে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, তুরাগ, টঙ্গী খাল, বালু ও শীতলক্ষ্যার মতো নদী-জলপথের নেটওয়ার্ক শহরটিকে সামরিক ও বাণিজ্যিক—দুই ক্ষেত্রেই বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল। সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক গবেষণাতেও এই নদীঘেরা অবস্থানকে মোগল ঢাকার বিকাশের একটি মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তখনকার নদী ছিল আজকের ভাষায় একই সঙ্গে highway, port, freight corridor এবং water source। সপ্তদশ শতকের ইংরেজ নাবিক টমাস বাউরি ঢাকার পাশের নদীকে বড় ও নৌযান চলাচলের উপযোগী প্রবাহ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সেই সময় নদীর তীরেই বসতি, বাণিজ্য ও প্রশাসনিক স্থাপনার বিস্তার ঘটেছিল। এ কারণেই ঢাকা প্রথমে নদী থেকে দূরে গিয়ে বড় হয়নি। আসলে ঢাকা বেড়েছিল নদীকে ধরে।

নদী শহরকে জন্ম দিল, শহর পরে নদী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল

প্রাক্-মোগল ও মোগল ঢাকার বসতির বড় অংশ বুড়িগঙ্গার উত্তর তীরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। বাংলাবাজার, শাঁখারীবাজার, তাঁতিবাজার, পটুয়াটুলি, কুমারটুলি ও আশপাশের বিভিন্ন কারুশিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্রের অবস্থানের পেছনেও নদীপথে যোগাযোগের ভূমিকা ছিল। নদী ছিল মানুষ, পণ্য, প্রশাসন এবং সংস্কৃতির চলাচলের প্রধান মাধ্যম।

পরবর্তী সময়ে সড়ক, রেল, মোটরযান এবং আধুনিক নগর অবকাঠামোর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার অর্থনৈতিক কেন্দ্র ধীরে ধীরে উত্তর ও পূর্ব দিকে সরে যেতে থাকে।

নদী তখন আর শহরের সামনের দরজা রইল না। ধীরে ধীরে সেটি যেন শহরের পেছনের উঠানে পরিণত হলো।—এ পরিবর্তন শুধু মানচিত্রে ঘটেনি; মানুষের মানসিক মানচিত্রেও ঘটেছে। যে নদীর দিকে মুখ করে শহর গড়ে উঠেছিল, সেই নদীর দিকে পরে ড্রেন, নর্দমা ও শিল্পবর্জ্যের মুখ ঘুরে গেল।

Enjoy Music- বুড়িগঙ্গা বাঁচাও | Save Buriganga | Let the River Breathe Again | Bangla-English Awareness Song Odhikarpatra and LearningBdFun

বিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা: বুড়িগঙ্গা একা নয়

বুড়িগঙ্গার জন্ম ও বিবর্তনের ইতিহাস আমাদের একটি জরুরি শিক্ষা দেয়—একটি নদীকে কখনো একা বোঝা যায় না।

গঙ্গা বদলেছে। ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ বদলেছে। যমুনা শক্তিশালী হয়েছে। ধলেশ্বরীর শাখা বদলেছে। তুরাগ এসে বুড়িগঙ্গাকে পানি দিয়েছে। বুড়িগঙ্গা পলি এনে নতুন চর সৃষ্টি করেছে। —আর সেই নদীর তীরেই ঢাকা ছোট জনপদ থেকে মহানগরে পরিণত হয়েছে।

এই পুরো ইতিহাস আসলে একটি living delta বা জীবন্ত বদ্বীপের ইতিহাস। তাই আজ যদি আমরা বুড়িগঙ্গাকে শুধু সদরঘাট থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত দৃশ্যমান একটি জলরেখা হিসেবে দেখি, তাহলে নদীটিকে বোঝার শুরুতেই ভুল করব।

বুড়িগঙ্গা একটি বৃহত্তর hydrological system-এর অংশ। তার অতীত গঙ্গার সঙ্গে যুক্ত। তার বর্তমান তুরাগ ও ধলেশ্বরীর সঙ্গে যুক্ত। আর তার ভবিষ্যৎ ঢাকার ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। শত শত বছর আগে নদী তার পথ বদলে ঢাকা নামের একটি শহরের বিকাশের সুযোগ তৈরি করেছিল।

আজ সেই শহরের সামনে উল্টো প্রশ্ন—যে নদী নিজের ভূপ্রাকৃতিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঢাকার জন্ম ও বিকাশে জায়গা করে দিয়েছিল, আধুনিক ঢাকা কি সেই নদীকে তার নিজের মতো বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট জায়গা দেবে?

বুড়িগঙ্গার তীরে জন্ম নেওয়া ঢাকা: নদী থেকে মহানগর

ঢাকার ইতিহাস থেকে বুড়িগঙ্গাকে বাদ দিলে শহরটির পরিচয়ের বড় একটি অংশই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গা ঢাকার দক্ষিণ ও পশ্চিম দিয়ে প্রবাহিত জোয়ার-ভাটা প্রভাবিত নদী। ঐতিহাসিক ভৌগোলিক বর্ণনায় এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭ কিলোমিটার; কামরাঙ্গীরচরের কাছে তুরাগ এসে এতে মিলেছে এবং পরে নদীটি ধলেশ্বরীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। পুরোনো ঢাকার বসতি, ব্যবসা, ঘাট, কারুশিল্প ও নদীনির্ভর যোগাযোগের বিকাশে বুড়িগঙ্গার ভূমিকা ছিল মৌলিক।

আজকের বিমানবন্দর, মহাসড়ক বা রেলপথের বহু আগে নদীপথই ঢাকাকে বৃহত্তর বাংলার সঙ্গে যুক্ত করেছিল। সদরঘাট তাই শুধু একটি টার্মিনাল নয়। এটি ঢাকার নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ইতিহাসের জীবন্ত অংশ। আহসান মঞ্জিল, বাকল্যান্ড বাঁধ, শাঁখারীবাজার, ইসলামপুর, বাংলাবাজার, চকবাজার—পুরান ঢাকার নগরজীবনের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক বহু শতকের। কিন্তু শহর বড় হতে হতে একটি মৌলিক ভুল করেছে।

ঢাকা নদীর সুবিধা নিয়েছে, কিন্তু নদীর বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা, প্রবাহ ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করেনি। ফলে যে নদী একসময় শহরের প্রবেশদ্বার ছিল, সেই নদীর দিকে এখন শহরের অসংখ্য নর্দমা ও বর্জ্যের পথ খোলা।

২০২৬-এর বুড়িগঙ্গা: চোখে দেখা দূষণের চেয়েও গভীর সংকট

নদীর পানি কালো দেখাচ্ছে কি না, দুর্গন্ধ হচ্ছে কি না—এসব গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। কিন্তু নদীর স্বাস্থ্য বোঝার জন্য বৈজ্ঞানিক সূচক আরও গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০২৪ সালের চার মৌসুমে ঢাকা অঞ্চলের বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যার ১৪৪টি পানির নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় তৈরি Water Quality Index বা WQI অনুযায়ী চার নদীর মধ্যে বুড়িগঙ্গার গড় মান ছিল সবচেয়ে খারাপ—৪৬.৮৫। শুষ্ক মৌসুমে সূচক নেমে গিয়েছিল ২৯.৭৮-এ। বর্ষায় পানির পরিমাণ বাড়লে দূষক কিছুটা পাতলা হওয়ায় অবস্থার উন্নতি দেখা যায়। 

