odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 24th March 2026, ২৪th March ২০২৬
অর্জনের শিখর ছুঁয়ে কেন অনিশ্চয়তায়—বিগত অন্তবর্তীকালীন সময়ে প্রাথমিক শিক্ষায় বাজেট কাটছাঁট ও অস্থিরতায় শিশুদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ধারাবাহিক যাত্রায় ছন্দপতন: গুরুগৃহ থেকে ৯৮% এনরোলমেন্ট—তারপর হঠাৎ পতন! বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা কোন পথে?

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২৪ March ২০২৬ ০২:৩৬

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২৪ March ২০২৬ ০২:৩৬

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার হাজার বছরের ইতিহাস, স্বাধীনতার পর অভূতপূর্ব সাফল্য এবং সাম্প্রতিক বাজেট সংকোচন, শিক্ষক আন্দোলন ও নীতিগত চ্যালেঞ্জে সৃষ্ট সংকটের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ। জানুন কেন ৯৮% এনরোলমেন্ট অর্জনের পরও আজ শিক্ষার ধারাবাহিকতা প্রশ্নের মুখে। ১.৭ কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কি অনিশ্চিত? বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাস, অর্জন ও সাম্প্রতিক ছন্দপতনের কারণ জানুন এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।

প্রাথমিক শিক্ষা শুধু বর্ণমালা নয়, একটি জাতির আত্মার আলো। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার এই ধারাবাহিক ইতিহাস প্রমাণ করে, কীভাবে হাজার বছরের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা আজ সার্বজনীন শিক্ষার স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছেছি। প্রাথমিক শিক্ষা ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্যের গল্প। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ইউনুস-নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে এই খাতের ধারাবাহিক অগ্রগতি থেমে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে প্রাথমিক শিক্ষায় ৩,৪১৬ কোটি টাকা কমানো, শিক্ষকদের ব্যাপক ধর্মঘট, সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক নিয়োগ বাতিল—এসব ঘটনায় দেশের ১ কোটি ৭০ লাখের বেশি প্রাথমিক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই প্রতিবেদনে আমরা দেখব কীভাবে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক চাপে প্রাথমিক শিক্ষার ছন্দ ভেঙে গেছে।

প্রতিটি শিশুর হাতে খড়ি দেওয়ার মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় একটি জাতির উত্থান। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা শুধু একটি শিক্ষাব্যবস্থা নয়—এটি আমাদের সভ্যতার ধারাবাহিকতার প্রতীক। প্রাচীন বৈদিক যুগের গুরুগৃহ থেকে শুরু করে আজকের ৯৮ শতাংশ নেট এনরোলমেন্টের যুগ পর্যন্ত এই যাত্রা বাধায় ভরা, কিন্তু অদম্য। আজ যখন আমরা ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ভিশন ২০৪১-এর কথা বলছি, তখন এই ইতিহাস স্মরণ করা জরুরি। কারণ প্রাথমিক শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নত হতে পারে না। এই প্রতিবেদনে আমরা খুঁজে দেখব সেই ধারাবাহিকতা—প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত।

প্রাচীন মধ্যযুগ: আত্মার উন্নয়ন থেকে মক্তব-পাঠশালার যুগ

প্রায় ৩০০০ বছর আগে, ঋগ্বেদ রচনার কাল থেকেই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে (তৎকালীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের অংশ) প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা। প্রাচীন যুগে শিক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল আত্মার উন্নতি। বৈদিক যুগে শিক্ষা ছিল ধর্মকেন্দ্রিক। বিদ্যালয় বলতে গুরুগৃহ বোঝাত। ব্রহ্মচর্য জীবন পাঁচ স্তরে বিভক্ত ছিল। পাঁচ বছর বয়সে ‘বিদ্যারম্ভ’ বা হাতে খড়ি—এটাই প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি। শিশু গুরুর বাড়িতে থেকে বর্ণমালা, আধ্যাত্মিক তত্ত্ব শিখত। শুধু ব্রাহ্মণরাই এই সুযোগ পেতেন; শূদ্র শিশুরা বঞ্চিত ছিল।

আরো পড়ুন: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা: অগ্রগতির ইতিহাস, না কি ফিরে আসা পাকিস্তানি ভূতের ছায়া? প্রাথমিক শিক্ষার ক্রমবিকাশ থেকে সংকট: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পাকিস্তানি ভূতের ফিরে আসা ও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আলো-অন্ধকার

ব্রাহ্মণ্য যুগে (খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দ) শিক্ষা আরও উন্নত হয়। উপনয়ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিশু গুরুগৃহে প্রবেশ করত। মৌখিক শিক্ষা প্রধান ছিল। অপরাবিদ্যা (মুখস্থ) ও পরাবিদ্যা (অর্থবোধ) বিভক্ত। গুরুগৃহ ছাড়াও গ্রামীণ গৃহশিক্ষক (গৃহী-শিক্ষক) শিক্ষা দিতেন।

ষষ্ঠ শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বে বৌদ্ধ যুগ এনে দেয় বিপ্লব। গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা অশিক্ষাকে পাপ বলে ঘোষণা করে। শিক্ষা সার্বজনীন ও গণতান্ত্রিক হয়। আট বছর বয়সে ‘প্রব্রজ্যা’ অনুষ্ঠানে শিশু মঠে প্রবেশ করত। চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং ও ই-সিং-এর বিবরণে জানা যায়, সাত বছর বয়সে শিশুরা ‘শিদ্ধিরত্ন’ বা সংস্কৃত বর্ণমালা শিখত, তারপর ব্যাকরণ, চিকিৎসা, যুক্তিবিদ্যা। পাল আমলে (৮ম-১২শ শতাব্দী) বিক্রমশীলা, নালন্দার মতো কেন্দ্রে প্রাথমিক স্তরও চলত।

মধ্যযুগে মুসলিম শাসন (১৩শ শতাব্দী থেকে, বখতিয়ার খিলজির বিজয়ের পর) মক্তব-মাদ্রাসা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। চার-সাত বছর বয়সে শিশুরা মক্তবে কুরআন, আরবি, ফারসি, হিসাব শিখত। হিন্দু শিশুরা পাঠশালায় যেত। সুফি পীর-ফকির খানকাহ চালাতেন। মুঘল আমলে আকবরের সময় পার্সিয়ান ভাষা প্রধান হয়। জমিদার-আমিররা দান করতেন। মক্তব-পাঠশালা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। এই যুগে শিক্ষা ধর্মীয় হলেও ব্যবহারিক—কৃষি, বাণিজ্য শেখানো হতো। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এখনও সীমিত ছিল।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগ: আধুনিকতার সূচনা কিন্তু সীমিত সাফল্য

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন শুরু। প্রাথমিক শিক্ষায় কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছিল না। ১৮১৩ সালের শিক্ষা আইন (লর্ড মিন্টো) এক লাখ টাকা বরাদ্দ করে, কিন্তু উচ্চশিক্ষায় ফোকাস। ১৮৩৫-৩৮ সালে উইলিয়াম অ্যাডামের তিনটি রিপোর্ট (বাংলা-বিহারের শিক্ষা জরিপ) প্রাথমিক শিক্ষার প্রথম আধুনিক দলিল। তিনি জেলাভিত্তিক তথ্য, মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক, ইন্সপেক্টর নিয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণের সুপারিশ করেন।

১৮৫৪ সালের উডস ডেসপ্যাচ ঐতিহাসিক। প্রতি প্রদেশে পাবলিক ইন্সট্রাকশন ডিরেক্টর, প্রাইমারি স্কুল, নর্মাল স্কুল (শিক্ষক প্রশিক্ষণ) স্থাপন। বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম। ১৮৮২ সালের হান্টার কমিশন জেলা বোর্ডকে দায়িত্ব দেয়। ১৯৩০ সালে বেঙ্গল প্রাইমারি স্কুল অ্যাক্ট—ছয়-এগারো বছর বয়সীদের জন্য চার বছরের বিনামূল্যে শিক্ষা। কিন্তু বাস্তবে সাফল্য সীমিত। গ্রামীণ এলাকায় পাঠশালা টিকে থাকলেও ইংরেজি-কেন্দ্রিক নীতি সাধারণ মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখে। ১৯৪৪ সালের সার্জেন্ট কমিশন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ শাসন শেষ হলে বাস্তবায়ন বন্ধ। এই যুগে প্রাথমিক শিক্ষা আধুনিক হয়, কিন্তু শুধু অভিজাতদের জন্য।