এর অর্থ খুব সহজ। বর্ষার পানি দূষণকে সাময়িকভাবে পাতলা করতে পারে; কিন্তু দূষণের উৎস বন্ধ করে না। শুষ্ক মৌসুম এলে নদীতে প্রবাহ কমে। একই পরিমাণ বা কাছাকাছি পরিমাণ দূষিত বর্জ্য তখন কম পানিতে মেশে। ফলে দূষকের ঘনত্ব বাড়ে এবং জলজ প্রাণীর জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ আরও প্রতিকূল হয়।

এই মৌসুমি ওঠানামাই বলে দেয়, বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে শুধু নদীর তলদেশ খনন বা বর্ষার পানির ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দূষণের বোঝা কমানো এবং স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারদুটিই।

৫০৬টি দূষণের মুখ: নদীর দিকে তাক করা শহরের পাইপলাইন

সমস্যার ব্যাপ্তি বোঝাতে একটি সংখ্যা যথেষ্ট—৫০৬। ২০২৫ সালে প্রকাশিত River and Delta Research Centre-এর একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, শুধু বুড়িগঙ্গাতেই ৫০৬টি দূষণের উৎস শনাক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে শিল্পবর্জ্যের লাইন, বড় পৌর পয়োবর্জ্য লাইন, ছোট বেসরকারি পয়োনিষ্কাশন সংযোগ, স্লুইসগেট, সার্ভিস খাল, বড় ও ছোট বর্জ্য ফেলার স্থান, ডকইয়ার্ড, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কাঁচাবাজার অন্তর্ভুক্ত ছিল। জরিপে ঢাকার আশপাশের নদীগুলোতে মোট দূষণের উৎস পাঁচ বছরে ৬০৮ থেকে বেড়ে ১,০২৪ হওয়ার কথাও বলা হয়।

এই তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সংখ্যাটি নয়। আসলে শিক্ষাটি হলো—বুড়িগঙ্গার দূষণ একটি বহুমুখী নগরব্যবস্থার ব্যর্থতার ফল।

কোনো একটি কারখানা বন্ধ করলে সমস্যার একটি অংশ কমতে পারে। একটি ঘাট পরিষ্কার করলে জায়গাটি কয়েক দিন সুন্দর থাকতে পারে। কিছু প্লাস্টিক তুলে ফেললে দৃশ্যমান ময়লা কমবে। কিন্তু ৫০৬টি উৎসের নদীকে বাঁচাতে ৫০৬টির বিপরীতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রয়োজন।

নদী পরিষ্কার করার আগে তাই জানতে হবে—কোন ড্রেন কোথা থেকে আসছে, কোন শিল্প কী ধরনের বর্জ্য ছাড়ছে, কোন বাজারের আবর্জনা কোথায় যাচ্ছে, কোন নর্দমার পানি পরিশোধন ছাড়াই নদীতে পড়ছে। অর্থাৎ বুড়িগঙ্গা রক্ষার প্রথম কাজ নদীতে নয়; অনেক ক্ষেত্রেই কাজ শুরু করতে হবে নদীতে পৌঁছানোর আগেই।

পয়োবর্জ্যের শহর: নদী কি ঢাকার অঘোষিত স্যুয়ারেজ লাইন?

বুড়িগঙ্গার বড় সংকটগুলোর একটি শিল্পবর্জ্য। কিন্তু নগরের অপরিশোধিত পয়োবর্জ্যের সমস্যাও কম ভয়াবহ নয়। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী ঢাকার প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা ঢাকা ওয়াসার কেন্দ্রীয় পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের বাইরে ছিল। ফলে বিপুল পরিমাণ গৃহস্থালি বর্জ্যপানি বিভিন্ন ড্রেন, খাল ও স্থানীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত আশপাশের জলাশয় ও নদীতে পৌঁছায়।

সমস্যাটি বোঝার জন্য দাশেরকান্দি Sewage Treatment Plant-এর বর্তমান পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। ৩ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বৃহৎ শোধনাগারটির সক্ষমতা থাকলেও ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে একটি IMED মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যাপ্ত sewer connection না থাকায় এটি মাত্র প্রায় ২৫ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। অর্থাৎ শোধনাগার তৈরি করলেই সমাধান হয় না; বাড়ি, এলাকা ও নর্দমার সঙ্গে সেই শোধনাগারের কার্যকর সংযোগও দরকার।

এটি ঢাকার পানি ব্যবস্থাপনার একটি বড় শিক্ষা। একদিকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে শোধনাগার নির্মাণ করা হবে, অন্যদিকে বর্জ্য সেই শোধনাগারে পৌঁছাবে না—এই মডেল টেকসই নয়।

বুড়িগঙ্গা রক্ষার জন্য প্রয়োজন পুরো sewer catchment ধরে কাজ করা। কোন বাড়ির পয়োবর্জ্য কোথায় যাচ্ছে, কোন ড্রেন কোন খালে পড়ছে এবং কোন খাল শেষে নদীতে মিলছে—এই ধারাটি সম্পূর্ণভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।

ইটিপি আছেকিন্তু চলছে তো?

শিল্পবর্জ্যের ক্ষেত্রে Effluent Treatment Plant বা ETP বহু বছর ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে।

২০২৬ সালের আগস্টে সংসদে দেওয়া সরকারি তথ্যে জানানো হয়, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা তীরবর্তী তরল বর্জ্য উৎপাদনকারী ১৯৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪২টিতে ETP স্থাপিত হলেও ৫৪টিতে তখনও ETP ছিল না। পরিবেশগত নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে ২৭টি শিল্পের utility service বিচ্ছিন্ন করার কথাও জানানো হয়।

আবার পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আগস্ট ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি ২০২৫ থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা ও সংযুক্ত খাল এলাকায় অতিরিক্ত তরল বর্জ্য নির্গমনের কারণে ১০৩টি শিল্প ও প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রায় ২ কোটি ৯২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছিল; একই সময়ে ETP-বিহীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু ETP থাকার হিসাব আর ETP নিয়মিত ও সঠিকভাবে চালানোর হিসাব এক নয়।

একটি ETP চালাতে বিদ্যুৎ, রাসায়নিক, দক্ষ জনবল ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ লাগে। প্রতিষ্ঠান যদি উৎপাদনের সময় ETP বন্ধ রাখে, তাহলে কাগজে পরিবেশসম্মত হলেও বাস্তবে দূষণ চলতে পারে।

এই কারণে continuous monitoring গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে সরকার কিছু শিল্পে ক্যামেরাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং online water-quality monitoring-এর উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।