পাকিস্তান আমল (১৯৪৭-১৯৭১): বৈষম্য সীমিত অগ্রগতি

ভারত বিভাগের পর পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অংশ। ১৯৪৮ সালে এডুকেশন অ্যাডভাইজরি কমিটি প্রাথমিক শিক্ষা চার থেকে সাত বছর করে। ১৯৫৫-৬৬ প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিকের স্কিম। ১৯৫১ সালে বেঙ্গল পল্লী প্রাইমারি এডুকেশন অ্যাক্ট সংশোধন। ৫০০০ স্কুল ‘মডেল’ ঘোষণা, বাকিগুলো অ-মডেল। শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ। ১৯৫৯ সালের প্রথম শিক্ষা কমিশন ১৫ বছরে আট বছরের প্রাথমিকের সুপারিশ করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ববাংলায় বৈষম্য—বাংলা মাধ্যম অবহেলিত। শিক্ষা বাজেট কম, অবকাঠামো দুর্বল। ফলে এনরোলমেন্ট নিম্ন, ড্রপআউট উচ্চ। এই যুগে প্রাথমিক শিক্ষা অগ্রসর হয়নি বললেই চলে।

স্বাধীন বাংলাদেশ: জাতীয়করণ থেকে সার্বজনীনতার পথে

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা মৌলিক অধিকার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৪ সালে কুদরাত-ই-খুদা কমিশন রিপোর্ট—১৯৮০ সালের মধ্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক, ১৯৮৩ সাল নাগাদ আট বছর। ১৯৭৪ সালে ২৬,০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ—এটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) ও দ্বিতীয় (১৯৮০-৮৫)-এ ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-আইডিএ সহায়তায় ৪৪ থানায় ইউনিভার্সাল প্রাইমারি এডুকেশন (ইউপিই)। ১৯৮১ সালে প্রাইমারি এডুকেশন অ্যাক্ট—লোকাল এডুকেশন অথরিটি গঠন। ডিরেক্টরেট অব প্রাইমারি এডুকেশন (ডিপিই) স্থাপন। ১৯৯০ সালে প্রাইমারি এডুকেশন (কম্পালসরি) অ্যাক্ট পাস—১৯৯২ সালে ৬৮ থানায় চালু, পরে সারাদেশে। এটি ইতিহাসের মাইলফলক।

১৯৯০-এর পর: পিইডিপি যুগ এবং অভূতপূর্ব সাফল্য

১৯৯০-এর দশকে প্রাইমারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (পিইডিপি) শুরু। পিইডিপি-১ (১৯৯৮-২০০৪): ২৭টি প্রকল্প, ডেভেলপমেন্ট পার্টনারদের সমন্বয়। এনরোলমেন্ট ৬৮% থেকে বাড়তে শুরু। পিইডিপি-২ (২০০৪-২০১১), পিইডিপি-৩ ও ৪-এ সেক্টর-ওয়াইড অ্যাপ্রোচ (এসডব্লিউএপি)। ফল: নেট এনরোলমেন্ট ৯৮% (২০২৫ সালের তথ্য অনুসারে), কমপ্লিশন রেট ৮২%+, জেন্ডার প্যারিটি (মেয়েদের এনরোলমেন্ট ছেলেদের চেয়ে বেশি)।

ব্র্যাকের নন-ফরমাল প্রাইমারি এডুকেশন (১৯৮০-এর দশক থেকে) ১৪ লাখ শিশুকে শিক্ষা দিয়েছে—দরিদ্র, প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এনজিওর অবদান অপরিসীম। ১৯৯২ সালে মন্ত্রণালয় গঠন—মন্ত্রণালয় অব প্রাইমারি অ্যান্ড মাস এডুকেশন (এমওপিএমই)। ২০১০ ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসি: প্রাক-প্রাথমিক বাধ্যতামূলক, প্রাথমিক ক্লাস ৮ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ। ২০২৪ সালে আবার আলোচনা—ক্লাস ৮ পর্যন্ত প্রাথমিক করার উদ্যোগ।

আজ ৪৪,০০০+ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লাখ লাখ শিক্ষক। সাক্ষরতা হার ৭৫%+ (যুবকদের মধ্যে প্রায় ১০০%)। এমডিজি-২, এসডিজি-৪ অর্জনে বাংলাদেশ মডেল। কিন্তু চ্যালেঞ্জও আছে—শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো, কোয়ালিটি, ড্রপআউট (বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রতিবন্ধী শিশু), ডাবল শিফট, পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন।

ইউনুস সরকারের হাতে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের ছন্দপতন: বাজেট কাটছাঁট, শিক্ষক ধর্মঘট সৃজনশীলতার পিছু হটা

স্বাধীনতার পর থেকে প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল হয়ে উঠেছিল। পিইডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে নেট এনরোলমেন্ট ৯৮ শতাংশে উঠেছিল, জেন্ডার প্যারিটি অর্জিত হয়েছিল, সমাপ্তির হার বেড়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত ইউনুস সরকারের ১৯ মাসে (আগস্ট ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত) এই খাতে যে ছন্দপতন ঘটেছে, তা ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুস সংবিধান, নির্বাচন ও প্রশাসনিক সংস্কারে মনোযোগ দিলেও প্রাথমিক শিক্ষার মতো মৌলিক খাত উপেক্ষিত থেকে গেছে। ফলে এসডিজি-৪ (মানসম্মত শিক্ষা) অর্জনের পথে বড় বাধা সৃষ্টি হয়েছে।

বাজেট কাটছাঁট: উন্নয়নের মূল স্তম্ভ ভেঙে পড়া
সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে। প্রথমবারের মতো স্বাধীনতার পর বাজেট সংকুচিত হয়েছে—মোট ৭.৯ ট্রিলিয়ন টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ৩৫,৪০৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের (২০২৪-২৫) ৩৮,৮১৯ কোটি টাকা থেকে ৩,৪১৬ কোটি টাকা কম। শিক্ষা খাতের মোট বরাদ্দ মাত্র ১২ শতাংশ (জিডিপির ১.৭২ শতাংশ), যা ইউনেস্কোর সুপারিশকৃত ৪-৬ শতাংশের অনেক নিচে। সুদ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ শিক্ষার চেয়ে বেশি হয়ে গেছে।

এই কাটছাঁটের ফলে কী হয়েছে? নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ, ওয়াশব্লক, টিউবওয়েল স্থাপন—সবকিছুতে ধীরগতি। স্টাইপেন্ড ও বই বিতরণ কর্মসূচি সংকুচিত। প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বই বিতরণ ও ফিডিং প্রোগ্রামে বরাদ্দ কমায় দরিদ্র শিশুদের স্কুলে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় ‘স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার’-এর কথা বলা হলেও বাস্তবে বাস্তবায়নের অর্থ নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইএমএফ-এর চাপে এই ‘কনজারভেটিভ’ বাজেট মানবসম্পদ উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানের যে ধারাবাহিক উন্নতি চলছিল, তা থেমে গেছে।

শিক্ষক আন্দোলন: স্কুল বন্ধ, শিক্ষার্থীরা রাস্তায়
 বাজেট কাটছাঁটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষকদের ব্যাপক অসন্তোষ। ২০২৫ সালের মে মাস থেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা তিন দফা দাবিতে (বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি, সুবিধা) আন্দোলন শুরু করেন। মে মাসে হাজার হাজার শিক্ষক অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে যান। ডিসেম্বর ২০২৫-এ ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর ডাকে দেশব্যাপী স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়। লক্ষাধিক স্কুলের ক্লাস বন্ধ থাকায় লাখ লাখ শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।

২০২৫ সালের পুরোটা জুড়ে শিক্ষক আন্দোলন ছিল প্রধান ঘটনা। সরকারের আশ্বাস সত্ত্বেও দাবি অপূর্ণ থাকায় ধর্মঘট চলতে থাকে। ফলে শিক্ষার্থীদের লার্নিং লস বেড়েছে, বিশেষ করে দরিদ্র ও গ্রামীণ এলাকায়। একজন প্রাথমিক শিক্ষক নেতা বলেন, “আমরা সরকারের সংস্কারের অংশ হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বেতন-ভাতা না বাড়লে কীভাবে মানসম্মত শিক্ষা দেব?” এই অস্থিরতায় প্রাথমিক শিক্ষার যে গতি ছিল, তা একেবারে ভেঙে পড়েছে।

সংগীত-শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক নিয়োগ বাতিল: সেক্যুলার শিক্ষার পিছু হটা
 সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনা ঘটেছে ২০২৫ সালের নভেম্বরে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার নতুন শিক্ষক পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল—যা শিশুদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর বিরোধিতার মুখে সরকার নভেম্বরের ৩ তারিখে এই নিয়োগ বাতিল করে। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয় ‘পরিকল্পনার ত্রুটি’, কিন্তু বিশ্লেষকরা একে ‘ইসলামিস্ট চাপের কাছে নতি স্বীকার’ বলে অভিহিত করেছেন।

ছাত্র-শিক্ষকরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ করেন। একটি অপিনিয়ন পিসে লেখা হয়, “এটি দেশের সেক্যুলার ও সৃজনশীল চেতনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ।” প্রাথমিক শিক্ষায় হলিস্টিক অ্যাপ্রোচের যে আশা জেগেছিল, তা এক রাতে শেষ হয়ে যায়। এই সিদ্ধান্ত শুধু শিক্ষার গুণগত মানই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