এই ব্যবস্থাকে ব্যতিক্রম নয়, নিয়মে পরিণত করতে হবে।

প্লাস্টিক: নদীর ওপরের আবর্জনা নয়, তলদেশের দীর্ঘমেয়াদি বোঝা

বুড়িগঙ্গায় প্লাস্টিকের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ হলো ভাসমান বোতল, পলিথিন, প্যাকেট ও ঘাটসংলগ্ন আবর্জনা। কিন্তু ভাসমান প্লাস্টিকই পুরো সমস্যা নয়।

অনেক প্লাস্টিক নদীর তলদেশে জমে যায়। বড় প্লাস্টিক সময়ের সঙ্গে ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বুড়িগঙ্গার পানি, পলি এবং মাছ, কাঁকড়া ও শামুকে microplastic পাওয়ার কথা জানানো হয়। গবেষণায় নদীর তলদেশের sediment-কে দূষক জমার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য বুঝতে হবে। নদীর তীর থেকে আজ এক ট্রাক প্লাস্টিক তুলে ফেললে জায়গাটি পরিষ্কার দেখাবে। কিন্তু যে microplastic ইতিমধ্যে sediment ও food chain-এর মধ্যে ঢুকে গেছে, তাকে একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে সরানো যায় না। তাই প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার সঠিক নীতি হলো—নদীতে পড়ার  আগেই আটকানো।

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন সদরঘাটে ‘বর্জ্যের বিনিময়ে ভাসমান বাজার’ উদ্যোগ শুরু করেছে। সচেতনতা ও উৎসাহ তৈরিতে এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। তবে নদীর প্লাস্টিক সংকটের পরিমাণ বিবেচনায় এগুলোকে বৃহত্তর source-separation, collection এবং recycling ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

Listen Song to Save the River Buriganga: If Dhaka’s River Could Speak... 💔 | বুড়িগঙ্গার শপথ — Save Buriganga Environmental Anthem on Odhikarpatra and LearningBdFun

নদীর তলদেশে পুরোনো দূষণের স্মৃতি

বুড়িগঙ্গার দূষণ শুধু আজকের নয়। বহু বছরের শিল্প, ট্যানারি, নগর ও কঠিন বর্জ্যের একটি অংশ নদীর sediment-এ জমেছে।

এ কারণেই নদী পুনরুদ্ধারে dredging বা খনন নিয়ে খুব সতর্ক হতে হয়।

দূষিত পলি তুলে কোথায় রাখা হবে? সেটি শুকিয়ে গেলে দূষক কি মাটি বা ভূগর্ভস্থ পানিতে যাবে? ভারী ধাতুসমৃদ্ধ sediment আবার অন্য জলাশয়ে ফেললে কি শুধু দূষণ স্থানান্তর করা হবে?

২০২৫ সালের একটি গবেষণায় বুড়িগঙ্গার পানি, sediment এবং মাছের বিভিন্ন অংশে trace metal-এর উপস্থিতি বিশ্লেষণ করে sediment-কে গুরুত্বপূর্ণ দূষণভাণ্ডার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গবেষণাটি খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করেছে। তাই ‘খনন করলেই নদী ভালো হবে’—এমন সরল সমীকরণ যথেষ্ট নয়। —দূষিত sediment ব্যবস্থাপনা নিজেই একটি বৈজ্ঞানিক প্রকল্প হওয়া দরকার।

সবকিছুর পরও বুড়িগঙ্গা এখনও জীবন্ত

বুড়িগঙ্গার ছবি দেখে কখনো কখনো মনে হয় নদীটি যেন জীববৈচিত্র্য হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু বিজ্ঞান একটু অন্য কথা বলছে।

২০২৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার ২৭ কিলোমিটার অংশে বিপন্ন Ganges river dolphin বা শুশুক পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষকদের statistical N-mixture model প্রায় ১৯.৮টি ডলফিনের সম্ভাব্য abundance অনুমান করেছে। এটি সরাসরি একসঙ্গে ২০টি ডলফিন গুনে পাওয়ার সংখ্যা নয়; বরং পর্যবেক্ষণ ও detection probability-এর ভিত্তিতে একটি মডেলভিত্তিক অনুমান। গবেষণায় নদীর গভীরতার সঙ্গে ডলফিনের উপস্থিতির ইতিবাচক এবং নৌযানের চাপের সঙ্গে নেতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

এই তথ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এত চাপের মধ্যেও যদি বুড়িগঙ্গায় শুশুক টিকে থাকে, তার অর্থ নদীর ecological function পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। এবং ঠিক এ কারণেই পুনরুদ্ধারের সুযোগ এখনও আছে।

নদীকে যদি পর্যাপ্ত প্রবাহ, নিরাপদ গভীরতা, কম দূষণ এবং কিছু শান্ত habitat দেওয়া যায়, তাহলে aquatic ecosystem পুনরুদ্ধার হতে পারে।

ঢাকার পানি নিষ্কাশনে বুড়িগঙ্গা: যে ভূমিকা চোখে দেখা যায় না

ঢাকায় ভারী বৃষ্টি হলে আমরা জলাবদ্ধতা দেখি। রাস্তা ডুবে যায়। যান চলাচল থেমে যায়। তখন সাধারণত ড্রেন পরিষ্কারের কথা ওঠে। কিন্তু শহরের drainage system শুধু ড্রেন দিয়ে তৈরি নয়। ড্রেনের পানি খালে যায়। খালের পানি নদীতে যায়। নদীর সঙ্গে প্লাবনভূমি, জলাধার ও নিম্নাঞ্চলের সংযোগ থাকে। এই পুরো network-ই শহরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা।

World Bank-এর Greater Dhaka flood-risk বিশ্লেষণ দেখিয়েছে, নদী, খাল, wetlands ও নিচু এলাকাগুলো অতিরিক্ত পানি ধারণ ও সরানোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দখল, ভরাট, বর্জ্য এবং নদী-খালের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে পানি বহনের ক্ষমতা কমে যায় এবং নগর জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ে। সুতরাং বুড়িগঙ্গার জায়গা কমানো মানে শুধু নদীর জায়গা কমানো নয়।

এটি ঢাকার water-storage এবং drainage capacity কমানো।

একটি শহর যত বেশি কংক্রিটে ঢেকে যায়, বৃষ্টির পানি মাটিতে ঢোকার সুযোগ তত কমে। সেই শহরে খাল, জলাধার ও নদী আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঢাকার ক্ষেত্রে আমরা উল্টো পথে হেঁটেছি—কংক্রিট বাড়িয়েছি, আবার জলধারণের প্রাকৃতিক জায়গাও কমিয়েছি।

ভূগর্ভস্থ পানির সংকটেও নদীর সঙ্গে যোগ আছে

ঢাকার পানির আরেকটি বড় সংকট ভূগর্ভস্থ পানির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ। ADB-এর একটি মূল্যায়নে ঢাকার পানির বড় অংশ ভূগর্ভস্থ aquifer থেকে তোলার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নামার ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছিল। একই সঙ্গে দূষিত surface water-ও নিরাপদ বিকল্প পানির উৎস ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি করে।

এখানে বুড়িগঙ্গার সঙ্গে ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তার সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ।

একটি মহানগর যদি তার চারপাশের নদীগুলো এমনভাবে দূষিত করে যে সেগুলোকে পানি সরবরাহে ব্যবহার করাই কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে শহর বাধ্য হয়ে দূরের উৎস ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর আরও নির্ভরশীল হবে। অর্থাৎ নদী দূষণের খরচ শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বাজেটে আসে না।

এর মূল্য দিতে হয় পানি সরবরাহ প্রকল্পে, বিদ্যুৎ ব্যয়ে, অবকাঠামোয় এবং ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তায়।

নৌপথ হারালে সড়কের ওপর চাপ আরও বাড়বে

ঢাকার যানজট নিয়ে প্রতিদিন আলোচনা হয়। কিন্তু শহরটির পাশে যে একটি প্রাকৃতিক পরিবহন করিডর রয়েছে, সেটির পরিবেশগত স্বাস্থ্যকে পরিবহন নীতির অংশ হিসেবে খুব কমই দেখা হয়।

বুড়িগঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ।

নদী নাব্য, নিরাপদ এবং পরিচ্ছন্ন থাকলে জলপথ সড়ক পরিবহনের একটি কার্যকর complement হতে পারে। নদী সংকুচিত, ভরাট ও দূষিত হলে নৌপরিবহনের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২০২৬ সালে BIWTA ঢাকার নদীবন্দর ও ফতুল্লা থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত নৌপথ পরিদর্শনের সময় দখল ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নাব্যতা রক্ষা এবং যাত্রীসেবা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।

ঢাকার sustainable transport নিয়ে কথা বললে তাই শুধু বাস, মেট্রোরেল ও flyover যথেষ্ট নয়। বুড়িগঙ্গাও সেই আলোচনার অংশ।

জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন: নদীর দূষণ নদীতীরে থেমে থাকে না

দূষিত নদীর সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি হলো—আমরা ভাবি দূষণটি নদীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে নদীর সঙ্গে মানুষ যুক্ত মাছের মাধ্যমে, খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে, নৌযাত্রায়, কর্মস্থলে, বাতাসে দুর্গন্ধের মাধ্যমে এবং বন্যা বা জলাবদ্ধতার সময় দূষিত পানির সংস্পর্শে।

বুড়িগঙ্গার মাছ নিয়ে গবেষণায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিভিন্ন গবেষণায় পানি ও sediment-এ heavy metal এবং microplastic-এর উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে। 

এগুলো দেখে আতঙ্ক ছড়ানো ঠিক হবে না। একটি গবেষণার নির্দিষ্ট নমুনা থেকে পুরো নদীর প্রতিটি মাছ বা প্রতিটি এলাকার মানুষের ব্যক্তিগত ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। কিন্তু সংকেতটি উপেক্ষা করাও যাবে না।

নদীর দূষণ environmental problem হওয়ার পাশাপাশি food-safety এবং public-health surveillance-এর বিষয়।

বুড়িগঙ্গা জলবায়ু সহনশীল ঢাকা: যে সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে

জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ে ঢাকার সামনে দুটি বিপরীত পানি-সমস্যা রয়েছে। একদিকে অল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে কম প্রবাহ ও পানি সংকট। - এই দুই পরিস্থিতিতেই কার্যকর blue-green infrastructure প্রয়োজন—নদী, খাল, পুকুর, জলাধার, floodplain এবং সবুজ এলাকার সমন্বিত নেটওয়ার্ক।

বুড়িগঙ্গাকে তাই শুধু ‘একটি দূষিত নদী পরিষ্কারের প্রকল্প’ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি হওয়া উচিত Dhaka Climate Resilience Strategy-এর অংশ।

একটি সুস্থ নদী অতিরিক্ত পানি বহন করে, জলজ বাস্তুতন্ত্র ধরে রাখে, শহরকে উন্মুক্ত নীল-সবুজ করিডর দেয় এবং একটি ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরের environmental buffer হিসেবে কাজ করতে পারে। অন্যদিকে নদী সংকুচিত করে দুই পাশে কংক্রিট তুলে দিলে আমরা হয়তো কিছু জমি পাই; কিন্তু শহর হারায় পানি ধারণের জায়গা।

এই বিনিময়টি দীর্ঘমেয়াদে খুব ব্যয়বহুল।

এত প্রকল্পের পরও সমস্যা কেন থেকে যায়?

বুড়িগঙ্গার ইতিহাসে পরিষ্কার অভিযান, উচ্ছেদ, dredging, walkway, boundary pillar, আদালতের নির্দেশ—কোনোটিই নতুন নয়। তবু সংকট থেকে গেছে। কারণ সমস্যাটিকে প্রায়ই আলাদা আলাদা অংশে ভাগ করে দেখা হয়েছে।

এক সংস্থা নদী খনন করে। আরেক সংস্থা বর্জ্য তোলে। আরেক সংস্থা শিল্পের ETP দেখে। অন্য সংস্থা sewerage নির্মাণ করে। শহর করপোরেশন কঠিন বর্জ্য দেখে। ভূমি কর্তৃপক্ষ উন্নয়ন পরিকল্পনা করে। BIWTA নৌপথ দেখে। কিন্তু নদী প্রশাসনিক সীমানা বোঝে না।

একটি ড্রেনের বর্জ্য শেষ পর্যন্ত একটি খাল হয়ে নদীতে গেলে তিনটি আলাদা সংস্থার দায়িত্বের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। মাঝখানে যদি একটি সংযোগও দুর্বল হয়, দূষণ নদীতে পৌঁছাবে।

এই কারণেই ২০২৬ সালের আগস্টে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সভায় শিল্পবর্জ্যের উৎসভিত্তিক তালিকা, কার্যকর ETP, অবৈধ ড্রেন বন্ধ, খাল পরিষ্কার, STP এবং সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, বালু ও শীতলক্ষ্যা এবং সংযুক্ত খালের দূষণ ও নাব্যতা নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় সেল গঠনের খবরও আসে।—এই সমন্বয় বাস্তবে কতটা ফল দেবে, তার বিচার হবে নদীর পানিতে—সভাকক্ষের নথিতে নয়।

নতুন অর্থায়ন এসেছেএবার ফলাফল মাপতে হবে

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে World Bank বৃহত্তর ঢাকার পানি দূষণ কমানো, sanitation ও solid-waste management উন্নত করা এবং নদী-খাল পুনরুদ্ধারের জন্য ৩৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করেছে।

Metro Dhaka Water Security and Resilience Program-এর আওতায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে safely managed sanitation এবং ৫ লাখ মানুষকে উন্নত solid-waste management service দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এটি বড় সুযোগ। তবে নদী ব্যবস্থাপনায় অর্থের পরিমাণ দিয়ে সাফল্য মাপা যায় না।

সাফল্যের সূচক হওয়া উচিত—নদীর কোন অংশে dissolved oxygen বাড়ল, কতটি untreated outfall বন্ধ হলো, কত শতাংশ sewage treatment-এর আওতায় এল, কত শিল্প ২৪ ঘণ্টা ETP চালাচ্ছে, কত খালের সংযোগ পুনরুদ্ধার হলো, কত প্লাস্টিক নদীতে পৌঁছানো বন্ধ হলো, dry-season flow কতটা ফিরল, aquatic biodiversity কীভাবে বদলাল। অর্থাৎ project output নয়, river outcome মাপতে হবে।

বিশ্বের শহরগুলো পেরেছেঢাকা কেন পারবে না? নদী ফিরিয়ে আনার চারটি শিক্ষা

একসময় ইউরোপ ও এশিয়ার বহু বড় শহরও তাদের নদীকে নর্দমা, শিল্পবর্জ্যের পথ কিংবা বন্যার ঝুঁকি হিসেবে দেখেছে। কোথাও নদীর ওপর রাস্তা হয়েছে, কোথাও অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য গেছে, কোথাও নদীর প্রাকৃতিক তীর কংক্রিটে বন্দী হয়েছে। পরে সেই শহরগুলোর অনেকেই বুঝেছে—নদীকে মেরে নগরকে বাঁচানো যায় না।

তখন শুরু হয়েছে উল্টো যাত্রা। শহর নদীর দিকে আবার মুখ ফিরিয়েছে। দূষণের উৎস বন্ধ করেছে। sewerage পুনর্গঠন করেছে। floodplain ফিরিয়েছে। নদীর জন্য জায়গা রেখেছে। মানুষকে আবার নদীর কাছে নিয়ে গেছে।

বুড়িগঙ্গার জন্য সবচেয়ে বড় আশার জায়গা এখানেই—বিশ্বে এমন নদী আছে, যেগুলো একসময় ভয়াবহ সংকটে ছিল, কিন্তু ধারাবাহিক নীতি বিনিয়োগের মাধ্যমে আবার শহরের সম্পদে পরিণত হয়েছে।

ভিয়েনার দানিউব: নদীকে আটকে নয়, জায়গা দিয়েই শহরকে রক্ষা

অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার সঙ্গে দানিউব নদীর সম্পর্ক বুড়িগঙ্গা ও ঢাকার জন্য বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। দানিউব ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ নদী। ইতিহাসে এই নদীর বন্যা ভিয়েনার জন্য বড় হুমকি ছিল। শহর কর্তৃপক্ষ চাইলে শুধু উঁচু বাঁধ তুলে নদীকে আরও কংক্রিটের মধ্যে আটকে রাখতে পারত। কিন্তু তারা ধীরে ধীরে অন্য একটি পথ নেয়—নদীর পানি চলাচলের জন্য অতিরিক্ত জায়গা তৈরি করে, আর সেই জায়গাকেই একই সঙ্গে বন্যা সুরক্ষা, পরিবেশ জনজীবনের অংশ বানায়।

১৯৫৪ সালের ভয়াবহ বন্যার পর নতুন flood-protection পরিকল্পনা তৈরি হয়। ১৯৬৯ সালে ভিয়েনা একটি উন্নত বন্যা-সুরক্ষা প্রকল্প অনুমোদন করে। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে মূল দানিউবের পাশে প্রায় ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ New Danube নামে একটি relief channel নির্মাণ করা হয়। খনন করা মাটি দিয়ে মাঝখানে তৈরি হয় Danube Island বা Donauinsel। আজ এই দ্বীপ এবং নতুন জলধারা ভিয়েনার বন্যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল অংশ।

ব্যবস্থাটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যে বড় বন্যার সময় New Danube অতিরিক্ত পানি বহন করতে পারে। মূল নদী ও relief channel মিলিয়ে পরিকল্পিত সর্বোচ্চ প্রবাহক্ষমতা প্রায় ১৪ হাজার ঘনমিটার পানি প্রতি সেকেন্ড। ভিয়েনা নগর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার কারণে ২০০২ এবং ২০১৩ সালের বড় বন্যাতেও শহরে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। কিন্তু এখানেই ভিয়েনার গল্প শেষ নয়।

২১ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ Danube Island-কে শুধু প্রকৌশল অবকাঠামো হিসেবে রাখা হয়নি। এর বড় অংশে প্রাকৃতিক habitat, ঘাসের মাঠ, গাছপালা, হাঁটা ও সাইকেল চলার পথ, সাঁতারের জায়গা এবং মানুষের বিনোদনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ভিয়েনা সিটি প্রশাসন দ্বীপটিকে একই সঙ্গে flood-protection infrastructure, ecological habitat এবং recreation area হিসেবে পরিচালনা করে।

এখানে বুড়িগঙ্গার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা আছে: নদীর তীর মানেই কংক্রিটের দেয়াল নয়। নদী রক্ষার নামে যদি পুরো তীরকে পাকা promenade-এ পরিণত করা হয়, তাহলে শহর হয়তো হাঁটার সুন্দর রাস্তা পাবে, কিন্তু নদী হারাতে পারে floodplain, vegetation এবং habitat।

ভিয়েনা দেখিয়েছে, প্রকৌশল ও প্রকৃতিকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না বানিয়েও নগর সুরক্ষা সম্ভব। —বুড়িগঙ্গার ক্ষেত্রেও তাই তীর পুনরুদ্ধারের অর্থ কেবল উচ্ছেদ করে দেয়াল ও টাইলস বসানো হওয়া উচিত নয়। কোথাও public walkway প্রয়োজন হবে, কোথাও নৌঘাট, আবার কোথাও নদীর জন্যই জায়গা ছেড়ে দিতে হবে।

সিঙ্গাপুর নদী: যে নদী ছিল প্রায় খোলা নর্দমা

সিঙ্গাপুর নদীর ইতিহাস বুড়িগঙ্গার সঙ্গে আরও সরাসরি তুলনাযোগ্য। ১৯৭০-এর দশকে Singapore River এতটাই দূষিত ছিল যে সরকারি ভাষ্যেই নদীটিকে প্রায় open sewer-এর মতো অবস্থায় পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। এর তীরে ছিল শিল্পপ্রতিষ্ঠান, boatyard, hawker, ঘনবসতি, খামার ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড। শিল্পবর্জ্য, পয়োবর্জ্য এবং কঠিন বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ত। জলজ প্রাণীর জন্য পরিবেশ ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল।

১৯৭৭ সালে শুরু হয় দশ বছরব্যাপী একটি বড় নদী পরিষ্কার কর্মসূচি। কিন্তু সিঙ্গাপুর শুধু নদীর ওপর ভাসমান ময়লা তুলেনি। শিল্পবর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়া বন্ধ করা হয়। নদীর তীরের দূষণকারী কর্মকাণ্ড পুনর্বিন্যাস করা হয়। sanitation উন্নত করা হয়। কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। নদীর তলদেশ dredging করা হয়। নদীতীরবর্তী কিছু বসতি ও কর্মকাণ্ড স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে দীর্ঘমেয়াদি পরিষ্কার কর্মসূচির মূল ধাপ শেষ হয়।

এই ঘটনাটি বুড়িগঙ্গার জন্য প্রায় পাঠ্যপুস্তকের উদাহরণ। কারণ একটি নদী যদি প্রতিদিন নতুন করে দূষিত হতে থাকে, তাহলে নদী পরিষ্কারের অভিযান কখনো শেষ হবে না।

সিঙ্গাপুর প্রথমে বুঝেছিল—নদী পরিষ্কার করার আগে দূষণের supply chain ভাঙতে হবে। আরও বড় বিষয় হলো, পরিষ্কার হওয়ার পর নদীটি পরে Singapore-এর বৃহত্তর পানি ব্যবস্থাপনার অংশ হয়ে ওঠে। Singapore River-সহ কেন্দ্রীয় নগরাঞ্চলের কয়েকটি জলধারা Marina Basin-এ প্রবাহিত হয়; Marina Barrage নির্মাণের মাধ্যমে এই নগর catchment-কে পানি সংরক্ষণ, stormwater management এবং নগরজীবনের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ একসময় যে নদী ছিল শহরের বর্জ্য বহনের জায়গা, পরিকল্পিত পুনরুদ্ধারের পর সেই জলব্যবস্থাই শহরের পানি নিরাপত্তার সম্পদ হয়ে উঠেছে।

বুড়িগঙ্গার ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি তাই শুধু—‘পানি কতটা কালো?’—এখানে থামতে পারে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই নদীকে কি ভবিষ্যতে ঢাকা মহানগরের blue-green infrastructure-এর সক্রিয় অংশে পরিণত করা যায়?

লন্ডনের টেমস: মৃতপ্রায় নদী থেকে আবার জীববৈচিত্র্যের আবাস

আজ লন্ডনের পরিচয়ের সঙ্গে River Thames অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু টেমস সবসময় এমন ছিল না। দীর্ঘ শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও sewage pollution-এর কারণে বিংশ শতকের মাঝামাঝি টেমসের কিছু অংশের অবস্থা এত খারাপ হয়েছিল যে নদীটি ‘biologically dead’ হিসেবে পরিচিত হয়ে পড়ে। পরবর্তী কয়েক দশকে sewage treatment, environmental regulation, water-quality monitoring এবং অবকাঠামোতে বিনিয়োগের ফলে অবস্থার বড় পরিবর্তন হয়। ২০২৬ সালে Zoological Society of London-এর সর্বশেষ Thames health assessment-ও দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের ফলে পানিতে অক্সিজেন পরিস্থিতি এবং কিছু ecological indicator-এর উন্নতির কথা জানিয়েছে, যদিও দূষণ ও বাড়তে থাকা পানির তাপমাত্রা এখনও উদ্বেগের কারণ।

এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—লন্ডন সমস্যাটিকে অতীতের সাফল্য বলে ছেড়ে দেয়নি।

শহরের পুরোনো combined sewer system-এ ভারী বৃষ্টির সময় sewage ও stormwater মিশে নদীতে overflow হতো। এর মোকাবিলায় নির্মিত হয়েছে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ Thames Tideway Tunnel, যাকে ‘super sewer’ বলা হয়।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুরো ব্যবস্থা সংযুক্ত হওয়ার পর tunnel network লন্ডনের পুরোনো sewer system-এর overflow-এর বড় অংশ আটকাতে শুরু করে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত Tideway-এর তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থাটি ২০ মিলিয়ন টনের বেশি storm sewage টেমসে ঢোকা থেকে আটকেছে।

এখানে ঢাকার জন্য অত্যন্ত পরিষ্কার একটি বার্তা আছে: নদীর দূষণের সমস্যা অনেক সময় নদীর মধ্যে নয়শহরের নিচের sewer network-এ।—বুড়িগঙ্গার তীরে গিয়ে প্লাস্টিক তুললে দৃশ্যমান পরিচ্ছন্নতা বাড়বে। কিন্তু ঢাকার sewer ও drain system থেকে যদি প্রতিদিন অপরিশোধিত পানি নদীতে আসে, তাহলে নদী আবার দূষিত হবে।

লন্ডন তাই এখনও sewer infrastructure-এ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করছে। কারণ একটি মহানগর তার নদীকে সুস্থ রাখতে চাইলে শহরের ভেতরের অদৃশ্য drainage infrastructure-কেও সুস্থ করতে হয়।

তবে টেমসের গল্প একটি সতর্কতাও দেয়। পুনরুদ্ধার মানেই সমস্যা চিরতরে শেষ নয়। লন্ডনের বিভিন্ন waterway-এ sewage, nutrients এবং ecological status নিয়ে এখনও উদ্বেগ রয়েছে। অর্থাৎ নদী পুনরুদ্ধার কোনো একবারের প্রকল্প নয়।—এটি স্থায়ী নগর ব্যবস্থাপনা।

সিউলের চংগেচন: নদীর ওপরের সড়ক সরিয়ে আবার পানিকে জায়গা দেওয়া

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের Cheonggyecheon নদী বা stream-এর গল্প একটু ভিন্ন, কিন্তু ঢাকার জন্য খুব তাৎপর্যপূর্ণ। দ্রুত নগরায়ণের সময় এই জলধারার বড় অংশ ঢেকে ফেলা হয়েছিল। তার ওপর তৈরি হয়েছিল সড়ক এবং elevated highway। নদী কার্যত শহরের নিচে হারিয়ে গিয়েছিল।

২০০৩ সালে সিউল নগর সরকার একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়—পুরোনো elevated roadway সরিয়ে জলধারাটিকে আবার নগরের প্রকাশ্য অংশে ফিরিয়ে আনা হবে। তাই ২০০৩ সালের জুলাই থেকে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৫.৮৪ কিলোমিটার corridor পুনরুদ্ধার করা হয়। সেখানে পানি, সবুজ এলাকা, pedestrian path, bridge এবং public space তৈরি হয়।

পরবর্তীকালে Cheonggyecheon নগরের গুরুত্বপূর্ণ recreational এবং cultural corridor-এ পরিণত হয়। Seoul Metropolitan Government এটিকে শহরের পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।

এই উদাহরণের প্রতীকী গুরুত্ব অসাধারণ। সিউল একসময় বলেছিল—রাস্তা নদীর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরে শহর আবার স্বীকার করেছে—নদীও নগর অবকাঠামো। তবে Cheonggyecheon-এর অভিজ্ঞতাকে অতিরঞ্জিত করাও ঠিক হবে না। Seoul Museum of History নিজেই উল্লেখ করে যে প্রকল্পটি নিয়ে ecological authenticity-এর প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে এর প্রবাহ ধরে রাখতে Han River থেকে পানি pumping করতে হয় এবং সমালোচকদের একাংশ মনে করেন এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক river restoration নয়।

এই সমালোচনাটিও বুড়িগঙ্গার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ঢাকার লক্ষ্য যেন শুধু এমন একটি সুন্দর waterfront তৈরি না হয়, যা ছবিতে ভালো দেখাবে কিন্তু নদীর নিজস্ব hydrology পুনরুদ্ধার করবে না। বুড়িগঙ্গাকে ‘সাজানো’ এবং বুড়িগঙ্গাকে ‘বাঁচানো’ এক জিনিস নয়।

চার শহর, চার পদ্ধতিকিন্তু মূল সূত্র এক

ভিয়েনা, সিঙ্গাপুর, লন্ডন ও সিউলের সমস্যা এক ছিল না। তাই সমাধানও এক ছিল না। কিন্তু চারটি অভিজ্ঞতার মধ্যে কয়েকটি আশ্চর্যজনক মিল আছে।

  • প্রথমত, তারা সমস্যার উৎসে গেছে। সিঙ্গাপুর শুধু নদীর আবর্জনা তোলেনি; নদীতে বর্জ্য যাওয়ার ব্যবস্থাটাই বদলেছে। লন্ডন শুধু Thames পরিষ্কার করেনি; শহরের sewer infrastructure পুনর্গঠন করেছে।
  • দ্বিতীয়ত, নদীকে নগর পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ভিয়েনা দানিউবকে flood-control, ecology ও recreation—তিনটির অংশ করেছে। সিউল রাস্তার জায়গা কমিয়ে আবার পানিকে জায়গা দিয়েছে।
  • তৃতীয়ত, কাজগুলো বহু বছরের। নদীর কয়েক মাসের ‘clean-up campaign’ দিয়ে কেউ এই পরিবর্তন আনেনি। Singapore River পরিষ্কারে এক দশক লেগেছে। Vienna-র Danube flood system নির্মাণেও দেড় দশকের বেশি সময় গেছে। London এখনও তার sewer system আধুনিক করছে।
  • চতুর্থত, নদী পুনরুদ্ধারকে শুধু সৌন্দর্যায়ন হিসেবে দেখা হয়নি। পানি, sewage, flood protection, habitat, transport, recreation এবং public health—সবকিছুর সঙ্গে নদীকে যুক্ত করা হয়েছে।

—আর এখানেই ঢাকার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

বুড়িগঙ্গার জন্যভিয়েনা মডেলনকল নয়নীতিটা শেখা দরকার

ঢাকায় দানিউব বানানো যাবে না। বুড়িগঙ্গা দানিউব নয়। দুই নদীর আকার, প্রবাহ, জলবায়ু, ভূমির ব্যবহার, অর্থনীতি এবং সামাজিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সিঙ্গাপুরের প্রশাসনিক কাঠামোও বাংলাদেশের মতো নয়। লন্ডনের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও ভিন্ন। সিউলের নগর পরিবহন ব্যবস্থার বিকল্প সক্ষমতাও ঢাকার সঙ্গে সরাসরি তুলনীয় নয়। তাই বিদেশি প্রকল্পের নকশা কপি করা সমাধান নয়। শেখার বিষয় হলো তাদের নীতি:

  • নদীকে জায়গা দিতে হবে।
  • দূষণকে উৎসেই থামাতে হবে।
  • পয়োবর্জ্য নদীতে যাওয়ার আগেই শোধন করতে হবে।
  • floodplain-কে অবকাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
  • নদীকে জনজীবনের অংশ করতে হবে। এবং
  • সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—একটি সরকারের মেয়াদ নয়, কয়েক দশকের পরিকল্পনায় নদীকে দেখতে হবে।

বুড়িগঙ্গার ক্ষেত্রেও এমন একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা সম্ভব। ধরা যাক, “Buriganga 2040” নামে একটি measurable restoration programme হলো। সেখানে বছরে কত দূষণ কমবে, কয়টি outfall বন্ধ হবে, কত sewage treatment হবে, নদীর কোন অংশে dissolved oxygen কত হবে, কত floodplain ফিরবে, কোন habitat সংরক্ষিত হবে—এসবের নির্দিষ্ট সূচক থাকবে। তাহলে এক মন্ত্রীর সময়ে প্রকল্প শুরু এবং আরেক মন্ত্রীর সময়ে বন্ধ হওয়ার বদলে নদী পাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় commitment।

বিশ্বের শহরগুলো দেখিয়েছে, নদীর মৃত্যু অনিবার্য নয়। একসময় প্রায় খোলা নর্দমা হয়ে যাওয়া Singapore River আবার নগরের সম্পদ হয়েছে। একসময় ‘biologically dead’ বলে পরিচিত Thames আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সিউল কংক্রিট সরিয়ে হারিয়ে যাওয়া জলধারাকে শহরের সামনে এনেছে। আর Vienna দানিউবকে শত্রু হিসেবে ঠেকিয়ে না রেখে নদীর জন্য অতিরিক্ত জায়গা তৈরি করে সেই জায়গাকেই flood protection, biodiversity এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

বুড়িগঙ্গার ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি তাই নদীটিকে বাঁচানো সম্ভব কি না—এটি আর প্রধান প্রশ্ন নয়। বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, সম্ভব। কিন্তু প্রধান প্রশ্ন হলো—ঢাকা কি তার নদীর জন্য সেই সময়, জায়গা, অর্থ, বিজ্ঞান এবং রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা দিতে প্রস্তুত?

কারণ সফল শহর নদীকে পেছনের নর্দমা বানায় না। সফল শহর তার নদীর দিকে মুখ করে বাঁচতে শেখে।

বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধারের দশটি কাজ: পরিষ্কার নয়, পুরো ব্যবস্থার চিকিৎসা

  • প্রথমত, দূষণের প্রতিটি উৎসের ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করতে হবে। কোন pipe, drain, canal, factory, market বা dumping point থেকে কী ধরনের দূষণ আসছে—তার geotagged database জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা দরকার।
  • দ্বিতীয়ত, untreated sewage নদীতে পৌঁছানো বন্ধ করতে হবে। trunk sewer, interceptor drain, household connection এবং STP—সবকিছুকে একটি network হিসেবে নির্মাণ করতে হবে। শোধনাগার তৈরি করে connection না দিলে বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল মিলবে না।
  • তৃতীয়ত, শিল্পের ETP শুধু স্থাপন নয়, চালু রাখা নিশ্চিত করতে হবে। online monitoring, automated sensors এবং surprise inspection-এর তথ্য regulatory dashboard-এ থাকতে পারে। একই ধরনের শিল্পঘন এলাকায় কার্যকর common effluent treatment solution-ও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
  • চতুর্থত, প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে নদীতে নয়, উৎসে যুদ্ধ করতে হবে। বাজার, ঘাট, মহল্লা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আলাদা বর্জ্য সংগ্রহ, recycling incentive এবং low-value plastic recovery ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
  • পঞ্চমত, polluted sediment-এর বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা দরকার। dredging-এর আগে sediment testing এবং পরে নিরাপদ disposal plan আবশ্যক। একটি নদী থেকে বিষ তুলে অন্য জমিতে রাখা পুনরুদ্ধার নয়।
  • ষষ্ঠত, বুড়িগঙ্গা-তুরাগ-খাল network-এর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। খাল দখলমুক্ত করা, bottleneck দূর করা এবং floodplain রক্ষা করা ছাড়া শুধু মূল নদী খনন দীর্ঘস্থায়ী ফল দেবে না।
  • সপ্তমত, নদীতীরে ecological buffer তৈরি করতে হবে। সব জায়গায় কংক্রিটের দেয়াল বা walkway-ই নদীর সেরা সুরক্ষা নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী vegetation, permeable bank এবং habitat zone রাখতে হবে।
  • অষ্টমত, শুশুক অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে ecological zone হিসেবে চিহ্নিত করা দরকার। অতিরিক্ত গতির নৌযান, শব্দ ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌচলাচল নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ২০২৬ সালের ডলফিন গবেষণায় boat traffic-এর নেতিবাচক সম্পর্ক এই প্রয়োজনীয়তার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।
  • নবমত, প্রতি মাসেরRiver Health Report Card’ প্রকাশ করা উচিত। DO, BOD, COD, ammonia, coliform, heavy metals, turbidity এবং flow-এর মতো সূচক সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে এমনভাবে প্রকাশ করা গেলে জবাবদিহি বাড়বে।
  • দশমত, ‘polluter pays’ নীতিকে বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। দূষণের খরচ জনগণ নয়, দূষণকারীকে বহন করতে হবে। জরিমানা যেন ব্যবসার একটি ছোট operating cost হয়ে না দাঁড়ায়; repeated violation-এর ক্ষেত্রে উৎপাদন স্থগিতসহ কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

একটি নদী পরিষ্কার নয়একটি শহরের চিন্তাভাবনা বদলানো দরকার

বুড়িগঙ্গার সংকটের গভীরে আসলে একটি নগরদর্শনের সংকট আছে। যেমন:

  • আমরা নদীকে দেখি খালি জমির মতো।
  • তীরকে দেখি নির্মাণের সুযোগ হিসেবে।
  • খালকে দেখি ঢেকে রাস্তা করার জায়গা হিসেবে।
  • নিচু জমিকে দেখি প্লট হিসেবে।
  • ড্রেনকে দেখি বর্জ্য সরিয়ে দেওয়ার পথ হিসেবে।

কিন্তু প্রকৃতি এসবকে আলাদা করে দেখে না। একটি খাল ভরাট হলে বৃষ্টির পানি অন্য জায়গায় জমে। নদী সংকুচিত হলে পানির ধারণক্ষমতা কমে। পয়োবর্জ্য নদীতে ফেললে downstream-এর মানুষ তার মূল্য দেয়। দূষিত sediment-এর বিষ aquatic food chain-এ প্রবেশ করতে পারে। নদীর স্বাভাবিক habitat নষ্ট হলে মাছ, শুশুক ও অন্যান্য প্রাণীর জায়গা কমে।

শেষ পর্যন্ত শহর নিজেই সেই ক্ষতি বহন করে। বুড়িগঙ্গা তাই কোনো ‘পরিবেশবাদীদের আলাদা বিষয়’ নয়।

  • এটি নগর পরিকল্পনার বিষয়।
  • এটি জনস্বাস্থ্যের বিষয়।
  • এটি খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়।
  • এটি জলবায়ু অভিযোজনের বিষয়।
  • এটি পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়।
  • এটি পরিবহনের বিষয়।
  • এটি অর্থনীতির বিষয়।

সবশেষে, এটি ঢাকার ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

নদীকে সুন্দর করার আগে নদীকে জীবিত করতে হবে

আমরা প্রায়ই বিদেশের পরিচ্ছন্ন নদীর ছবি দেখি। নদীর পাশে promenade, ক্যাফে, আলো, সবুজ বাগান দেখে ভাবি—বুড়িগঙ্গাও এমন হতে পারে।

হতে পারে। কিন্তু নিচের ক্রমটি গুরুত্বপূর্ণ:

  • প্রথমে sewage বন্ধ হবে।
  • শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ হবে।
  • প্লাস্টিক নদীতে যাওয়া বন্ধ হবে।
  • প্রবাহ ফিরবে।
  • জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার হবে।
  • তারপর সৌন্দর্যায়ন।

নদীর পানি বিষাক্ত রেখে তীরে সুন্দর টাইলস বসালে সেটি river restoration নয়। সেটি নদীর অসুস্থতার পাশে সাজানো ফুটপাত।

শেষ প্রশ্ন: বুড়িগঙ্গা ছাড়া ঢাকা কি সত্যিই টিকতে পারবে?

আজকের ঢাকা হয়তো বুড়িগঙ্গাকে ছাড়াই দিনের কাজ চালিয়ে নিচ্ছে বলে মনে হতে পারে।

কল খুললে পানি আসে। গাড়ি সেতু দিয়ে পার হয়। মানুষ নদী না দেখেও মাসের পর মাস কাটিয়ে দেয়।কিন্তু একটি মহানগর তার প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলো ধ্বংস করে অনির্দিষ্টকাল টিকে থাকতে পারে না।

  • পানি কোথাও যেতে হবে।
  • বৃষ্টি কোথাও জমতে হবে।
  • বর্জ্য কোথাও শোধন হতে হবে।ৎ
  • জলজ প্রাণীর থাকার জায়গা দরকার।
  • নদীর প্রবাহের জায়গা দরকার।

আমরা যদি এসব জায়গা একে একে দখল করি, ভরাট করি এবং দূষিত করি, প্রকৃতি হিসাব ভুলে যায় না। হিসাবটি শুধু পরে আসে—জলাবদ্ধতা হয়ে, দুর্গন্ধ হয়ে, দূষিত খাদ্য হয়ে, বাড়তি পানি সরবরাহের খরচ হয়ে, হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য হয়ে, আরও ব্যয়বহুল একটি শহর হয়ে।

বুড়িগঙ্গা আমাদের কাছে কোনো করুণা চাইছে না। এই নদীকে বাঁচানো আসলে আমাদের নিজেদের স্বার্থ। চার শতকের বেশি সময় ধরে ঢাকা বুড়িগঙ্গার কাছ থেকে নিয়েছে—পথ, পানি, বাণিজ্য, জায়গা, পরিচয়, ইতিহাস। —এখন প্রশ্নটি খুব ছোট, কিন্তু উত্তরটি একটি মহানগরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে—আমরা কি বুড়িগঙ্গাকে শুধু ব্যবহার করব, নাকি তাকে বেঁচে থাকার সুযোগও দেব?

কোনো এক সন্ধ্যায় সদরঘাটে দাঁড়িয়ে নদীটির দিকে তাকালে হয়তো উত্তরটি আরও সহজ হয়ে যায়। নৌকা চলছে। মানুষ যাচ্ছে। শহর ব্যস্ত। তার নিচে একটি নদী এখনও বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে।—ঢাকা কি সেই চেষ্টা শুনতে পাচ্ছে?

এক মুহূর্ত নীরব থাকুন। কারণ যে শহর তার নদীর মৃত্যু দেখেও নির্বিকার থাকে, একদিন সেই শহরকেই নিজের বেঁচে থাকার মূল্য নতুন করে হিসাব করতে হয়।

লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#বুড়িগঙ্গা, #Buriganga, #ঢাকা, #Dhaka, #নদীদূষণ, #RiverPollution, #ঢাকারনদী, #WaterPollution, #RiverRestoration, #ClimateResilience, #UrbanEcology, #WasteManagement, #PlasticPollution, #Biodiversity, #অধিকারপত্র, #Odhikarpatra, #বাংলাদেশ, #Bangladesh