সংস্কারের প্রতিশ্রুতি vs বাস্তবতা: ‘টু লিটল, টু লেট
 ইউনুস সরকার শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করলেও প্রাথমিক স্তরে বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষকদের ক্যারিয়ার পাথ, উপজেলা-স্তরের বিকেন্দ্রীকরণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ—কোনোটাই অগ্রসর হয়নি। দ্য ডেইলি স্টারের এক সম্পাদকীয়তে (জানুয়ারি ২০২৬) বলা হয়েছে, “শিক্ষা সংস্কার: অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে টু লিটল, টু লেট।” মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দ্রুত পরিবর্তন (বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারসহ একাধিক উপদেষ্টা) এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। ফলে ড্রপআউট বেড়েছে, লার্নিং আউটকাম কমেছে।

প্রভাব: শিশুদের ভবিষ্যৎ জাতির ক্ষতি
এই ছন্দপতনের সবচেয়ে বড় শিকার দেশের শিশুরা। গ্রামীণ এলাকায় স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুশ্রম ও বিবাহ বেড়েছে। শহরে ডাবল শিফট স্কুলগুলোতে অবকাঠামোর অভাবে শিক্ষার মান পড়েছে। দরিদ্র শিশুরা স্টাইপেন্ড না পেয়ে ঝরে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই প্রজন্ম যদি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা না পায়, তাহলে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশের মানবসম্পদ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

বর্তমান ভবিষ্যৎ: চ্যালেঞ্জ জয় করে স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য হারানো গতি ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব
 ইউনুস সরকারের হাতে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের যে ছন্দপতন ঘটেছে, তা শুধু বাজেট বা আন্দোলনের ফল নয়—এটি অগ্রাধিকারের অভাব ও রাজনৈতিক চাপের ফল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই খাতকে আবার গতিতে ফিরিয়ে আনা। বাজেট বাড়াতে হবে, শিক্ষকদের দাবি মানতে হবে, সৃজনশীল শিক্ষা ফিরিয়ে আনতে হবে। না হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আলো নিভে যাবে। প্রাথমিক শিক্ষা কোনো সরকারের নয়—এটি জাতির সম্পদ। ইউনুস আমলে হারানো ছন্দ ফিরিয়ে না আনলে সেই সম্পদের ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে থাকবে।

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, প্রাথমিক শিক্ষা এখন আর শুধু পড়া-লেখা নয়—ডিজিটাল স্কিল, মানবিক মূল্যবোধ, আইসিটি। সরকারের চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রোগ্রাম চলছে। কিন্তু শিক্ষকদের মোটিভেশন, ইনক্লুসিভ এডুকেশন, ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যাডাপটেশন—এসব নতুন চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে ক্লাস ৮ পর্যন্ত একীভূত, ফ্রি, কম্পালসরি শিক্ষা; প্রতি গ্রামে ডিজিটাল ক্লাসরুম; শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৩০-এ নামিয়ে আনা।

এই ধারাবাহিক ইতিহাস আমাদের শেখায়—সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সাফল্য আসে। প্রাচীন গুরুরা যেমন জ্ঞানের আলো জ্বালিয়েছিলেন, ব্রিটিশ আমলে অ্যাডাম-উড যেমন ভিত্তি গড়েছিলেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যেমন জাতীয়করণ করেছিলেন, তেমনি আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব এই আলোকে আরও উজ্জ্বল করা। প্রাথমিক শিক্ষা যদি সবার হয়, তাহলে বাংলাদেশ সত্যিই স্মার্ট ও উন্নত হবে।

এই যাত্রা চলবে—প্রতিটি শিশুর মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা: অতীতের গৌরব, বর্তমানের অগ্রগতি, ভবিষ্যতের আশা।

(প্রতিবেদনটি সাম্প্রতিক সরকারি বাজেট দলিল, দৈনিক পত্রিকা ও শিক্ষক সংগঠনের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি।)

 অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#প্রাথমিকশিক্ষা #শিক্ষাসংকট #বাংলাদেশ #শিক্ষাব্যবস্থা #ঝরেপড়া #শিক্ষকসংকট #শেখমুজিব #শেখহাসিনা #২০২৪শিক্ষা #শিক্ষানীতি #বাংলাদেশশিক্ষা #শিক্ষা-সংস্কার  #EducationCrisis #BangladeshEducation #DropoutCrisis #SDG4 #EducationPolicy #শিশুরভবিষ্যৎ #SaveEducation #EducationEmergency #FutureAtRisk #EducationReform



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: